জুলে, আবার, জুলে লাদাখ – প্রথম পর্ব

মর্মে যবে মত্ত আশা
সর্পসম ফোঁসে
অদৃষ্টের বন্ধনেতে
দাপিয়া বৃথা রোষে
তখনো ভালোমানুষ সেজে
বাঁধানো হুঁকা যতনে মেজে
মলিন তাস সজোরে ভেঁজে
খেলিতে হবে কষে!
অন্নপায়ী বঙ্গবাসী
স্তন্যপায়ী জীব
জন-দশেকে জটলা করি
তক্তপোষে ব’সে।

ভদ্র মোরা, শান্ত বড়ো,
পোষ-মানা এ প্রাণ
বোতাম-আঁটা জামার নীচে
শান্তিতে শয়ান।
দেখা হলেই মিষ্ট অতি
মুখের ভাব শিষ্ট অতি,
অসল দেহ ক্লিষ্টগতি–
গৃহের প্রতি টান।
তৈল-ঢালা স্নিগ্ধ তনু
নিদ্রারসে ভরা,
মাথায় ছোটো বহরে বড়ো
বাঙালি সন্তান।

ইহার চেয়ে হতেম যদি
আরব বেদুয়িন!
চরণতলে বিশাল মরু
দিগন্তে বিলীন।
ছুটেছে ঘোড়া, উড়েছে বালি,
জীবনস্রোত আকাশে ঢালি
হৃদয়তলে বহ্নি জ্বালি
চলেছি নিশিদিন।
বর্শা হাতে, ভর্‌সা প্রাণে,
সদাই নিরুদ্দেশ
মরুর ঝড় যেমন বহে
সকল বাধাহীন।

=========================

তখন আমার প্রায় জ্ঞান ছিল না।
ট্যাক্সি ডাকা হল একটা, দুজন দু দিক থেকে আমাকে ধরে আছে, তখন আমার মুখ ঢাকা সার্জিকাল মাস্কে। নিজের পায়ে চলার ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছি তখন।
… ট্যাক্সি গড়িয়ে চলল, কোথায় যাচ্ছে, কতক্ষণ ধরে যাচ্ছে, আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না, কেমন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে চোখে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। এভাবেই কি মৃত্যু আসে?

=========================

রবি ঠাকুরের কবিতা দিয়ে বেড়ানোর গপ্পো শুরু করা – খুবই ন্যাকা ন্যাকা স্টার্টিং হয়ে গেল হয় তো – কিন্তু রাস্তায় প্রথম নামার আগে এই কবিতাটা যে কতবার মনে মনে আবৃত্তি করেছি, তার ইয়ত্তা নেই। লেখা শুরু করতে গিয়েও তাই প্রথমেই মনে হল, রবীন্দ্রনাথের এই কটা লাইন দিয়েই শুরু করি।

অবিশ্যি, শুরুরও শুরু থাকে। ভণিতা করার ছলে একটু নিজের ঢাক পিটিয়ে নিতে কে-ই বা না চায়? এমন তো নয় যে আপনাদের খুব তাড়া আছে, আমি ডায়েরি খুলে বললাম, এই যে এত তারিখে সকালবেলায় স্টার্ট করলাম, দিনের শেষে অমুক জায়গায় পৌঁছলাম, আর দ্বাদশ দিনে ফিরে এলাম। ও রকম ট্র্যাভেলগ মশাই আপনারা শয়ে শয়ে পাবেন। আমি কম পড়ি নি এমন ভ্রমণকাহিনি। পড়তে মন্দ লাগে না ঠিকই, তবে একই রাস্তায়, হাজারটা লোক হাজারবার গেলেও প্রতিটা ভ্রমণে তার থেকে আলাদা গল্প তৈরি হয়।

এই গল্প, শুধুই আমার কয়েকদিনের ভ্রমণের বিবরণ নয়। এটা আমার, “আমি” হয়ে ওঠার গল্প।

যে আমি আসলে অন্য রকম ছিলাম।

সাধারণ, আর পাঁচটা বাঙালি ছেলে যেমন হয়, ঠিক তেমনই।

… মোটরসাইকেল চালাতে শিখেছিলাম সেই দু হাজার সালে, প্রথম চাকরি পেয়ে প্রথম বাইক কেনা, তাতেই শেখা। মূল উদ্দেশ্য ছিল অফিস যাওয়া আর আসা। আর ছুটিছাটার দিনে দোকানটা বাজারটা সেরে আসা।

তখন থাকতাম ভুবনেশ্বরে। নতুন চাকরি, ছোট্ট শহর, চারপাশে চওড়া চওড়া রাস্তাঘাট, কিন্তু কখনও মনে হয় নি এই শহরের সীমানা পেরিয়ে আরেকটু দূরে, এই মোটরসাইকেলটা নিয়েই টুক করে কোথাও ঘুরে আসা যেতে পারে। মনে আছে, একবার কী কারণে কটক যাবার দরকার হয়েছিল, কারুর সাথে একটা দেখা করবার ব্যাপার ছিল। আমার রুমমেট, যে আমাকে মোটরসাইকেল চালানো শিখিয়েছিল, সে আর আমি মিলে ঘুরে এসেছিলাম কটকে। মাত্রই পঁচিশ কিলোমিটারের দূরত্ব, আমার এখনকার অফিস থেকে বাড়ির দূরত্ব তার থেকে বেএশ খানিকটা বেশি, তবু তখন ঐটুকুতেই মনে হয়েছিল বিশ্বজয় করে এলাম। … ইচ্ছে হয় নি বলব না, এক উইকেন্ডে ইচ্ছে হয়েছিল, বাইক নিয়ে কেন পুরীটা ঘুরে আসছি না? মাত্রই তো ষাট কিলোমিটার।

ততদিনে অবিশ্যি বার দশেক পুরী ঘুরে আসা হয়ে গেছে। বাসে চেপে। ভবিষ্যতেও আরও তিন চারবার গিয়ে উঠতে পেরেছিলাম পাকাপাকি ঊড়িষ্যার পাট (তখনও ওড়িশা হয় নি) চুকিয়ে আসার আগে, কিন্তু সেই যে সেদিন মনে ইচ্ছে নিয়ে শনিবারের সকালে বেরিয়েছিলাম পুরীর উদ্দেশ্যে, নিজের বাইক চালিয়ে, সেই অ্যাডভেঞ্চারাস জার্নি ভুবনেশ্বর শহরের চৌহদ্দিও পেরোতে পারে নি।

বাইক নিয়ে একটু এগোতেই, স্টেশনের কাছে, মাস্টার ক্যান্টিন এলাকায় আমার ঠিক সামনে জাবর কাটতে কাটতে উদয় হল এক ষাঁড়, আর আমি বাইকের গতি সামলাতে না পেরে মারলাম গিয়ে সেই ষাঁড়ের পেটে এক গোঁত্তা। ষাঁড়ের কিছু হয়েছিল কিনা সে আর আমার জানা হয় নি, তবে আমার হয়েছিল বিস্তর। বেকায়দায় পড়ে গিয়ে বাঁ-কনুইয়ের হাড় লক্‌ হয়ে গেছিল কিছুদিনের জন্য, বাঁ-হাতখানা না সোজা করতে পারি, না পুরো ভাঁজ করতে পারি।

সেরে উঠেছিলাম ঠিকই, তবে আমার অ্যাডভেঞ্চার করার মানসিকতার, তখনকার মত সেখানেই ইতি।

তার পর তো বিয়ে করলাম, চাকরি বদলালাম, আর ঊড়িষ্যা ছেড়ে দিল্লিতে স্থিতু হলাম। আর পাঁচটা বাঙালি ছেলে যেভাবে গার্হস্থ্যের পথে এগোয়, সেইভাবে আমিও পুরোপুরি সংসারীই হয়ে গেলাম। মনে আছে, যেদিন প্রথম নয়ডার অফিস ছেড়ে আমার পরের প্রোজেক্টে আমাকে গুরগাঁও অফিসে জয়েন করতে বলা হল, আমি ভ্যাক করে কেঁদে ফেলেছিলাম। উরেবাবা। গুরগাঁও? সে যে অনেক দূর!

যখনকার কথা বলছি, তখনও গুরগাঁওয়ের রাস্তায় একটাও ফ্লাইওভার তৈরি হয় নি, তৈরি হবার কাজ সবে শুরু হয়েছে – এখানে খোঁড়া, ওখানে ডাইভার্সন, সে এক পুঁদিচ্চেরি ব্যাপার হত অফিস টাইমে। লাখে লাখে গাড়ি, এদিকে এইটুকুনি সরু যাবার রাস্তা, জুন মাসের গরমে সেদ্ধ হতে হতে গুরগাঁও পৌঁছনো এবং রাতের দিকে এন এইচ এইটে পাগলের মত চলতে থাকা ট্রাকগুলোর মাঝখান দিয়ে প্রাণ হাতে করে ফেরা – সে এক ক্যাডাভ্যারাস ব্যাপার ছিল। প্রায় প্রতিদিনই মনে হত, এই শেষ, আর পারব না কাল থেকে।

শেষমেশ সেই চাকরিই ছেড়ে দিয়ে নয়ডাতে একটা লোকাল কোম্পানি জয়েন করে ফেলেছিলাম, এতটাই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল দৈনিক ঐ চল্লিশ-চল্লিশ আশি কিলোমিটারের যাত্রা।

আশি, খুব বেশি হলে একশো। একদিনের পক্ষে এটাই আমার সবচেয়ে বড় দূরত্ব – যেটা আমি বাইকে চেপে পার করেছি।

কীভাবে হল বদল?

ধীরে, বন্ধু ধীরে। সব বলব। বলব বলেই তো বসেছি।

আধা শহর ভুবনেশ্বর ছেড়ে পুরোদস্তুর শহর দিল্লিতে বাসা বাঁধলাম। চোখের সামনে দিল্লিকে বদলাতে দেখলাম তিলে তিলে, আমার সেই ভুবনেশ্বরের মোটরসাইকেলও একদিন চুরি হয়ে গেল আমাদের আবাসনের পার্কিং লট থেকে, সে গল্পও আপনাদের আমি শুনিয়েছি আমার আগের বইতে। এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু – প্রথম বাড়ি, প্রথম গাড়ি, প্রথম এবং একমাত্র সন্তান – দিয়েছে অনেক।

নিয়েছেও কিছুটা। আমার ফুসফুসের এক তৃতীয়াংশ।

এক বছর ধরে যে ব্যাকটেরিয়ারা বাসা বেঁধেছিল আমার বুকে, তাদের আইডেন্টিফাই পারেন নি আমার চারপাশের নামকরা সব হাসপাতালের এবং ডিসপেন্সারির ডাক্তারেরা। শুকনো কাশি ক্রমে পরিণত হল সর্বক্ষণের কফ-বসা ঘড়ঘড়ানিতে, কফের রঙ পাল্টালো, আমার শরীরের ওজন কমতে কমতে চল্লিশ কিলোরও নিচে নেমে যাবো যাবো হল, ঘড়ির ব্যান্ডে নতুন ফুটো করতে হল হাতে আটকাবার জন্য, প্যান্টের কোমরের ঘের কমাতে হল, তবু রোগ ধরতে পারলেন না কেউ।

কার যেন উপদেশে হোমিওপ্যাথিতে শিফট করেছিলাম। তিনিও লাগাতার দু মাস ধরে সাদা পাউডার খাওয়ালেন। পরিস্থিতির উন্নতি হল না। অবশেষে একদিন তিনি দেখা দিলেন।

কাশির দমক এবং কফের সাথে রক্তের ছিটে।

ততদিনে প্রায় সাত মাস কেটে গেছে। বেগতিক বুঝে এইবারে হোমিওপ্যাথি ডাক্তারই আমাকে কয়েকটা স্পেসিফিক টেস্টের পরামর্শ দিলেন। টেস্টের রেজাল্ট এল এক শনিবার, যা ভাবা গিয়েছিল তাইই। টিবি, এবং প্রায় টার্মিনাল স্টেজ। হোমিওপ্যাথি ডাক্তার বললেন, এ তো আর আমার হাতে নেই, এইবারে আপনি চেস্ট স্পেশালিস্টকে দেখান, রিপোর্টগুলো সাথে নিয়ে যান।

আজ প্রায় কত বছর যেন হয়ে গেল, পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে আছে সেই সব দিনগুলোর কথা। হাসপাতালে যাবো বলে রেডি হচ্ছি, হঠাৎ কাশির দমক এল, বাথরুমে গিয়ে গলা ঝেড়ে সাফ করতে গিয়ে হড়হড়িয়ে বেরিয়ে এল তাজা রক্ত, একেবারে অফুরন্ত স্রোত।

নিজেকে কোনওভাবে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে নিয়ে গিয়ে ফেললাম বিছানায়। হার্টবীট তখন ক্ষীণ হয়ে এসেছে, চোখে অন্ধকার দেখছি, আর মনে হচ্ছে, এই শেষ। এত কিছু বাকি রয়ে গেল, আমার জীবন, আমার সংসার, আমার স্ত্রী, মেয়ে –

যাবার কথা ছিল নয়ডার কৈলাস হাসপাতালে, সে প্ল্যান বাদ দিয়ে প্রথমে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল বাড়ির সবচেয়ে কাছের হাসপাতালে। সেখানে এক ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পরে তাঁরা সুমধুর স্বরে আমাকে ভর্তি নিতে অস্বীকার করলেন। বদলে একটা ওষুধের নাম লিখে দিয়ে বললেন, দিল্লির অমুক জায়গায় টিবি রিসার্চ ইনস্টিট্যুট আছে, সেইখানে নিয়ে যান।

যাওয়া হল। সে মোটামুটি নরকের আগের স্টেশন। চারপাশে আরও অসংখ্য টিবি রোগী বসে আছে ডাক্তারের প্রত্যাশায়, সামনে যে বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে, তার জানলায় পাল্লা নেই, ভেতরে টিনের খাটে কোনও তোষক নেই। চারপাশে ভর্তি রক্তমাখা তুলো-গজ-ব্যান্ডেজ, এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটনো, সেইগুলো মুখে করে নিয়ে ইতিউতি ঘুরছে কুকুর। ডাক্তারের কোনো দেখা নেই কোথাও।

ডাক্তারের অপেক্ষায় আর বসে না থেকে ফিরতি রাস্তা নেওয়া হল নয়ডার দিকে, কৈলাস হাসপাতাল। সেখানে আমাকে একটা বেডে ভর্তি নেওয়া হল বটে, কিন্তু জানানো হল, ফাইনাল ডিসিশন নেবেন চিফ মেডিকেল অফিসার।

অফিসার এসেছিলেন সন্ধ্যের দিকে, এবং তিনি আমাকে দেখেনও নি, রোগের বিবরণ শোনামাত্র তিনি হুকুম দেন, ইনফেকশাস ডিজিজের জন্য “সেপারেশন ওয়ার্ড”এর প্রভিশন তো নেই এখানে, তাই আমাকে যেন তক্ষুনি তক্ষুনি উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কৈলাস হাসপাতাল আমাকে ভর্তি নিতে অপারগ।

ততক্ষণে প্রায় নির্জীব আমার শরীর থেকে আরও বেশ খানিকটা রক্ত বেরিয়ে গেছে কাশির দমকের সাথে। অত্যন্ত সহানুভূতিহীন ভাবে নার্সরা আমাকে বের করে নিয়ে যেতে বললেন, হেডনার্স কাকে যেন হুকুম দিলেন গোটা ঘরটা স্টেরিলাইজ করার, অবশ্য যাবার আগে একদিনের বেড চার্জ দাবি করতে ভোলেন নি তাঁরা।

মৃতপ্রায় অবস্থায়, অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য জানোয়ার হিসেবে অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে কেমন লাগে, জানেন? আমি জেনেছি। হয় তো প্রয়োজনীয় নয়, তবু বলে রাখি, এটি নয়ডার একটি অন্যতম নামী হাসপাতাল, বর্তমান কেন্দ্রীয় পর্যটনমন্ত্রী শ্রী মহেশ শর্মা এই হাসপাতালটির মালিক। আরও একটু জানিয়ে রাখাও দরকার, যখনকার কথা বলছি, তখনও টিউবারক্যুলোসিস নিয়ে সেই অর্থে গণসচেতনতা গড়ে ওঠে নি। টিবি রোগীকে প্রায় কুষ্ঠ রোগীর মতই ট্রিট করা হত। এখনও হয় অবশ্য, তবে সেই সময়ের মত অত ব্যাপকভাবে নয়।

যাক, রোগের গল্প শুনিয়ে আপনাদের আর বিব্রত করব না – সেই রাত কোনও রকমে ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়িতে কাটিয়ে পরদিন গাজিয়াবাদের ইন্টিরিয়রে এক দেবতুল্য ডাক্তারের সান্নিধ্যে যখন আমাকে তুলে দেন বাড়ির লোকেরা, আমি তখন আধা বেহুঁশ। কীভাবে যে সেই ডাক্তারের খোঁজ পাওয়া গেছিল, কীভাবে পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকা সম্পূর্ণ অপরিচিত তামিল ভদ্রলোক আমাকে ধরে ধরে ট্যাক্সিতে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছিলেন, আর কীভাবে আমি সেদিন রাজনগর গাজিয়াবাদের সেই ছোট্ট হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছেছিলাম, এখন আর মনে পড়ে না। আধা অচেতন, শ্বাস হালকা হয়ে এসেছে, চোখের সামনে চাপ চাপ অন্ধকার।

মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিলাম। ঘোরের মধ্যে শুনতে পাচ্ছিলাম কয়েকটা কথা – টার্মিনাল স্টেজ … কথা দিতে পারছি না … আর এক দু দিন দেরি করলেই …

ডাক্তার প্রথম আমার মুখ থেকে মাস্কটা খুলে ফেললেন, আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, চীয়ার আপ দোস্ত, কিচ্ছু হয় নি তোমার। মুখ ঢেকে রেখেছিলে কেন? কে বলেছে তোমাকে, মুখ না ঢেকে রাখলে টিবির ইনফেকশন ছড়ায়? চলো, এখন কদিন তুমি আমার মেহমান।

লাগাতার ন দিন যমে মানুষে টানাটানির পর নতুন জীবনের রসদ নিয়ে ফিরেছিলাম। এক বছর ওষুধ চলেছিল এর পরে। একদম খাদের ধার থেকে ইউ-টার্ন নিয়ে ফিরে আসা কী জিনিস, সে আমি নিজেকে দিয়ে বুঝেছি।

আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ সুস্থ হলাম, ওজন বাড়ল, চেহারা ভালো হল আস্তে আস্তে। ওষুধের প্রভাব নাকি – সেই, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে ফেলার প্রভাব, জানি না, একটা সময়ে বুঝতে পারলাম, আমার মানসিকতা, আমার স্ট্যামিনার পরিবর্তন ঘটেছে। আমি কোনওদিনই খেলাধূলোর ধারকাছ দিয়ে ঘেঁষিনি, ছোটাছুটি আমার পোষাত না বলে ছোটবেলায় জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া ফুটবল মাঠে আমি গোলকিপার হতাম, সাঁতার শিখেছিলাম দীর্ঘ চার বছর কিন্তু কোনওদিন কোনও কম্পিটিশনে থার্ডও হতে পারি নি, সান্ত্বনা পুরস্কার নিয়েই খুশি থাকতাম, দমে কুলোত না, সেই আমি কী রকম বুঝতে পারছিলাম, আমার ভেতর থেকে একটা নতুন প্রাণশক্তি জন্ম নিচ্ছে।

লাদাখ ভ্রমণ, মোটরসাইকেলে করে অনেক অনেক দূর যাওয়া – এ স্বপ্ন ঠিক কবে কী করে দেখতে শুরু করেছিলাম, এখন মনে নেই – বোধ হয় ইন্টারনেটে অবসর সময়ে এদিক ওদিক পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ করে চোখে পড়ে যায় ঝকঝকে বরফে ঢাকা পাহাড় আর চোখ-ধাঁধানো পাহাড়ি হ্রদ আর নীল আকাশের ছবি। পড়তে শুরু করি। দিল্লির কোনও এক ছেলে, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসে, কয়েক মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, সে-ও বন্ধুর সঙ্গে লাদাখ বেড়াতে যাবে – সেই গল্প।

অফিসে মিথ্যে কথা বলে, ছেলেটা উঠে পড়েছিল চণ্ডীগড়গামী বাসে, বন্ধুর সাথে। সেখান থেকে মানালি। সেখানে গিয়ে মোটরসাইকেল ভাড়া করে, তার পরে সে এক রোমহর্ষক গল্প।

সেই গল্প শেষ করে আমি পরের ট্র্যাভেলগটা ধরি, তার পরে আরও একটা, আরও, আরও … পড়তে পড়তে কখন যেন মনের মধ্যে বসে যায় ইচ্ছেটা, আমাকেও যেতে হবে।

“পারবো না” – বলে ভাবতে পারি নি কখনও। আমি শুধু জেনেছিলাম, আমাকে এটা পারতে হবে। এবং নান্যপন্থা বিদ্যতে।

২০১২তে একবার ভেবেছিলাম বেরিয়ে পড়ব, ততদিনে এত বেশি ট্র্যাভেলগ পড়ে ফেলেছি – লেহ্‌-লাদাখের প্রায় প্রতিটি রাস্তা, না-গিয়েও আমার পুঙ্খানুপুঙ্খ মুখস্থ। বেরিয়েছিলাম বটে, তবে সে ছিল নিতান্তই ফ্যামিলি ট্রিপ। আর ফ্যামিলি মানে ফ্যামিলির হদ্দমুদ্দ – সঙ্গে ছিল আরেক ফ্যামিলি। চৌহান অ্যান্ড কোং।

মোটরসাইকেলে করে লাদাখ যাবো – এ কথা বলতেই প্রথমত স্ত্রী বললেন, আঁমরাঁ কেঁন বাঁদ যাঁবো? মোটরসাইকেলে যে পুরো ফ্যামিলিকে নিয়ে যাওয়া যায় না, সেটা বার কয়েক বুঝিয়েও বিশেষ লাভ হল না। বিস্তর আকচাআকচির পরে ঠিক হল, এইবারে ফ্যামিলি ট্রিপ হোক, আমার তরফে পুরো জায়গাটার একটা রেকি করে আসাও হবে, তার পরে আমি আরেকবার না হয় নিজে নিজে যাবো।

তা ঘুরে এসেছিলাম। প্রায় মিলিটারির আতিথ্যে (সিকিনীর তখনকার চাকরির সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনির একটা নিবিড় যোগাযোগ ছিল আর কি) প্রথমে ফ্লাইটে করে শ্রীনগর, তার পরে বাই রোড লেহ্‌ ঘুরে লেহ্‌ থেকে আবার ডিরেক্ট ফ্লাইটে আমরা দিল্লি ফিরেছিলাম। ভালোয় মন্দয় মিশিয়ে সে এক যাত্রা হয়েছিল বটে, তবে সে বেড়ানোর গল্প আমি লিখতে বসি নি আজ।

এক অসম্পূর্ণ মুগ্ধতা নিয়ে আমি ফিরে এসেছিলাম, দু হাজার বারো সালের সেই জুন মাসে, আর আসার আগে আমি নীরবে লেহ্‌-কে কথা দিয়ে এসেছিলাম, আমি আসবো, আবার। আসবোই তোমার কাছে ফিরে।

বহুদিনের লালিত আশা ছিল, সে তো এখন সবাইই জানে। ফিরে এসে আরও দ্বিগুণ উৎসাহে যতরকমভাবে যত জায়গা থেকে ট্রাভেলগ পাওয়া যায়, সব পড়ে ফেলতে শুরু করেছিলাম। যা যা জানা দরকার সমস্ত জেনেছিলাম। দু হাজার চোদ্দ সালে একটা সুযোগ নিয়েছিলাম, কিন্তু অফিস এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন কারণে তা আর হয়ে ওঠে নি।

আমিও বিশেষ জোর দিই নি, কারণ দু হাজার তেরোর ডিসেম্বরে, শুধুমাত্র লাদাখ যাবার জন্যেই কিনেছিলাম নতুন বাইক – পালসার 200NS। সেটা তখনও ফ্রি সার্ভিসিংয়ের পিরিয়ডের মধ্যে ছিল, তাই সে বছরে আর রিস্ক নিই নি। সম্পূর্ণ সার্ভিসিং শেষ হবার আগে আমি বেরোতে চাইছিলাম না। অতএব, টার্গেট, দু হাজার পনেরো।

এল দু হাজার পনেরো। ফেব্রুয়ারি মাস যখন যাই যাই করছে, তখন থেকেই মনে আবার চাগাড় দিয়ে উঠল সেই ইচ্ছে, বেরোতেই হবে।

কপালের অনেক দোষে আমার চাকরিটা আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে। এক অদ্ভূত ছানাকাটা ইন্ডাস্ট্রি, যেখানে … না থাক। কী হবে আর অফিসের গল্প করে! অফিসে প্রচণ্ড খারাপ সময় যাচ্ছিল তখন, ছুটি পাবো কিনা, পেলেও আদৌ যাওয়া হবে কিনা – এ নিয়ে দোলাচল ছিল প্রায় শেষদিন পর্যন্ত।

বেরোতে গেলে কারুর সঙ্গে টিম আপ করতে হয়, তারও ছুটিছাটার ব্যাপার থাকে, কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটার ব্যাপার থাকে, খুব দোলাচলে ভুগছিলাম শেষদিকটা। অসম্ভব রেস্টলেস লাগছিল – এবারেও কি হাত ফসকে বেরিয়ে যাবে সুযোগটা?

আইটিতে লোকের এনগেজমেন্ট হয় প্রজেক্টে, তো আমিও ছিলাম সে রকমই একটি ঘোড়াড্ডিম প্রজেক্টে। আইটির বাইরে অন্য ভুবন তো দেখা হয় নি বিশেষ, তবে আইটিতে যে খচ্চর লোকের সংখ্যা কম নেই, সেটা সেই বছরেই একটু বেশি বেশি করে যেন বুঝেছিলাম। যত বড় কর্পোরেট তত বেশিমাত্রায় গাধা এবং খচ্চরদের ভিড় হয়। টাই পরে, স্যুট পরে, ইংরেজি বলে এবং বুকের ভেতর হাইড্রেনের পাঁক এবং উনিশ শতকীয় সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে এঁরা প্রজেক্ট টিম পরিচালনা করেন, যাঁদের ডাকা হয় “প্রজেক্ট ম্যানেজার” নামে।

দু হাজার পনেরোর এপ্রিল মাসের বাইশ তারিখে আমার রিলিজ হল সেই রকমের একটা বিষাক্ত দুর্গন্ধময় প্রজেক্ট থেকে, বেরোবার সাথে সাথে একগাদা লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার প্রোফাইলের ওপর, আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে যেমন হয় আর কি, কেউ আমায় পাঠাতে চায় লন্ডনে, কেউ বেলজিয়ামে, কেউ জোহানেসবার্গে, তো কেউ চেন্নাইতে।

কিন্তু ততদিনে মননে, শরীরে জমেছে অনেক বিষ। কর্পোরেট জগতের বিষ, সামন্ততান্ত্রিক ভারতীয় মানসিকতা সহ্য করে চলার বিষ, মাসের শেষে একটা ভদ্রগোছের মাইনে অ্যাকাউন্টে পেতে গেলে যে সমস্ত বিষ সইতে হয়, সেই সমস্ত বিষে তখন আমি জর্জরিত।

বিষ নামাতে হবে।

থিতু হয়ে ঝেড়েবেছে একটা প্রজেক্ট অ্যাকাউন্টে মনোনিবেশ করতে করতেই হয়ে গেল মে মাসের পনেরো তারিখ। ততদিনে আমার প্ল্যান ছকা সারা। বেরোবার ছিল ছয়ই জুন সকালে।

Day Date Journey Distance
শনিবার দিল্লি – জম্মু ৬০০ কিমি
রবিবার জম্মু-শ্রীনগর ৩১০ কিমি
সোমবার শ্রীনগর-কারগিল ২৬৫ কিমি
মঙ্গলবার কারগিল-লেহ্‌ ২৪০ কিমি
বুধবার লেহ্‌-তে ঘোরাঘুরি, অ্যাক্লাইমেটাইজেশন ০ কিমি
বৃহস্পতিবার লেহ-ডিস্কিট ১২৫ কিমি
শুক্রবার ডিস্কিট-পানামিক-লেহ্‌ ১৯০ কিমি
শনিবার বিশ্রাম, লেহ্‌ শহর দর্শন ৫০ কিমি
রবিবার লেহ্‌-প্যাংগং লেক ২২০ কিমি
১০ সোমবার প্যাংগং-মারসিমিক লা হয়ে লেহ্‌ ২৭০ কিমি
১১ মঙ্গলবার লেহ্‌-সো মোরিরি ১৯০ কিমি
১২ বুধবার সো মোরিরি-সারচু ২৩০ কিমি
১৩ বৃহস্পতিবার সারচু-মানালি ২২৫ কিমি
১৪ শুক্রবার মানালি-দিল্লি ৫৫০ কিমি
১৫ শনিবার বাফার দিন

তা হলে কি হবে না? নতুন প্রজেক্টে জয়েন করেই সাথে সাথে দু সপ্তাহের ছুটি নিতে চাইলে লোকে জাস্ট ক্যালাবে। তবুও, তৎসত্ত্বেও, তাও, খুব ঠাণ্ডা মাথায় নতুন প্রজেক্ট অ্যাকাউন্টের লোকজনের সাথে নেগোশিয়েশন চালাতে থাকলাম, সাথে সাথে পার্টনারও খুঁজতে থাকলাম।

অ্যাকাউন্ট ম্যানেজারটি প্রায় আমারই বয়েসী, আমার বেড়াবার প্ল্যানের কথা শুনে নিজেই খুব দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল – আরে ইয়ার, এ তো দারুণ প্ল্যান বানিয়েছো, আমি ইন্ডিয়াতে থাকলে আমিও তোমার সাথে বেরিয়ে পড়তাম।

যথাসম্ভব বিনয়ী হয়ে বললাম, বললাম – বস, এটা আমার ড্রিম ট্রিপ, তুমি যদি ‘না’ করো – তো, কী আর বলব, অফিশিয়ালি আমি কিছু মনে করব না, কিন্তু ঐ আর কি, স্বপ্নটা রয়ে যাবে – আজ নেহি তো ফির কভি। দ্যাখো কী করা যায়।

ম্যানেজার বলল, ঠিক আছে, তুমি ছুটি অ্যাপ্লাই করো, আমি কথা বলে রাখছি – তবে প্ল্যানটা একটু এদিক ওদিক করা যায় কি? একটু তাড়াতাড়ি ফিরে আসা যায়?

আমি তখন বিনয়ের বটগাছটি একেবারে। বললাম, ট্রিপ পুরো দু সপ্তাহেরই লাগবে, পুরোটাই মোটরসাইকেলে যাওয়া আসা কিনা, তবে তুমি চাইলে ছয়ই জুনের বদলে আমি এক সপ্তাহ আগে বেরোতে পারি – তিরিশে মে, আর ফিরে আসতে পারি এক সপ্তাহ আগে, বারোই জুন। তারপরে আমি তোমার অ্যাকাউন্টের জন্য বলিপ্রদত্ত।

তাই সই। ম্যানেজার রাজি। ইতিমধ্যে আমি তর সইতে না পেরে একটু একটু করে কিনে নিয়েছি এলবো গার্ড, নী গার্ড, চেন লুব্রিক্যান্টের ক্যান, বালাক্লাভা। করোল বাগে গিয়ে গাড়িতে ফিট করিয়ে নিয়েছি মোবাইল চার্জার আর মোবাইল মাউন্ট – জিপিএস দেখার জন্য।

বিসিএম ট্যুরিং সাইটটা ফলো করি। সেখানেই লেহ্‌ লাদাখ টু থাউজ্যান্ড ফিফটিন প্ল্যানার বলে একটা ডিসকাশন থ্রেড চলছিল, লোকে পার্টনার খোঁজাখুঁজি করছিল – সেইখানে আলাপ হল এক সর্দারের সঙ্গে, সুখদীপ সিং। সে তিরিশে মে-ই শুরু করছে। প্রথমে মোবাইল নাম্বার বিনিময়, তারপরে হোয়াটস্যাপ, তারপরে ঠিক হল আগামী শনিবার (২৩শে মে) আমরা একই সময়ে একই সার্ভিসিং সেন্টারে যাবো আমাদের গাড়ি সার্ভিসিং করাতে, সেইখানেই চাক্ষুস মোলাকাত হবে, প্ল্যান নিয়ে আলোচনা হবে। সুখদীপের বাড়ি আবার আমার বাড়ির কাছাকাছিই।

বাইশে মে ছুটি অ্যাপ্লাই করে আনন্দ নিকেতনে গিয়ে অ্যাডভেঞ্চার্স-এইট্টিন থেকে কিনে আনলাম পালসার এনএসের জন্য স্যাডল ব্যাগ – ভায়াটেরা ক্ল।

তেইশে মে বাজাজের সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে দেখি – ও মা, এ তো সর্দার নয় – সেমি সর্দার। মানে শিখ অবশ্যই, তবে পাগড়িবিহীন। হুবহু আমারই রঙের পালসার এনএস – আর সর্বাঙ্গে বিভিন্ন স্টিকার মারা; বিভিন্ন কোম্পানির ইঞ্জিন অয়েলের, গীয়ার লুব্রিক্যান্টের, টায়ার কোম্পানির। ছোকরা কাজ করে সেন্ট্রাল এক্সাইজে, তো সেন্ট্রাল এক্সাইজ থেকে নাকি এর আগে কেউই বাইক নিয়ে লাদাখ যায় নি, এ-ই প্রথম, তাই সেন্ট্রাল এক্সাইজ ডিপার্টমেন্ট থেকে এর পুরো জার্নি স্পনসর করবে। আর ওর নাকি কে থাকে আম্বালায় বা চণ্ডীগড়ে – প্রায়ই দিনেরাতে সে নাকি দিল্লি থেকে আম্বালা যায় আসে, সুতরাং লং জার্নিতে সে খুবই অভ্যস্ত।

শুনে আমি একটু নার্ভাস হয়ে পড়লাম, আমার তো একেবারেই কোনও লং জার্নির অভ্যেস নেই। ম্যাক্সিমাম গেছি গাজিয়াবাদ থেকে গুরগাঁও আর ব্যাক। পঞ্চাশ পঞ্চাশ একশো কিলোমিটার।

তো, সুখদীপ আমাকে অভয় দিয়ে বলল, আরে ও সব নিয়ে চিন্তা কোরো না, রাস্তায় নামলে দেখবে এমনিই দেখতে দেখতে শয়ে শয়ে কিলোমিটার পেরিয়ে যাবে। আমি সমস্ত কিট নিয়ে নিচ্ছি, পাংচার কিট, হ্যান্ডপাম্প, হ্যান ত্যান, তুমি শুধু ক্লাচ কেবল, ক্লাচ প্লেট, চেন লিউব (লুব্রিক্যান্ট) নিয়ে রেখো তা হলেই হবে। আমি ইঞ্জিন অয়েলও ক্যারি করব, আমি জানি কীভাবে অয়েল ঢালে, কীভাবে পাংচার সারায় – তুমি একেবারে চিন্তা কোরো না।

চিন্তা না করে কি থাকা যায়? বাইক চালাতে ভালোবাসি, কিন্তু বাইক সারাবার বেসিক কিচ্ছুটি জানি না। এমন একজন সাথে থাকবে, এটা অবশ্যই অনেক বড় ভরসার কথা।

বাইক যতক্ষণে সার্ভিসিং হচ্ছে, ততক্ষণ কিছু কাজের কথা বলে নেওয়া যাক।

খেয়াল করে দেখবেন, মোটরসাইকেলে করে ঘুরে বেড়ানোর শখ যাদেরই থাকে, তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায় টেড়ায় বটে, কিন্তু লাদাখকে বাইকারদের জন্য একটা আলটিমেট ডেস্টিনেশন হিসেবে ধরা হয়। কেন? অমন ন্যাড়া রুক্ষ পাহাড়ে যাবার থেকে কি ভালো নয় বেশ ছায়াসুনিবিড় পাইন গাছের জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ে বাইক চালিয়ে বেড়াতে যাওয়া? যাবার তো অনেক যায়গা আছে, লেজার ট্রিপ মারবার, অ্যাডভেঞ্চারাস ট্রিপ মারবার, সব ছেড়ে লাদাখ কেন?

অ্যাডভেঞ্চারাস ট্রিপ বা ফ্যামিলি ট্রিপ অনেক জায়গায় হয়। ভারতেই এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে দুর্গম রাস্তা ধরে ট্রেকিং করতে হয় বা খুব খাড়াই পথে চলতে হয়, ইত্যাদি।

লাদাখ যে এলাকাটা, সেটা মূলত পামীর মালভূমি। হিমালয় আর কারাকোরাম রেঞ্জের মধ্যে পড়ে এই এলাকা পৃথিবীর উচ্চতম মালভূমি, একে তাই বলা হয় পৃথিবীর ছাদ। ভূগোল বইতে এসব পড়েছেন আপনারা সবাইই। এতটা উঁচুতে, আর এত কম ঢেউখেলানো অঞ্চল, যে এখানে অনায়াসে গাড়ি বা বাইক নিয়ে চলাফেরা করা যায়। কিছু কিছু স্ট্রেচ একটু বেশিই চড়াই, গাড়িতে করে যেতে গিয়ে অনেক সময়েই বিভিন্ন ভাবে ফেঁসে যাবার চান্স থাকে, তাই লাদাখকে মূলত বলা হয় বাইকার্স প্যারাডাইস। এই রাস্তায় যাবার আসল মজা হল বাইকে। গত এক দেড় দশকে এই অঞ্চলে যাওয়া আসার রাস্তা এত উন্নত হয়ে গেছে, এত ভালো হয়ে গেছে অ্যাক্সেসিবিলিটি, যে দিল্লি বা চণ্ডীগড় থেকে দীর্ঘ রাস্তা বাইকে করে যেতে বা আসতে খুব বিশাল কিছু চাপ পড়ে না। লং ড্রাইভ করা যাদের অভ্যেস আছে, এমনকি যাদের অভ্যেস নেই-ই, তাদেরকেও অনায়াসে তাই হাতছানি দেয় লাদাখের রাস্তা। সেই মণিরত্নমের দিল সে সিনেমায় তার সৌন্দর্যের কিছুটা দেখা মিলেছিল, পরে তো থ্রি ইডিয়টস, হলিডে ইত্যাদি বিভিন্ন সিনেমায় টুকরোটাকরা লাদাখ এখন অনেকেরই দেখা বড় পর্দায়। তবুও, নিজের চোখে সেই বিশাল সৌন্দর্যকে দেখতে পাবার অভিজ্ঞতা আলাদা। সম্পূর্ণ আলাদা।

লাদাখ একটা এলাকার নাম। উপত্যকার নাম। আসলে তা লেহ্‌ (বা, লে) জেলার অন্তর্গত। জম্মু কাশ্মীরের সীমান্তবর্তী এই এলাকা আলতো করে ছুঁয়ে রয়েছে একদিকে চীন, আর অন্যদিকে পাকিস্তানকে। লাদাখ উপত্যকা আসলে বৃহত্তর তিব্বতেরই অংশ। এখানকার মানুষজনদের আচার বিচার, পোশাক আশাক, দৈনন্দিন জীবনচর্যা তাই হুবহু তিব্বতীদের মত।

লাদাখ যাবার দুটো রাস্তা। লোকে মূলত জার্নি শুরু করে দিল্লি, অথবা চণ্ডীগড় থেকে। দিল্লি থেকেই বেশি হয়, তার কারণ আছে।

চণ্ডীগড়ের পর থেকেই হঠাৎ করে পাহাড় শুরু হয়ে যায়। ফলে ওখান থেকে জার্নি শুরু করলে সরাসরি পাহাড়ী রাস্তায় বাইক চালাবার মত কনফিডেন্স আসে না – যদি না খুব খুব এক্সপিরিয়েন্সড বাইকার হয়। বরং দিল্লি থেকে লং ড্রাইভ করে চণ্ডীগড়ে আসতে আসতে হাত আর মন, দুইই সেট করে যায়। অবিশ্যি লং মানে, খুব লংও নয়, মাত্রই আড়াইশো কিলোমিটার। মানে, এই ধরুন, হাওড়া স্টেশন থেকে নিউ ফরাক্কা জংশন যদ্দূর। চওড়া রাস্তা, আরামসে আশি একশোর স্পিডে গাড়ি চালানো যায়।

এখন, “জার্নি শুরু” বলতে, সবাইই তো দিল্লির বাসিন্দা নয়, অনেকেই ট্রেনে বা কার্গোতে করে বাইক নিয়ে এসে নামায় দিল্লিতে বা চণ্ডীগড়ে। সেখান থেকে ড্রাইভ শুরু করে। অবশ্য লাদাখ সংক্রান্ত ফোরামে যাতায়াত করতে গিয়ে আমি এমন ক্রেজি জনতাও দেখেছি যে সরাসরি চেন্নাই, পুনে বা ব্যাঙ্গালোর থেকে গাড়ি বা বাইক চালিয়ে আসে দিল্লি, এবং তারপরে সেইভাবেই চলে লাদাখ বিজয়ে।

তো, যা বলছিলাম। চণ্ডীগড় ঠিক নয়, আসলে আম্বালা ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত রাস্তাটা কমন। তারপরে দুটো রাস্তা। একটা রাস্তা যাচ্ছে লুধিয়ানা, জালন্ধর, পাঠানকোট হয়ে জম্মু। সেখান থেকে উধমপুর, পাটনি টপ পেরিয়ে, পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে কাটা জওহর টানেল পেরিয়ে শ্রীনগর। শ্রীনগর থেকে সোনমার্গ, জোজিলা পাস, দ্রাস, কারগিল, মুলবেক, নিমু হয়ে লেহ্‌।

অন্য রাস্তাটা যাচ্ছে চণ্ডীগড় হয়ে মানালি দিয়ে। মানালির পরে রোহতাং পাস, টান্ডি, সারচু, বারলাচা-লা, উপসী, কারু হয়ে লেহ্‌।

কোন রাস্তাটা নেওয়া উচিত?

আলাদা কোনও রুল নেই। যে কোনও রাস্তা নিতে পারেন, দুটো রাস্তা দু রকমের সুন্দর। বরং মানালির রাস্তা, যদিও দূরত্বের হিসেবে একটু কম পড়ে, তাকে বলা যায় ভয়ংকর সুন্দর। শ্রীনগরের রাস্তায় উচ্চতা বাড়ে ধীরে ধীরে, মাঝখানে জোজিলা ভিন্ন অন্য কোনও “পাস” নেই। মাঝে অনেকগুলো জনপদ আছে। বরফ প্রায় নেই বললেই চলে। কারগিল পর্যন্ত সবুজ দেখতে পাওয়া যায়। … অন্যদিকে মানালির পরেই রোহ্‌তাং পাসে সেই যে বরফ শুরু হয়, সেই বরফ চলে একেবারে মুরে’জ প্লেন পর্যন্ত। (মুরে’জ প্লেন কী? পরে বলব)।

উচ্চতা বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে, AMS বা অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস ধরার চান্স খুব বেশি। রাস্তাও অতি ভয়ঙ্কর, বেশির ভাগ এলাকাতেই প্রায় “নেই” বললেই চলে। প্রায় পুরো রাস্তাতেই যেখানে বরফ, সেখানে পাকা রাস্তা বানানো এবং মেনটেন করা প্রায় অসম্ভব কাজ। রোহতাং পাসের পরেই রাস্তায় এমন কাদা শুরু হয়ে যায়, পাথরের কুচি মেশানো কাদা, তাতে গাড়ি বা বাইকের চাকা প্রায় অর্ধেক ডুবে যায়, সেই অবস্থায় ওপরের দিকে বাইক বা গাড়ি চালিয়ে তোলা বেজায় শক্ত কাজ। খুব পাকা ড্রাইভার বা বাইকার না হলে ওখানেই বাইক দেহ রাখতে পারে বা মানালিতে নেমে আসতে হতে পারে বাইক সারানোর জন্য, আবার পরের দিন কি তার পরের দিন সকালে চেষ্টা করতে হতে পারে।

সুতরাং, সেফ খেলার জন্য, যদি অ্যাডভেঞ্চারের শখ ষোলআনা থাকে অথচ ফর্মুলা ওয়ানে চালাবার মত বাইকিং স্কিল না থাকে, তা হলে ফুল সার্কিট করুন এইভাবেঃ যাওয়া শ্রীনগর হয়ে, ফেরা মানালি হয়ে। শ্রীনগর দিয়ে গেলে যেহেতু উচ্চতা বাড়ে ধীরে ধীরে, তাই AMS ধরার চান্স খুব কম, অ্যাক্লাইমেটাইজেশন হয় লেহ্‌ পৌঁছতে পৌঁছতেই। একদিন আরাম নিলেই যথেষ্ট। অন্য দিকে মানালি হয়ে গেলে, আগেই বলেছি, AMS এর প্রকোপে পড়তে পারে যে কেউই, আর না পড়লেও লেহ্‌তে পৌঁছে অন্তত একদিন রেস্ট নিতেই হয়, নইলে পরের বেড়ানো চৌপাট হয়ে যাবে।

AMS কী?

আগেই বলেছি, এটি উচ্চতাজনিত অসুস্থতা। এর একমাত্র চিকিৎসা হল, পরিপূর্ণ বিশ্রাম, এবং খুব বেশি বাজে কেস হয়ে গেলে, সেখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিচে, সমতলে চলে আসা, ট্রিপ বাতিল করে। নইলে? মৃত্যু হওয়াও অসম্ভব নয়।

এই ভয়ঙ্কর সুন্দর রাস্তা আর এএমএসের চ্যালেঞ্জের জন্যেই বাইকারদের কাছে এই সার্কিট এত প্রিয়।

কার হতে পারে এই এএমএস? যে কারুর। আমি খুব সুস্থ সবল, আমি রোজ বডিবিল্ডিং করি, আমার বাইসেপ এত ইঞ্চি, ট্রাইসেপ অত ইঞ্চি, ওসব দিয়ে কিস্যু নির্ধারিত হয় না। ওটা যে কাউকে অ্যাটাক করতে পারে। খুব রোগাপাতলা পেটরোগা হাঁপানির ব্যামোওলা লোকও বিন্দাস ঘুরে আসতে পারে, আবার খুব তাগড়া জোয়ানও কাহিল হয়ে পড়তে পারে এর ধাক্কায়।

যত ওপরে উঠি আমরা, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকে। আমাদের শ্বসন প্রক্রিয়ায় আমরা ফুসফুস ভরে অক্সিজেন নিই, হার্ট আর ফুসফুস মিলে সেই অক্সিজেন রক্তে মিশিয়ে সারা দেহে পাম্প করে, মস্তিষ্ক থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত, বদলে শরীরের দুষিত বর্জ্য মেশানো রক্ত নিয়ে ফেরত আসে। আমাদের শরীরের কলকব্জা সাধারণত এইভাবেই চলে।

এইবার, বাতাসে যখন অক্সিজেন কমে যায়, তখন সমপরিমাণ অক্সিজেন রক্তে মেশাতে গেলে হয় হার্টকে খুব জোরে জোরে পাম্প করতে হয়, অথবা রক্তে কম অক্সিজেন মেশে। রক্তে অক্সিজেন কম মিশলে কী হবে? শরীরের কলকব্জা ঠিকমত পারফর্ম করবে না। শরীর অবশ লাগবে, মাথা ভারি লাগবে, ঝিমঝিম করবে, আঙুলের ডগায় পিন ফোটানোর মত ঝিঁঝিঁ ধরবে, খুব ঘুম পাবে, শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়াও বিচিত্র নয়।

এই হচ্ছে এএমএস। ঘুমিয়ে পড়েছেন কি মরেছেন। বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হল তখন শরীরকে অক্সিজেন জোগানো। মানে? হার্টকে আরও জোরে পাম্প করান। হাঁটুন একটু, জল খান বোতল বোতল, জলের মধ্যে মেশা অক্সিজেন রক্তে মিশবে, হাঁটলে হার্ট জোরে চলবে।

ভয় পাবেন না একদম। ভয় সরাসরি হার্টে অ্যাটাক করে। সেটি খতরনক। চকলেট চিবোন। আর, আর, ডায়ামক্স রাখুন হাতে।

ডায়ামক্স হল এই এএমএস কাটানোর একমাত্র ওষুধ। লেহ্‌-র দিকে জার্নি শুরু করার অন্তত দুদিন আগে দিনে একটা করে ডায়ামক্স খেতে শুরু করুন, খেতে থাকুন যতক্ষণ না লেহ্‌ সিটিতে পৌঁছচ্ছেন। ওখানে পৌঁছে খাওয়া ছেড়ে দিলেই হবে। ডায়ামক্স কীভাবে শরীরকে এএমএসের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে, সেটা আমি ডিটেলে লিখছি না, উইকি থেকে পড়ে নিন।

ছোট বাচ্চাদের সাধারণত এএমএস হয় না। অনেকে মনে করেন এত উচ্চতায় বাচ্চা নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কিনা, আমি বলব, বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া সবচেয়ে সেফ। আপনি অসুস্থ হতে পারেন, কিন্তু বাচ্চার হার্ট লাংস একদম ওয়্যার‌্যান্টি পিরিয়ডের মধ্যে আছে, তাগড়া সার্ভিস, ওদের চট করে এএমএস হয় না। হলে সেটা খুব রেয়ার কেস হয়।

দেখুন, কী বিচ্ছিরি অভ্যেস। থেকে থেকে আধিব্যাধির গল্পের দিকে চলে যাচ্ছি। ফিরে আসি আবার দু হাজার পনেরোতে, কেমন? বাকি জ্ঞানের ব্যাখ্যান, আবার জায়গামত বলব।

তো, ছাব্বিশে মে ছুটি অ্যাপ্রুভ হল। আর আমায় পায় কে? সুখদীপকে হোয়াটস্যাপে মেসেজ করলাম। সুখদীপ স্টার্ট করছে উনত্রিশ তারিখে। ও যাবে আম্বালায় আগের রাতে। আমাকে পরদিন আম্বালা পৌঁছতে হবে একা একা, সেখান থেকে সুখদীপ আমার সাথে যাবে। আম্বালা থেকে যাবো জম্মু। দিল্লি থেকে পাক্কা ছশো কিলোমিটার। শেষরাতে বেরোতে হবে, যাতে দিনে দিনে জম্মু পৌঁছতে পারি, আর উত্তর ভারতের গরমটাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্রস করে যাওয়া যায়।

সুখদীপ জানাল ওরও ছুটি কাল পরশুর মধ্যেই অ্যাপ্রুভ হয়ে যাবে, যে হেতু ওর গাড়ি অলরেডি চল্লিশ হাজার কিলোমিটার চলে ফেলেছে, তাই ও টায়ার বদলে নেবে। পিরেলির টায়ার লাগাবে। ও হ্যাঁ, ওর কাছে গুচ্ছ গুচ্ছ বানজি কর্ড আছে, আমাকে কিনতে হবে না, আম্বালা অবধি কোনওরকমে চলে এলেই ও আমার লাগেজপত্র বানজি দিয়ে ভালোভাবে বাইকের সাথে বেঁধে দেবে।

সাতাশে মে, সক্কালবেলায় ভাবলাম একটু রাস্তাটা চিনে আসি। সাড়ে সাতটায় বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে। ড্রাই রানেরও বাচ্চা ভার্সন। গীতা কলোনি পেরিয়ে কাশ্মীরি গেট পেরিয়ে মজনু-কা-টিলা পেরিয়ে সঞ্জয় গান্ধী ট্রান্সপোর্ট নগর পেরিয়ে আরো খানিকটা এগিয়ে গিয়ে ফিরলাম। বাইকে মাউন্টে বাঁধা মোবাইল, সেখান থেকে চার্জারে চার্জ নিচ্ছে ঠিকঠাক, হেডফোন কানে গোঁজা, সুন্দর গেলাম, ফিরে এলাম। চল্লিশ চল্লিশ আশি কিলোমিটার। ঠিক আছে – এইটুকু চলতে পারলে ছশো কিলোমিটার আর কতটুকু, দেখতে দেখতে পেরিয়ে যাবো।

সন্ধ্যেবেলায় সুখদীপকে মেসেজ করলাম, গুরু, নতুন টায়ার কী লাগালে, ছবি পাঠাও। খানিক পর সুখদীপ রিপ্লাই করল, বস, একটা সমস্যা হয়েছে। অফিস থেকে না, আমার জার্নি স্পনসর করছে না, তার চক্করে আমার লিভও ক্যানসেল করে দিয়েছে।

আমার তো মাথায় হাত। ছোকরা বলে কী! বললাম, তুমি কথা বলো শিগগির অফিসে, স্পনসর না হয় না-ই করল, তুমি নিজের খরচায় তো যেতে পারো, লিভটা অন্তত অ্যাপ্রুভ করে দিক।

সুখদীপ বলল, হ্যাঁ, ডিরেক্টর ডেকেছে উনত্রিশ তারিখে, এসপার ওসপার যা হবার সেদিনই হবে।

উনত্রিশ তারিখ। মানে যেদিন সন্ধ্যেয় ওর আম্বালা যাবার কথা, আমার বেরোবার ঠিক একদিন আগে। হাতে মাত্র দুদিন। ওর কথা যদি ডিরেক্টর না শোনে তো কী হবে? আমার তো ছুটি অ্যাপ্রুভ হয়ে গেছে, আমি কোনওভাবেই আর এই ছুটি ক্যানসেল করাতে পারব না, করাতে চাইবও না। তা হলে কি একাই বেরোতে হবে?

উনত্রিশ তারিখ সন্ধ্যেবেলায় খবর এল। ডিরেক্টর কোনও কথাই শোনেন নি, তার লিভ বা স্পনসরশিপ – কোনওটাই স্যাংশন হয় নি। অতএব, সে যেতে পারবে না। সিকি একা।

হাতে আর চব্বিশ ঘন্টাও নেই। সিকিনীকে এখন এসব কথা বলবার কোনও মানেই হয় না, ভয় টয় পেয়ে একাক্কার হয়ে যাবে, আমার যাওয়া না চৌপাট হয়ে যায়।

ঘরের দরজা বন্ধ করে খানিক চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম।

আমাকে কাল একা বেরোতে হবে।

একা, কোনও ব্যাকআপ ছাড়া। বাইক বিগড়োলে সারাবার মত একটা জিনিস আমার কাছে নেই, পুরো খালি হাতে বেরোব। ভরসা আছে, এ রাস্তায় সঙ্গী মিলে যায়, মিলে যাবে ফর শিওর। কিন্তু কবে কখন কোথায় মিলবে, জানা নেই। তবু, যা থাকে কপালে, রাস্তা তখন আমায় চুম্বকের মতন টানছে, আমাকে রাস্তায় নামতে হবেই, এতটুকুও বাধা আসতে পারে এমন কিছু আমি টলারেট করতে রাজি নই। সর্দার যাক জাহান্নমে।

এইখানে আরও একজনকার কথা না বললে শুরুর প্রস্তুতির কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

গেছোদাদা। গুরুর একজন নীপা, আগে পাটনি টপে পোস্টেড ছিলেন, লেহ্‌ লাদাখ এলাকা খুব ভালো করে চেনেন চাকরিসূত্রে, আপাতত চাকরিসূত্রেই দিল্লিতে পোস্টেড। গেছোদাদার কাছ থেকে বেশ কয়েকবার রুট সম্বন্ধে বিস্তারিত জ্ঞানার্জন করেছি, এক এক দিনে কতটা দূরত্ব কভার করলে সেটা ডুয়েবল হয়, এই নিয়েও আইডিয়া বাড়িয়েছি। আসলে শুধু দূরত্বটা দেখলেই তো হয় না – সময়টাও তো একটা বড় ফ্যাক্টর। মে জুন মাসের দিনের বেলায় উত্তর ভারতের তাপমাত্রা সম্বন্ধে যাঁদের আইডিয়া আছে, তাঁরা জানেন কতটা কষ্টকর, কতটা বিপজ্জনক এই লম্বা রাস্তা দিনের বেলায় পাড়ি দেওয়া। যতক্ষণ না জম্মু পেরনো যাচ্ছে, ততক্ষণ এই নিদারুণ হিটওয়েভের হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই, তাই দূরত্ব, সময় আর শারীরিক পরিস্থিতি – এই তিনের একটা কম্বিনেশন বানিয়ে রুট প্ল্যান করতে হয়।

জার্নির প্ল্যান হিসেবে আমাকে সুখদীপ বলেছিল – ও টেন্ট ক্যারি করছে, ডাবল স্লিপিং ম্যাট ক্যারি করছে, আমি যদি একটা স্লিপিং ব্যাগ অ্যারেঞ্জ করে নিতে পারি নিজের জন্য, তা হলে জমে যাবে।

বেশ ভালো কথা। এর আগের বারে দ্রাসে আমার স্লিপিং ব্যাগে শোবার অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সে বড় আরামের ঘুম হয়। তো, এখন আর এখানে ভালো স্লিপিং ব্যাগ ঝেড়েবেছে কোথায় কিনব? গেছোদাদার শরণাপন্ন হতেই সমাধান মিলল, গেছোদাদার নিজেরই একটা স্লিপিং ব্যাগ আছে, সেটা আমি ধার নিতে পারি লেহ্‌-যাত্রার জন্য।

হয়ে গেল মুশকিল আসান। একদিন টুক করে গেছোদাদার অফিসে গিয়ে নিয়ে এসেছিলাম স্লিপিং ব্যাগ।

সে ব্যাগ পড়ে রইল আমার কম্পিউটার টেবিলের নিচে। সুখদীপের ছুটি ক্যানসেল, টেন্ট যাচ্ছে না, স্লিপিং ম্যাট যাচ্ছে না – আমি আর স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে গিয়ে কী করব?

তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লাম। ভোর চারটেয় উঠতে হবে।

শুরু হল এক ল্যাদাড়ুশ ক্যাবলাকান্ত পাবলিকের একলা লাদাখ অভিযান। জীবনে যে কোনওদিন একটানা একশো কিলোমিটার গাড়ি চালায় নি, সে প্রথমবার লং ড্রাইভে নেমে একদিনে ছশো কিলোমিটার পাড়ি জমাবার কথা ভাবছে। এ কি সম্ভব?


2 thoughts on “জুলে, আবার, জুলে লাদাখ – প্রথম পর্ব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.