জুলে, আবার, জুলে লাদাখ – পঞ্চম পর্ব

[পর্ব ১], [পর্ব ২] ,[পর্ব ৩] এবং [পর্ব ৪] -এর পরে …

২রা জুন ২০১৫ – চতুর্থ দিন

আজ, ফর আ চেঞ্জ, আর একা নই। আমরা এখন চারজন। সুমিত আর গুরদীপের সাহায্য নিয়ে আজ শুরু থেকেই একেবারে শক্তপোক্ত করে লাগেজ বেঁধে ফেললাম বাইকের পেছনে। ভালো করে ঝাঁকিয়ে হেলিয়ে দেখে নিলাম, কোনওভাবেই আর লুজ হয়ে যাবার সম্ভাবনা নেই। নটা সোয়া নটা নাগাদ সবাই রেডি হয়ে বাইকে স্টার্ট দিলাম। একটু এগোলেই পেট্রল পাম্প, সেইখানে সবাই ট্যাঙ্ক ফুল করবে, তারপরে এগোবে।

কিন্তু, কী অদ্ভূত ব্যাপার, একসাথেই তো পেট্রল পাম্পে ঢুকেছিলাম! তেল ভরার পরে আর সুমিত গুরদীপকে দেখতে পাচ্ছিনা কেন? সামনে শুধু জীবন ওর সাদা-কমলা হন্ডা সিবিআর বাইক নিয়ে। বাকি দুজন বেপাত্তা। ওরা কি আগে এগিয়ে গেল? নাকি পেছনে?

কোথাও দেখতে পেলাম না। অগত্যা আমরা দুজনেই এগোতে থাকলাম। জীবন বলল, ওর এগোবার তাড়া নেই, ও ধীরেসুস্থে ফটো তুলতে তুলতে এগোবে, আমি যেন আমার মত এগিয়ে যাই।

অতএব, আমি আবার একা। তাও বললাম, পরে চল্লিশ কিলোমিটার আগে মুলবেক আছে, সেইখানে আমি দাঁড়াব, ও যেন ওইখানে দাঁড়ায়, যদি আমার আগে এগিয়ে যায় তো।

এগোলাম। কারগিল পেরোতেই আবার ভাঙাচোরা খতরনাক রাস্তা শুরু হল, প্রায় দশ কিলোমিটার সেই নেই-রাস্তায় চলার পরে আবার ভালো রাস্তা পেলাম মুলবেকের বারো কিলোমিটার আগে। একদম মসৃণ রাস্তা। রানওয়ের মত। মুলবেক পোঁছে দাঁড়ালাম। এখন আর ফোন কাজ করবে না। খানিক দাঁড়াই।

দূর থেকে হেডলাইট জ্বালিয়ে একটা বুলেটের দল এসে বেরিয়ে গেল। না, জীবন এদের মধ্যে নেই।

আরও খানিক ওয়েট করার পর জীবন এল, কিন্তু সুমিত-গুরদীপের কোনও পাত্তাই নেই। আবার খানিক একসাথে চলা শুরু করলাম, আবার ও কোথাও ছবি তোলার জন্য স্লো হয়ে গেল, আমি এগিয়ে গেলাম, বললাম, আমি নামিক লা-তে ওর জন্য ওয়েট করব।

আগের বারেও দেখেছি, তাই এইবারে অতটা চমকপ্রদ লাগল না, ক্ষণে ক্ষণে রুক্ষ পাহাড়ের রিলিফ বদলাচ্ছে। কখনও গেরুয়া, কখনও গোলাপি, কখনও সবুজ, বিভিন্ন কালারের পাথর এসে দেখা দিয়ে যাচ্ছে সামনে, আশেপাশে।

খানিক বাদে পৌঁছে গেলাম নামিক লা। দেখি একটু আগে বেরিয়ে যাওয়া বুলেটের দল সেখানে দাঁড়িয়ে ফটোগ্রাফি করছে। আর একটা ফ্যামিলি রয়েছে, গুজরাত থেকে এসেছে একটা ইনোভা চালিয়ে। তাদেরই একজনকে দিয়ে আমি আমার একটা ফটো তোলালাম।

তারপরে আবার জীবন চলে এল। সে-ও নিজের এবং চারপাশের ফটো তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

আমার অনুরোধে আমার একটা বিজাতীয় ছবিও তুলে দিল – চিনতে না পারলে কিছু করার নেই, এটা আমিই।

এই সবের মাঝে হঠাৎ দেখি একদিকের আকাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে আসছে ঘন কালো মেঘ। আর এমন তার ফানেল আকারের শেপ, ঠিক যেন মনে হচ্ছে, পাহাড়টা ওই মেঘটাকে নিজের দিকে চুম্বকের মত টানছে। কিন্তু, মনে হল পাহাড়টা বোধ হয় কারগিলের দিকে, আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। সামনেটা পরিষ্কার।

কিন্তু পাহাড়ী রাস্তার মজাই এই, এই মুহূর্তে যেটা মনে হচ্ছে পেছনে, একটা টার্ন ঘুরলেই সেইটা সামনে চলে আসে, ক্রমশ পাকদণ্ডী দিয়ে এগোতে এগোতে অবশেষে এইটুকুই বুঝলাম, সামনে বা পেছনে নয়, মেঘটা পুরো আকাশ ছাইছে, অবিলম্বে বৃষ্টি শুরু হবে।

হলও তাই। আস্তে আস্তে মেঘ আমাদের ঘিরে ফেলল, বেশ ঘন মেঘ। তারপরে টেম্পারেচার হঠাৎ করে নেমে গেল, তারপরে শুরু হল বৃষ্টি। না না, বৃষ্টি নয়, তুষারপাত। স্নো-ফল। … সমতলের জনতা, স্নো-ফল ব্যাপারটা শুরুর দিকে বেশ রোমান্টিক লাগে, আমারও লাগছিল, ব্যাগের ওপর বিন্দু বিন্দু পড়ছে তাজা স্নো-ফ্লেকস, এর একটা ছবি না তুলে থাকা যায়?

কিন্তু রোমান্টিসিজম বেশিক্ষণ থাকল না। তুষারপাতের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালানো মোটেও সুখকর অভিজ্ঞতা নয়। একটু এগোতেই বুঝতে পারলাম, করোল বাগ থেকে কেনা স্পেশাল গ্লাভসের ভেতরে আমার আঙুলগুলো জমে গেছে, তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে প্রতিটা আঙুলের ডগায়, এদিকে হেলমেটের সামনের কাচে বাইরের দিকে ছিটে লেগে লেগে জমা হচ্ছে বরফ, একটু বাদে বাদেই সামনেটা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ভেতরেও নাক থেকে বেরনো নিশ্বাসের জলীয় বাষ্প কাচের ভেতরে জমে আরও ঝাপসা করে দিচ্ছে। গ্লাভসে করে কাচের বাইরেটা সাফ করছি, গ্লাভস সাদা হয়ে যাচ্ছে বরফের চাঙড়ে, চলন্ত অবস্থাতেই পায়ের ওপর হাত থাবড়ে গ্লাভস থেকে বরফ ঝরাচ্ছি, আবার খানিক বাদে একই অবস্থা, কাচ ঝাপসা, আবার গ্লাভসে করে বরফ সরানো …

ন্যাড়া পাহাড়। কোথাও এতটুকু শেড নেই যেখানে দাঁড়ানো যায়। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে গেলে নির্ঘাত মরে যাবো। যেভাবেই হোক, এগোতেই হবে, এগোতেই হবে। ফোটুলা টপ এখনও পঁচিশ কিলোমিটার।

ওইভাবেই এগোলাম, ফোটুলা টপ তখন তুষারপাতে সাদা, কেউ কোত্থাও নেই, সামনের রাস্তা দেখা যাচ্ছে না, জোরে বাইকও চালানো যাচ্ছে না, হাত জমে বরফ, সাঙ্ঘাতিক যন্ত্রণা হচ্ছে আঙুলে, এইবারে বোধ হয় ফ্রস্ট বাইটই হয়ে গেল।

প্রায় দেড় ঘণ্টা ধীরে ধীরে চলেছিলাম ওই অবস্থায়। ফোটুলা টপ থেকে খানিক নামবার পরে হঠাৎই দেখি রাস্তার ধারে একটা ছোট্ট পাকা শেড বানানো। আর কোনওদিকে চিন্তা নয়, বাইক পার্ক করলাম। আমি দৌড়ে গিয়ে উঠলাম শেডের নিচে। হাত এত অসাড় যে গ্লাভস খুলতে পারছি না। গ্লাভস কোনওরকমে খুললাম তো বাইকের চাবি পকেটে ঢোকাতে পারছি না। পাগলের মত হাত ঘষতে শুরু করলাম। তুষারপাতের তেজ তখন বাড়ছে। চারদিকে দু চারটে মিলিটারি ট্রাকের আসাযাওয়া ছাড়া, আর কেউ কোত্থাও নেই। কিছু দেখাই যাচ্ছে না।

হেলমেট খুলে দেখলাম, হেলমেটের কাচ নিয়ে ব্যস্ত থাকার ফলে নিজের দিকেই তাকাই নি। আমার রেনকোটের সামনের দিকটা পুরো সাদা হয়ে আছে। আলতো চাপড় মারতে ঝুরঝুর করে বরফ খসে পড়ল। হাতে এইবারে একটু সাড় ফিরেছে। ক্যামেরা হাতে নিলাম।


শেডের সামনে দাঁড় করানো আমার বাইক।


চারপাশের অবস্থা।

আর এই সেই স্নো-ফলের ভিডিও –

বেশ খানিকক্ষণ, প্রায় আধঘণ্টা ওয়েট করবার পরে মনে হল স্নোফলের তেজ একটু কমেছে। আস্তে আস্তে বেরোলাম, লামায়ুরু এখান থেকে আর দশ কিলোমিটার। ওখানে দোকান পেলে চা খাবো।

কিন্তু বাইকে স্টার্ট দিয়ে একটু এগনোমাত্র আবার তেড়ে স্নো-ফল শুরু হল, তখন আর পিছিয়ে গিয়ে ওই শেডের ফেরার উপায় নেই। অগত্যা আবার হাত জমে যাওয়া, আবার হেলমেটের কাচে বরফ জমে যাওয়া – তাই নিয়ে খানিক এগোতেই হঠাৎ সামনের পাহাড় থেকে সূর্য উঁকি দিল, আর স্নো-ফল থেমে গেল ম্যাজিকের মত। আর তার খানিক পরেই সামনে দেখি একটা ছোট্ট একলা চায়ের দোকান।

ভেতরে কেউ নেই। কোই হ্যায়? বলে হাঁক পাড়তে একটা হাসিখুশি লাদাখি ছেলে চলে এল কোথা থেকে, বললাম, চা বানাও, আর আমাকে একটু কিচেনে যেতে দাও, হাত সেঁকতে হবে।

ছেলেটা ভালো। চা বানাতে বানাতে আমার জন্য অন্য একটা বার্নার জ্বালিয়ে দিল। প্রায় দশ মিনিটের চেষ্টায় হাতে সাড় এল, শরীর গরম হল। চা খেলাম। চা শেষ হতেই দেখি জীবনও সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, আমার বাইক দেখে। ও-ও হাত সেঁকল, চা খেল। আরেকটু বসা গেল। তিনটে বাজে তখন। আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার।

… এই তো কদিন আগের ঘটনা, তবু মনে হচ্ছে যেন কতদিন আগে ঘুরে এসেছি। সময় কীভাবে পেরিয়ে যায়। টুকরোটাকরা ঘটনা মনে পড়ছে, যেমন, লামায়ুরুর কাছে যেই স্নো-ফল থেমে গেল, অমনি দেখলাম স্নো-ফ্লেকগুলো সব ব্যাগ থেকে ঝরে গিয়ে ব্যাগ ফর্সা হয়ে গেল, ব্যাগ এতটুকুও ভেজে নি। না ভিজেছিল আমার রেনগীয়ার। বরফ ঝরতেই সব শুকনো। এ এক্সপিরিয়েন্সও নতুন।

সাড়ে তিনটেয় স্টার্ট করলাম। লামায়ুরু এখান থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার। আগের বারে লামায়ুরু মনাস্ট্রি দেখা হয় নি।

মেন রোড থেকে বাঁদিকে ছোট্ট একটা পথ গেছে লামায়ুরুর দরজা পর্যন্ত। গেলাম। দেখলাম। কেন জানি না, খুব সাঙ্ঘাতিক ইমপ্রেসিভ কিছু লাগল না। এর থেকে লে-র মনাস্ট্রিগুলো অনেক বেশি সুন্দর।

তাও কিছু ফটো তুললাম।


লামায়ুরু থেকে সামনের পাহাড় – মুনল্যান্ড।




আর – ছবি তোলার জন্য এদের পেলাম।

লামায়ুরু থেকে বেরিয়ে মেন রোডে এগোলাম। এখানে বেশ কয়েকটা খাবারের জায়গা আর হোমস্টে অপশন আছে। এগোতে যেতেই মনে হল, এই দোকানটার সামনে যে দুটো বাইক দাঁড় করানো আছে, এদুটো সুমিত আর গুরদীপের না? … উঁকি মারতেই দেখি দুই মূর্তি বসে ম্যাগি খাচ্ছে। আমাকে দেখেই হইহই করে উঠল। ওরাও আমাকে পেট্রল পাম্পে কীভাবে যেন হারিয়ে ফেলেছিল। যাই হোক, দুই থেকে আবার আমরা চার হলাম। ঠিক হল, এইবারে আর কেউ কাউকে ছেড়ে বেশি এগোবে না, চারজনেই একসঙ্গে এগবো।

সাড়ে চারটে বাজে। আবার এগনো গেল। এর পরে পাহাড়ের রঙ পুরো অপার্থিব, মনে হবে যেন পৃথিবীতে নেই, চাঁদে এসে পৌঁছেছি। এই অঞ্চলের নাম তাই, মুনল্যান্ড।

এখনও আশি কিলোমিটার দূরে নিমু। বাকিরা প্রথম আসছে, তাই আমারই দায়িত্ব ওদের সিন্ধু আর জানস্কারের কনফ্লুয়েন্স দেখিয়ে দেবার। তাই একসাথেই এগোলাম এইবারে।

এই পথে প্রতি মোড়ে এত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, দেখতে দেখতে দূরত্ব পেরিয়ে যায়, কখনও বোর হতে হয় না। তাও যদি নিতান্তই কেউ বোর হয়ে যায়, তাকে চাঙ্গা করার জন্য আছে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ব্রো-র নোটিসগুলো, যেমন মনোগ্রাহী, তেমনি উইটি। পাহাড়ি রাস্তায় যে-ই গেছেন, তিনিই জানেন এইসব নোটিস সম্বন্ধে। ইফ ম্যারেড, ডাইভোর্স স্পিড। বি জেন্টল অন মাই কার্ভস। হোল্ড ইওর নার্ভস অন মাই কার্ভস, ফাস্ট ওন্ট লাস্ট, ইত্যাদি প্রভৃতি।

লামায়ুরু থেকে আমাদের সঙ্গ নিয়েছিল আরেকটা ইয়ং কাপল। তারাও দিল্লি থেকেই এসেছে, মিড টুয়েন্টিজের একটা ছেলে আর একটা মেয়ে, বুলেটে করে এসেছে। লামায়ুরু থেকে তারাও আমাদের সাথে সাথেই এল।

এই সব দেখতে দেখতে বিকেলের দিকে নিমু পৌঁছলাম। কিন্তু নিমু আসার আগে সেই জায়গাটা আসে, ফ্ল্যাট লান্ড, তার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সো-জা রাস্তা।

আগেরবারে তো গাড়িতে চেপে হুশ করে বেরিয়ে গেছিলাম। এইবারে তাই ফটোসেশন না করলেই নয়।


এইটা আমি।

নিমুতে তো, আপনারা জানেনই লোকে কী দেখতে যায়। আমরাও দেখলাম। আমার আগেই দেখা, আবার দেখলাম।

তারপর ম্যাগনেটিক হিল। জীবন বাড় খেয়ে খানিক অফরোডিং করে এল পাশের পাহাড়ে।

এবং তারপরে আবার বৃষ্টি। সঙ্গে কনকনে হাওয়া। আকাশ ভর্তি মেঘ। এর মধ্যেই এসে গেল গুরুদ্বারা পাত্থর সাহিব।

গুরদীপ তো সর্দার, সে তো যাবেই। আমার তখন ঠাণ্ডায় জবুথবু দশা। সারাদিনে খাওয়াও জোটেনি, একটু ম্যাগি আর চা খেয়েছি শুধু লামায়ুরুতে। পেটের ভেতর ঘোলাচ্ছে। নিজের ওপর কন্ট্রোল রাখতে পারছি না, ঠকঠকিয়ে কাঁপছি। ওদের বললাম, যাও দেখে এসো, আমি বাইরে বসে লাগেজ পাহারা দিচ্ছি। আমার তো দেখা আছে। …আসলে জুতো খোলার ইচ্ছে ছিল না।

ওরা মন দিয়ে গুরুদ্বারা দেখল, প্রসাদ খেল, আমি সামনে চেয়ারে বসে ঠকঠকিয়ে কেঁপে গেলাম। অসম্ভব ঠাণ্ডা। জুন মাসের লে-তে যেটা হাইলি আনলাইকলি। এই সময়ের ওয়েদার সাধারণত আরামদায়ক থাকে।

সাড়ে সাতটায় ওরা বেরিয়ে এল। লে সিটি আর পঁচিশ কিলোমিটার। টিপিটিপি বৃষ্টি পড়ছে, হাড়ের ভেতর অবধি কেঁপে যাচ্ছে শীতে, তবু যেতে হবেই।

কীভাবে যে রাস্তাটা চালিয়েছিলাম, মনে নেই, কেবল মনে আছে, এক সময়ে লে শহরে ঢুকলাম। তখন হোটেল খোঁজার পালা।

………………………………

আমার এই দ্বিতীয় আগমন লে-তে। ঢোকামাত্র এমন একটা এক্সট্যাসি ফীলিং হল – আমি পেরেছি, আমি সত্যি সত্যি চোদ্দশো কিলোমিটার বাইক চালিয়ে আমার স্বপ্নপূরণ করতে পেরেছি, লে-তে এসে পৌঁছেছি – আনন্দের চোটে শীত কমে গেল।

লে শহরে পৌঁছনো মাত্র বৃষ্টি থেমে গেল, কিন্তু ঢুকলাম অন্ধকার শহরের মধ্যে। চাংস্পা – জায়গাটার নাম মনে ছিল, পল গেস্ট হাউসে ছিলাম আগের বারে, শস্তায় সুন্দর থাকার ব্যবস্থা ছিল, মিসেস লিন্ডা ছিলেন তার হাসিখুশি ওনার। খুঁজে খুঁজে চাংস্পা এলাকায় পৌঁছে অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের সেই বিল্ডিংটা খুঁজে বের করতেই সব ছবির মত মনে পড়ে গেল, তিন বছরে কিছুই বদলায় নি। দু মিনিটের মধ্যে গেস্ট হাউস খুঁজে বের করে ফেললাম, মিসেস লিন্ডা গেটেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার সর্বাঙ্গ ঢাকা রেনগীয়ারে, মাথায় হেলমেট, তার ভেতরে বালাক্লাভা, চিনতে পারার কথাও নয়, তবু বললাম, তিন বছর আগে এসে আপনার হোটেলেই ছিলাম।

উনি একই রকমের হাসিখুশি রয়ে গেছেন, ছোট ছোট চোখদুটোকে আরও ছোট করে হেসে বললেন, কিন্তু আমার কাছে জাস্ট দুটোই রুম আছে।

আমরা এখন ছয় – আমি, জীবন, গুরদীপ, সুমিত, আর ঐ দুটি কাপল – ওদের নাম বিবেক আর প্রিয়াঙ্কা – জেনেছিলাম পরের দিন। চারজনকার জন্য দুটি রুম তো হয়ে যাবে, কিন্তু বিবেক-প্রিয়াঙ্কার জন্য?

মিসেস লিন্ডাই মোমবাতি নিয়ে সামনের বিল্ডিংয়ের দরজা ধাক্কালেন ওপরে গিয়ে, সঙ্গে আমিও গেলাম। সেটা আরেকটা হোটেল। প্রবল ঝড়বৃষ্টির জন্য কোথায় কোন পোল পড়ে গেছে, লে-তে আজ কারেন্ট আসবে না। মিসেস লিন্ডার হোটেলে ব্যাকআপ আছে, কিন্তু এই হোটেলে মোমবাতিই ভরসা। তা হোক, এক রাতের জন্য তাইই সই। কাপল সেইখানেই একটা ঘর নিল, আর মিসেস লিন্ডা যা দর বলেছিলেন তার থেকে একশো টাকা করে কমিয়ে দিলেন আমাদের জন্য। হোটেলের পার্কিংয়ে বাইকগুলো রাখার জায়গা হয়ে গেল, আর আবিষ্কার করলাম, তিন বছর আগে এসে আমি-সিকিনী-সাঁঝ দোতলার যে রুমটায় ছিলাম, ঠিক সেই রুমটাই বরাদ্দ হল আমাদের জন্য। জীবন আর আমি এক ঘরে, সুমিত গুরদীপ অন্য ঘরে, বিবেক প্রিয়াঙ্কা পাশের হোটেলে।

মিসেস লিন্ডা বললেন – এত রাতে গরম জল পাবে অবশ্য, আমার জেনারেটর আছে, আমি গীজার চালিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু কেউ চান কোরো না। শরীর খারাপ হয়ে যাবে। তোমরা কাল সকালে চান কোরো, এখন জাস্ট ফ্রেশ হয়ে খেয়ে এসো। লে মার্কেট এমনিতে আটটায় বন্ধ হয়ে যায় তবে খাবার জয়েন্টগুলো রাত দশটা সাড়ে দশটা পর্যন্ত খোলা থাকে। কাল রেস্ট নাও, খারদুংলা টপ এখন বন্ধ, হেভি স্নো-ফল হয়েছে। তিনদিন লাগবে ঠিক হতে।

বলে কী? অরিজিৎরা নুব্রা পৌঁছতে পেরেছিল তো? তাড়াতাড়ি অরিজিতের ফোন ডায়াল করলাম, লাগল না, তার মানে নুব্রা পৌঁছে গেছে। লে-তে থাকলে ফোন চালু থাকত। তাও কনফার্মড খবর না পেলে মন খুঁতখুঁত করে।

ফ্রেশ হয়ে খেতে বেরোলাম যখন, তখনই প্রায় রাত দশটা বাজতে চলেছে। বাইরে বেরিয়ে টের পেলাম ঠাণ্ডা কাকে বলে। সেদিন বোধ হয় পূর্ণিমা, মেঘ ছিঁড়ে আকাশে উঠেছে বিশাল সাইজের একখানা চাঁদ, যেমনি তার আয়তন তেমনি তার ঔজ্জল্য, চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, অন্ধকার শহরকে ঘিরে চারপাশের বরফের চূড়াগুলো সেই আলোয় ঝিকমিক করছে রূপোর মতন, ক্যামেরার সাধ্যি কী, সেই ছবি তোলে। শুধু দেখে মুগ্ধ হতে হয়। তাপমাত্রা সম্ভবত শূন্যর কাছাকাছি, হাতে মুখে কামড়ে ধরছে ঠাণ্ডা, তার মধ্যে গরম গরম হানি চিলি পট্যাটো আর চিকেন হাক্কা নুডল। আহা, অমৃত।

কাল রেস্ট। খেয়ে উঠে এদের সাথে প্ল্যান ছকতে হবে। জীবন তো কাল বেরোবেই। খারদুংলা বন্ধ থাক বা খোলা, ও খারদুংলা যাবেই যাবে। ওকে আটকানো যাবে না। কাল থেকে আমরা পাঁচজন।

*****************************************************

সুমিতের প্রথম প্রশ্ন – মারসিমিক লা যাবে?

মানে? আরে আমিও তো সেই একই প্ল্যান ছকে বেরিয়েছি। আর্গুয়েবলি, খারদুংলা এখন আর হায়েস্ট মোটরেবল রোড নয়। প্যাংগং লেকের কাছে একটা পাস আছে, মারসিমিক লা, সেটা খারদুংলার থেকেও তিনশো মিটার উঁচুতে। রাস্তা তৈরি হয় নি, পুরোটাই অফরোডিং, কিন্তু গতবছর এবং তার আগের বছর অনেকেই করে এসেছে। অতএব, ওটা তো আমাদের করতেই হবে।

এমনিতে লে-র সাইটসিয়িংগুলোর জন্য এখন আর আইএলপি (ইনার লাইন পারমিট) নিতে হয় না, ওটা ২০১২ থেকে বন্ধ হয়ে গেছে, তবে মারসিমিক লা-র জন্য নিতে হবে। কাল তাই ডিসি অফিস যাবো, ওটার পারমিট বানিয়ে লে প্যালেস শান্তিস্তূপ আর স্পিটুক মনাস্ট্রি দেখব। পরশু যদি খারদুং লা না খোলে তা হলে আমরা প্যাংগং লেকের দিকে এগোব। ফিরে আসতে আসতে নিশ্চয় খারদুংলা খুলে যাবে।

ভরপেটে একটা করে ডায়ামক্স গিলে ভরপুর ঘুম।

Advertisements

2 thoughts on “জুলে, আবার, জুলে লাদাখ – পঞ্চম পর্ব

  1. Mon diye porchhi. Darun cholchhey ekhono obdhi. Next ta ki abar 28th e ? Ami Arijit dar songey kaj kori. Naam Sounak. Bullet chalayi. Apatato ta thekey porey giye har gor vengey bosey achhi bari tey. Kintu apnar chhobi aar bornona amakey chumbok er moto tanchhey Leh er dikey.

    Like

  2. দেখি, আজ রাতে পারলে তুলে দেবো। আসলে লিখতেও সময় যাচ্ছে তো।

    অ্যাক্সিডেন্ট কোথায় হল? কলকাতার রাস্তায়? সেরে উঠুন আর পরের বছরের জন্য প্ল্যান করুন।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s