পাশের পাড়ার মেয়েটি

সাধারণভাবে কোনও বই পড়া শুরু করার আগে আলাদা করে কোনও মানসিক প্রস্তুতি নেবার দরকার হয় না – কিন্তু এই বইটা পড়ার আগে আমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হয়েছিল। বইটা পড়ার জন্য হয় তো আগে থেকে ঘটনাটার কিছু না জানলেই ভালো হত, একটা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে বইটা পড়ে একটা মতামতে পৌঁছনো যেত। কিন্তু এটা কোনও কাল্পনিক গল্পের বই নয়, কঠিন বাস্তবের ন্যারেশন। এই ন্যারেশনের একটা অংশ আমি জানি, জানতাম, ঘটনার শুরু থেকেই আমি নজরে রেখেছিলাম, নিজের মত করে খবর জোগাড় করতাম, পড়তাম, ফলে নিজের অজান্তেই একটা মত – সহজ ইংরেজিতে যাকে বলে ওপিনিয়ন, আমার তৈরি হয়ে ছিল। ফলে পুরোপুরি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এই বই পড়া আমার পক্ষে আর কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না। আমি জানতাম, বইটা পড়ে ফেলার পরে আমি ঠিক আগের মত স্বাভাবিক থাকতে পারব না, বইটা আমাকে ধাক্কা মারবে জোরে, আর হন্ট করে চলবে অনেকদিন ধরে। পড়বার পরে বুঝেছিলাম, আমার এই ধারণা অমূলক ছিল না।

Aarushi-Coverহন্ট করে বেড়াচ্ছে আমাকে বইটা, সত্যিই – অভিরূক সেনের বই, আরুষি। তার বেশ কিছু কারণ আছে। আমার আত্মজা সেই স্কুলেই পড়ে, যেখানে আরুষি পড়ত। ফলে, মনের অজান্তে কোথায় যেন আমি নিজেকে রাজেশ তলওয়ারের সঙ্গে একটা জায়গায় রিলেট করি। এই অবচেতনের ধারণাটা আমাকে নিরপেক্ষ থাকতে বড় বাধা দিয়েছে সর্বক্ষণ। এই বইয়ের প্রায় সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ যে সমস্ত এলাকা ঘিরে, সেগুলো সবই আমার বাড়ির খুব কাছাকাছি। নয়ডা সেক্টর পঁচিশের জলবায়ু বিহার, যেখানে একসময়ে আমার প্রচুর যাতায়াত ছিল, আজও যাই মাঝেমধ্যে – সেইখানেই আরুষিদের বাড়ি। এই জলবায়ু বিহারের মার্কেটেই নয়ডার অন্যতম নামকরা বাঙালি মিষ্টির দোকান – মিষ্টিমুখ, যেখানে একসময়ে গুরুচন্ডালির বইপত্র রাখা হত। আরুষিদের বাড়ি থেকে ঢিল-ছোঁড়া দূরত্বে। বইয়ের একটা দীর্ঘ অংশ জুড়ে থেকেছে আইনি প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ, তলওয়ারদের মামলার শুনানি, গাজিয়াবাদ কোর্টে। এই গাজিয়াবাদ কোর্টেই একসময়ে আমাকে দিন ছয়েক চক্কর কাটতে হয়েছিল আমার চুরি যাওয়া মোটরসাইকেলের এফআইআরের ক্লোজার রিপোর্ট বের করার জন্য, সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, আমি তার সামান্য অংশ লিখেছিলাম আমার “লা-জবাব দিল্লি” বইতে, ওই ছটা দিন আমার পক্ষে এ জীবনে ভোলা খুব মুশকিলের ব্যাপার হবে – অভিরূক সেনের বই আমার সেই কদিনের ভীতিপ্রদ অভিজ্ঞতার স্মৃতি আবার জাগিয়ে তুলল।

সব মিলিয়ে মিশিয়ে বইটা আমাকে খুবসে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটা দমচাপা ভয় তৈরি হয়ে গেছে মনের মধ্যে। পড়তে পড়তে বার বার ভেবেছি, এ বই নিয়ে লিখতেই হবে, লোককে খুব বেশি করে জানানো দরকার বইটার ব্যাপারে, আরো আরো লোকের পড়া দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, বইটা তো কোনও ফিকশনধর্মী উপন্যাস নয়, আদ্যোপান্ত সত্যি ঘটনা। রহস্যময় সেই হত্যাকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত দুজন, আরুষির বাবা আর মা, রাজেশ আর নূপুর তলওয়ার আজও গাজিয়াবাদের শেষপ্রান্তে দাসনা জেলের এক কোণায় শাস্তিভোগ করছেন, সম্পূর্ণভাবে আইনব্যবস্থা আর বিচারপ্রক্রিয়ার গাফিলতি আর অক্ষমতার কারণে। যদ্দূর জানি, খুব তাড়াতাড়ি তাঁদের নিজেদের ডিফেন্ড করবার উপায় নেই, এ জীবনের জন্য তাঁদের জেলের বাইরে বেরোনর সমস্ত রাস্তা বন্ধ – যদি না খুব অভাবনীয় কিছু মির‍্যাকল হয়। অপরাধ প্রমাণিত হয় নি, তবু শাস্তি ঘোষিত হয়ে গেছে, যে শাস্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সমস্ত চেষ্টা গত দু বছরে ব্যর্থ হয়েছে, কবে সফল হবে, আদৌ সফল হবে কিনা, তা হয় তো একমাত্র সময়ই বলতে পারবে।

আমি জানি না, আমি সম্পূর্ণ নিস্পৃহ, নিরপেক্ষভাবে এই বইয়ের সম্বন্ধে কিছু লিখতে পারব কিনা, হয় তো আমি বায়াসড হয়ে যাব, রাজেশ আর নূপুরের প্রতি, সেইজন্য বইটা শেষ করে ফেলার পরেও অন্তত দুই তিন চার সপ্তাহ আমি এটা নিয়ে লেখার সাহস করি নি। কিন্তু আর পারলাম না। এটা নিয়ে লিখতে না পারলে আমি শান্তি পাচ্ছি না। আমাকে সত্যি সত্যি আজও, বই শেষ করার দুই-আড়াই সপ্তাহ পরেও, আজও প্রায় প্রতিদিন ঘুমের মধ্যে জাগিয়ে তুলছে বইটা, কেমন একটা আতঙ্ক জাগিয়ে তুলছে মনের মধ্যে। কী বলা যায় এটাকে, মিসক্যারেজ অফ জাস্টিস নাকি ডিনায়াল অফ জাস্টিস, আমার জানা নেই। আসলে এই বইটা শুধু আরুষির হত্যাকাণ্ডের ওপর তো নয়, এটা প্রচণ্ড প্রকটভাবে দেখিয়েছে এই মামলাটাকে ঘিরে – ভারতীয় আইনব্যবস্থা, ইন্ডিয়ান জুডিশিয়ারি কতদূর নীচ, কতটা নির্মম হতে পারে; একটা আপাত-সুখী, সফল পরিবার একেবারে শেষপ্রান্ত পর্যন্ত তছনছ হয়ে যেতে পারে একটা অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে, দোষী হিসেবে যারা হয় তো অভিযুক্ত হতেও পারত, তারা স্রেফ সঠিক সময়ে চার্জশীট পেশ না হবার কারণে মুক্তি পেয়ে গায়েব হয়ে গেল, আর দোষী সাব্যস্ত হয়ে গেল এমন দুজন, যারা হয় তো অপরাধের সঙ্গে কোনওভাবে যুক্ত ছিল না।

না। তলওয়ারদের নির্দোষ প্রমাণ করবার উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এ লেখা লিখতে বসি নি, অভিরূকের বইয়ের উদ্দেশ্যও তাঁদের নির্দোষ বা দোষী প্রমাণিত করা নয়। প্রত্যক্ষ কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় নি। সিবিআই এবং বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কিছু এক্সপার্ট চরিত্রদের বানিয়ে তোলা গল্পে, “পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ” বা “সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স”এর ওপর ভিত্তি করে কীভাবে ভারতীয় আইনব্যবস্থা কাউকে চরম অপরাধী বানিয়ে ফেলতে পারে, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই আরুষি হত্যাকাণ্ড মামলা। পড়তে পড়তে কেবল মনে হচ্ছিল, কোনওদিন তো তা হলে এই রকম অভিজ্ঞতা আমার সাথেও হয়ে যেতেই পারে, ইচ্ছে করলেই যে কেউ তছনছ করে ফেলতে পারে আমার জীবন, সম্পদ, পরিবার, ভবিষ্যত – ভারতীয় পুলিশ আর আইনব্যবস্থার কাছে আমরা প্রত্যেকে সত্যিই এতটাই এক্সপোজড, এতটা অসহায়!

সিনেমায়, কিংবা নিউজ চ্যানেলের পর্দায় আমরা অনেকবার দেখেছি জননেতাকে পুলিশের হাতে ঘটনাচক্রে অ্যারেস্ট হবার পরে কুটিল হাসি হেসে বলতে, আই হ্যাভ ফুল ফেথ অন জুডিশিয়ারি।

ফুল ফেথ অন জুডিশিয়ারি। আইনপ্রক্রিয়ার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা। এই বইটা পড়বার পরে, আমি জানি না, আর কোনওদিন, কোনও অবস্থাতেই বলতে পারব কিনা, আইনপ্রক্রিয়ার ওপর আমার পুরো আস্থা আছে। নাঃ, আমার আস্থা টলে গেছে।

আরুষি হত্যাকাণ্ডের প্রথম দিন থেকেই এই কেসটা আমি নিয়মিত ফলো করেছিলাম, মূলত খবরের কাগজ আর নিউজ চ্যানেলের মাধ্যমে, এখন অভিরূকের বইটা পড়ে ফেলার পরে বুঝলাম, আমি আসলে কিছুই জানতাম না, কিছুই জানতে পারি নি – যা জেনেছিলাম, তা ছিল কিছু মোটাদাগের ফ্যাক্ট। তার বাইরেও অনেক ঘটনা, অনেক অবিচার, অনেক অন্যায় ঘটে গেছে, যা মিডিয়াতে আসে নি। কতটা লিখব এই বই সম্বন্ধে, তাও ভেবে উঠতে পারছি না, কারণ, লিখতে গেলে, মনে হচ্ছে পুরো বইটাই অনুবাদ করে ফেলা দরকার, একটা প্যারাগ্রাফও বাদ না রেখে, এতটাই নিখুঁত বিস্তারে বর্ণনা করেছেন অভিরূক। আর এই বিস্তারিত ঘটনাপ্রবাহ সবিস্তারে না জানলে কেসটা সম্বন্ধে অনেক কিছুই অজানা থেকে যায়। আমি এই নিবন্ধে তাই পুরো ঘটনা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মূল অংশগুলো তুলে ধরব, পুরো কেসটা সম্বন্ধে জানার জন্য, অতি অবশ্যই এই বইটা পড়ে ফেলতে অনুরোধ করব, সবাইকে।

টাইমলাইন
aarushi-talwarদু হাজার আট সালের ষোলই মে ভোরবেলা আরুষি তলওয়ারকে তার ঘরের বিছানায় মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করেন আরুষির বাবা মা, রাজেশ তলওয়ার আর নূপুর তলওয়ার। আরুষির গলার নলি কাটা ছিল, মাথার খুলি ভারী কিছুর আঘাতে ভেঙে গেছিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তার শরীরে কোনওরকমের ধর্ষণ বা সঙ্গমের চিহ্ন পাওয়া যায় নি – কিন্তু সে তো পরের কথা। তলওয়ারদের কাজের লোক হেমরাজের ওপর সন্দেহ এসে পড়ে, কারণ সেদিন ভোর থেকেই সে নিপাত্তা, তার মোবাইলও সুইচড অফ ছিল। পুলিশ এসে ক্রাইম সীন কর্ডন অফ করে ফেলার আগেই অসংখ্য বাইরের লোক, মূলত প্রতিবেশি, কিছু শুভানুধ্যায়ী এবং অতি উৎসাহীর দল এসে ভিড় করে ঢুকে পড়েছিল তলওয়ারদের ঘরে, নয়ডার পুলিশ তাদের আটকাতে বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যেমন রক্তের দাগ বা হাতের ছাপ ইত্যাদি, সংরক্ষণ করতে অসমর্থ হয়। সাধারণ বুদ্ধিতে সবাইই যখন হেমরাজকেই দোষী সাব্যস্ত করছে, তখন, সতেরোই মে, আরুষির মৃতদেহ আবিষ্কার হবার ঠিক একদিন পরে, তলওয়ারদেরই বাড়ির তালাবন্ধ টেরেসে, তালা ভেঙে আবিষ্কৃত হয় হেমরাজের মৃতদেহ। একইরকম ভাবে গলার নলি কাটা আর ভারী কিছু দিয়ে মাথার খুলি ভেঙে দেওয়া। সামনে এমনভাবে একটা বেডকভার ঝোলানো ছিল, আশেপাশের বাড়ির জানলা বা বারান্দা থেকে কোনওভাবেই বোঝা যায় নি এখানে একটা মৃতদেহ পড়ে আছে।

সন্দেহের তির এর পরে ঘুরে যায় রাজেশ তলওয়ারের দিকে, এবং উত্তর ভারতের রীতি অনুযায়ী একটি অনার-কিলিং-এর তত্ত্ব খাড়া করা হয়। নয়ডা পুলিশ ২৩শে মে রাজেশকে অ্যারেস্ট করে। কিন্তু ততক্ষণে নয়ডা পুলিশের অপদার্থতা পদে পদে ফুটে উঠতে শুরু করেছে। লোকজনের ভিড়ে সমস্ত গুরুত্বপুর্ণ ফরেনসিক তথ্য লোপাট, চোখের সামনে তালাবন্ধ টেরেস দেখতে পেয়েও তার তালা ভাঙতে প্রায় দেড় দিন দেরি করা – সব মিলিয়ে নয়ডা পুলিশের এই কেসে বিশেষ কিছু করার ছিল না। বিশেষ কিছু ইনফ্লুয়েনশিয়াল লোকের সহায়তায় সিবিআই এই কেসের দায়িত্ব নেয় ৩১শে মে। তারা পর পর কিছু অ্যারেস্ট করে, মূলত হেমরাজের সঙ্গী, ওই এলাকারই অন্যান্য বাড়িতে ভৃত্যের কাজ করা কৃষ্ণ (কৃষ্ণা), রাজকুমার এবং দেড় মাস পরে অ্যারেস্ট করে আরেকজন ভৃত্য, বিজয় মণ্ডলকে। কৃষ্ণার ঘর থেকে একটি কুকরি এবং একটি রক্তমাখা পিলো-কভার বা বালিশের ওয়াড় পাওয়া যায়। প্রাথমিক জেরা ইত্যাদির পরে কৃষ্ণা তার দোষ কবুল করে, এগারোই জুলাই ২০০৮, রাজেশ তলওয়ার মুক্তি পান।

এই অবধি পড়লে মনে হয়, সবই তো ঠিক আছে। অপরাধী কে জানা গেল, অপরাধের অস্ত্র পাওয়া গেল, প্রমাণ পাওয়া গেল, আর কী চাই?

সিবিআই নিজেও সেই রকমই ভেবেছিল, অন্তত সিবিআইয়ের তরফে ইনভেস্টিগেটিং অফিসারও সেই রকম ভেবেছিলেন। কিন্তু ততদিনে এই কেস মিডিয়ার নজরে এসে গেছে। মিডিয়া বিভিন্ন ভাবে ঘটনার নাট্য রূপান্তর দেখিয়ে, অনার কিলিং-এর ওপর টক শো অর্গানাইজ করে ব্যাপারটাকে এমন একটা সেনসেশনাল পর্যায়ে নিয়ে গেছিল, যে মিডিয়া-ট্রায়ালে মুগ্ধ আমজনতা “হয়-তো” এই রকমের একটি জোলো এন্ডিং এই কেসের জন্য মেনে নিতে পারত না। সিবিআইয়ের তৎকালীন ডিরেক্টরও মেনে নিতে পারেন নি। তিনি ইনভেস্টিগেটিং অফিসারকে কেস ফাইল বানিয়ে কেস “ক্লোজ” করার অনুমতি দেন না – তাঁর সন্দেহ ছিল, ভৃত্যরা নয়, স্বয়ং রাজেশ আর নূপুরই তাঁদের মেয়ে আরুষি আর চাকর হেমরাজের মৃত্যুর জন্য দায়ী।

এই সন্দেহকে সত্যি প্রমাণ করার জন্য এর পর তিনি বহুদূর যাবেন, এবং সময়মত কেস ফাইল তৈরি করতে না পারার কারণে দু হাজার আটের চৌঠা সেপ্টেম্বর বিজয় মণ্ডল, এবং বারোই সেপ্টেম্বর কৃষ্ণা আর রাজকুমারও ছাড়া পেয়ে যায়। এরই মধ্যে দিল্লির এইমস থেকে ফাইনাল পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসে, যাতে লেখা ছিল, মৃতদের মাথার আঘাত কুকরির আকারের সাথে ম্যাচ করছে, এবং হায়দরাবাদের ফরেনসিক ল্যাব থেকে ফাইনাল রিপোর্ট আসে, কৃষ্ণার ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া রক্তমাখা বালিশের ওয়াড়ে হেমরাজের রক্ত লেগে আছে।

এত কিছুর পরেও, সিবিআইয়ের ডিরেক্টর এই সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন যে, কৃষ্ণা বা রাজকুমার নয়, তলওয়ার দম্পতিই অনার কিলিং করিয়েছেন নিজের মেয়ে এবং হেমরাজকে। এবং এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য যা যা করা দরকার, তার সমস্তই তিনি করতে থাকেন ধীরে ধীরে, ক্রমশ সন্দেহের কাঁটা ঘোরাতে থাকেন তলওয়ার দম্পতির দিকে। বিভিন্ন ব্যক্তির বয়ান – যা শুরুতেই রেকর্ড করা হয়েছিল, তার দ্বিতীয় ভার্সন আসতে শুরু করে, প্রায় সকলের ক্ষেত্রেই, যে সব লোকেদের বয়ান বদলানো সম্ভব হয় নি, তাদের বয়ান বাদই দিয়ে দেওয়া হয় কেস থেকে। খুনের অস্ত্র, মার্ডার ওয়েপন কুকরি থেকে সরে গিয়ে কখনও হয়ে দাঁড়ায় গলফ ক্লাব, কখনও সার্জিকাল নাইফ, যা গলফ-খেলা ডেন্টিস্ট রাজেশ তলওয়ারের বাড়ি থেকে সহজেই উদ্ধার করে ফেলা সম্ভব হয়। মৃত্যুর প্রায় এক বছর পরে নতুন টেস্টিমনির মাধ্যমে জানা যায় আরুষি খুন হবার আগে ধর্ষিত হয়েছিল কিংবা সঙ্গম করেছিল, জানান সেই ব্যক্তি যিনি আরুষির দেহের পোস্ট মর্টেম করেছিলেন এবং শুরুতেই জানিয়েছিলেন কোনওরকমের যৌন সঙ্গম বা বলাৎকারের চিহ্ন পাওয়া যায় নি আরুষির শরীরে বা যৌনাঙ্গে। প্রসঙ্গত, মৃত্যুর সময়ে আরুষি ছিল তার চোদ্দতম জন্মদিন থেকে মাত্রই কয়েকদিন দূরে। যাকে কেন্দ্র করে এই অনার কিলিং-এর তত্ত্ব, সেই হেমরাজের বয়েস ছিল মোটামুটি পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ বছর।

বয়ান বদলের পরে আরও জানা যায় তলওয়ার দম্পতি নাকি ধর্ষণের কেচ্ছাটি জানতেন এবং রাজেশ নাকি বিশেষভাবে পুলিশকে অনুরোধ করেছিলেন যাতে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে “ধর্ষণ” বিষয়টির উল্লেখ না থাকে – পারিবারিক সম্মানের খাতিরে। জানা যায় যে রাজেশ আর নূপুর নাকি “যথেষ্ট” শোক প্রকাশ করেন নি মেয়ের মৃতদেহ আবিষ্কারের পরে, ঘরভর্তি উৎসুক জনতার কেউই নাকি তলওয়ার দম্পতিকে “সেইভাবে” শোকগ্রস্ত অবস্থায় দেখেন নি। আরও জানা যায় যে পুলিশ নাকি প্রথম দিনই টেরেসের দরজার তালা ভেঙে হেমরাজের মৃতদেহ উদ্ধার করে ফেলতে পারত, রাজেশই নাকি তাদের ভুলিয়েভালিয়ে টেরেসের সিঁড়ির দিকে এগনো থেকে বিরত রাখেন। এই রকমের আরও অনেক কিছুই জানা যায় পর পর। হতবাক তলওয়ার দম্পতি সমস্ত পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেন, কিন্তু সিবিআইয়ের ডিরেক্টরকে টলানো সম্ভব হয় নি।

কিন্তু এত করেও শেষমেশ সিবিআই অনার কিলিং-এর তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হল না। প্রতিটা বয়ানের বদলকে লিঙ্ক করতে গেলে যে ঠাসবুনোট কাহিনির প্রয়োজন হয়, সেই কাহিনি বানাতে অপারগ হয় সিবিআই। অবশেষে রাজেশ আর নূপুর তলওয়ারকে গুজরাতের গান্ধীনগর নিয়ে যাওয়া হয় তাঁদের নারকো-অ্যানালিসিস টেস্ট এবং ব্রেন ম্যাপিং-এর জন্য। এতেও তলওয়াররা নির্দোষ সাব্যস্ত হন। ইতিমধ্যে ২০১০ সালের জুন মাসে সিবিআইয়ের ডিরেক্টর বদল হয়। নতুন ডিরেক্টর পুরো কেস পর্যবেক্ষণ করে অবশেষে ইনভেস্টিগেটিং অফিসারকে এই মর্মে কেস বন্ধ করতে বলেন – যে, রাজেশ তলওয়ার বা অন্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার মত যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় নি।

২৯শে ডিসেম্বর সিবিআই ক্লোজার রিপোর্ট জমা দেয় এই মর্মে। কেস বন্ধ হয়।

তা হলে কে মেরেছে আমাদের আদরের মেয়ে আরুষিকে? কে মেরেছে হেমরাজকে? – প্রশ্ন করেন রাজেশ তলওয়ার, নূপুর তলওয়ার। উত্তর মেলে না, ঠিক সেই ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকা’র মত করে নতুন করে রাজেশ আর নূপুর জানতে হয়, নো ওয়ান কিলড আরুষি।
২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে গাজিয়াবাদ কোর্টে রাজেশ তলওয়ার সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্টের বিরুদ্ধে পিটিশন দাখিল করেন এবং কেসকে আবার ওপেন করার দাবি জানান। সেই দিনই, গাজিয়াবাদ কোর্ট চত্ত্বরে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি একটি মাংস-কাটার ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজেশ তলওয়ারের ওপর। রাজেশ গুরুতর আহত হন। অনেকেরই হয় তো মনে থাকবে – সেই সময়ে কাগজে নিয়মিত বেরোত এই কেসের খুঁটিনাটি।
গাজিয়াবাদের কোর্টে সিবিআইয়েরও একটি স্পেশাল কোর্ট আছে। সেখানকার স্পেশাল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যখন এই পিটিশন পৌঁছয়, তিনি দুটিকেই খারিজ করে দেন। দুটিকেই – একদিকে রাজেশের পিটিশন কেস আবার ওপেন করার জন্য, অন্যদিকে সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট, উলটে তিনি সিবিআইকে পরামর্শ দেন যে রিপোর্টের শেষে ‘ক্লোজড’ কথাটা না লিখে এটাকেই চার্জশীটে পরিণত করতে। ফাইলে তলওয়ারদের বিরুদ্ধে যে গল্প সাজানো হয়েছিল, যা সিবিআইয়ের ইনভেস্টিগেটিং অফিসারদের নিজেদের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য লাগে নি, বিচারক সেই গল্পগুলোকেই রাজেশ আর নূপুর তলওয়ারের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে তাদের নামে চার্জশীট বানানোর নির্দেশ দেন সিবিআইকে।

সচ্ছল বাড়ির প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার দম্পতি। তাদের একমাত্র মেয়ে এবং একটি চাকর রহস্যজনকভাবে খুন। উত্তর ভারত এমন একটা জায়গা – এখানে এটা অনার কিলিং-এর গল্প তৈরি করতে এবং সেটা এই ঘটনার তদন্তপ্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত অথবা যুক্ত নয়, সেই সব লোকজনকে বিশ্বাস করাতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। তা যতই কেসে লুপহোল থাকুক না কেন। আরুষির কেসে এই ব্যাপারটা বার বার দেখা গেছে যে ইনভেস্টিগেটিং অফিসার, কিংবা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অথবা অন্য কোনও অথরিটি, একটা প্রি-অকুপায়েড মাইন্ড নিয়ে কেস রিভিউ করতে আসছেন – ইট মাস্ট বি আ কেস অফ অনার কিলিং – আর তারপরে ছকগুলোকে অনার কিলিং-এর তত্ত্বে মেলানোর চেষ্টা করছেন। যেখানেই ছক মিলছে না, সেখানে অদ্ভূত অদ্ভূত সব গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে। বয়ান বদলে দেওয়া হয়েছে।

অনার কিলিং-এর থিওরি অনুযায়ী, রাজেশ ঘটনার দিন রাতে আরুষির ঘরে আরুষি এবং হেমরাজকে “আপত্তিজনক অবস্থায়” দেখতে পান, এবং তাই দেখে তাঁর মাথায় খুন চেপে যায়। তিনি সার্জিকাল স্ক্যালপেল (ডেন্টিস্টের কাছে যা থাকে, যা দিয়ে দাঁতের নিচের মাড়ি কাটা হয়, এবং যা দিয়ে গলার নলি কাটা রীতিমত কষ্টসাধ্য ব্যাপার, যদি না অসাধ্য হয়) দিয়ে আরুষি আর হেমরাজ দুজনকেই খুন করেন, এবং গলফ ক্লাব দিয়ে বাড়ি মেরে দুজনকারই মাথা ফাটিয়ে দেন। এই ছিল সিবিআইয়ের রিপোর্টে লেখা। সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠে আসে – আরুষি আর হেমরাজ কি একই ঘরে খুন হয়েছিল? সিবিআইয়ের প্রাথমিক যুক্তি – হ্যাঁ। একই ঘরে আরুষি আর হেমরাজ খুন হয়। পরে হেমরাজের ডেডবডি রাজেশ আর নূপুর মিলে টেরেসে নিয়ে যান।

কিন্তু রহস্য তাতে বাড়ে বই কমে না। যদি সেই ঘরেই হেমরাজ খুন হয়, তা হলে ঘরে বিছানায় শুধুমাত্র আরুষিরই ব্লাড স্যাম্পল পাওয়া গেল কেন, কেন হেমরাজের রক্তের একটা বিন্দুও ওই ঘরে পাওয়া যায় নি? সিবিআইয়ের যুক্তি – দে (রাজেশ আর নূপুর) ড্রেসড আপ দা ক্রাইম সীন। তারা নাকি বেছে বেছে হেমরাজের রক্তের সমস্ত চিহ্ন মুছে শুধু আরুষির রক্তের চিহ্নগুলোকে রেখে দিয়েছিলেন বিশ্বাসযোগ্যতা আনবার জন্য।

একবার ভেবে দেখুন। বিছানায়, বা ঘরের মধ্যে দুটি মানুষকে বীভৎসভাবে খুন করা হয়েছে, প্রথমে গলা কেটে, তার পরে মাথার খুলি ফাটিয়ে। ঘরের মধ্যে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবার কথা, এখন, কত উন্নতমানের ডাক্তার হলে সেই রক্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে একটি বিশেষ গ্রুপের রক্তের দাগ মুছে অন্য গ্রুপের রক্তের দাগটি অবিকৃত রেখে দিতে পারেন? হেমরাজ আর আরুষির রক্তের গ্রুপ ছিল আলাদা। ঘরের মধ্যে হেমরাজের গ্রুপের এক বিন্দু রক্তও পাওয়া যায় নি।

সিবিআইয়ের রিপোর্টে এর কোনও যৌক্তিক উত্তর মেলে নি, কিন্তু সিবিআই কোর্টের স্পেশাল জাজ এই তত্ত্বে কোনও অসঙ্গতি খুঁজে পান নি। সমস্যার এখানেই শেষ নয়। যদি ধরেও নেওয়া যায় মৃত হেমরাজকে রাজেশ আর নূপুরই চ্যাংদোলা করে টেরেসে রেখে আসেন, তা হলে সিঁড়িতে, রেলিং-এ – কোথাও রক্তের কোনও চিহ্ন নেই কেন? সিবিআইয়ের যুক্তি ছিল, মৃতদেহ বেডকভারে মুড়ে ছাদে রেখে আসা হয়েছিল, তাই কোথাও রক্তের দাগ মেলে নি।

ক্রিমিনাল কেসে সীন রিক্রিয়েট করার একটা প্রসিডিওর থাকে, ঠিক কীভাবে অপরাধটা সংগঠিত হয়েছিল তার একটা হুবহু ড্রিল করা হয় যাতে যে তত্ত্বের ওপর আধার করে কেস সাজানো হচ্ছে, সেই তত্ত্ব যৌক্তিকতা পায়। এই কেসের দায়িত্বে ছিলেন যে ফরেনসিক অফিসার, তিনি এই সীন রিক্রিয়েট করার ব্যাপারে বিশেষ পারদর্শি ছিলেন। গুজরাতের গোধরা হত্যাকাণ্ডের সীন রিক্রিয়েট করে তিনিই প্রথম এই তত্ত্বটি জানান যে, বাইরে থেকে নয়, করসেবকরা ট্রেনের ভেতরেই স্টোভ জ্বালিয়ে রান্না করছিল, সেখান থেকেই নাকি ট্রেনে আগুন ছড়ায়। অবিশ্যি, পরে তদন্তপ্রক্রিয়ায় তাঁর এই সীন রিক্রিয়েটের তত্ত্ব ধোপে টেকে নি গোধরা কেসে, বাইরে থেকে ট্রেনে আগুন লাগার তথ্য এখন নানাবতী কমিশনের হাতেই রয়েছে। তো, সেই একই ব্যক্তি এখানেও সীন রিক্রিয়েট করার চেষ্টা করেছিলেন – হেমরাজের সমান ওজনের একটি কনস্টেবলকে বেডকভারে শুইয়ে দুজন পুলিশকে দিয়ে তিনি সিঁড়ি ভেঙে ওই বেডকভারশুদ্ধ কনস্টেবলকে বয়ে টেরেসে রেখে আসার অভিনয় করিয়েছিলেন। দেখা গেছিল, দুজনের পক্ষে ওইভাবে একজন মৃত মানুষকে চাদরে বেঁধে, কোথাও রক্তের কোনও চিহ্ন না লাগিয়ে, সিঁড়ি ভেঙে ছাদে রেখে আসা খুবই অসম্ভব কাজ। দুটি খুনের অব্যবহিত পরে রাজেশ এবং নূপুর তলওয়ারের পক্ষে যা করা ফিজিকালি সম্ভব ছিল না।

তা হলে কি হেমরাজকে জীবন্ত অবস্থায় ছাদে নিয়ে গিয়ে খুন করা হয়েছে? সে তলওয়ারদের সঙ্গে ছাদে গেছিল? ততক্ষণে কি আরুষি খুন হয়ে গেছে? যদি খুন হয়ে গিয়েই থাকে, তা হলে সেই খুন দেখার পরেও হেমরাজ বিনা প্রতিবাদে কী করে ছাদে গেল তলওয়ারদের সাথে? কোনও ধ্বস্তাধস্তির চিহ্ন নেই কোথাও – কী করে হতে পারে? যদি আরুষি আর হেমরাজ এক ঘরেই থেকে থাকে, তা হলে যে কোনও একজনের খুন অন্যজনের পক্ষে দেখতে পাবার কথা, আর মৃত্যুভয়ে অন্যজন আপ্রাণ চেষ্টা করবেই হত্যাকারীর থেকে মুক্তি পাবার – সে হত্যাকারী যে-ই হোক না কেন। কিন্তু কারুর তরফেই প্রতিরোধের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায় নি। তার মানে কি দুজনকে আলাদা ভাবে, অথবা আলাদা সময়ে খুন করা হয়েছে?

এই সমস্ত ফাঁক সিবিআই তার রিপোর্টে বোজাতে পারে নি। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে তারা সেই ক্লোজার রিপোর্টকে বদলালো চার্জশীটে।

রাজেশ আর নূপুর এলাহাবাদ হাইকোর্টে গেলেন এই বদলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে, কিন্তু লাভ হল না। এইখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ রোল ছিল সেই বালিশের ওয়াড়ের। আমরা আগেই জেনেছি যে, আরুষির ঘরে হেমরাজের রক্তের একটি কণাও পাওয়া যায় নি। কিন্তু হেমরাজের রক্ত পাওয়া গেছিল একটি বালিশের ওয়াড়ে, যেটা লুকনো ছিল কৃষ্ণার ঘরে, সিবিআই আগেই উদ্ধার করেছিল সেটা, একটা কুকরির সঙ্গে। রাজেশ আর নূপুরের সাথে কৃষ্ণা আর রাজকুমারেরও নারকো-অ্যানালিসিস টেস্ট হয়, এবং সেখানে অবচেতনে তারা স্বীকার করে আরুষির প্রতি তাদের দুর্বলতার কথা, হেমরাজকে খুন করার কথা।

প্রথমে নয়ডা পুলিশ, পরে সিবিআই – কেস হাতে নেবার পরে অনেক জিনিসই সীজ করে তলওয়ারদের বাড়ি থেকে এবং কৃষ্ণার আস্তানা থেকে, এভিডেন্স হিসেবে। আরুষির ঘর থেকে সীজ হয় আরুষির বালিশের ওয়াড়, যাতে আরুষির রক্তের দাগ ছিল, আর কৃষ্ণার ঘর থেকে সীজ হয় কৃষ্ণার বালিশের ওয়াড়, যাতে ছিল হেমরাজের রক্ত। ক্লোজার রিপোর্ট যখন চার্জশীটে বদলে গেল, রাজেশ আর নূপুর সবিস্ময়ে দেখলেন – এই দুটি বালিশের ওয়াড় পরস্পরের জায়গা বদলাবদলি করে নিয়েছে, অর্থাৎ, নতুন এভিডেন্সের লিস্ট অনুযায়ী, আরুষির ঘর থেকে সীজ হওয়া বালিশের ওয়াড়ে রয়েছে হেমরাজের রক্ত।

কী ভাবে হল এই বদলাবদলি? কে বদলালো সীল করা এভিডেন্সের প্যাকেট? এলাহাবাদ হাইকোর্টে এই প্রশ্ন রাখলেন তলওয়ার দম্পতি। কিন্তু, হাইকোর্ট তাঁদের এই দাবীকে নস্যাৎ করে দিয়ে জানালেন – এটা নিতান্তই একটি টাইপোগ্রাফিকাল এরর, আগে ভুল লেখা হয়েছিল, এখন ঠিক লেখা আছে। … কিন্তু দুটো বালিশের ওয়াড়ের যে ডিজাইন আলাদা! এই ওয়াড় আরুষির ঘরে আসতেই পারে না, অন্তত তাঁরা যখন ওই ঘরে উপস্থিত ছিলেন, তখনও এই ওয়াড় ওই ঘরে ছিল না, বরং তাঁদের স্পষ্টই মনে আছে, ওয়াড়টি কৃষ্ণার ঘর থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

কিন্তু মহামান্য হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন – টাইপো। কার কত ক্ষমতা তাকে বদলায়? তিনি গাজিয়াবাদ কোর্টের রায়কেই বহাল রাখলেন, সাথে সিবিআইকে বললেন, খোঁজ নিয়ে দ্যাখো তো বাপু, কারা এই টাইপোটি করেছিল? সিবিআই প্রশ্নটি পাঠিয়ে দিল হায়দরাবাদের ফরেনসিক ল্যাবের অধিকর্তাকে, কিছুদিনের মধ্যেই হায়দরাবাদ থেকে উত্তর এসে গেল, হ্যাঁ, আমাদের কাছেই টাইপো হয়েছিল। অর্থাৎ কিনা, ফরেনসিক ল্যাবরেটরির নতুন বয়ান অনুযায়ী হেমরাজের রক্তমাখা বালিশের ওয়াড়, আসলে আরুষির ঘর থেকেই উদ্ধার হয়েছিল।

মেয়ের মৃত্যুর পরে একদিনের জন্যেও শোক করার অবকাশ পান নি তলওয়ারেরা। কিন্তু এত বড় ঘাপলাকে শুধু টাইপোগ্রাফিকাল এরর বলে ছেড়ে দেওয়া তো নিতান্তই মূর্খতা! খুব জেনেবুঝেই কেউ এই কাজটা করেছে, যাতে প্রমাণ করা যায় যে আরুষির ঘরে হেমরাজের ব্লাড স্যাম্পল পাওয়া গেছে, যা আসলে অনার কিলিং-এর তত্ত্বকেই প্রতিষ্ঠিত করবে – সিবিআইয়ের যেটা আসল লক্ষ্য।

মরিয়া হয়ে তলওয়াররা অ্যাপিল করলেন সুপ্রিম কোর্টে। তাঁরা জানালেন, তাঁদের সন্দেহ হচ্ছে গাজিয়াবাদের কোর্টে ফেয়ার ট্রায়াল হচ্ছে না, এবং এভিডেন্স ট্যাম্পার করা হচ্ছে তাঁদের বিরুদ্ধে কেস সাজাবার জন্য। তাঁরা অনুরোধ জানালেন, কেস যেন গাজিয়াবাদ থেকে বের করে এনে দিল্লির কোনও কোর্টে করা হয়, প্রথমত তাঁদের পক্ষে দিল্লি থেকে গাজিয়াবাদের কোর্টে যাতায়াত করা সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, দ্বিতীয়ত দিল্লির কোর্টে হলে তাঁদের পক্ষে কেস ভালোভাবে নজরে রাখা সম্ভব হবে।

তলওয়ারদের কথা শোনার বদলে, তলওয়াররা পেলেন সর্বোচ্চ আদালতের পবিত্র ক্রোধ। তুমি একজন সাধারণ ইন্ডিয়ান সাবজেক্ট, তোমার এত বড় সাহস হয় কী করে একটি আদালতের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করার? তাকে বায়াসড বলবার? শুধু এই চার্জে তোমাকে দিয়ে জেলের ঘানি ঘোরানো যায়, নেহাত তুমি প্রথমবার এই অনুরোধ করেছো, তাই তোমাকে ছাড় দেওয়া হল। আর কখনও কোনও আদালতের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করার সাহস দেখিও না।
মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট গাজিয়াবাদ কোর্টেই মামলার প্রসিডিংস বহাল রাখলেন, শুধু এইটুকু স্বস্তি দিলেন, যে চার্জশীট পেশ হলেও কেস শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজেশ আর নূপুর তলওয়ার জামিনে থাকতে পারবেন। পুলিশ তাঁদের অ্যারেস্ট করবে না।

কিন্তু আইনের হাত থেকে বাঁচা এত সহজ ছিল না তলওয়ারদের পক্ষে। সুপ্রিম কোর্টে দৌড়োদৌড়ি করতে গিয়ে নূপুর গাজিয়াবাদের কোর্টে হাজিরা দেবার একটি ডেট মিস করে ফেলেছিলেন, ফলে সিবিআইয়ের তরফে তাঁর নামে নন-বেলেবল ওয়ারান্ট জারি হল। নূপুর আত্মসমর্পণ করলেন ৩০শে এপ্রিল ২০১২। বেলের জন্য অ্যাপ্লাই করলেন। কিন্তু বেল পেলেন না, অ্যারেস্ট হলেন। ইতিমধ্যে গাজিয়াবাদ কোর্টে সিবিআইয়ের স্পেশাল বেঞ্চে এই মামলার শুনানি শুরু হল – রাজেশ আর নূপুরকে খুনী হিসেবে চার্জ করে। সিবিআই একের পর এক সাক্ষী নিয়ে আসতে থাকল, ফরেনসিক এক্সপার্ট, পোস্টমর্টেম করা ডাক্তার, ঘটনার দিন হাজির হওয়া স্থানীয় কনস্টেবল, বন্ধু, কাজের লোক। এবার সক্কলের বয়ান বদলে যেতে থাকল। সবার সমস্ত বয়ান তলওয়ারদের বিরুদ্ধে যেতে থাকল। ফরেনসিক ল্যাবের এক্সপার্ট সেখানে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলেন যে হেমরাজের রক্তমাখা বালিশের ওয়াড়টি আরুষির ঘরে পাওয়া গেছিল। প্রকারান্তরে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে এই ওয়াড়টি হেমরাজ বা কৃষ্ণার ঘর থেকেই পাওয়া গেছিল। এই একটি স্বীকারোক্তি ছাড়া আর কোনও সাক্ষ্যই তলওয়ারদের পক্ষে গেল না। এমনকি তলওয়ারদের বাড়িতে কাজ করা মহিলা, ভারতী মণ্ডলের জবানবন্দীও বদলে গেছিল সুচারুভাবে। অবশ্য ভারতী জবানবন্দী দেবার শুরুতেই শপথ নিয়ে বলেছিলেন, আমাকে যা “শেখানো” হয়েছে আমি শুধু তা-ই বলব।

২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১২, নূপুর তলওয়ার সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে ছাড়া পান।

কেস গড়িয়ে চলে ২০১৩ সালে। মে মাস পর্যন্ত একের পর এক সাক্ষীর জবানবন্দী নেওয়া হয় সিবিআইয়ের তরফে।

পয়সার খেলা

আমাদের অনেকেই বোধ হয় কোনও মামলা চালাবার জন্য কখনও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবির সাহায্য নিই নি। আমিও নিই নি। তবে অভিরূকের বইটা পড়ে যা জানলাম, আপনাদেরও জানাচ্ছি – প্রতিটা শুনানিতে উপস্থিতির জন্য একজন সুপ্রিম কোর্ট লইয়ারের মোটামুটি বর্তমান রেট হচ্ছে দশ থেকে পনেরো লাখ। মানে, আন্দাজ করে নিতেন পারেন – সুব্রত রায় সাহারাকে নিজের কেস সুপ্রিম কোর্টে শুধু চালাবার জন্য একটা দুটো হোটেল বিক্রি করে ফেলতে হয়েছিল। তলওয়াররা কোথা থেকে পেলেন এত টাকা?

তলওয়ারদের কেসটা ছিল একটু আলাদা। একদিকে যখন সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রায় কোনও সাহায্যই পান নি তলওয়াররা, ইনভেস্টিগেটিং অফিসার থেকে বিচারক – সকলেই অনার কিলিং-এর তত্ত্বটিকেই পালিশ করে চকচকে করে তুলতে ব্যস্ত ছিলেন, সেইখানে দিল্লির কিছু নামকরা লইয়ার, স্রেফ কেসটির মেরিট বিবেচনা করে, তলওয়ারদের স্বার্থে, বিনা পয়সায় কেসটিতে তাদের হয়ে সওয়াল করতে রাজি হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হরিশ সালভে, ভারত সরকারের প্রাক্তন সলিসিটর জেনারেল। সালভের ফীজ ভরার সাধ্য তলওয়ারদের ছিল না, কিন্তু কেসটি ততদিনে বিতর্কের এমন একটা মাত্রায় উঠে বসেছিল, সালভে এক পয়সা না নিয়ে এই কেসে কাজ করতে রাজি হয়েছিলেন। এমনি আরেকজন ছিলেন মুকুল রোহতাগি, যিনি পরে ভারত সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল হন। মূলত এঁদের সওয়ালেই নূপুর সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তি পান।

অবশ্য সবাই এতটা উদার হতে পারেন নি। তলওয়ারদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উকিলের সাহায্য নিতে হয়েছে। কেউ বিনা পয়সায়, কেউ সাধারণ ফি-এর চেয়ে কম রেটে তলওয়ারদের জন্য কাজ করেছেন। এর পাশাপাশি ছিলেন গাজিয়াবাদ কোর্টের উকিলরা – সব মিলিয়ে তলওয়ারদের প্রতি মাসে খরচ হয়ে চলেছিল পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ – শুধু কেস চালানোর জন্য। এটা মূলত সম্ভব হচ্ছিল রাজেশ আর নূপুরের নিজস্ব পেশেন্টদের জন্য। না, কেউ তাঁদের টাকাপয়সা দানধ্যান করেন নি, রাজেশ আর নূপুর, জেলের বাইরে, কেসের শুনানির বাইরে যতবার নিজেদের চেম্বারে বসেছেন, পেশেন্টরা এসেছেন নিজেদের দাঁতের সমস্যা নিয়ে, রোজগার বন্ধ হয় নি তলওয়ারদের। এর বাইরে নয়ডার জলবায়ু বিহারের ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে তাঁদের মাসে আয় হচ্ছিল মাসে কুড়ি হাজার টাকা। নয়ডার চেম্বারটি তাঁরা বিক্রি করতে বাধ্য হন – সেই বিক্রির টাকায় চলেছিল কিছুদিন। শেষে হাউজ খাসে তাঁদের ডেন্টাল চেম্বারও তাঁরা ভাড়া দিয়ে দেন, তাতেও টাকার সমস্যা মিটছিল না। বাকি টাকার জোগান দেন রাজেশ নূপুরের কিছু বন্ধু, এবং নিকটাত্মীয়রা।

জুন মাসে ডিফেন্স লইয়ার, তনভীর আহমেদ মীর তাঁর ট্রায়াল শুরু করেন। ক্রিমিনাল লইয়ার হিসেবে রীতিমত খ্যাতিমান মীর এই কেসে যুক্ত হন ২০১২ সালের শেষদিকে। ডিফেন্সের এভিডেন্স হিসেবে তিনি কৃষ্ণা আর রাজকুমারের নারকো-অ্যানালিসিস রিপোর্ট আর সমস্ত ডিএনএ স্যাম্পল চেয়ে পাঠান। সেই মর্মে এলাহাবাদ হাইকোর্টে আবেদন করেন তলওয়ারেরা। কিন্তু সিবিআই রাজি হয় না সেই সমস্ত তথ্য তলওয়ারদের দিতে। রাজেশ সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন যাতে সুপ্রিম কোর্ট সিবিআইকে বাধ্য করে সেই সমস্ত রিপোর্ট দিতে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সিবিআইকে কিছু বলবার আগেই সিবিআই সুপ্রিম কোর্টকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জানায় যে তলওয়ারেরা শুধুমুধু কেসকে ডিলে করানোর জন্যই এইসব এভিডেন্স চাইছেন – এগুলো শুধু তাঁদের জেলের বাইরে বেশিদিন থাকার ছল। সুপ্রিম কোর্ট এতটুকুও সময় নিল না সিবিআইয়ের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করতে। তলওয়ারদের জানানো হল, তোমরা মহামান্য কোর্টের সময় নষ্ট করছো, শুধুমুধু কোর্টের কাজকর্মের দেরি ঘটাচ্ছো এই সমস্ত জিনিস চেয়ে। কিচ্ছু দেওয়া হবে না তোমাদের।

তিনটি কোর্টের মধ্যে নিরন্তর দৌড়োদৌড়ি সুবিচারের আশায় – একটি দিল্লিতে, একটি গাজিয়াবাদে, আরেকটি এলাহাবাদে। শুধু যাওয়া আসাতেই দৈনিক খরচ হয়ে যাচ্ছিল হাজার হাজার টাকা।

সমস্ত আশা হারালেও, আশা হারান নি তনভীর আহমেদ মীর। ২৪শে অক্টোবর ২০১৩, তিনি তলওয়ারদের হয়ে ফাইনাল আর্গুমেন্ট রাখা শুরু করলেন।
কিন্তু জাজ স্বয়ং খুব একটা শোনবার মুডে ছিলেন না। যিনি এতদিন ধরে সিবিআইয়ের সমস্ত শুনানি মন দিয়ে শুনেছেন, নোট নিয়েছেন, তিনি এখন ডিফেন্সের আর্গুমেন্ট শোনার আগে ধৈর্য হারিয়ে বসছেন, বারবার বলছেন – আরে এত বলার কী আছে? তাড়াতাড়ি শেষ করুন। আর কত বাকি আছে, মীর সাহাব? সময় কম।

সময় সত্যিই কম। গাজিয়াবাদের স্পেশাল কোর্টের জাজ শ্যাম লাল নভেম্বর মাসের ৬ তারিখে ৬০ বছর পূর্ণ করবেন, নভেম্বর মাসেই তাঁর রিটায়ারমেন্ট। চাইলেই তিনি পরের জাজের হাতে কেসের দায়ভার দিয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন বিচারকের আসনে বসে থাকা অবস্থায় আরুষি হত্যাকাণ্ডের জাজমেন্ট শুনিয়ে যেতে।

২৪শে নভেম্বর ২০১৩ তনভীর মীরের আর্গুমেন্ট শেষ হয়, ২৫ তারিখে জাস্টিস শ্যাম লাল রাজেশ এবং নূপুরকে দোষী সাব্যস্ত করেন। ২৬ তারিখে তিনি তাঁর ২১০ পাতার রায় পড়ে শোনান – মেয়ে আরুষি আর ভৃত্য হেমরাজকে খুন করার দায়ে দুজনকার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

রাজেশ আর নূপুর এখনও দিন কাটাচ্ছেন গাজিয়াবাদের প্রান্তে দাসনা জেলে। অ্যাপিল করেছেন গাজিয়াবাদ কোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে – কিন্তু কবে তাঁদের কেস হাইকোর্টে উঠবে, তাঁরা নিজেরাও জানেন না। ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এলাহাবাদ হাইকোর্টে ১৯৮২-৮৩ সালের মামলার শুনানি চলছে। এত বিশাল রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, তার এত লাখ লাখ মামলা, ব্যাকলগ প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে, কোনও মামলাকে আলাদা করে প্রাধান্য দেবার কোনও ক্ষমতাই নেই কারুর। সুতরাং ২০১৩ সালে জমা হওয়া মামলার পিটিশন আদৌ একুশ শতকের কোনও বছরে সেখানে শুনানির সুযোগ পাবে কিনা, সে উত্তর দিতে পারে একমাত্র ভবিষ্যত।

সিবিআই এবং জিমেল

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, সিবিআই। অফিশিয়ালি তারা কোনও কেস টেকআপ করে, অফিশিয়ালি সেই কেসের তদন্ত করে, অভিযুক্ত, সাক্ষী বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ফোনে, বা ইমেলে। সিবিআইয়ের নিজস্ব সরকারি ইমেল আইডি আছে, নিয়মমতে সমস্ত অফিশিয়াল কাজকর্ম, যেখানে ইমেল করবার দরকার হয়, সেখানে সিবিআই নিজেদের অফিশিয়াল ইমেল আইডিই ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু কেসের প্রয়োজনে, অফিশিয়াল কমিউনিকেশন, সিবিআই করছে জিমেল অ্যাকাউন্ট খুলে – এ জিনিস কেউ কখনও শুনেছে বলে মনে হয় না।

সম্ভবত সিবিআই নিজেও শোনে নি। কিন্তু এই ঘটনাই ঘটেছে এই আরুষি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে। ২০১০ সালের শেষদিকে, সিবিআই ইনভেস্টিগেটিং অফিসার কৌল মোটামুটি ছক কষেই ফেলেছেন এই ঘটনাকে অনার কিলিং-এর তকমা লাগিয়ে সলভ করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, ক্রিমিনাল কেসে তদন্তের ফলাফল আগেই ভেবে রাখলে সেই অনুযায়ী ঘটনাক্রমকে সাজাতে হয়। এখন সরাসরি তথ্যপ্রমাণ, যেগুলো বা যারা কথা বলে না, যেমন বালিশের ওয়াড়, বিছানার চাদর, কিংবা বোতলে বা গ্লাসে আঙুলের ছাপ, সিঁড়িতে রক্তের দাগ – এদের বয়ান তো বদলে ফেলা যায় না, এরা যে অবস্থায় রেকর্ডেড হয়েছিল, সেইভাবেই রেকর্ডেড থাকে। এর চেয়ে অনেক সহজ, সাক্ষীদের বয়ান বদলে ফেলা। তা, সে ব্যাপারে কৌল খুবই সফল হচ্ছিলেন, একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের বয়ান ততদিনে বদল হয়ে আসছিল, কিন্তু কৌল পড়লেন স্বয়ং নূপুর তলওয়ারকে নিয়ে। মৃত আরুষির শরীর ঢাকা ছিল একটি সাদার ওপর গোল ডিজাইন করা চাদর দিয়ে। কৌল সেটিকে দাবি করেন সাদা চাদর, এবং সেই সম্বন্ধে বিস্তারিত গল্প ফাঁদতে গিয়ে তিনি নূপুরের ওপর চাপ দিতে শুরু করেন, যাতে নূপুর স্বীকার করেন, চাদরের ব্যাপারে তিনি কৌলকে আগে “মিথ্যে কথা” বলেছিলেন। নূপুর অস্বীকার করেন – তিনি প্রথম থেকেই চাদরের সঠিক বর্ণনা দিয়েছিলেন, সে চাদর বেশ কয়েকবার টিভি চ্যানেলে দেখানোও হয়ে গেছে, এখন কৌল সাদা বললেই নূপুরকে তা মেনে নিতে হবে কেন? নূপুর পরিষ্কার জানান, তিনি বয়ান বদল করবেন না, তিনি মিথ্যে বলেন নি কখনওই। কৌল, এমনকি নূপুরকে ভয় দেখান যে, তিনি নূপুরের বিরুদ্ধে কুড়িজন সাক্ষী দাঁড় করিয়ে দেবেন নূপুরকে মিথ্যেবাদী প্রমাণিত করার জন্য।

তাতেও নূপুরের বয়ান বদল করতে পারেন নি তিনি। এর পরে কৌল এক নতুন ফন্দী আঁটেন। সিবিআইয়ের ইতিহাসে যা সম্ভবত আগে কখনও হয় নি। hemraj.jalvayuvihar@gmail.com নামে একটি ইমেল অ্যাকাউন্ট খুলে সেইখান থেকে তিনি মেল করতে শুরু করেন রাজেশ এবং নূপুরকে। উদ্দেশ্য মহৎ – সাইকোলজিকাল চাপ তৈরি করে রাজেশ নূপুরকে ফ্যাসাদে ফেলা। এবং, শুধুই মানসিক চাপ তৈরির খেলা নয়, এই বিশেষ জিমেল আইডিটি থেকে সিবিআই তার সমস্ত অফিশিয়াল কমিউনিকেশনও পাঠাত তলওয়ারদের – উদাহরণস্বরূপ, তলওয়ারদের হাজিরার জন্য সমনও পাঠানো হত এই hemraj.jalvayuvihar@gmail.com আইডি থেকে। খুবই মহৎ উদ্দেশ্য, নিঃসন্দেহে – এমন একটি ব্যক্তির নাম নিয়ে তলওয়ারদের মেল পাঠানো হচ্ছে – যে ব্যক্তিটিকে, সিবিআইয়ের সন্দেহ অনুযায়ী তলওয়াররাই খুন করেছেন। উত্তমকুমার অভিনীত ‘শেষ অঙ্ক’ সিনেমাটার কথা মনে আছে? ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া এই বাংলা ছবিটি কৌল দেখেছিলেন কিনা, তা অবশ্য জানা যায় নি।

পয়লা মে ২০১১ সালের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজে প্রথম এই ভূতুড়ে ইমেল আইডির রিপোর্ট ছাপা হয়। সিবিআই সাথে সাথে অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট দিয়ে সিবিআইয়ের তরফে এই ধরণের কোনও মেল আইডি দিয়ে তলওয়ারদের সাথে যোগাযোগের কথা অস্বীকার করে। এই অস্বীকারের পেছনেও ছিল একটি নিরীহ “টাইপো” – প্রিন্টিং মিসটেক। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টে ইমেল আইডিটি ভুল করে ছাপা হয়েছিল hemraj.jalvayuvihar.com@gmail.com। এই বাড়তি একটি ডট কম-এর চক্করে সিবিআইয়ের পক্ষে গোটা ঘটনাটা ডিনাই করা, অফিশিয়ালি, অনেক অনেক সহজ হয়ে গেছিল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এই টাইপোটি না ঘটালে সিবিআইয়ের কী রেসপন্স হত, তা বোধ হয় আর জানা যাবে না।

কিন্তু সিবিআই স্বীকার করুক বা না করুক, এই আইডি থেকে নিয়মিত মেল আসত রাজেশ আর নূপুর তলওয়ারের কাছে। রাজেশ এই সব মেলের রিপ্লাই করতেন “মিঃ কৌল” নামে। এবং এই মেলের মাধ্যমে হওয়া সমস্ত কমিউনিকেশন কোর্টে একেবারেই লুকোবার চেষ্টা করা হয় নি। শুধু সমন পাঠানো নয়, রাজেশ নূপুরের নারকো টেস্টের জন্য তাদের সম্মতিও চাওয়া হয়েছিল এই মেল আইডির মাধ্যমে। কোর্টে সেই সংক্রান্ত সমস্ত দলিল দস্তাবেজ আজও রাখা আছে।

এই কেসের বাকি সমস্ত অফিশিয়াল কমিউনিকেশন কিন্তু এই জিমেল আইডি থেকে করা হয় নি। আরুষি আর হেমরাজের মোবাইলের কল ডিটেল চেয়ে যে সমস্ত মেল সিবিআই এয়ারটেল আর ভোডাফোনকে পাঠিয়েছিল, সেখানে সিবিআইয়ের অফিশিয়াল মেল @cbi.gov.in দিয়েই ছিল। শুধুমাত্র রাজেশ আর নূপুরের সাথে মেল করা হত এই জিমেল আইডিটি থেকে।

সিবিআইয়ের চিফ ইনফর্মেশন অফিসার ধারিনী মিশ্র বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন যে সিবিআই কখনও জিমেল ইউজ করে অফিশিয়াল কাজকর্ম করতে পারে। অভিরূক যখন ধারিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখনও তিনি অস্বীকার করেই চলেছিলেন, কিন্তু অভিরূক ততদিনে কোর্টের কাগজপত্র অনেকটাই পড়ে ফেলেছেন, এবং যখন তিনি ধারিনীকে জানান যে কোর্টে সিবিআইয়ের পেশ করা ডকুমেন্টে এই ইমেল আইডি জ্বলজ্বল করছে, ধারিনী মিশ্র “দশ মিনিট পরে কল করছি” বলে লাইন কেটে দেন।

দশ মিনিট পরে তিনি কল করেন অভিরূককে – এবং জানান – “Okay, I have spoken to the officers. They say they have used this email ID for some time due to some very special reason.” অভিরূক জানান যে তাঁর এই বয়ান বদল ঠিক কী কারণে সেটা তিনি জানতে ইচ্ছুক, এবং আগে যে তিনি অস্বীকার করছিলেন – সেটা ভুল কিনা। ধারিনী প্রথমে ব্যাপারটাকে তুচ্ছ ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেন, তার পরে অভিরূক যখন বলেন যে তিনি তাঁর বইতে এই ব্যাপারটা নিয়ে লিখবেন, ধারিনী ফোনেই অভিরূককে প্রথমে অনুরোধ করেন না লিখতে, তারপরে ধমক দেওয়া শুরু করেন – আমি মুম্বই মিররকে (অভিরূক যেখানে কাজ করতেন) তোমার নামে কমপ্লেন করব, তারও পরে জানান যে এটা কোনও অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট নয় তাঁর তরফে, তাঁর অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট তিনি একটু পরেই অভিরূককে এসএমএস এবং ইমেল করে জানিয়ে দেবেন।

মেসেজ এসেছিল। গতানুগতিক ছকে বাঁধাঃ “Regarding your query in the Aarushi case—the matter is sub judice therefore CBI will not comment on court proceedings, evidence in court etc.” এবং “Regarding your query about issuance of summons by e-mail—the same is normally done by official email. In rare occasions, personal or other e-mail ID can be used.”

এর পর একটি নিউজ এজেন্সিকে ফোন করে একটি দু লাইনের স্টেটমেন্ট ইস্যু করে সিবিআই – যে সিবিআই সত্যিই এই মেল আইডিটি বানিয়েছিল তদন্তের স্বার্থে।
তদন্তের স্বার্থে – তাই কোনও প্রশ্ন উচ্চারিত হয় নি। ব্যাপারটি ওখানেই ধামাচাপা পড়ে যায়। কেউ প্রশ্ন করল না, তদন্তের স্বার্থে জিমেল ব্যবহার করে সিবিআই কাউকে সমন পাঠাতে পারে কিনা, নারকো টেস্টের সম্মতি চাইতে পারে কিনা, বিশেষত যে ব্যক্তির খুন নিয়ে তদন্ত চলছে, সেই মৃত ব্যক্তির নামে ইমেল আইডি বানিয়ে কাউকে সেই মৃত ব্যক্তির নাম নিয়ে কারুর সাথে ইমেলে যোগাযোগ করতে পারে কিনা। কোনও প্রশ্নও উঠল না, তাই উত্তরের প্রয়োজনও নেই।

কৌল একা নন, তৎকালীন সিবিআইয়ের ডিরেক্টরও এই মেল আইডি ব্যবহার করেছেন বেশ কয়েকবার, মেলে কপিইড হয়েছেন বেশ কয়েকবার। কৌলের উর্ধ্বতন অফিসার এবং অধস্তন অফিসারও এই মেল আইডি ব্যবহার করে নূপুরের সঙ্গে একাধিকবার বার্তালাপ চালিয়ে গেছেন। সিবিআইয়ের ডিরেক্টর থেকে ইনস্পেক্টর – এতগুলো লেভেলে এই ফেক ইমেল আইডি ব্যবহার করে একটা গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত করার উদাহরণ – আর বোধ হয় একটিও নেই।

কোথাও কোনও সন্দেহ তৈরি হয় নি। যে কাজের জন্য সিবিআইকে কোর্টের কাঠগড়ায় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো যেত – সেই কাজের জন্য কোনও উকিল, কোনও বিচারক কখনও অবজেকশন তোলেন নি। খুব স্বাভাবিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বার বার এই মেলের বিভিন্ন বক্তব্য, চার্জশীটে, ক্লোজার রিপোর্টে, আর্গুমেন্টে এবং অন্তিম জাজমেন্টেও। যেন এটাই স্বাভাবিক, এমনটা তো হয়েই থাকে।

সত্যি বলতে, জিমেল ব্যবহার করে কেসের ইনভেস্টিগেশন করার আইনি অধিকার সিবিআইয়ের নেই। এমন কোনও প্রিসিডেন্সও নেই, না আরুষি মামলার আগে, না তার পরে।

মিডিয়া ট্রায়াল

অভিরূক সেনের আরুষি বইটা, শুধুই বিচারের নামে প্রহসনের কথা তুলে ধরে নি। এই বইটা – অভিরূকের নিজের কথায় বলতে গেলে, আজকের ভারতের একটা বহুমাত্রিক প্রতিফলন। এই বইয়ের পাতায় প্রতিফলিত হয়েছে আজ, এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের ভারতের সমাজচিত্র, তার হায়ারার্কি, ভারতের গণতন্ত্রের কয়েকটি প্রধান প্রতিষ্ঠান, যেমন জুডিশিয়ারি, পুলিশ, এ ছাড়াও প্রতিফলিত হয়েছে ভারতের শহর আর গ্রামের বিভাজন, যাকে আমরা বলি ইন্ডিয়া বনাম ভারত, তাদের মধ্যেকার কনফ্লিক্ট, এবং, সবশেষে, ভারতের মিডিয়া। গণতন্ত্রের কাঠামোয় যাদের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়ে থাকে।

মিডিয়া ট্রায়াল বস্তুটির সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়ে গেছি অনেকদিন হল। তদন্ত সঠিক হোক বা বেঠিক, তার গতিপ্রকৃতি যেদিকেই হোক না কেন – মিডিয়া তার নিজের মত করে কাহিনির একটা প্লট বানায়। অ্যামেচার অভিনেতাদের দিয়ে তার “নাট্য-রূপান্তর”ও তৈরি করে, সেগুলো প্রাইম টাইমে টিভির চ্যানেলে বা সকালে খবরের কাগজে গরমাগরম পরিবেশন করা হয়, জনমত বানানো হয়। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভটি, চতুর্থ স্তম্ভ হবার কারণে অনেক রকমের প্রিভিলেজ ভোগ করে – এই জনমত তৈরি করা এবং নিজেদের পছন্দমত “এক্সপার্ট”দের নিয়ে টিভি চ্যানেলের স্টুডিওতে ক্যাঙারু-কোর্ট বসানো – আজকালকার বেশির ভাগ তথাকথিত নিউজ চ্যানেলদের কাছে এগুলো বেশ জলভাত।

আজ থেকে সাত বছর আগে, ব্যাপারগুলো আজকের তুলনায় একটু বেশিই অপরিশীলিত ছিল। সেই সময়টা ছিল মিডিয়ার পক্ষে একটা বুমিং ফেজ। পর পর বেশ কিছু ট্যাবলয়েড এবং নিউজ চ্যানেল খুলেছিল সেই সময়েই, এবং নিজেদের বাজার তৈরি করতে, টিকিয়ে রাখতে এবং বিস্তৃত করতে এই নিউজ চ্যানেলগুলো যতদূর যা করা সম্ভব, তাইই করত। কোন ঘটনা নিয়ে কত সেনসেশনাল স্টোরি বানানো যায় – তার একটা প্রতিযোগিতা চলত এদের মধ্যে, উদ্দেশ্য, টিআরপি বাড়ানো।

সেই রকমের অবস্থায় কিছু বাজারি মিডিয়া আরুষির গল্পটাকে তুলে নিল। প্রায় চোদ্দ বছর বয়েসের একটি কিশোরীর অস্বাভাবিক মৃত্যু, সঙ্গে একটি চাকরের মৃত্যু – এই প্লটে বিভিন্ন রকমের গল্প হয়। আসুন, আমরা সে রকমের কিছু গল্প জেনে নিই। মিডিয়া এথিকস যাক চুলোয় – ভিউয়ারশিপ আর রিডারশিপ বাড়ানোটাই আসল কথা – তার জন্য যা দরকার সব করতে রাজি এই হঠাৎ বেড়ে যাওয়া মিডিয়াকূল। রহস্যময় হত্যার সঙ্গে যদি একটু সেক্সের চাটনি দেওয়া যায়, তা হলে লোকে দারুণ খায়। সেই সেক্সকে যদি আরও একটু মনের মাধুরী মিশিয়ে বিকৃত যৌনতার রূপ দেওয়া যায়, টিআরপি আরও বাড়ে।

দিল্লির ট্যাবলয়েড “মেল টুডে” – ১৭ই মে ২০০৮এর রিপোর্টে লিখল, স্কুলগার্ল কিলড অ্যাট নয়ডা হোম, ফিঙ্গার অফ সাসপিশন পয়েন্টস অ্যাট মিসিং সারভেন্ট। ১৭ তারিখ সকালে লোকে যখন এই রিপোর্ট পড়ছে, নয়ডার সেই বাড়ির টেরেস থেকে ঠিক তখনই উদ্ধার হচ্ছে হেমরাজের মৃতদেহ, ঘটনার একদিন পরে। মিডিয়া আরও পাগল হয়ে গেল পরের দিন থেকে। জড়িয়ে ফেলা হল ১৫ বছরের একটি কিশোরকে, আরুষির সাথে নাকি তার গোপন প্রণয় ছিল। সেই প্রণয় কতদূর ছিল? শুধুই ফোনকল আর এসএমএস? নাকি দৈহিক?

নয়ডা পুলিশ নিজে কিছু করে উঠতে পারছিল না, এখন তারা খবরের কাগজ দ্বারা পরিচালিত হতে থাকল। এই রিপোর্ট বেরোবার পরে তারা কিশোরটিকে তুলে নিয়ে যায়, সম্ভাব্য অসম্ভাব্য অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য করা হয় বাচ্চা ছেলেটিকে। তাকে যখন তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তার বাবা-মা-কে জানানোর প্রয়োজনও বোধ করে নি নয়ডা পুলিশ।

এর কিছুদিন পরে নয়ডা পুলিশ রাজেশ আর নূপুরকে তুলে নিয়ে যায় ইনভেস্টিগেশনের জন্য, পেছনে লাইন দিয়ে চলে সারি সারি মিডিয়া ভ্যান। হঠাৎ মাঝপথে তাদের জানানো হয় যে আজ ইনভেস্টিগেশন হবে না। রাজেশ নূপুর, ফিরে আসেন – তাঁদের ফলো করে ফেরে মিডিয়ার ভ্যানেরা। সেদিন টিভিতে দেখানো হয় এসব। সেই ফুটেজ হাতে নিয়ে পরদিন রাজেশকে আবার পুলিশ লাইনে ডেকে পাঠায় নয়ডা পুলিশ। ফুটেজ দেখিয়ে জানানো হয় রাজেশ নাকি পুলিশের হাত থেকে “পালাবার চেষ্টা” করছিলেন। সাধারণত ঠাণ্ডা মাথার রাজেশ, এর পরে মেজাজ হারিয়ে চিৎকার শুরু করেন, তখন নয়ডা পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে, মেয়ে এবং চাকরকে খুন করার অপরাধে। তেইশে মে।

মীরাট রেঞ্জের ইনস্পেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ গুরদর্শন সিং, এর পরদিন একটি প্রেস কনফারেন্স করেন। দাবি করেন মামলা শেষ। অভিযুক্ত ধরা পড়ে গেছে। “শ্রুতির বাবা (হ্যাঁ, আইজিপি সাহেব সারা প্রেস কনফারেন্স জুড়ে আরুষিকে ‘শ্রুতি’ বলে উল্লেখ করেছেন, যে মেয়েটির খুনের তদন্ত চালাচ্ছিল তার পুলিশবাহিনি, যে খুনের মামলার প্রেস ব্রিফ দিচ্ছিলেন তিনি, সেই মেয়েটির নামই জানতেন না তিনি) রাজেশ তলওয়ারের একটি বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক ছিল শ্রুতির এক প্রিয় বন্ধুর মায়ের সঙ্গে। সেই মহিলার নামটিও তিনি উল্লেখ করেন প্রেস কনফারেন্সে – অনিতা দুরানি। ‘শ্রুতি’, বাবার এই এক্সট্রা ম্যারিটাল সম্পর্ক মেনে নিতে না পেরে নিজে একটি অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করার কথা ভাবে – তার থেকে বয়েসে অনেক বড় চাকর হেমরাজের সঙ্গে।”

aarushi-talwar_14আইজিপি প্রেস কনফারেন্সে বলে চলেন, “ঘটনার রাতে ১১টার সময়ে রাজেশ আরুষির ঘরে ঢুকে আরুষি আর হেমরাজকে আপত্তিজনক অবস্থায় দেখেন। হেমরাজকে তিনি টেনে ছাদে নিয়ে যান, হাতুড়ি আর স্ক্যালপেল দিয়ে খুন করেন। নিচে নেমে তিনি কয়েক পেগ মদ খান, তারপরে নিজের মেয়েকে একইভাবে সম্মানরক্ষার্থে হত্যা (অনার কিলিং) করেন।”

প্রমাণ? হ্যাঁ, প্রমাণ আছে তো! ওই হাতুড়ি আর স্ক্যালপেল পাওয়া যায় নি। তার মানেই অপরাধী ওগুলো হয় নষ্ট করে ফেলেছে নয় তো লুকিয়ে ফেলেছে। এটাই তো অপরাধের প্রমাণ! অপরাধী না হলে তো হাতুড়ি আর স্ক্যালপেল দেখতে পাওয়া যেত!

এক ঢিলে কতগুলো পাখি মারা হয়ে গেল। মৃত মেয়েটি “ক্যারেক্টারলেস” ছিল। তার বাবা ক্যারেক্টারলেস, এমনকি আরও এক মহিলাও ক্যারেক্টারলেস। সেক্স হি সেক্স।

সেদিন আইপিএলের একটা গুরুত্বপূর্ণ খেলা ছিল। কিন্তু টিআরপি বলছে, সেই দিনটিতে বেশি লোক টিভিতে মীরাট রেঞ্জের আইজিপির প্রেস কনফারেন্স দেখছিল, খেলা দেখছিল খুব কম লোক।

মহিলা ও শিশুসুরক্ষা বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রেণুকা চৌধুরী এই প্রেস স্টেটমেন্টের প্রতিবাদ জানান – আইজিপি প্রেস কাউন্সিল গাইডলাইনের সমস্ত নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন এই জাতীয় স্টেটমেন্ট দিয়ে। আইজিপি পরদিন তাঁর স্টেটমেন্টে বদল ঘটাতে বাধ্য হন। নতুন থিওরি অনুযায়ী – না, আরুষির সাথে হেমরাজের যৌনগন্ধী সম্পর্ক ছিল না। বাবার যৌন-কেচ্ছার খবরে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত আরুষিকে জড়িয়ে ধরে হেমরাজ সান্ত্বনা জানাচ্ছিল – সেই সময়ে রাজেশ এদের দেখে ফেলেন এবং ভুল ধারণা করে – ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু ততক্ষণে যা হবার, তা হয়ে গেছে। যৌনতাবুভুক্ষু মিডিয়া রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে। পর দিন টাইমস অফ ইন্ডিয়ার হেডলাইন হল – ড্যাড কিলড আরুষি। “কুডন্ট টলারেট হার অবজেকশন টু হিজ এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ার উইথ ফেলো ডেন্টিস্ট।” এর পরে জানা গেল “অ্যাটাক শো’ড ক্লিনিকাল প্রিসিশন অ্যান্ড প্ল্যানিং”, এবং পরের দিনে হেডলাইন হল – “ডক্টর ডেথ অ্যান্ড হাউস অফ হরর।”

প্রিন্ট মিডিয়াতে যদি টাইমস অফ ইন্ডিয়া, তো ভিজুয়াল মিডিয়াতে জি নিউজ। কেসটি “ক্র্যাক” করা হয়ে গেছে – এই বয়ানে ২৫শে মে জি নিউজ পুলিশের স্টেটমেন্টের একটি নাট্য রূপান্তর দেখালো, কীভাবে রাজেশ আরেকজন মহিলার সঙ্গে “ঢলানি” করছেন, কীভাবে তিনি হেমরাজকে খুন করছেন, আরুষিকে খুন করছেন। আর বার বার দেখানো হচ্ছিল সেক্স, ভায়োলেন্স, ডেথ। যৌনতার লালসা কীভাবে একটি বাচ্চা মেয়েকে শেষ করে দিতে পারে, দর্শকরা সবাই চোখ বিস্ফারিত করে দেখুন।

জি নিউজ একা ছিল না এই লিস্টে। একই গোত্রের আরও বেশ কয়েকটি নিউজ চ্যানেল তাদের নিজস্ব পছন্দমত যৌনতার আচার দিয়ে খবর পরিবেশন করছিল সেই সময়ে – নামকরা সাংবাদিক বীর সাংভি তাঁর কাউন্টারপয়েন্ট কলামে লেখেন একটি ঘটনার কথা, কীভাবে একজন অ্যাঙ্কর, রক্তের ব্যাপ্তি বোঝাতে নিজের হাত লাল রঙের পেন্টে চুবিয়ে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরেছিলেন।

নয়ডা পুলিশও চুপ করে বসে ছিল না। এমন একটা রগরগে গল্পের পরে, তারা মিডিয়ার হাতে তুলে দিল আরুষির সমস্ত ব্যক্তিগত টেক্সট মেসেজ, তার সোসাল নেটওয়ার্কিং-এর পাতা, সেখানকার সমস্ত পোস্ট এবং ব্যক্তিগত চ্যাটিং-এর ট্র্যান্সস্ক্রিপ্ট। এমনিতে সেগুলো পড়লে একটি টিনএজ কিশোরীর উচ্ছলতার বাইরে আর কিছুই নজরে পড়ে না, কিন্তু পুলিশের নজর কিনা আলাদা হয়, তাই তারা এর মাধ্যমেই (অনেকবার LOL লেখা ছিল চ্যাটে) মিডিয়াকে বুঝিয়ে ছাড়ল, মেয়েটি জীবদ্দশায় কতখানি ক্যারেক্টারলেস ছিল।

শুধু মিডিয়া চ্যানেল নয়, এন্টারটেনমেন্ট চ্যানেলরাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আরুষির মৃতদেহের ওপর। একতা কাপুর তাঁর জনপ্রিয় সোপ “কহানি ঘর ঘর কি”তে এই খুনের ঘটনার ওপর একটি স্পেশাল এপিসোড বানান। অবশ্য ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রোটেকশন অফ চাইল্ডস রাইটস-এর হস্তক্ষেপে তৎকালীন তথ্য-সম্প্রচারমন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী স্টার প্লাস চ্যানেলের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাদের থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি আদায় করেন যে এই আপিসোডটি কখনওই টিভিতে দেখানো হবে না।

পুলিশ দু হাত উপুড় করে মিডিয়ার থলিতে ঢেলে দিচ্ছিল রগরগে কাহিনির রসদ, আর তারা সমানে তলওয়ারদের বারণ করে যাচ্ছিল, মিডিয়ার কাছে মুখ না খুলতে। কিন্তু অবশেষে, নিয়ম ভাঙলেন নূপুর তলওয়ার। ২৫শে মে, সকলের বারণ অগ্রাহ্য করে তিনি এনডিটিভির ইংরেজি চ্যানেলে একটি ইন্টারভিউ দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, নয়ডা পুলিশ এবং মীরাট রেঞ্জের আইজিপি যে অসত্য গল্প ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন মিডিয়া এবং জনগণের কাছে, সেইসব মিথ্যে জনতার সামনে প্রকাশ করা। কিন্তু ফল হল উলটো।

রাজেশ তখন বন্দী। নূপুরকে পুলিশ তখনও পর্যন্ত কোনও সন্দেহই করে নি। কিন্তু নিউজ চ্যানেলে প্রকাশ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেবার পরে নূপুরকেও সন্দেহের তালিকায় যুক্ত করা হল। নূপুর, মেয়ের মৃত্যুর মাত্র দেড় সপ্তাহের মধ্যে কী করে অত শান্তভাবে ইন্টারভিউ দিলেন? তাঁকে ইন্টারভিউতে একবারও কাঁদতে দেখা গেল না কেন? নূপুরের চোখে জল নেই কেন? এর মানে নূপুর অবশ্যই মেয়ের মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত নন! তার মানে তিনিও অপরাধী!!
দেখুন, সেই ইন্টারভিউ।

ও হ্যাঁ, শুধু ইন্টারভিউটা দেখে থেমে যাবেন না, তার নিচে ভিউয়ারদের কমেন্টগুলোও পড়ুন। আজও কমেন্ট যুক্ত হচ্ছে এই ভিডিওর নিচে। গত সাত বছর ধরে। প্রথম দিনের মতই – আজও অধিকাংশ দর্শক শ্রোতাদের মূল বক্তব্য ছিল – এবং, আছে, একই রকমের – নূপুর তলওয়ার ইমোশনলেস, ফেক। অতএব, অবশ্যই খুনী।

এর কিছুদিন পরেই উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী এই কেস সিবিআইয়ের হাতে সঁপে দেন। কিন্তু সেক্স নিয়ে চর্চা তাতে বাড়ল বই কমল না। আইজিপি-র স্টেটমেন্ট শুধু রাজেশ তলওয়ারের বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল, এর পরে পুলিশ, মিডিয়া এবং ট্যাবলয়েডদের দৌলতে জানা যাবে রাজেশ নূপুর গ্রুপ-সেক্সে জড়িত ছিলেন, বিভিন্ন ধরণের অর্গি-পার্টিতে তাঁরা নিয়মিতই যেতেন, শুধু তাই নয়, জানা যাবে চোদ্দ বছরের আরুষিরও একাধিক “বয়ফ্রেন্ড” ছিল। এমনকি আরুষি আদৌ রাজেশ আর নূপুরের “বায়োলজিকাল” সন্তান ছিল কিনা, সে প্রশ্নও উঠতে শুরু করবে, আর সহ্য করতে না পেরে বীর সাংভি আবার কলম ধরেন, পুলিশের উদ্দেশ্যে চাঁচাছোলা ভাষায় লেখেন, এই পুলিশ গল্প বানাতে ওস্তাদ আর এদের সমস্ত গল্পেই অদ্ভূতভাবে সেক্সের অ্যাঙ্গল চলে আসে। এরা যে শুধু অকর্মণ্য পুলিশ – তাইই নয়, এরা আসলে যৌনবুভুক্ষু, সেক্স-স্টার্ভড। বিশেষত আইজিপি মহাশয়ের কোনও স্পেশালিস্ট ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া খুবই দরকার।

“Most worrying of all is the IGP’s obsession with sex. Every possible motive leads back to sex. First, there was the extraordinary statement that Rajesh Talwar found his daughter in an objectionable position with Hemraj, the servant. As Aarushi and Hemraj are dead, and Rajesh Talwar denies the incident how could the IGP possibly have known about the incident? Then there’s the suggestion that Rajesh Talwar was having an affair with a colleague and that his daughter objected; off the record, the police have painted the parents as orgy goers and wife swappers. And now, the cops are claiming that the father was motivated by Aarushi’s relations with various boyfriends.

This is not a sex crime. So why is the Noida police going on and on about sex, ruining the reputations of the dead and the living without a shred of evidence? My guess is that they are not just incompetent, they are also sex starved. Perhaps the IGP needs professional help.”

মিডিয়া যেমন খোলা বাজারে প্রকাশ্যে কারুর জামাকাপড় খুলে নেবার ব্যাপারে এক সেকেন্ডও সময় লাগায় না, তেমনি পালটি খেতেও ওই … এক রাতের বেশি সময় লাগায় না। পয়লা জুন মায়াবতী কেস সিবিআইয়ের হাতে দিয়ে দেন, পরের দিন ওই একই মিডিয়া হেডলাইন বানায় – নয়ডা পুলিশ থিওরি ট্র্যাশড্‌। কিন্তু সিবিআই দায়িত্ব নিলেও কি মৃতদেহ নিয়ে ব্যবসা থেমে থাকে? একইসঙ্গে বাজারে স্পেকুলেশন ছড়াতে থাকে, তলওয়ারদের পলিটিকাল স্ট্রংহোল্ড আছে, নইলে কি আর মায়াবতী ওদের কথা ভেবে সিবিআইকে কেস দেন? ওই যে নূপুর তলওয়ার, উনি মায়াবতীর দাঁতের চিকিৎসা করতেন, মায়াবতী ওঁর খুব পরিচিত।
নূপুর, অন্য একজন সিনিয়র ডেন্টিস্ট ডক্টর সিদ্ধার্থ মেহতার সার্জিকাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। ডক্টর মেহতা একসময়ে মায়াবতীর দাঁতের চিকিৎসা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই সময়ে নূপুর তাঁর অ্যাসিস্টেন্ট ছিলেন না। নূপুর মায়াবতীকে কখনও চোখেও দেখেন নি, চেনা তো পরের কথা।

হিন্দুস্তান টাইমস এই সময়ে দেশের ছটি বড় বড় শহরে এই কেসের ব্যাপারে একটি সার্ভে চালায়। সার্ভের রেজাল্ট জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত হয়।

নব্বই শতাংশ লোক মনে করেছিল, মিডিয়া কেসটা নিয়ে “অবসেসড”।
পঁচাত্তর শতাংশ লোক জানিয়েছিল, তারা কেসটা নিয়মিত ফলো করছে, মিডিয়ার মাধ্যমে।
পঁচাত্তর শতাংশ লোক এ-ও মনে করছিল, মিডিয়াই আগেভাগে রাজেশ তলওয়ারকে দোষী বানিয়ে দিয়েছে।
চৌষট্টি শতাংশ লোক মনে করছিল, মিডিয়ার এই অত্যধিক কভারেজ, তদন্ত এবং আদালতের বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে।

এক মাসের মধ্যে একটা পরিবারের, কয়েকটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম যতটা সম্মান পাওয়া দরকারি, সেটাও হারিয়ে ফেলেছিলেন তলওয়ারেরা। রাজেশকে একাধিকবার লাই ডিটেক্টর টেস্টে বসতে হয়, প্রতিবারই তিনি নির্দোষ হিসেবে সাব্যস্ত হন, কিন্তু মিডিয়া তাঁকে ভিলেন বানাতে ছাড়ে নি এক দিনের জন্যেও। মুম্বইয়ের জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড মিড-ডে জুন মাসের শেষে এক “গোপন সূত্রে পাওয়া খবর” অনুযায়ী রিপোর্ট প্রকাশ করে, তলওয়ার দম্পতি নিয়মিত সেক্স-পার্টিতে যেতেন, ওয়াইফ-সোয়্যাপিং-এর খেলা খেলতেন অন্যান্য পুরুষদের সঙ্গে। তলওয়ারের প্রতিবেশিরা “নাকি” অনেকদিন আগে থেকেই “আন্দাজ” করতেন, তলওয়ারদের বাড়িতে বিশেষ ধরণের পার্টি চলছে, আর যখন পার্টি “চলত” – আরুষিকে নাকি একটা ঘরে লক্‌ করে রাখা হত।

এই কাহিনি মিড-ডে থেকে হাত ঘুরে পৌঁছয় হেডলাইনস টুডে-তে, তার পরে আজ তক, জি নিউজ এর আবার একটা নাট্য রূপান্তর তৈরি করে দেখিয়েও দেয়, সেখান থেকে খবরটা ছাপা হয় মেইল টুডে-তে – ততক্ষণে চাল হয়ে গেছে বিরিয়ানি। খবরের সোর্স হিসেবে সেখানে লেখা হয়েছে সিবিআইয়ের নাম।
বিধ্বস্ত নূপুর, এর পরে সিবিআইকে চিঠি লেখেন এর সত্যতা জানতে চেয়ে। সিবিআই অফিশিয়ালি লিখে জানায়, তারা এ ধরণের কোনও খবর কোনও চ্যানেল বা ট্যাবলয়েডকে পাঠায় নি।

সিবিআইয়ের এই অফিশিয়াল উত্তরটা অবশ্য, কোনও চ্যানেলে এর পরে দেখানো হয় নি। কোনও কাগজে ছাপানো হয় নি। ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন এর পরেও চলতে থেকেছে। আজও চলছে। অভিযুক্ত বা সন্দেহের তালিকায় থাকা কোনও ব্যক্তির ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট তৈরি করে দেওয়া, সম্ভবত আজও, মিডিয়ার অন্যতম ফেভারিট টাইমপাস।

মুখ্য চরিত্রে

দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলা এই ঘটনার তদন্তপ্রক্রিয়ায় বেশ কিছু মুখ উঠে এসেছে, যাদের সম্বন্ধে অভিরূক যথাসম্ভব বিস্তারিত তথ্য জোগাড় করেছেন এই বইতে, যেখানে সম্ভব হয়েছে, সেখানে অভিরূক নিজে গিয়ে কথা বলেছেন সেইসব ব্যক্তিদের সঙ্গে। এই মুখগুলি মূলত কয়েকটা ক্যাটাগরিতে বিভক্ত, এক, যাঁরা বিচারপ্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত, দুই, যাঁরা তদন্তপ্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত, আর তিন, বাকিরা – যাঁরা অভিযুক্ত, যাঁরা সাক্ষী, যাঁরা কোনও না কোনওভাবে এই কেসের সঙ্গে যুক্ত। আমরা তাদের কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনা করব এখানে।

১। ভারতী মণ্ডল – নয়ডার একটি তত-পশ-নয় সেক্টরের এক বস্তির বাসিন্দা। বিভিন্ন লোকের বাড়িতে ঘর পরিষ্কার করা, বাসন মাজা ইত্যাদি দৈনিক কাজকর্ম করে – যাদেরকে আমরা বলি “ঠিকে কাজের লোক”। ভারতী ছিল আরুষির মৃতদেহের প্রথম সাক্ষী। ভোরবেলা কাজ করতে এসে সে অন্যান্য দিনের মতই তলওয়ারদের দরজাতে নক্‌ করে ডাকে। সাধারণত হেমরাজ দরজা খুলে দেয়, কিন্তু সেদিন নূপুর তলওয়ার দরজা খুলতে গিয়ে টের পান যে – বাইরের দরজাটা বাইরের দিক থেকে লক করা। প্রথমে নূপুর এবং ভারতী ভাবেন যে হেমরাজ নিশ্চয়ই মাদার ডেয়ারি থেকে দুধ আনতে বেরিয়েছে, দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে। ভারতী নূপুরকে জানায় যে সে নিচে যাচ্ছে – নূপুর যেন ব্যালকনি থেকে তাকে চাবিটা ছুঁড়ে দেন। এর পরে চাবি নিয়ে উঠে দরজা খুলে ভারতী তলওয়ারদের ঘরে ঢুকে দেখে, শ্রীমতি তলওয়ার প্রচণ্ড কান্নাকাটি করছেন, ভারতী হতবাক হয়ে কারণ জিজ্ঞেস করাতে নূপুর তাকে নিয়ে আরুষির বেডরুমে নিয়ে গিয়ে দেখান আরুষির মৃতদেহ। নূপুরও মাত্র তখনই মৃতদেহটা আবিষ্কার করেছিলেন। আরুষির গলা কাটা ছিল, মাথার একটা দিক ভারি কিছুর আঘাতে থেঁতলে দেওয়া ছিল।

প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ভারতীকে এরপরে অসংখ্যবার তুলে নিয়ে যায় পুলিশ, তার বয়ান লিপিবদ্ধ করানো হয়। এবং, অদ্ভুতভাবে পরে সিবিআইয়ের রিপোর্টে ভারতীর এই “দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল” বয়ান আমূল পালটে যায়, সিকোয়েন্স এমনভাবে প্রেজেন্ট করা হয় তার বয়ানের মাধ্যমে যে পরিবর্তিত বয়ানে জানা যায়, বাইরের দরজাটা খোলাই ছিল, ভারতীকে চাবি দিয়ে খুলতে হয় নি, বাড়ির ভেতরের দিকের দরজা আর মাঝে আরেকটা দরজা ভেতর থেকেই বন্ধ ছিল – অর্থাৎ বাইরে থেকে কেউই আসে নি আরুষিদের বাড়িতে।

পরে ভারতীর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন অভিরূক। ভারতী, কাজের সন্ধানে এসেছিল মালদা থেকে। যেমন প্রতি বছর অসংখ্য বাঙলাভাষী চলে আসে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে। ভারতী নিরক্ষর। সে তার প্রথম বয়ানও পড়তে পারে নি, পরের বয়ানও নয়। সে শুধু তার বক্তব্য জানিয়েছিল পুলিশকে, সিবিআইকে, একাধিকবার। কিন্তু পুলিশ বা সিবিআই কী লিখেছিল, তা সে জানে না। সাক্ষী হিসেবেও তাকে যখনই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল, সিবিআইয়ের উকিল তাকে জেরা করত, তাকে আগে থেকেই শিখিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হত কী কী প্রশ্ন করা হবে আর তার কী উত্তর দিতে হবে। এইসন্য জবানবন্দী দেবার সময়ে সে কোর্টে বলেছিল – “আমাকে যা শেখানো হয়েছে, আমি শুধু তাইই বলব”।

আইন আদালত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এই মহিলাটি এর পরে বুঝতেও পারে নি, এর প্রথম বয়ানের “তালা খুলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকা”-র ঘটনা এইভাবেই কখন “দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকা” হয়ে গেছে। পরে সে লোকমুখে জানতে পারে, মূলত তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই তলওয়ারদের যাবজ্জীবনের শাস্তি হয়েছে।

২। কে কে গৌতম – নয়ডার জনৈক রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। সারাজীবন পুলিশে কাজ করার সুবাদে তিনি প্রচুর লোককে চিনতেন, বিভিন্ন লেভেলের। চেনাপরিচিতির সুবাদে এঁর কিঞ্চিত পরোপকারের নেশা আছে। সামান্য হিন্ট পেলেই তিনি অকুস্থলে পৌঁছে যান উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে “সাহায্য” করতে। মূলত এঁর পুলিশি দৃষ্টিতে ধরা পড়ে যে টেরেসের তালাটা দুদিনেও ভাঙা হয় নি, এবং টেরেসের সিঁড়ির রেলিং-এ রক্তের দাগ লেগে। অভিরূকের সঙ্গে কথা বলার সময়েও এই পয়েন্টটা বার বার তিনি কনফার্ম করেছিলেন – সিঁড়িতে কোনও রক্তের দাগ ছিল না, কেবল দাগ ছিল সিঁড়ির রেলিং-এ। এঁর উদ্যোগেই টেরেসের তালা দ্বিতীয় দিনে ভাঙা হয় এবং হেমরাজের মৃতদেহ ইনিই প্রথম দেখতে পান, যা আগের দিন থেকে নয়ডা পুলিশ উদ্ধার করতে পারে নি। টেরেস না খুললেও রেলিং-এ এই রক্তের দাগ নয়ডা পুলিশ দেখতে পায় নি বা তার স্যাম্পল নেবার চেষ্টা করে নি।

অভিরূকের সঙ্গে কথোপকথনে এই কেসের অনেক লজিকাল পয়েন্ট তুলে ধরেন শ্রী গৌতম – যা রাজেশ বা নূপুরকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাইরে রাখতে পারত। কিন্তু এই কেসে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন না কখনওই – না নয়ডা পুলিশের তরফে, না সিবিআইয়ের তরফে। সিবিআই শুধু “উইটনেস” হিসেবে তাঁর সাক্ষ্য নেয়, যে সাক্ষ্যের বয়ান পরে বিপুলভাবে বদলে যায় সিবিআইয়ের দস্তাবেজে।

কেন তিনি পরে বয়ান বদল করেছিলেন? প্রশ্নের উত্তরে অভিজ্ঞ প্রাক্তন পুলিশ অফিসারটি চুপ করে যান।

I asked him whether he was under pressure from Kaul to change his testimony because Kaul had some personal information on him.
Gautam gave me another long look. ‘It is best we don’t discuss this.’
‘So were you put under pressure?’
‘Why not drop this subject?’
‘It is important that I know from you.’
‘You know everything already. Please let us not discuss this anymore.’

৩। বিজয় মণ্ডল, কৃষ্ণা এবং রাজকুমার – নয়ডা জলবায়ু বিহার এলাকার অন্যান্য কিছু বাড়ির কাজের লোক। হেমরাজের সঙ্গী। প্রাথমিক সন্দেহের তালিকায় এদের নাম ছিল। নয়ডা পুলিশ এদের তুলে নিয়ে যায়। পরে এদের নারকোঅ্যানালিসিস এবং পলিগ্রাফ টেস্টও হয়। দুজনকার বয়ানই কমবেশি একই রকম ছিল, হেমরাজের সঙ্গে তারা হেমরাজের ঘরে বসে মদ খাচ্ছিল, এর পরে কোনও বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়, হেমরাজকে টেরেসে নিয়ে গিয়ে কৃষ্ণা কুকরি দিয়ে হেমরাজের গলা কেটে ফাঁক করে দেয়, তার পরে মাথা ভেঙে দেয়। এর পরে মাতাল অবস্থায় তারা আরুষির ঘরে হানা দেয়। আরুষির ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল, কিন্তু বাইরের ঘরের একটি কমন বাথরুমের দ্বিতীয় দরজা খুলে আরুষির ঘরে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যেত, এটা কৃষ্ণা আর রাজকুমার জানত, সেভাবেই তারা আরুষির ঘরে ঢোকে এবং তাকে ধর্ষণ করতে যায়, আরুষি জেগে উঠে বাধা দেয়, কিন্তু সে চীৎকার করে ওঠার আগেই কুকরি দিয়ে আরুষিরও গলা কেটে, একইভাবে তার মাথাতেও ভারী অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তাকে মেরে ফেলা হয়। পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা রাজেশ আর নূপুর তলওয়ার এর কিছুই বুঝতে পারেন নি সারারাতে।

কুকরি পাওয়া যায় রাজকুমারের ঘর থেকে, হেমরাজের রক্তমাখা বালিশের ওয়াড় উদ্ধার হয় কৃষ্ণার ঘর থেকে, এবং তিনটে গ্লাসও পাওয়া যায় হেমরাজের ঘর থেকে, যেখানে বসে সে কৃষ্ণা আর রাজকুমারের সঙ্গে মদ খেয়েছিল বলে এরা জানিয়েছিল। গ্লাসগুলোর কোনও ফরেনসিক টেস্ট হয় নি, বালিশের ওয়াড় সিবিআইয়ের হাতসাফাইয়ে পরে ডকুমেন্টেড হয় “আরুষির ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া” জিনিস হিসেবে।

রাজকুমারের নজর পড়েছিল আরুষির ওপর – সে আরুষিকে কামনা করত। পনেরোই মে-র রাতে হেমরাজকে অনুরোধ করেছিল সে – “সেটিং” করিয়ে দেবার জন্য, কিন্তু ছেচল্লিশ বছর বয়স্ক হেমরাজ সরাসরি জানিয়েছিল, আরুষি তার মেয়ের মত, আরুষির কোনও ক্ষতি সে বরদাস্ত করবে না। এর পরেই ঝগড়া বাড়ে এবং হেমরাজ খুন হয়।

খুনের রাতে সরানো আরুষির মোবাইল এর বেশ কিছুদিন পরে একজনের কাছে পাওয়া যায়, সে জানায় মোবাইলটা একটা পার্কে পড়ে থাকতে দেখেছিল সে।
হেমরাজের মোবাইল, খুনের ঘটনার বেশ কয়েক মাস পরে পাঞ্জাবে অ্যাকটিভেটেড অবস্থায় ট্রেস করা হয়। কিন্তু পুলিশ বা সিবিআই – কেউই সেই মোবাইল নিয়ে আর মাথা ঘামায় নি – হয় তো কোনও ক্লু বেরোতেও পারত, কিন্তু কেউ আর হেমরাজের মোবাইল নিয়ে মাথা ঘামায় নি। হেমরাজের মোবাইল সিবিআইয়ের আর দরকার ছিল না হয় তো।

গ্রেফতার করার কয়েক মাসের মধ্যেও পুলিশ বা সিবিআই কৃষ্ণা আর রাজকুমারের নামে চার্জশীট ফাইল করতে অক্ষম হয়, ফলে সেপ্টেম্বর মাসে এরা দুজনেই ছাড়া পেয়ে যায়। পরে গাজিয়াবাদের স্পেশাল কোর্টে তলওয়াররা বার বার অনুরোধ করেন ওদের পলিগ্রাফ আর নারকোঅ্যানালিসিস টেস্টের রেজাল্ট আদালতে পেশ করবার অনুমতি চেয়ে, কিন্তু কোনও কোর্ট তাদের সেই অনুমতি দেয় নি, বরং জানানো হয়েছে, এইভাবে বার বার এই রিপোর্ট ওই রিপোর্ট চেয়ে চেয়ে তলওয়ারেরা ইচ্ছে করে কেসটায় ডিলে ঘটাচ্ছেন, আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন। গাজিয়াবাদ কোর্ট, এলাহাবাদ হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, তিন জায়গা থেকে একই উত্তর আসে। কৃষ্ণা আর রাজকুমারের জবানবন্দীর রিপোর্ট তলওয়ারেরা ট্রায়াল চলাকালীন কখনওই হাতে পান নি।

ছাড়া পাবার পরেই কৃষ্ণা, বিজয় আর রাজকুমার অ্যাবস্কন্ডিং হয়ে যায়, তাদের আর ট্রেস করা যায় নি। কৃষ্ণা আর রাজকুমার সম্ভবত নেপাল চলে গেছে, বিজয়ের খবর জানা যায় নি একেবারেই। তাদের আর কেউই ট্রেস করার চেষ্টা করে নি।

৪। এ জি এল কৌল – সম্ভবত আরুষির ঘটনায় সবচেয়ে অন্ধকার চরিত্র। সিবিআইয়ের ইনস্পেক্টর কৌল আরুষি তদন্ত হাতে নেন ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে, এবং বিচারের শেষ রায় বেরোনর দিন পর্যন্ত তিনি এই কেসের সাথে যুক্ত ছিলেন। ইনিই সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কোনও না কোনও সময়ে বাকি সমস্ত চরিত্রদের সাথে যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে। সাক্ষী, পুলিশ, ফরেনসিক এক্সপার্ট, বিচারক, উকিল, অভিযুক্ত, প্রমাণাভাবে মুক্ত, সমস্ত চরিত্রের সাথে এই কৌল কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত ছিলেন। সিবিআই, যে প্রতিষ্ঠানের নামটার ওপর আপামর ভারতের মানুষ প্রায় অন্ধভাবে ভরসা করে, সেই সিবিআই আসলে কীভাবে চালিত হয়, তা আমাদের হাতে ধরে দেখিয়ে দেন শ্রী কৌল।

সিবিআইয়ের ভেতরে কৌলের রেপুটেশন খুব একটা ভালো ছিল না। সিবিআই যেহেতু সবসময়েই হাই প্রোফাইল এবং হাইলি সেন্সিটিভ কেস নিয়ে নাড়াচাড়া করে, এই সংস্থার অফিসারদের অনেকেই বিশেষ কিছু ইনফ্লুয়েনশিয়াল লোকের আওতায় চলে আসেন, বিশ্বাস্য অবিশ্বাস্য অনেক রকমের অফার আসে তাঁদের কাছে, সম্ভাব্য অভিযুক্তকে বাঁচানোর জন্য, বা তার বদলে অন্য কাউকে স্কেপগোট বানানোর জন্য। সিবিআই সে ব্যাপারে জানে না, তা নয়, এর জন্য, সিবিআইয়ের ভেতরেই এই অফিসারদের ওপর বিশেষ নজর রাখা হয়, এদের সমস্ত কার্যকলাপের একটা লিস্ট মেনটেন করতে থাকা হয়। এই লিস্টের নাম হল ওডিআই – অফিসার্স অফ ডাউটফুল ইন্টিগ্রিটি।

কৌল সর্বদাই এই ওডিআই লিস্টে ছিলেন, তাঁর সিবিআই কর্মজীবনে। দু দুবার তাঁর প্রাপ্য প্রমোশন থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আসা কনফিডেনশিয়াল রিপোর্টের ভিত্তিতে। এই ব্যক্তিটি নিজে সিবিআইয়ের ভেতরেও খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। আরুষির কেস হাতে নেবার কিছুদিন আগেই কৌলের নামে একটি ডাউরি ডেথের কেসে অভিযুক্তদের বাঁচানোর জন্য তাদের থেকে মোটা টাকা নেবার অভিযোগ জমা পড়েছিল সিবিআইয়ের কাছে। সাধারণভাবে এই ধরণের লোকেদের চাকরি চলে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সিবিআই ঠিক প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে চলে না। এই ধরণের লোকেদেরও দরকার হয় বৈকি তদন্তের ক্ষেত্রে, বিশেষত কৌলের একটি রেপুটেশন ছিল উনি যে কোনও কেস হাতে নিলে, তা ‘ক্লোজ’ করে ছাড়তেন, যেভাবেই হোক।
কৌলের পছন্দের বিষয় ছিল, সেক্স। তিনি জানতেন একটি খুনের কেসের সঙ্গে সঠিক পরিমাণে সেক্সের গল্প জুড়ে দিতে পারলে মিডিয়াও খুউব খুশি হয়, কেস ক্লোজ করতেও সুবিধে হয়। মধ্যপ্রদেশের ভোপালে মানবাধিকার কর্মী শেহ্‌লা মাসুদের হত্যাকাণ্ডের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই অনেকের। সিবিআইয়ের তরফে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করেছিলেন কৌল। তদন্তভার হাতে নেবার দুদিনের মধ্যেই আপাত-অভিযুক্ত জাহিদা পারভেজের একটি গোপন ডায়েরি মিডিয়ার হাতে চলে আসে, যাতে জাহিদা, শেহ্‌লা এবং এক রাজনীতিকের ত্রিকোণ প্রেমের সম্পর্কের ইঙ্গিত ছিল। কৌল তাতে যোগ করেন যৌনতার চাটনি এবং সবচেয়ে খুশি হয় মিডিয়া।

এ রকম আরও মণিমুক্তো রয়েছে কৌলের কেরিয়ার জুড়ে। কৌলের সুপিরিয়ররাও তাঁকে চিনতেন ভালো করেই। সমসাময়িক নয়ডার নিঠারি হত্যাকাণ্ডের মামলাও সিবিআই যখন হাতে নেয়, কৌলকে সেই তদন্তে একটা সামান্য রোল দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কৌলকে সুচারুভাবে কাজে লাগানো হয় আরুষির মামলায়, কৌলের এই বিশেষ বিশেষ বিষয়গুলোতে পারদর্শিতার জন্যেই। সিবিআই ততদিনে ক্লুলেস হয়ে গেছে। প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ যা পাওয়া যেতে পারত তলওয়ারদের বাড়ি থেকে, নয়ডা পুলিশের অকর্মণ্যতায় তার বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। তখনও পর্যন্ত সন্দেহের তালিকায় থাকা পাড়ার কাজের লোক – কৃষ্ণা আর রাজকুমার ছাড়া পাবার পর থেকেই নিরুদ্দেশ, এই অবস্থায় সমাধানসূত্র খুঁজে আসল অপরাধীকে ধরা সিবিআইয়ের কাছে প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিল। অতএব, কেস যেভাবেই হোক, ‘ক্লোজ’ করা জরুরি ছিল। তো, ক্লোজ করার ব্যাপারে সিবিআইয়ে সবচেয়ে পারদর্শী আর কে হতে পারেন, এ জি এল কৌল ছাড়া?

কৌল তাঁর নাম রেখেছিলেন। দু দুবার প্রমোশন মিস হয়ে যাওয়া কৌলের কাছে সফলভাবে একটা কেস ক্লোজ করা, চ্যালেঞ্জের মত ছিল। সেই চ্যালেঞ্জ তিনি জিতে গেছেন। মৃত হেমরাজের নামে জিমেল আইডি তৈরি করে তাই দিয়ে তলওয়ারদের সঙ্গে কমিউনিকেশন চালানো, অনার কিলিং-এর তত্ত্ব খাড়া করা এবং তা প্রমাণ করবার জন্য সমস্ত রকমভাবে তদন্তকে প্রভাবিত করা, সাক্ষীদের বয়ান পালটানো (আরেকবার পড়ে দেখুন কে কে গৌতমের শেষ কথাগুলো), এমনকি ফরেনসিক ল্যাবে গিয়ে রাতারাতি দুটো বালিশের ওয়াড় অদলবদল করে ফেলা, – যার প্রভাবে গোটা কাহিনিটাই অন্য মোড় নিয়ে নিয়েছিল এবং রাজেশ নূপুরকে কনভিক্ট করা আদালতের পক্ষে সহজ হয়েছিল – প্রতিটা ব্যাপারে হাত ছিল এই কৌলের। কৌলের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে সিবিআইয়ের পে-রোলের লোকেরা সাহস পেতেন না, সঙ্গত কারণেই রিটায়ারমেন্টের পর, আরুষি মামলা শেষ হয়ে যাবার পরেও গৌতম সরাসরি কৌলের নাম নিতে সাহস পান নি। সাহস পান নি ফরেনসিক ল্যাবের অধিকর্তাও।

প্রসঙ্গত, কৌল এই তদন্তের দায়িত্বভার নেবার কিছুদিন পরেই জানা যায় হেমরাজের ফোন পাঞ্জাবে চালু থাকার কথা। কৌল নিজেই এই তথ্যটি জানিয়েছিলেন। অথচ, পরে যখন সংশ্লিষ্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের প্রতিনিধি আদালতে বয়ান দিতে আসেন, প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানা যে হেমরাজের ফোন ট্রেস করার জন্য সিবিআইয়ের তরফে তাঁদের কাছে কোনও অনুরোধই করা হয় নি।

২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে, অভিরূক যখন এই বই সদ্য লিখে শেষ করেছেন, এ জি এল কৌল হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।

৫। জাস্টিস শ্যাম লাল – সম্ভবত আরুষি হত্যাকাণ্ড মামলার সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, এবং একইসঙ্গে একটি ইন্টারেস্টিং চরিত্র। গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে, গাজিয়াবাদের স্পেশাল কোর্টে ইনিই দীর্ঘ এক বছর ধরে এই কেসের সমস্ত পক্ষের তথ্য প্রমাণ সাক্ষ্য ইত্যাদি শুনেছেন, দেখেছেন, বিবেচনা করেছেন, এবং শেষে রাজেশ আর নূপুর তলওয়ারকে দোষী সাব্যস্ত করে ২১০ পাতার একটি রায় দেন, যাতে দুই অভিযুক্তের জন্য শাস্তি ছিলঃ যাবজ্জীবন কারাবাস।

শ্যাম লালের একটি নিকনেম চালু ছিল গাজিয়াবাদের আদালতে। সাজা লাল। দীর্ঘ বিচারকজীবনে, কখনও কোনও অভিযুক্তই নাকি তাঁর বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তি পায় নি। প্রত্যেকেই শাস্তি পেয়েছে তাঁর জাজমেন্টে। শ্যাম লাল নিজে যদিও দাবি করেন অনেকেই তাঁর রায়ে মুক্তি পেয়েছেন বা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, কিন্তু এ রকম একটা কেসের রেফারেন্সও তিনি দিতে পারেন নি। আরুষি হত্যাকাণ্ডের কেস তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল সম্ভবত এই কারণে, ন্যায় প্রদানের থেকেও এই কেসে তাঁর কাছে জরুরি ছিল এই কেসের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত পালন করে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম তোলার। “শেষ পর্যন্ত” কথাটি অবশ্যই ব্যঞ্জনামূলক, কারণ, শেষ করার জন্য কোনও চাপ তাঁর ওপর ছিল না, চাপটা ছিল তাঁর নিজের কাছেই। আরুষি হত্যার রায় প্রকাশের ছদিন পরেই শ্যাম লাল অবসর নেন। দেশের সমস্ত মিডিয়া যখন গভীর আগ্রহের সঙ্গে এই কেসটা ফলো করছিল, একটা সঠিক বিচার হওয়া খুব দরকার ছিল, কিন্তু শ্যাম লালের হাতে বেশি সময় ছিল না। অবসর নেবার আগেই তাঁকে মামলার শুনানি শেষ করে জাজমেন্ট শুনিয়ে যেতে হত। শ্যাম লাল চাইলেই কেসটি আরও শুনানির জন্য পরবর্তী বিচারকের হাতে ছেড়ে যেতে পারতেন, শেষ করার জন্য কোনও চাপ ছিল না, কিন্তু তিনি সে পথে হাঁটেন নি।

অবসর নেবার পরের দিনই তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে যান। অসংখ্য মিডিয়া তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছিল এর পরে – কিন্তু তিনি একটি ইন্টারভিউও দেন নি অবসর নেবার পর দিন থেকে। একটিও না। আর হ্যাঁ, নিজের উদ্যোগে আরুষি হত্যার জাজমেন্টের কপি যত্ন করে হার্ডবাউন্ড করে তিনি বিলি করেছিলেন তাঁর পরিচিত সমস্ত বিচারকদের কাছে এবং এলাহাবার হাইকোর্ট বার কাউন্সিলের মেম্বারদের কাছে। অভিরূকের বই রচনার পেছনে সবচেয়ে বড় সাফল্যের কারণ এইটাই – তিনি শ্যাম লালের কাছ পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন, তাঁর মতামত জানতে পেরেছিলেন। না, বিশেষ কোনও আগ্রহ শ্যাম লাল দেখান নি আরুষির মামলার ব্যাপারে, সারা জীবনে অনেক মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তিনি, আরুষির মামলা আলাদা করে মনে রাখার মত কিছু বলে তাঁর মনে হয় নি, কিন্তু তিনি বিশেষ গর্ব প্রকাশ করেছিলেন জাজমেন্টে ব্যবহার করা ইংরেজি শব্দ এবং ফ্রেজের ব্যবহার নিয়ে। একটি হত্যাকাণ্ড মামলার জাজমেন্ট, একটি আইনি দলিল, সেখানে যৌক্তিক কাটাছেঁড়ার বদলে তিনি আগাগোড়া জোর দিয়ে গেছেন অদ্ভূত ইংরেজি ভাষায় তাঁর তথাকথিত “দক্ষতা”র ওপর। উদাহরণস্বরূপ – হত্যার দেড়দিন পরে আবিষ্কার হওয়া হেমরাজের মৃতদেহের বেশির ভাগ অংশই বিকৃত হয়ে গেছিল, ফুলে গেছিল বীভৎসভাবে, চেনার উপায় ছিল না প্রায়। তার যৌনাঙ্গও ফুলে গেছিল – শ্যাম লালের জাজমেন্টে Penis-এর বদলে লেখা হয়েছে এই রকমের শব্দবন্ধঃ Hemraj’s ‘willy was turgid’; his ‘pecker was swollen’।

যতক্ষণ তিনি অভিরূকের সাথে কথা বলেছেন, কেসের মেরিটের থেকে তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল কীভাবে প্রচন্ড খাটাখাটনি করে তিনি আর তাঁর ছেলে মিলে একটা একটা করে ইংরেজি শব্দ চয়ন করেছেন, কী কী ইংরেজি বই তিনি পড়েছেন (যদিও সমসাময়িক কোনও ইংরেজি ভাষার সাহিত্যিকের লেখা তিনি পড়েছেন বলে মনে করতে পারেন নি, কেবলমাত্র শেকসপিয়র, মিলটন, শেলি, কিটসের নাম তিনি মনে করতে পেরেছিলেন) – সেইসব জানানো। বার বার তিনি মনে করিয়েছেন তিনি ইংরেজিতে এম এ করেছিলেন।

একজন বিচারককে শুধুই আইনের বই পড়লে চলে না, সাথে সাথে বিভিন্ন ল্যান্ডমার্ক, গুরুত্বপূর্ণ এবং কম গুরুত্বপূর্ণ জাজমেন্টও পড়তে হয়, এইগুলোই বিচারকের গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি বলে বিবেচিত হয় সাধারণত। কিন্তু গর্বের সাথে শ্যাম লাল জানান, তিনি হাইকোর্টের জাজমেন্ট পড়েন না – তিনি শুধুই সুপ্রিম কোর্টের জাজমেন্ট পড়েন। এমনিতে তিনি দশ মিনিটে এক পাতা ইংরেজি লিখে ফেলতে পারেন, কিন্তু শুধুমাত্র আরুষি কেসটির জন্য, ২১০ পাতার দীর্ঘ রায় লেখার জন্য তাঁকে তাঁর আইনজীবি ছেলে আশুতোষ লালের সাহায্য নিতে হয়েছিল। সময় নিয়ে, ধৈর্য ধরে প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা ফ্রেজ, প্রতিটা বাক্য তাঁরা চয়ন করেছেন, লিখেছেন। লেখা শেষ হলে টাইপ করিয়েছেন।

সত্যিই, খুবই খাটাখাটনির ব্যাপার। তা, কতদিন লেগেছিল এই পুরো জাজমেন্ট লিখে উঠতে?

শ্যাম লাল মুখ খোলার আগেই তাঁর ছেলে আশুতোষ জানান, পুরো এক মাস লেগেছিল।

অভিরূক খুব কষ্টে “কিছুই-বুঝতে-পারি-নি” মুখ করে এর পরেও কথোপকথন চালিয়ে গেলেন, কিন্তু আসল উত্তর ততক্ষণে বোঝা হয়ে গেছে। পাঠকদের জন্য টাইমলাইন আরেকবার মনে করিয়ে দেওয়া যাক – ২৪শে অক্টোবর ২০১৩ তলওয়ারদের তরফে ডিফেন্স লইয়ার নিজের আর্গুমেন্ট শুরু করেন, তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করেন কীভাবে ডেন্টিস্টের স্ক্যালপেল দিয়ে মানুষের গলা কাটা অসম্ভব, কীভাবে সিবিআই ভুল গলফ স্টিক নিয়ে সন্দেহ করে চলেছে মার্ডার ওয়েপন হিসেবে। … আরুষি মামলার ভার্ডিক্ট বেরোয় ২৫শে নভেম্বর – ভার্ডিক্ট টাইপ করে তৈরি করতে ‘পুরো’ এক মাস লেগেছিল, তার মানে …?

তার মানে কি এইই দাঁড়ায় না, ডিফেন্স লইয়ার নিজের আর্গুমেন্ট পেশ করবার আগেই ভার্ডিক্ট লেখার কাজ শুরু হয়ে গেছিল? রাজেশ তলওয়ার, নূপুর তলওয়ার, আর তনভীর আহমেদ মীর মিলে এক মাস ধরে আদালতে যা যা প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন, তা আসলে বিচারক শ্যাম লালের কানেই ঢুকছিল না, উনি তার আগেই রায় তৈরি করে ফেলেছিলেন? অভিরূকের মনে পড়ছিল, তনভীরের আর্গুমেন্ট শোনার সময়ে বিরক্ত শ্যাম লাল মাঝে মাঝেই বলতেন, তাড়াতাড়ি করুন – আর কত বাকি আছে? – বা – লিখে জমা দিয়ে দিন। তনভীরের আর্গুমেন্ট শোনার ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহী ছিলেন না শ্যাম লাল। তাঁর রিটায়ারমেন্টের সময় এগিয়ে আসছিল খুব কাছে। ইংরেজি শব্দের সম্ভার সাজানোর জন্যেও সময় দিতে হচ্ছিল তাঁকে।

২৫শে নভেম্বরের জাজমেন্টের অংশঃ Undaunted by their unsuccess in the Supreme Court, they have now approached the High Court. The application has been oppugnated by CBI tooth and nail on the fulcrum of putting unwarranted road blocks in the surge of an urge for expeditious trial as mandated by the Supreme Court.

…Procrastination is the thief of time. Now the time has come to see that the syndrome of delay does not erode the concept of expeditious justice which is a constitutional demand. Sir Francis Bacon in his aphoristic style said ‘hope is a good breakfast, but it is a bad supper’.

জাজমেন্টের পুরো কপিটি পাওয়া যাচ্ছে এখানেঃ

https://www.scribd.com/doc/187237668/Aarushi-Talwar-Murder-Case-Judgment-Nov-26-2013-Sessions-Trial-Case

আরও অনেকের সম্বন্ধে বলা হল না – দাহিয়া, এস এল ভায়া, অরুণ কুমার, বিজয় শঙ্কর, কিংবা নরেশ যাদব – এই কেসের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটা চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ আলাদা আলাদা কারণে, আলাদা আলাদা ভাবে। পুরো জানতে গেলে বইটা পড়া ছাড়া গতি নেই।

কে মারল আরুষিকে?

না, এটা কোনও সুলিখিত ক্রাইম ফিকশন নয়, যে, শেষপাতে একটা বুদ্ধিদীপ্ত “whodunnit” চ্যাপ্টার দিয়ে বই শেষ হবে। এটি একটি ক্রাইম নন-ফিকশন। আদালতের রায় অনুযায়ী, রাজেশ আর নূপুর তলওয়ার, জোড়া খুনের অপরাধে দোষী। কিন্তু হত্যার দিন থেকে শেষ রায় বেরোনর দিন পর্যন্ত, পদে পদে এত বেশিমাত্রায় তদন্তপ্রক্রিয়ায় ফাঁকফোঁকর দেখা গেছে এবং যাচ্ছে, যে এই রায়ের ওপর সম্পূর্ণভাবে ভরসা রাখা যায় না। আদালতও শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারে নি আরুষি বা হেমরাজ কার হাতে কী পরিস্থিতিতে খুন হয়েছিল। এই কেসে রাজেশ আর নূপুর তলওয়ারকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় “পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ” বা সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সের ভিত্তিতে। একটি বাড়ি, তার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, বাড়ির ভেতর চারটি মানুষ, দুজন খুন হয়ে গেল এক রাতে, এখন যে হেতু বাইরে থেকে অন্য কোনও লোক ঘরে ঢোকার সম্ভাবনা নেই, অতএব, বাকি দুজনের কোনও একজন, বা দুজন ছাড়া আর কেউ খুনী হতেই পারে না। অতএব, এই দুজনের ওপরেই দায় বর্তায় ব্যাখ্যা করার যে, খুন কী করে হল।

সেইভাবেই রায় লেখা হয়েছে। যে হেতু এই দুজন ছাড়া আর কেউ খুনী হতেই পারে না, অতএব, এই দুজনই খুনী। খুনের পরে রাজেশ রক্তমাখা স্ক্যালপেল হাপিস করে ফেলেছেন, গলফ ক্লাব ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে লফটে তুলে রেখেছেন, এবং নিষ্পাপ মুখে মেয়ের মৃত্যুর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে যতজন, যতভাবে দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন, কৌল, বা দাহিয়া বা অন্যরা – কেউই নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণ করতে পারেন নি খুনের প্রক্রিয়া, খুনের উদ্দেশ্য বা মোটিভ এবং খুনের অস্ত্র। তদন্তের ফাঁক বোজাতে কখনও সাক্ষীর বয়ান বদলাতে হয়েছে, কখনও গল্প তৈরি করতে হয়েছে, কখনও মিডিয়ার মাধ্যমে জনমত বানানো হয়েছে সেইসব গল্প “বিশ্বাস” করার জন্য।

অথচ শুরুর দিকে কিন্তু প্রক্রিয়াটা এতটা ঘাঁটা ছিল না। রাজকুমার আর কৃষ্ণার পলিগ্রাফ আর নারকো টেস্টের বিস্তারিত রিপোর্ট হাতে পাবার পরে সিবিআইয়ের কাছে যথেষ্ট কারণ ছিল, এই দুজনকে আটকে রেখে আরও জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাওয়া। শুরুর দিকে এই সব রিপোর্টের কথা মিডিয়াতেও এসেছিল, কিন্তু এ জি এল কৌল একবার দায়িত্ব নিয়ে নেবার পরে – এই সমস্ত রিপোর্ট চিরদিনের মত সমাধিস্থ হয়ে যায়। পরেও, যখনই সিবিআই বাধ্য হয়েছে এই টেস্টের রিপোর্ট জমা দিতে, কৌলের নির্দেশে সব সময়ে জমা পড়েছে এই সব রিপোর্টের প্রথম দু তিন পাতা, যাতে কনটেন্ট ছিল না, কেবল হেডলাইন আর কিছু রেফারেন্স ছিল। গাজিয়াবাদের আদালতে শুনানি চলাকালীন তলওয়াররা বার বার চেয়েছেন এই রিপোর্টের সম্পূর্ণ কপি, তাঁদের দেওয়া হয় নি, বরং ভর্ৎসনা করা হয়েছে – তাঁরা আলফাল জিনিস চেয়ে আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন – বলে। হয় তো সেই সমস্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে তদন্ত এগনো গেলে কেসটার অন্য পরিণতি হতে পারত, কিন্তু একবার কৌল তদন্তের ভার নিয়ে নেবার পরে, সে আশা আর একেবারেই রইল না।

তেরো বছরের মেয়েটাকে কীভাবে, কে মারল, এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আর কোনও দিনই মিলবে না। হাইকোর্টের ব্যাকলগ কাটার অপেক্ষায় তলওয়ারদের জীবন কেটে যাচ্ছে গাজিয়াবাদের প্রান্তে দাসনা জেলের কুঠুরিতে।

অবশ্য জীবনের কথা বলে ফেলার পক্ষে এ উপযুক্ত সময় নয়। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস, যখন এই নিবন্ধ লিখছি, তখন গাজিয়াবাদের দাসনা জেলে রাজেশ আর নূপুর তলওয়ার তাঁদের কারাজীবনের দু বছর পূর্ণ করার দিকে এগিয়ে চলেছেন, এবং তনভীর আহমেদ মীর, তাঁদের তরফের আইনজীবি, কোনওরকমের ফাঁক না রেখে কেসটি নতুন করে তৈরি করছেন এলাহাবাদ হাইকোর্টে নতুন পিটিশন দাখিল করবার জন্য, যাতে হাইকোর্টে কেসের পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত তলওয়ারদের শাস্তি “আপহেল্ড” করে রাখা যায়, তাঁদের জামিনে মুক্ত রাখা যায়।

দাসনা জেলের ডায়েরি

আমি আজ পর্যন্ত মেয়ের জন্য একটু শোক করারও সময় পাই নি – এত ব্যস্ত ছিলাম। – নূপুর তলওয়ারের বক্তব্য, প্রথম যেদিন অভিরূক তাঁদের সাথে দেখা করতে যান দাসনা জেলে।

পুরুষদের সেলে থাকেন রাজেশ, মহিলাদের সেলে থাকেন নূপুর। গাজিয়াবাদের দাসনা জেল তৈরি ১৭০০ বন্দীর থাকার জন্য, সেখানে এখন থাকে ৩৪০০ বন্দী। প্রতি বন্দীর জন্য বরাদ্দ জায়গা তিন ফুট বাই ছ ফুট। তার মধ্যেই শুতে হয়, তার মধ্যেই নিজের জিনিসের পুঁটলি রাখতে হয়। রাতে ঘুমের মধ্যে একজনের গায়ে অন্যজনের পা লেগে গেলে অশ্রাব্য ভাষায় রাত জুড়ে গালিগালাজ চলে। শীতকালে শীত লাগে, অন্য সময়ে মশা কামড়ায়, কখনও কখনও মশা মারার কয়েল জোটে, ক্ষণিকের স্বস্তি, কিন্তু তা লাগানোর জন্য মেটালের স্ট্যান্ড পাওয়া যায় না, কারণ ওটি সিকিওরিটি থ্রেট। ওই স্ট্যান্ড ব্যবহার করে কেউ নিজেকে বা অন্যকে আহত করতে পারে। পোটেনশিয়াল ওয়েপন। কয়েল না জুটলে মশার কামড় খাওয়া ভবিতব্য।

রাজেশ তলওয়ারের ভাগ্য খারাপ বলা যাবে না। ডেন্টিস্টের বিদ্যা কাজে লাগিয়ে তিনি জেলের ভেতরে একটি ডেন্টাল চেম্বার খোলার অনুমতি পেয়েছেন। সমস্ত যন্ত্রপাতি কিনে সেখানে সেটআপ করা হয়েছে। রাজেশ আর নূপুরের সহযোগিতায় সেখানে দাসনা জেলের পুলিশ এবং অন্যান্য বন্দীদের দাঁতের চিকিৎসা করেন।

নূপুর কাজ করেন ‘ইংলিশ অফিসে’। এখানে জেলের বেশির ভাগ অফিশিয়াল কাজকর্ম চলে, যেখানে ইংরেজি জানা কর্মীর দরকার হয়। বিভিন্ন রায়, চার্জশীট ইত্যাদির প্রতিলিপি, ইংরেজি অনুবাদ বা ইংরেজি থেকে হিন্দিতে অনুবাদের কাজ করেন নূপুর।

জনৈক “মন্ত্রীজি” কোনও এক স্ক্যামে ফেঁসে গিয়ে দাসনা জেলে বন্দী ছিলেন কিছুদিন। অল্পদিনেই রাজেশ তাঁর প্রিয়পাত্র হয়ে যান, মূলত মন্ত্রীজির সুপারিশেই ছাড়া পাবার পরেও রাজেশ একটু বেশি খাতিরযত্ন পান – একজন বন্দীর পক্ষে যতটা পাওয়া সম্ভব আর কি। এখনও মন্ত্রীজিকে মাঝে মাঝে দাসনা জেলে আসতে হয় হাজিরার কারণে, তখন তিনি রাজেশের জন্য বাড়িতে বানানো খাবার দাবার নিয়ে আসেন।

আর আসেন বিকাশ শেঠি, রাজেশের প্রিয় বন্ধু, ঘটনার বহু আগে থেকে রাজেশের সাথে যাঁর হৃদ্যতার সম্পর্ক। খাবার নিয়ে আসেন, কিছু টাকা নিয়ে আসেন, বন্দী অবস্থায় হাতে কিছু টাকা সময়বিশেষে প্রয়োজনীয় হয় বৈকি, ভারতীয় কারাগারের সাথে যাঁরা পরিচিত, তাঁরাই জানেন।

মাঝে মাঝে মন্ত্রীসান্ত্রী আসেন, জেল খাটতে নয় – জেলে থাকা বন্দীদের দেখতে। অন্যান্য বন্দীদের সাথে তখন রাজেশকে প্যারেড করানো হয় সেই সব হাই প্রোফাইল রাজনৈতিক নেতাদের সামনে।

ডায়েরি লেখেন রাজেশ। ডায়েরিতে লিখেছেন, নিজেকে চিড়িয়াখানার জন্তু মনে হচ্ছিল, চেনে বেঁধে আমাদের দর্শকদের সামনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো হচ্ছে।
সেই ডায়েরি অভিরূকের হাতে তুলে দিয়েছেন রাজেশ তলওয়ার। ডায়েরির কিছু অংশ আমাদের পড়বার জন্য এই বইয়ের শেষে তুলে দিয়েছেন অভিরূক।

পড়ে ফেলুন। পড়া দরকার বইটা। সব্বার।


তথ্যসূত্রঃ
1. Aarushi by Avirook Sen, Penguin Publishers, ISBN 978-0-143-42121-4
2. http://www.hindustantimes.com/books/avirook-sen-s-aarushi-highlights-the-coldness-of-the-judiciary/article1-1370340.aspx
3. http://www.thehindu.com/books/literary-review/avirook-sen-on-his-new-book-on-the-aarushihemraaj-murder-case/article7460290.ece
4. https://www.scribd.com/doc/187237668/Aarushi-Talwar-Murder-Case-Judgment-Nov-26-2013-Sessions-Trial-Case
5. http://www.sify.com/topics/avirook-sen.html
6. http://www.ndtv.com/video/player/the-big-fight/aarushi-talwar-murder-case-has-justice-been-served/383585

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s