স্মৃতির সরণী বেয়ে –

লেখাটি এক বছরের পুরনো। এক বছরে জায়গাটি খানিক পাল্টেছে, অনেকটাই এক রকমের রয়ে গেছে। হয় তো সবকিছু না মিলতেও পারে।
চরিত্রেরা সব্বাই কাল্পনিক। কেবল জায়গাটি বাস্তব।


দিল্লি থেকে ব্যান্ডেল যাত্রাটা, সময়বিশেষে, ঠিক রাজধানী এক্সপ্রেসে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবার মতন সাধারণ থাকে না। দুটো জায়গা এতটাই দু’রকম, মনে হয়, টাইম ট্র্যাভেল করছি। একটা যুগ থেকে আরেকটা যুগে। একটা শতাব্দী থেকে আরেকটা শতাব্দীতে চলেছি। সেই যেখানে সময় এগোয় না, থেমে থাকে, কখনও ক্কচিৎ দুটো একটা পরিবর্তন চোখে পড়ে কি পড়ে না। জীবন গিয়াছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার। সেই পঁচানব্বই সালে ছেড়ে যাওয়া, আর ফিরে আসা হয় নি, হবেও না নিকট ভবিষ্যতে, তবু যেভাবে ছেড়ে গেছিলাম, জায়গাটা সেভাবেই রয়ে গেছে। রয়ে যায়। অনেকদিন বাদে বাদে কিছু চেনা-আধচেনা মুখ দেখলে চমকে যেতে হয়, এরা তো আমার থেকেও ছোট ছিল, জীবনের কী প্রচণ্ড তাপে এদের মুখচোখনাকহাত এই রকম বুড়িয়ে গেল? গাল ভাঙা, দীর্ঘসময়ের অযত্নলালিত দাড়ি, সাইকেলের হ্যান্ডেলে অলস ঝুলে থাকা সেই একই রকমের ডোরাকাটা নাইলনের ব্যাগ, তার হ্যান্ডেলদুটো বহুব্যবহারে জীর্ণ, সুতলি বেরিয়ে আসা, শরীর যেন অল্প নুয়ে পড়ছে, মুখ খুললে শোনা যায় সেই আদি ও অকৃত্রিম হুগলির ডায়ালেক্ট, উচ্চগ্রামে কথা বলার অভ্যেস – যা দূর থেকে শুনলে হঠাৎ মনে হয় ঝগড়া লেগেছে বুঝি। এদের মাঝে গিয়ে পড়লে মনে হয়, শুধু এদেরই বুঝি বয়েস বেড়েছে, আমি মানুষটা বুঝি একই রকম আছি। এই লোকগুলোকেই আমি চিনতাম, অনেকদিন আগে, তখন তারা বালক, কিশোর, সদ্যযুবক, গালে দাড়ি গজিয়েছে কি গজায় নি, আজ তারা পূর্ণবয়স্ক, হাতে বিড়ি কি সিগারেট ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে আলোচনা করছে দুর্গাপুজোর ফান্ডিং-এর ব্যাপারে।

রাজধানী এক্সপ্রেস এখন যাওয়া আসা দুদিকেই বর্ধমানে সামান্য স্টপেজ দেয়। ফলে হাওড়া পর্যন্ত উজিয়ে গিয়ে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে উল্টোদিকে ব্যান্ডেলে ফিরে আসার গল্পটা নেই। বর্ধমান স্টেশনে পাশের প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়িয়ে থাকে একটি মেন লাইনের বর্ধমান লোকাল, অলস ভঙ্গিতে ঝিমিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে, অল্পসংখ্যক প্যাসেঞ্জার নিয়ে। টাইম যদিও তার এগারোটা বাইশ, তবু রাজধানী এক্সপ্রেসের এগারোটা কুড়িতে বর্ধমানে আগমনকে সম্মান জানিয়ে সে নির্দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থাকে আরও দশ মিনিট। অবশেষে এগারোটা বত্তিরিশে সে নড়েচড়ে ওঠে, তারপরে পর পর স্টেশন পেরিয়ে স্বচ্ছন্দ গতিতে এগিয়ে চলে ব্যান্ডেলের দিকে।

ব্যান্ডেল পালটায় নি। ব্যান্ডেল পালটায় না। পাল্টেছিল সেই পরিবর্তনের বছরে, নাকি তার এক বছর আগে। সংকীর্ণ রাস্তার দুপাশ থেকে ভাতের হোটেল ইত্যাদি এনক্রোচমেন্ট সরিয়ে রাস্তা চওড়া করা হয়েছিল, এক ধাক্কায় সিটু সমর্থিত অটোরিক্সা ইউনিয়ন রিক্সাচালক সমিতির ব্যানারের রঙ পালটে হয়ে গেছিল আইএনটিটিইউসি। সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দুটি তিনটি পতাকা ফাউ। পরিবর্তনও এখন পুরনো হয়েছে। সেই সব ব্যানারের কোণায় কোণায় এখন জং ধরার ছাপ সুস্পষ্ট। পতাকাতেও তেমন জৌলুশ আর নেই। ব্যান্ডেল জংশনের নতুন স্টেশন বিল্ডিং তৈরি হচ্ছিল দু বছর আগে থেকে, এখনও হচ্ছে। দেখে মনে হল না দু বছরে একটি দুটি বাড়তি ইঁটও যুক্ত হয়েছে। স্টেশনের সাবওয়েতে ঢোকার মুখে যে লোকটি খবরের কাগজ আর সাপ্তাহিক বর্তমান বেচছে, এক সময়ে সেন্ট জনস ইশকুলে সে আমার সঙ্গে পড়ত। এখন তাকে কষ্ট করে চিনতে হয়, আমিও আর তাকে চেনা দিতে চাই না, দুজনকারই অস্বস্তি বাড়বে বই তো কমবে না। জীবন গিয়াছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার।

একটি সাবওয়ে ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে বেরোবার জন্য, আরেকটি সাবওয়ে স্টেশনের অ্যাপ্রোচ রোড থেকে বেরিয়ে ব্যান্ডেল স্টেশন রোড ধরার জন্য। সেটি তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের জন্যই এক বিভীষিকাবিশেষ। একসময়ে বর্ষাকালে কোমর জল জমত। সে সব এখনও জমে, তবে খুব বেশিক্ষণ জল দাঁড়ায় না, কারণ নিচে ড্রেনেজ সিস্টেমটা ঢেলে সাজানো হয়েছে, সে প্রায় অনেক বছর হয়ে গেল, পরিবর্তন তখনও স্বপ্নেও আসে নি। কেবল এই জলনিকাশি ব্যবস্থাকে সচল রাখতে সাবওয়ের ভেতরে মসৃণ রাস্তার বদলে আলগা করে বসানো বিভিন্ন আকারের কংক্রিটের স্ল্যাব, এবড়োখেবড়োভাবে সাজানো। তার নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অন্তঃসলিলা নর্দমা, ওপর দিয়ে নাচতে নাচতে চলে আটোরিক্সা কিংবা এমনি রিক্সা। সাবওয়ে থেকে বেরিয়েই রিক্সাওলাকে সীট থেকে নেমে পড়ে হেঁচড়ে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে যেতে হয় তার রিক্সা, কারণ সামনে খানিকটা রাস্তা বুক সমান উঁচু, সাবওয়েটা অনেকটা নিচে কিনা। রিক্সায় সুটকেস সমেত আসীন আমি অপরাধবোধে ভুগি, অথচ বলেও উঠতে পারি না, আমি কি একটুখানি নেমে যাবো, দু কদম হেঁটে যাবো, তুমি যতক্ষণ রিক্সাটা টেনে নাও সমতল রাস্তার দিকে?

জিটি রোডের ক্রশিং, যাকে আমরা ব্যান্ডেল মোড় বলি, সেখানে এখন লাল সবুজ সিগন্যাল বসেছে। তামাম হুগলি চুঁচুড়ার একমাত্র সিগন্যাল – না, একমাত্র নয়, চুঁচুড়াতে একটা আছে। তা সে সিগন্যাল মানবে-টা কে? ট্রাফিক বলতে তো অগুনতি রিক্সা আর সাইকেল, মাঝেমধ্যে দু একটা মোটরসাইকেল কি প্রাইভেট গাড়ি, হয় তারা বোকার মত লাল আলো দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে অযথা জ্যাম বাড়ায়, নয় তো সাইকেলের ভিড়ে লুকিয়ে টুক করে পেরিয়ে যায় জিটি রোড, প্রস্থে যা নয়ডার যে কোনও মহল্লার গলির থেকেও সরু।

আমি বাড়ি ফিরি। চেনা পরিত্যক্ত পাঁচিলঘেরা জমিতে নতুন “ফ্ল্যাট” উঠতে দেখি আসার পথে, মাদার ডেয়ারি বুথের শুভ্রতা চিরকালের মত হারিয়ে গিয়ে কালচে মৈসে পড়া চেহারা দেখি, ঝোপজঙ্গল আগাছায় ঘিরে ধরা আধাখেঁচড়া বানানো “মুক্তমঞ্চ” আমাকে স্বাগত জানায় তার শ্যাওলা ধরা দেওয়াল মেলে, চল্লিশ বছরের পুরনো চিলড্রেন্স পার্কের বেঁটে পাঁচিলের গা ঘেঁষে ওঠা উজ্জ্বল লাল রঙের ঢাউস সাইনবোর্ড জানায়, সেনকো গোল্ড এখন চুঁচুড়াতেই শোরুম খুলেছে, আর আমার সোনা কিনতে কলকাতা যাবার দরকার নেই।

গেট খুলে দাঁড়ায় আমার বুড়ো হয়ে যাওয়া বাবা, এক সময়ের যত্ন করা বাগানে এখন লকলকিয়ে বাড়ছে কী কী সব যেন গাছ, ছেঁটে সাফ করার কেউ নেই, নাকি ছাঁটবার উৎসাহই নেই, কে জানে, দু পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে আমি আসার খানিক আগে, গাছগুলো সেই জল ধরে রেখেছে এখনও, সুটকেস নিয়ে হেলেদুলে ঢুকতে যেতেই আমার সর্বাঙ্গে ডালপালা বুলিয়ে খানিক ভিজিয়ে দেয় তারা, আমাকে।

আমি বাড়ি ঢুকি।

=============

আলাদা কিছু ছবি নয়, সব মফসসলেরই কমবেশি এক রকমের চেহারা। হুগলি গার্লস স্কুলের সামনে সাগরিকা ফটো স্টুডিও প্রায় জন্মের সময় থেকে দেখে আসছি, তখন সাইনবোর্ডে সবুজ ব্যাকগ্রাউন্ডে উজ্জ্বল সাদা রঙের অক্ষরগুলো আলাদাভাবে চেনা যেত, দীর্ঘ কয়েক দশকের রোদবৃষ্টির নির্মম অত্যাচারে এখন সাদা আর সবুজ আলাদা করে চেনা যায় না, পুরোটাই একটা ফ্যাকাসে নীলচে সাদা ক্যানভাস। ভেতরে অবশ্য নতুন রঙ লেগেছে, কম্পিউটার বসেছে, সেখানে এখন ফটাফট ছবি প্রসেস হয়।

আমাদের মফসসলে ট্যাক্সি চলে না। হলুদ ট্যাক্সি আমরা প্রথম দেখি হাওড়া স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে। তা সেই হলুদ ট্যাক্সিও কখনও সখনও দলছুট হয়ে একটা দুটো চলে আসে আমাদের পাড়ায়, নমাসে ছমাসে একদিন, তখন রীতিমতো ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখতে হয়, ব্যান্ডেলের রাস্তায় কলকাতার ট্যাক্সি একটা দেখার মতই জিনিস বটে। তা সে আমিও দেখলাম। হলুদ নয়, সাদা রঙের ট্যাক্সি, দরজায় নীল রঙে বড় বড় করে লেখা, নো রিফিউজাল। হুগলির দিক থেকে ঢেউখেলানো জিটি রোড ধরে আসছিল, ধীরে ধীরে পালতোলা নৌকোর স্টাইলেই হেলতে দুলতে চলে গেল বাঁশবেড়িয়ার দিকে। কে জানে, কারা বসেছিল ভেতরে। দুদিকে ধূলিধূসরিত দোকানপাট, কাদা আর ভাঙাচোরা কংক্রিটের যুগলবন্দীর মাঝে ট্যাক্সিটাকে একটু বেশিই যেন সাদা লাগছিল। এখানের লোকে তো ট্যাক্সি চড়ে না, এখান দিয়ে ট্যাক্সি যায়ও না। হিথাক তুকে মানাইছে না রে, ইঁক্কেবারে মানাইছে না রে।

শুধু জিটি রোড নয়, ভেতরের সমস্ত রাস্তাঘাটগুলোই কমবেশি এক অবস্থা, কোথাও একটু ভালো, কোথাও অল্প ভাঙাচোরা তো কোথাও পুরোটাই খোয়া-ইঁট বের করা দাঁত খিঁচনো। উঠতি বয়েসে আমি এই তল্লাটের অন্যতম কাপ্তেন ছিলাম, তার একটা কারণ যদি হয় আমার প্রচুর মেয়েবন্ধু ছিল, তো অন্যতম কারণটি ছিল আমার সাইকেল। হীরো রেঞ্জার, ঝকঝকে নীল রঙের। হীরো রেঞ্জার আরও দু একটা ছিল বটে সে তল্লাটে, কিন্তু অমন নীল রঙের সাইকেলটি আর দ্বিতীয় কারুর ছিল না। আমার বহু সকাল, বহু বিকেল, বহু অভিসার, কিছু প্রত্যাখ্যানের সাক্ষী ছিল সে সাইকেল। কালের নিয়মেই সে সাইকেল সেরদরে বেচে দেওয়া হয়েছে, কারণ আমি ছাড়া সোজা-হ্যান্ডেলের ঐ সাইকেল আর কেউ চালাতে পারত না। আর কেউ বলতে, বাবা। উনিশশো পঁচানব্বইতে আমি হুগলি থেকে চলে যাবার পর বেশ কয়েক বছর সিঁড়ির তলায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছিল, তার পরে বেচে দেওয়া হয়েছিল। রয়ে গেছে তারও আগে কেনা দিদির অ্যাভন লেডিজ সাইকেলটা। এককালে লাল রঙের ছিল, এখন আর কোনও রঙ নেই। ওটাই বাবা ইউজ করে, সকালে বাজার যেতে আসতে। আর আমি এলে, আমি চালাই একটু আধটু। বহু সারাই হবার পরে এখন ওটা সারাইয়ের আয়ত্ত্বের বাইরে চলে গেছে। প্যাডেল করলে চেনগার্ডের সাথে ঘষা খেয়ে ট্যাঙোস ট্যাঙোস আওয়াজ বেরোয়, বাঁ হাতের ব্রেক চাপার সাথে সাথে মাটিতেও পা ঘষতে হয়, নইলে ব্রেক পুরো কাজ করে না, ইত্যাকার ছোটখাটো সমস্যা বাদ দিলে সাইকেলটা মন্দ চলছে না।

এখন আর আমার সে কৈশোর নেই, সে যৈবনও নেই, হীরো রেঞ্জারও নেই, অতএব, দিদির সেই পুরনো লেডিজ সাইকেল চেপেই বেরিয়ে পড়লাম হারানো রাজ্যপাট ফিরে দেখতে। কিন্তু দেখব কি, রাস্তাই তো নেই। দেবীপার্ক থেকে চকবাজার অবধি পুরোপুরি ভাঙা। দু একটা গর্ত যদি বা হ্যান্ডেল এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ডজ করে এড়িয়ে যাওয়া যায়, বাকিটা তো পুরোটাই গর্ত। এড়িয়ে কোথায় যাবে? … একই অবস্থা পাঙ্খাটুলি থেকে পিপুলপাতি পর্যন্ত রাস্তা। ডানদিকে নন্দীপাড়ার রাস্তা ঢুকে গেছে আগের মতই, আমার আর যেতে সাহস হয় না। মেন রাস্তার অবস্থাই যদি এই হয়, ভেতরের রাস্তার কী অবস্থা হবে কে জানে।

ঐ গলির ভেতরেই, কারবালা মোড়ের কাছে ছিল নীলুদের বাড়ি। নীলাঞ্জনা। ছোট্টখাট্টো চেহারার মিষ্টি হাশিখুশি মেয়েটি। তার হাতের আঁকা কথা বলত। তার কথা লিখেছিলাম এক সময়ে, ভাঙা-প্রেম টইতে। নীলু অনেকদিন শুনেছি বিয়ে হয়ে টালিগঞ্জে থাকে। কী লাভ আর ওই রাস্তায় গিয়ে? আমার কিশোরবেলা তো আর ফিরে আসবে না।

চুঁচুড়াকে আমরা বলি চুঁচড়ো। কথ্যভাষায় “চুঁজড়ো”। যাবার মুখে হসপিটাল রোডে অরো সিনেমাহলটি আর নেই। নাকি ভেঙেচুরে সেখানে শপিং কমপ্লেক্স হবে। তা, ভাঙাচোরার কাজটা শেষ হয়ে গিয়েছে প্রায় বছর চারেক হল, পরের কাজটা এখনও শুরু করা যায় নি। এক চিলতে ফাঁকা জমি দেখে এখন আর নস্টালজিয়া জাগে না। এইখানেই প্রথম দেখেছিলাম বাজীগর। কাজলের জোড়া ভ্রূ-র সম্মোহনে একটা শিরশিরানি জেগেছিল, কিন্তু সে শিরশিরানি ডুবে গেছিল শিল্পা শেট্টির শরীরের ভাঁজে। হার্টবীট বেড়ে গেছিল “কিতাবেঁ বহোত সি পড়ি হোগি তুমনে” দেখে। এখন বুঝি, শিল্পা নয়, হার্টবীট আসলে বেড়েছিল আশা ভোঁসলের কণ্ঠমাধুর্যে, প্রতিটা লাইনের শেষে সেই যে শব্দ করে শ্বাস নেবার আওয়াজটা …

তো, চুঁজড়ো পাল্টেছে। পুরনো কাদা প্যাচপ্যাচে বাসস্ট্যান্ড পালটে এখন পাকা বাসস্ট্যান্ড হয়েছে। মিনিবাসের জন্য একটা দিক, বড় দূরপাল্লার বাসের জন্য আরেকটা দিক। মধ্যে সেনকো গোল্ড, খাদিমের শোরুম, আর ব্যাঙ্কের এটিএমেরা, সারি সারি। নেহাতই কিছু কংক্রিটের স্ট্রাকচার। সৌন্দর্য বাড়ে নি। বিনীত নামক জামাকাপড়ের দোকানটা এখনও আছে, খুবই ধুলো মেখে বিবর্ণ হয়ে, কেসটা কী বুঝি নি, এদিকে আখনবাজারের দিকে একটা পেল্লায় ঝাঁচকচকে সিকিওরিটি বসানো দোতলা দোকান হয়েছে, তার নাম বিনীত শপিং সিটি। দোকান আলাদা হয়ে গেছে নাকি ওই দোকানটাই এখানে উঠে এসেছে, কে জানে! ঢুকেছিলাম ভেতরে। ভালো ভালো জামাকাপড়ের কালেকশন রয়েছে, অপছন্দ হবার মত নয় কিছু। আর? আর … ঘড়ির মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল বসেছে, দুটি পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিঠ ঘাড় চুলকোয়, যানবাহন যে যার মত ঠিকই বয়ে যায়। ওখানে কস্মিনকালেও ট্র্যাফিক জ্যাম হয় নি, হবেও না। খরুয়াবাজার একই রকমের সংকীর্ণ, এখন ওটা ওয়ান ওয়ে করে দিয়েছে। দোকানপাট সব যেন রাস্তার ওপর উঠে পড়েছে, হাত দিয়ে মাপলে বোধ হয় পাঁচ কি ছ হাত চওড়া হবে ওখানকার রাস্তা। কোনওরকমের একটা মিনিবাস চলে যায়। ওভারটেকিং সম্ভব নয়।

সেই একই দোকানেরা। বসকো শাড়ি প্যালেস, বাটার শোরুম, রেনবো টেলার্স, আর যারা যারা ছিল, তারাই আছে, ভেতরে কিছু বুড়ো বুড়ো মানুষ বসে, নয় তো তাদের পরের প্রজন্মের ছেলেবউরা। ধুলোপড়া দোকানঘর, রংচটা বিবর্ণ সন্তোষ রেডিওর প্যাকেটও যেন একসারি দেখলাম একটা দোকানে। কেউ কেউ সেই যুগেও দোকানের বাইরে ম্যানিকিন লাগিয়েছিল। গত কুড়ি বছরে তারা শাড়ি বদলায় নি। এখনও তাদের পরনে বিগত শতকের হলুদ শাড়ি, তাতে নিশ্চিন্তে বাসা বেঁধেছে মাকড়সার পরিবার।

বেরিয়ে এলাম চুঁচড়ো কোর্টের পেছনের দিকটায়। প্রেমনগরের মাঠ, রবীন্দ্রভবন, হুগলি কলেজিয়েট স্কুল, মহসীন কলেজ। হ্যাঁ, রাস্তা বটে এখানে। সিঁদুর পড়লে কুড়িয়ে নেওয়া যায়, এত সুন্দর। এটাই হুগলির অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এলাকা, জেলাশাসকের অফিস, পুলিশ সুপারের অফিস, বর্ধমান ডিভিশনের মুখ্য কমিশনারের বাসস্থান ও অফিস, লঞ্চঘাট, মুখ্য ডাকঘর, এবং বিশাল বিশাল মাঠ। একটা মাঠে দেখলাম হস্তশিল্প মেলা হচ্ছে। লালদিঘীতে এখনও বাচ্চারা দাপাচ্ছে। প্রেমনগরের মাঠ বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে – কী নাকি “উন্নয়নের কাজ” চলছে।

লঞ্চঘাটের কাছেই ডাফ ইশকুল। এই স্কুলের ছাত্রদেরই অতিপাকামি বাংলা ভোক্যাবুলারিতে অমর হয়ে আছে “ডেঁপো” ছেলে বলে। আমরা যখন প্রথম হুগলিতে আসি, ডাফ স্কুলের লিস্টিতে এক নম্বরে আমার নাম এসেছিল। কিন্তু সেন্ট জনসে চান্স পেয়ে যাওয়ায় ও সেটি বাড়ির কাছে হওয়ায় আমার আর ডেঁপো ছেলে হয়ে ওঠা হয় নি। ফিরে আসি গঙ্গার ধারের রাস্তা ধরে। এইবারে বেশ ঘন ঘন চোখে পড়ে ত্রিফলা আলো। উদ্ধত হ্যালোজেনের দুপাশে নিষ্প্রভ ত্রিফলা। কোনও দরকার নেই, তবুও তারা জ্বলছে, পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে। জোড়াঘাট। ছোট একতলা সাদা বাড়িটিতে একসময়ে বঙ্কিমচন্দ্র থাকতেন, যখন তিনি মহসীন কলেজে অধ্যাপনা করতেন। এই বাড়িতে বসেই তিনি আনন্দমঠের একাংশ এবং বন্দেমাতরম গানটি রচনা করেন। তার ঠিক পাশেই কালিকানন্দ অবধূতের আশ্রম। আশ্রমটি এখন কারও বাড়ি হয়ে গেছে। মূল কাঠামোটা একই আছে, আর বাইরে শ্বেতপাথরের ফলকে “মরুতীর্থ হিংলাজ”, “উদ্ধারণপুরের ঘাট”, আর “কালিকানন্দ অবধূত” – এই শব্দগুলো এখনও পড়া যায়। এইখানেই কাছাকাছি কোথাও থাকতেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিশোর রবি তখন গান লিখে হাত মকশো করছেন। একদিন, মাঘোৎসব উপলক্ষ্যে কয়েকটি গান লিখে এনে তিনি বাবাঠাকুরকে দেখালেন। তার মধ্যে একটি গান ছিল, নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছো নয়নে নয়নে। বাবাঠাকুর দেবেন্দ্রনাথ গানগুলি পড়ে কিশোর রবিকে পাঁচশো টাকা উপহার দিয়েছিলেন। এ গল্প আজ সব্বাই জানে। এখন শুধু আধভাঙা সাইকেল নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়ল বিক্রম সিং-কে।

গঙ্গার পাড়ের সৌন্দর্যায়ন চলছে। রাসমণি ঘাটের সংস্কার করা হয়েছে। রাসমণি, শুধু কলকাতার রাণী ছিলেন না, এ তল্লাটের ধীবর সম্প্রদায়ের হৃদয়ের রাণী ছিলেন। ইংরেজ শাসক তখন গঙ্গায় মাছ ধরার জন্য খাজনা নিত গরীব জেলেদের কাছ থেকে। নিরুপায় জেলের দল কেঁদে পড়েছিল রাণীমার পায়ে। রাণী রাসমণি চুঁচুড়া থেকে ত্রিবেণী পর্যন্ত গঙ্গানদী ইজারা নিয়েছিলেন নিজের খরচে। তার পর থেকে এ তল্লাটে জেলেরা মাছ ধরত বিনা পয়সায়। তাদেরই ভালোবাসার দানে গড়া শতাব্দীপ্রাচীন এই ঘাট। এর পরে ময়ূরপঙ্খী ঘাট, জগন্নাথ ঘাট। এখানে কোথায় যেন থাকতেন কানন দেবী।

যা বলছিলাম। সৌন্দর্যায়ন চলছে। গঙ্গার পাড় ধরে সমস্ত ঘাট সংস্কার করা হয়েছে, রঙ করা হয়েছে, ছোট ছোট পার্ক বানানো হয়েছে, জায়গায় জায়গায় প্রায় জীবন্ত জন্তুজানোয়ারের মূর্তি বসানো হয়েছে। বাঘ, হরিণ, হাতি, বাঁদর, গণ্ডার। আর রাস্তা ধরে বসেছে ত্রিফলা আলো। এমপিল্যাডের টাকা থেকে। হুগলির সাংসদ, রত্না দে নাগের উদ্যোগে। গঙ্গার ধার ধরে রাস্তাটিও মন্দ নয়।

বাবুঘাটের শ্মশানঘাট। মল্লিকদের গ্যাসের দোকান, আসলে ইন্ডেন গ্যাসের এজেন্সি। তার পাশেই আর্য লাইব্রেরি, বাড়িতে লুকিয়ে এখানকার মেম্বার হয়েছিলাম আমি, পাঁচ টাকা বাৎসরিক মেম্বারশিপ দিয়ে। বাংলা অনুবাদে জেমস হ্যাডলি চেজ, জেমস বন্ড পড়ে সেই আমার প্রথম বড় হবার হাতেখড়ি। সেই আর্য লাইব্রেরির ফলকটি আজও আছে, উনবিংশ শতকের আদলে তৈরি একতলা বাড়িটিও আছে, তবে দরজা দেখলাম বন্ধ। হয় তো, সন্ধ্যে হয়ে গেছিল বলে বন্ধ হয়ে গেছে।

এর পরেই হুগলি জেল। জেলের সামনে বেশ এক্টুখানি খোলা চত্বর। তারপরে জমি ঢালু হয়ে নেমে গেছে গঙ্গার বুকে। এইখানেই আমি সাঁতার কেটেছি দিনের পর দিন। এখন মনে হল কেউ নামে না আর। পুরো ঢালটাই লম্বা লম্বা ঘাস ও অন্যান্য আগাছায় ভর্তি। জেলের সামনের চত্বরে কাজী নজরুল ইসলামের মূর্তি এখনও একই রকমের বিষণ্ণ, একলা। বাবার কাছে শুনলাম, এখন নাকি হুগলি জেলের সামনে ফুল উর্দি পরে জেলার সাহেব প্রতিদিন ব্যান্ডবাদ্য সহযোগে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেলামীসমেত সকালবেলায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

সামনেই রেলের ওভারব্রিজ। হুগলি ব্রিজের শুরু। আসলে জুবিলি ব্রিজ। ব্যান্ডেল নৈহাটি কানেক্টর। সেই আঠেরশো কত সালে যেন তৈরি, এখনও ট্রেন থেকে দেখা যায় ব্রিজের গায়ে বড় বড় পাতে লেখা ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানি রেলওয়েজ, ১৮৮৭। সেই ব্রিজ এমনিতেই বিপজ্জনক ঘোষিত হয়েছে অনেকদিন, তবু তার ওপর দিয়েই ট্রেন যায়, আসে, ঘন্টায় আট কিলোমিটার বেগে। এর পাশেই নতুন ব্রিজ বানানোর কাজ শুরু হয়েছিল প্রায় চার পাঁচ বছর আগে। খানিকটা হবার পরে থেমে যায়, কারণ নিন্দুকে বলে তৃণমূলের রেলমন্ত্রী (নাম গেস করার জন্য নকুলদানা নেই) দেড় কোটি টাকা মতন কাটমানি দাবি করে গ্যামন ইন্ডিয়ার কাছ থেকে – ব্রিজ তৈরি করার বরাত পাইয়ে দেবার জন্য। গ্যামন রাজি না হওয়ায় কাজ থেমে যায়। রেলমন্ত্রক তৃণমূলের কব্জা থেকে মুক্ত হবার পরে আবার নতুন করে টেন্ডার করা হয়, বর্ধিত খরচাপাতির হিসেব অ্যাপ্রুভ হবার পরে আবার নতুন করে শুরু হয়েছে কাজ। এইবারে গিয়ে দেখে এলাম, হইহই করে চলছে কর্মযজ্ঞ। নতুন হুগলি ব্রিজ বোধ হয় এবার বানানো হবে। একশো তিরিশ বছরের পুরনো ব্রিজ অবশেষে হয় তো মুক্তি পাবে।

গঙ্গার পাড়ের সৌন্দর্যায়ন এইখানেই শেষ। এর পরেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ইমামবাড়ার পাঁচিল ও তৎসংলগ্ন বাসিন্দাদের ঘেটো। তুমুল নোংরা, অপরিষ্কার, অস্বাস্থ্যকর। রাস্তাটিও পাল্লা দিয়ে ততোধিক ভাঙাচোরা। ইমামবাড়ার রক্ষণাবেক্ষণ বোধ হয় এমপিল্যডের টাকায় হয় না, অথবা এখনও কোনও পরিকল্পনা নেওয়া হয় নি এ ব্যাপারে। প্রাচীনকালের হলদেটে রঙ ছাপিয়ে এখন তার সর্বাঙ্গে মৈসে পড়ে আছে।

এর পর নোংরাই নোংরা। ইমামবাড়ার পরেই জেলাশাসকের বাংলো। ভেতরটা একই রকমের কেয়ারি করা বাগান দিয়ে সাজানো, বাইরে এবড়োখেবড়ো ভাঙাচোরা রাস্তা, আর চারদিক আমোদিত হচ্ছে মাছের গন্ধে। হ্যাঁ, এর পেছনেই, হুগলি ব্র্যাঞ্চ স্কুলের পেছনদিকটায় আজও সকালে মাছ নিলাম হয়। ভোরবেলায় অন্ধ্র তামিলনাড়ু থেকে ট্রাকে করে মাছ আসে। দশটার মধ্যে নিলাম হয়ে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে যায়।

জেলাশাসকের বাংলো আর ব্র্যাঞ্চ ইশকুলের খেলার মাঠ, পাশাপাশি, এরই ঠিক উল্টোদিকে একটা বাড়ি ছিল, যেখানে বসে নজরুল ধূমকেতু পত্রিকার পাতা ডিজাইন করতেন। অসুস্থ বিদ্রোহী কবিকে দেখতে এসে এখানে আড্ডা জমিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই বাড়িটা আর খুঁজে পেলাম না। ঘুরে এলাম স্কুলটার সামনের গেটের দিকে, যেটা বাজারের মধ্যে। ভাঙা রাস্তা, ইতস্তত ছড়ানো পচা সবজি, ছেঁড়া কলাপাতা, মাছের আঁশ, তার মধ্যে দিয়ে মাথা তুলে রয়েছে হুগলি ব্র্যাঞ্চ গভর্নমেন্ট হাইস্কুল, তোরণে লেখা – এস্ট্যাবলিশড, ১৮৩৪।

দু বছর পড়েছি এই স্কুলে, প্রতিষ্ঠার সালটা কখনও খেয়াল করি নি, খালি জানতাম, এটা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের টাকায় তৈরি।

ময়ূরপঙ্খী ঘাট। এর উল্টোদিকেই কোনও এক বাড়িতে থাকতেন কানন দেবী। এখন তার কোনও স্মৃতিচিহ্ন নেই।


ঘাট সংলগ্ন পার্ক, গঙ্গার ধারে।


রাণী রাসমণি ঘাট।


জোড়াঘাট। বন্দেমাতরম বাড়ি। এর বাঁ পাশেই অবধূতের আশ্রম। সেটা এখন লোকের বাসস্থান, তাই আর ছবি তুলি নি।


বঙ্কিমচন্দ্র এই বাড়িতে থাকতেন এক সময়ে।


এই বাড়িতে বসেই তিনি আনন্দমঠ আর বন্দেমাতরম রচনা করেছিলেন।


এইখানে গঙ্গায় আমরা সাঁতার কাটতাম। হুগলী জেলের সামনে।


পুরনো হুগলী ব্রিজের (জুবিলী ব্রিজ) গা ঘেঁষে তৈরি হচ্ছে নতুন হুগলি ব্রিজ। ব্যান্ডেল নৈহাটি কানেক্টর।

==========================

আমি যখন সদ্য জন্মেছি, বাবা ছিল বাম সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। আমি তখন সদ্য কথা বলতে শিখেছি, জেনেছি বাবা অফিসে “সমিতি” করে। সমিতি কী জিনিস আমি জানি না, কেবল জানি সমিতি শব্দটা আমার নামের সঙ্গে অনেকটাই মেলে। আমার নামের উচ্চারণের কাছাকাছি। ভালোবেসে ফেলেছিলাম “সমিতি” শব্দটাকে। আর ভালোবাসব না-ই বা কেন? বাবা যে মাঝে মাঝেই আমাকে নিয়ে যেত স্কুটারে করে, সমিতির অনুষ্ঠানে, সেখানে বাবার কোলে চেপে থাকতাম আমি, আর বাবা গণসঙ্গীতে গলা মেলাত, এসো মুক্ত করো – মুক্ত করো, অন্ধকারের এই দ্বার, কারা মোর ঘর ভেঙেছে স্মরণ আছে, সাথীদের খুনে রাঙা পথে দ্যাখো হায়নার আনাগোণা, জন হেনরি, কাল রাতে জো হিল তোমায় স্বপ্নে দেখেছি, সব যুদ্ধ থেমে যাবে এক দিন। আমার কাছে সমিতি মানে ছিল একগুচ্ছ গানের অনুষ্ঠান।

আমরা তখন থাকতাম বর্ধমানে। নতুন পল্লীতে। কার্জন গেটের ওপাশে বাণীপিঠ ইশকুলে পড়তাম, কেজি টু। বাবা স্কুটারে করে দিয়ে আসত, আবার নিতে যেত। সদ্য উত্তমকুমার মারা গেছেন, সিনেমা হল-এ মায়ের সাথে গিয়ে দেখেছিলাম ওগো বধূ সুন্দরী। তারপরে দীর্ঘদিন আমি গুণগুণিয়েছি “আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ট ভদ্রলোক”। কাছাকাছি সময়েই দেখেছিলাম হীরক রাজার দেশে। তখন সবে প্রথম ভাগ শেষ করেছি, যুক্তাক্ষর শিখি নি। হল-এ গিয়ে বড় স্ক্রিনে স্যুটিং শার্টিং-এর বিজ্ঞাপনের ওপরে বড় বড় অক্ষরে “স্ট্যানরোজ” লেখা দেখে আমি হল কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, “সটানরোজ”। আশেপাশের লোক হো-হো করে হেসে উঠেছিল, মনে আছে। হেসে ফেলেছিল বাবা-মাও। সেদিন সন্ধ্যেবেলায় আমি বর্ণপরিচয় দ্বিতীয় ভাগ হাতে পাই।

তো, এসব নেহাতই অপ্রাসঙ্গিক, কথার কথা। যেটা বলার ছিল, সব যুদ্ধ তো থামেই নি, জীবনের যুদ্ধে চলতে চলতে বাবা খুব শিগগিরই অ্যাকটিভ পলিটিক্স থেকে সরে এসেছিল, এবং ২০০৮ সাল নাগাদ বাবা তীব্র অ্যান্টি সিপিয়েম হয়ে যায়, এবং, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে, পরিবর্তনপন্থী। তৃণমূল হুগলি-চুঁচুড়া মিউনিসিপ্যালিটির বোর্ড দখল করার পরে পাড়ায় পাড়ায় মাংস ভাত খাইয়েছিল, বাবা-মাও নিমন্ত্রিত হয়েছিল ব্যান্ডেলের আনন্দ ভবনে। গেছিল।

এখন, এ-কথা সে-কথার মাঝে বাবা সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে বসে, এবং অচিরাৎ আমি আবিষ্কার করি, বাবা এখনও হীরকরানীর অন্ধ ভক্ত। তৃণমূলকে খোঁচানো খবরের কাগজ এবং নিউজ চ্যানেলগুলোর ওপর রাম-খচা – “আরে বাবা, সেই কবে থেকে শুনে আসছি এখন কান টানা হচ্ছে, খুব তাড়াতাড়িই মাথা পাকড়াও করা হবে, আর কতদিনে তোরা মাথা পাকড়াও করবি রে বাবা? যে নেই দুর্নীতিতে, তাকে ফাঁসাবার জন্যেই তো তোদের লাগানো হয়েছে, জানি না নাকি? যে মাথা খুঁজছিস, সে মাথা তোরা কোনওদিনও পাবি না। হুঁঃ, সিবিআইকে চিনতে বাকি আছে নাকি আমার? সিবিআই কি ধোয়া তুলসীপাতা?”

চুপ করে থাকি। সত্যিই, সিবিআই তো ধোয়া তুলসীপাতা নয়। তবু তর্কের খাতিরে কিছু ক্লিশে তর্ক চালাই – কিন্তু ওই ছবি বিক্রির টাকা? এমনিতে তো এক পয়সা দামেও কেউ ওই ছবি কিনত না। কে কিনল, কোথায় গেল অত টাকা? সেইসব ছবিই বা কোথায়?

উত্তর আসে, যে-ই কিনুক, তুই আমি তো ছবি বুঝি না, যে তার দাম বুঝেছে, সে কিনেছে। সে তো হুসেনের ছবির দামও তোর আমার কাছে এক পয়সাও নয়, তাই বলে কি হুসেনের ছবির দাম ওঠে না?

হ্যাঁ, তা ওঠে বটে। হুসেনের ছবিরও মাথামুণ্ডু আমি বুঝি না, সেটাও ঠিক। আমি ছবি বলতে বুঝি বিমল দাস আর সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়। তা সেগুলো কোটি টাকায় বিক্রি হয় না।

কথায় কথায় গঙ্গার পাড়ের সৌন্দর্যায়নের প্রসঙ্গ উঠল। বাবা বলল, “হুঁ, রত্নাদি এই একাটা ভালো কাজ করছে। এমপিল্যাডের টাকা দিয়ে গঙ্গার ধারটাকে ঢেলে সাজাচ্ছে।”

এমনি আশকথা পাশকথা। আমি অর্ধেক শুনি, অর্ধেক শুনি না।

তার পরের দিনই। বাবা বাজারে গেছিল, আমি ঘরে বসে চ্যানেল সার্ফ করছি। নিউজ চ্যানেল আর গানের চ্যানেল ছাড়া আমি তো আর কিছুই দেখি না, তো বাবা ঢোকার মুখে আমি দু সেকেন্ডের জন্য জি নিউজটা খুলে তারপরে পরের চ্যানেলে চলে গেছি, তার মধ্যেই জি নিউজে হেডলাইনের এক টুকরো কানে এসেছে – “ইউপি মে লাভ জিহাদ কে মামলে মে এক লড়কী কো …” একই বিরক্তিকর টপিক নিয়ে ভ্যানতাড়া পছন্দ হয় নি বলে বাকিটুকু না শুনেই চ্যানেল ঘুরিয়ে দিয়েছি, থলি হাতে বাবা ঢুকল তখন। থলিটাকে রেখে মাথা নেড়ে বলল, “এই লাভ জিহাদের ব্যাপারটা, বুঝলি, এখানেও টুকটাক শুরু হয়েছে। চুঁচড়োতেই গত মাসে দুটো ঘটনা জানা গেছে, মুসলমান মেয়ে হিন্দুঘরের ছেলের সাথে ইলোপ করেছে।”

প্রসঙ্গ কোনদিকে যেতে চলেছে বুঝতে পেরে আমি খুব নিস্পৃহভাবে উত্তর দিলাম, “তো? সমস্যাটা কী হয়েছে?”

“না, সমস্যা আর কী হবে, এইভাবেই ওরা আবার সংখ্যায় বাড়ার চেষ্টা করছে, এইসব ব্যাপারগুলো এখানে খুব বেড়ে গেছে। আগে এতটা হত না।”

“তো হোক না!” আমি আবারও নিস্পৃহ। “হিন্দু মুসলমানের বিয়ে তো খুব আনকমন ব্যাপার কিছু নয়। এর আগেও অনেক হয়েছে, এখনও হচ্ছে। দুজন মানুষ পরস্পরকে ভালোবেসেছে। জোর করে তো তুলে নিয়ে যায় নি। এতে এত আপত্তির কী আছে?”

“না, কোনওকিছুতেই তো আপত্তি নেই। তা হলে আমরাও পালটা ধর্মান্তরকরণ শুরু করি, ওদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে করা শুরু করি, তাতেও সমস্যার কিছু থাকবে না …”

আমি মিটিমিটি হাসি, “তাই? পারবে? হিন্দুধর্মের অত ধক আছে তো? মুসলমান ছেলেমেয়ে বিয়ে করে নিজের ধর্মে আনার? … শোনো, অত চিন্তা করার কিছু নেই, এই সব লাভ জিহাদ টিহাদ টোটাল ফালতু প্রোপাগান্ডা, এসবে নাচার কোনও কারণ নেই” বলে চাড্ডিদের চাড্ডিবাজি বিষয়ে অল্প জ্ঞানদান করলাম।

করলাম বটে, তবে মন থেকে ভয়টা গেল না। গেরুয়া রঙ তা হলে এই মফসসলেও ছেয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। কেউ বাকি থাকবে না। কেউ না।

========================

আমার এক নিকটাত্মীয়, ডানলপে চাকরি করতেন এক সময়ে। দীর্ঘকাল চাকরিহীন ছিলেন। সন্তানকে বড় করতে গিয়ে বেপরোয়াভাবে কিছুদিন ইনভেস্টমেন্ট বন্ড, কিছুদিন এলআইসি, কিছুদিন অন্যান্য কিছু করেছেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন গ্রামের মেয়ে, পদবী হালদার হওয়ায় ভাবী শ্বশুর তাঁকে মেনে নিতে পারেন নি, বাউন বাড়িতে জেলে বউ?  তা সেই জেলে বউ বিপদের দিনে একে তাকে ধরে শাড়ির বিজনেস শুরু করলেন। এই শান্তিপুর দৌড়চ্ছে্ন তো ওই বড়বাজার যাচ্ছেন, অক্লান্ত অপরিসীম খেটে, সাথে সংসার সামলে, মেয়েকে বড় করেছেন। এখন আর সেই অর্থে সংসারে অসাচ্ছল্য কিছু নেই, কিন্তু দুর্দিনে শুরু করা নিজেদের ব্যবসা ছাড়েন নি কেউই। স্ত্রী আজও শাড়ির বিজনেস করেন। আমার আত্মীয় এখনও এই ওই তাই চেষ্টা করে যান। শরীর ভেঙে গেছে।

তো, এই ওই তাই চেষ্টার মধ্যে একটি চেষ্টা হয়েছিল চিট ফান্ডের এজেন্সি। সংস্থাটির নাম ভিবজিওর। অনেকেই হয় তো নাম শুনেছেন। এইবারে তাঁর অনুরোধে বাবা সেখানে কিছু টাকা রাখে। এগারো হাজার মতন। রিটায়ার্ড মানুষের কাছে অনেকখানি টাকা। কথা ছিল এক বছরে টাকা দেড়গুণ বেড়ে যাবে। নির্ধারিত সময়ে ফলো আপ করতে গিয়ে দেখা গেল তাদের ঠিক সময়ে টাকা ফেরত দেবার, ঠিক মন নেই। অফিসঘর অবিশ্যি তখনও খোলা ছিল। কনসার্নড পার্সন ফোন করলে ফোন তুলছেন, এবং, আজ দেব, কাল ঠিক পেয়ে যাবেন, ইত্যাদি করে ঘোরাচ্ছেন।

তখন ২০১৩ সাল, সদ্য সারদা বার্স্ট করেছে। সুদীপ্ত সেন জেলে এবং চিটফান্ড সম্বন্ধে সবাই যে যার মত করে জানছে। চার পাঁচবার ফলোআপ করবার পরে বাবা আর রিস্ক না নিয়ে সোজা চুঁচুড়া থানায় গিয়ে একটা এফআইআর করে। ওসি বাবাকে আশ্বস্ত করেন, চিন্তা নেই, আপনি বাড়ি যান, টাকা আপনি ঘরে বসে ফেরত পাবেন। বাবা বাড়ি পৌঁছতে না পৌঁছতেই সেই ভিবজিওরের কর্তার ফোন, আপনি পুলিশের কাছে কেন এফআইআর কেন করতে গেলেন? আমি তো আপনাকে টাকা ফেরত দিয়েই দিতাম। এক কাজ করুন, আপনি কাল আমাদের অফিসে চলে আসুন, একটা ফোন করে আসুন, আর আসার আগে প্লিজ এফআইআরটাকে উইথড্র করে আসুন, আপনার টাকা হাতে হাতে ফেরত দিয়ে দেব। বাবা ফোনেই জানায়, এফআইআর তুলে নেবার প্রশ্নই নেই টাকা পাবার আগে। আগে টাকা দেওয়া হবে এক হাতে, অন্য হাতে এফআইআর তোলা হবে। চাইলে ট্রানজ্যাকশনটা থানায় বসেও হতে পারে।

“ঠিক আছে, আমি আপনাকে পরে ভেবে ফোন করছি” বলে লাইন কেটে দেন সেই ব্যক্তি।

তিন দিন কাটার পরে বাবা আবার থানায় গিয়ে জানায় পুরো ঘটনা। ওসি বলেন, “আচ্ছা? এই ব্যাপার? দাঁড়ান, টাকা ওর বাবা দেবে” বলে দুটি পুলিশকে পাঠান সেই লোকটিকে “তুলে আনার” জন্য। লোকটি থানায় উপস্থিত হলে ওসি বাবার সামনেই তাকে খুব কষে গালাগাল করে এবং জানায় টাকা না দিলে সে থানা থেকে বেরোতে পারবে না। যাকে খুশি সে ফোন করুক, হয় টাকা দেবে নয় জেলে যাবে আজই।

অতঃপর সে তার লোককে ফোন করে এবং এক ঘণ্টা বাদে আরেকটি লোক থানায় হাজির হয় টাকা নিয়ে। না, দেড়গুণ নয়, শুধু মূলধনটুকু নিয়ে। এগারো হাজার। বাবা তাতেই খুশি। পাঁচশো টাকার নোটের বান্ডিল গুণে নিতে গিয়ে দ্যাখে ভেতরে দুটো জাল নোট। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে জাল। শেষমেশ লোকটি তার নিজের পকেট থেকে এক হাজার টাকা বের করে ওই জাল নোট রিপ্লেস করে নেয়, এর পর বাবা এফআইআর উইথড্র করে নেয়। জাল টাকা গছাবার অপরাধে পুলিশ লোকটাকে ওইখানেই গ্রেফতার করতেই পারত। করে নি। কোথাও একটা কিছু ইকোয়েশন কাজ করছিল নিশ্চয়ই।

পুরো এপিসোডটায় আমি কাছে ছিলাম না, ফোনে ফোনে জেনেছি। এর পর আমি বাবাকে বলি, ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট বা রেকারিং ডিপোজিট ছাড়া যেন আর কোথাও টাকা না রাখে।

এর পরে বাবা আর ওইসবে টাকা ইনভেস্ট করার সাহস করে নি।

এইবারে চুঁচুড়ার রাস্তায় চক্কর কাটতে কাটতে দেখলাম এক অদ্ভূত বিজ্ঞাপন। ৫০ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করুন, বাকীটা আমরা দেব। সঙ্গে একটা ফোন নম্বর। খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে, এটি আরেকটি জোচ্চুরির টিপ অফ দা আইসবার্গ হতে চলেছে। হুগলির এসপির বাংলো, অফিসের আশেপাশের ল্যাম্পপোস্টে দেওয়ালে মারা হয়েছে এইসব বিজ্ঞাপন। পুলিশ কি কিছুই দেখে না? কেউ অভিযোগ না করা পর্যন্ত পুলিশ কি কোনও অ্যাকশনই নিতে পারে না? কে জানে!

==============================

ফেরিওলারা পাল্টেছে। কেটলির মতন দেখতে জালের পাত্রভর্তি ডিম নিয়ে ডিমওলা নেই, নেই আইসক্রীম গাড়ি, মফসসলের যা ছিল সিগনেচার। কমলা গোলাপি সাদা রঙের বরফকাঠি নীরবে কবে যে উধাও হয়ে গেল, জানাই গেল না। ভ্যানরিক্সায় করে হাওয়াই চটি বিক্রি করত কারা যেন – হাব্বাই লে হাব্বাই লে, চটি লে চপ্পল লে, পাঁচ টাকা দশ টাকা, এক চাপান উতোর স্টাইলে দুজন রিদমিক হাঁক দিতে দিতে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরত। তারা নেই। তবে ভ্যানরিক্সায় করে সবজি বেচা আর সাইকেলের পেছনে গামলা বেঁধে জ্যান্ত মাছ বেচা কালচারটা এখনও রয়ে গেছে।

উবে গেছে কাবুলিওয়ালাদের দল। হ্যাঁ, হুগলির প্রাচীন বাসিন্দাদের মধ্যে অন্যতম ছিল এই কাবুলিওয়ালারা। ডিএম বাংলোর সামনে একটা প্রায় ভাঙাচোরা দোতলা বাড়িতে তারা থাকত। গত দশক অবধি তাদের টাকা ধার দিতে দেখেছি স্থানীয় লোকজনকে। এবারে দেখলাম বাড়িটা আছে, একই রকম ভাঙাচোরা, নিচেরতলায় একজন হোমিওপ্যাথি ডিসপেন্সারি খুলেছেন, প্রচুর নাকি ভিড় হয়, রোববার উনি গরীবদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেন। কাবুলিওয়ালারা কোথাও নেই।

লোকাল ট্রেনের হকারদের আওয়াজ নিয়ে অনেক জোক বাজারে চালু আছে, গুরুতেই দু একটা টই আছে। তো, সেসব তেমন পালটায় নি, এখনও টাকায় একটা মুসাম্বি, পাঁচ টাকায় ছটা, দু টাকায় শোনপাপড়ি, দশ টাকায় এক প্যাকেট – এসব নিজেদের মতই আছে। এই শতকের গোড়ার দিক থেকে এক নতুন কালচার চালু হয়েছে, সে দেখলাম এখনও রমরমিয়ে চলছে।

অফিস টাইমটা পার করে, ট্রেন যখন মোটামুটি ফাঁকা থাকে, তখন সে ওঠে। নিতান্ত সাধারণ চেহারা, হাতে একটা মোটা বাক্স। উঠেই সে বাক্সটাকে একটা বাঙ্কে সেট করে দেয় নিষ্পাপভাবে। কেউ সন্দেহও করে না, নিজের ব্যাগ সরিয়ে জায়গা করে দেয়। তারপরে সাইডব্যাগ থেকে বেরোয় একটা কর্ডলেস মাইক্রোফোন, সুইচ অন করতেই বিবিধ ক্যাঁকোঁ আওয়াজ সমেত বাঙ্কের ওপরের বাক্সটি সজীব হয়ে উঠলে বোঝা যায়, ওটি আসলে একটি ব্যাটারিচালিত লাউডস্পীকার। আওয়াজটি তার মন্দ নয়, পুরো ট্রেনের একটা কামরার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত সাবলীলভাবে সে আওয়াজ ছড়িয়ে দেয়। বাঙ্কের নিচে বসা লোকের দল ততক্ষণে প্রমাদ গণতে শুরু করে দেয়। সে-সবদিকে নজর না দিয়ে লোকটি অল্প ইন্ট্রোডাকশন দিয়ে জানায়, সে গান গাইবে এবং আশা করে তার গান সকলের ভালো লাগবে। অতঃপর শুরু হয় “অমর শিল্পী তুমি কিশোরকুমার” কিংবা “দিল অ্যা্যসা কিসিনে মেরা তোড়া”। গলায় প্রায়শই সুর থাকে না, তালজ্ঞানও বীভৎস, বক্সে বাজে কারাওকে, তার সাথে গায়ক কর্ডলেসে গলা মেলায়, প্রায়শই বাজনা একদিকে, আর গান আরেকদিকে চলে যায়, তালজ্ঞান আছে এমনতরো অভাজনদের কানের পক্ষে সে বড় পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে।

দুটি গান গাইবার পরে গায়ক সবিনয়ে জানায়, সে এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ছিল, প্রায়ই লেট নাইটের ফাংশনে গান গাইত, কিন্তু সরকার বাহাদুর রাত এগারোটার পরে লাউডস্পীকার বাজানোয় নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করার পর থেকে সে বেকার হয়ে পড়েছে, এখন ট্রেনের দাদারা দিদিরা তাকে না দেখলে কে দেখবে। কিন্তু বিনা আয়াসে সে পয়সা ভিক্ষে করতে চায় না, গান গেয়ে সবাইকে খুশি করেই সে রোজগার করতে চায়। … এর পরেই সে আস্তিন থেকে বের করে তার তিন নম্বর গান, আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো। এবং তিন আর চার নং গান গাইবার সময়ে সে জনে জনে প্যাসেঞ্জারদের কাছে গিয়ে ডান হাত প্রসারিত করে, মধ্যমা আর অনামিকার ফাঁকে গোঁজা থাকে বেশ কয়েকটি দশ কুড়ি টাকার নোট। যেহেতু এ ছেঁড়া জামাকাপড় পরা ভিখিরি নয়, আদতে ভদ্রলোক – অবস্থাবিপাকে পড়ে ট্রেনে গান গাইতে “বাধ্য” হচ্ছে, অতএব ট্রেনের প্যাসেঞ্জার ভদ্রলোকেরাও “বাধ্য” হয়ে পার্স খুলে পাঁচ দশ টাকা তার হাতে ধরিয়ে দেন – এদের এক দু টাকা দিলে এরা নেয় না।

ছয় থেকে সাতটি স্টেশন কানের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালাবার পরে এই গায়ক তার বাক্স গুছিয়ে পরের কামরাটিতে উঠে পড়ে।

গল্পটা জানা ছিল। সে উঠল শেওড়াফুলিতে। গান শুরু হয়ে গেল, যথারীতি সুরলয়ের বালাই নেই, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, গায়ক মাইক হাতে চলে গেছে ট্রেনের দরজার সামনে, হাওয়ার দিকে মুখ করে ঠোঁটে কর্ডলেস ঠেকিয়ে গান করছে, কিন্তু আওয়াজ আসছে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার, চলন্ত ট্রেনের হাওয়ার ঝাপটার কোনও আওয়াজই নেই। সন্দেহ হল – সন্দেহ আরও পোক্ত হল যখন দেখলাম শসাওলা ঠিক তার মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শসার উৎকর্ষ বিষয়ে বেশ হেঁকে হেঁকে জানাল, কিন্তু মাইকে একটি শব্দ উঠল না, নিখুঁতভাবে কেবল গায়কের কণ্ঠই ভেসে গেল লাউডস্পিকার পর্যন্ত।

ভালো করে লক্ষ্য করলাম ছেলেটার গলাটা। হুঁ, যা ভেবেছিলাম তাইই, পাড়ার স্টুডিওতে রেকর্ডিং করে এনে এখানে দাঁড়িয়ে লিপ মেলাচ্ছে। গলাটা ওরই, সন্দেহ নেই, কিন্তু লাইভ গাইছে না। মজা মন্দ না। বিনা এফর্টে আরামসে আশি নব্বই টাকা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল ছেলেটা।

======================

আমাদের পাড়াটার একসময়ে নাম ছিল লিচুবাগান। প্রচুর লিচু গাছ ছিল। উনিশশো অষ্টআশি সালে আমাদের বাড়িটা যখন বানানো হয় তখন এই এলাকায় আরও চার পাঁচটা বাড়ি ছিল, বাকি সামনের দিকে ছিল একটা জলের ট্যাঙ্ক, একটা শিশু উদ্যান, আর আট দশটা লিচুগাছ। সেই লিচুগাছগুলো ইজারা দেওয়া থাকত। যে মালিক, এক বুড়ি আর তার ছেলেবউ, গরমকালের শুরুর দিকটায় চলে আসত ওখানে, জলের ট্যাঙ্কের নিচে চাটাই দরমা দিয়ে বানিয়ে ফেলত একটা অস্থায়ী ঘর, আর ইয়া লম্বা লম্বা নারকোল দড়ি দিয়ে আশপাশের সবকটা লিচুগাছের মধ্যে বেঁধে রাখত টিনের ক্যানেস্তারা। দড়ির অন্যপ্রান্তগুলো বিভিন্ন গাছ থেকে বেরিয়ে এসে শেষ হত বুড়ির ঘরের সামনে। লিচুর গন্ধ বাদুড়কে আকৃষ্ট করে, এ ছাড়াও কাকটা শালিকটা তো থাকেই, তাই ঠা-ঠা গ্রীষ্মের দুপুরে বুড়ি সারাদুপুর জলট্যাঙ্কির ছায়ায় বসে বসে দড়ি টানত বাদুড় তাড়াতে, আর ক্যানেস্তারার সম্মিলিত আওয়াজে আমাদের দুপুরের ঘুম নিটোল পরিপূর্ণ হত।

জলের ট্যাঙ্ক আর শিশু উদ্যান ছিল আমাদের বাড়ির ল্যান্ডমার্ক। বাড়ির কিনা কোনও নম্বর নেই, তাই চিঠি লিখলে কেয়ার অফ বাবার নাম, ব্যান্ডেল স্টেশন রোড লিখে নিচে লিখতে হত বিহাইন্ড চিলড্রেন্স পার্ক। পরে পাড়ার নামকরণ হয় জলটুঙ্গী, তবে সে নাম আজও বিশেষ কেউ ব্যবহার করে না। সেই চিলড্রেন্স পার্কে ছিল বেশ সুন্দর সুন্দর কিছু মূর্তি – শিম্পাঞ্জি, কুমীর, হরিণ, আর ছিল একটা উঁচু পাহাড়, রীতিমত পাথর টাথর দিয়ে বানানো, সেই পাহাড়ে একটা গুহা আর গুহার সামনে গর্জনকারী সিংহ। ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলতে গিয়ে অনেকবার সেই সিংহের গুহায় লুকিয়েছি।

গত শতাব্দীর শেষ বছরের দিকে, সেই – যে বছরে দলমা পাহাড়ের হাতি এসেছিল আমাদের পাড়ায়, হঠাৎ পুরসভা ঠিক করল, ওখানে একটা কমিউনিটি হল করা হবে। যে কথা সেই কাজ। রাতারাতি ডিসেম্বর মাসে কাটা পড়ল সেই সাত আটটা লিচুগাছ। পরের বছর কমিউনিটি হলএর শিলান্যাস করা হল, সেইখানে আমার মায়েদের মহিলা সমিতিকে দিয়ে গান করিয়ে ব্যাপারটা জলচল করিয়ে নেওয়া হল। জলচল করে নেবার প্রয়োজনটা ছিল, কারণ বাড়ির সামনেই একটা কমিউনিটি হল উঠলে, সেটা আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিক, শুধু আমাদের নয়, ওই লাইনে আরও তিনটে বাড়ির দক্ষিণদিকগুলো ব্লক হয়ে যাবে। আর গাছ কেটে কমিউনিটি হল করার ব্যাপারে কারুর সায় ছিলও না, সায় ছিল না পুরনো হলেও সুন্দর ওই চিলড্রেন্স পার্কটাকে নষ্ট করবার। বাবারা দরবার করেছিল পুরপ্রধানের কাছে, লোকাল কাউন্সিলরের কাছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নি। পুরপিতা জানিয়েছিলেন, কমিউনিটি হল আমরা ওখানেই করব, দেখি কে আটকায়।

রাতারাতি শিশু উদ্যানের সুন্দর মূর্তিগুলো উপড়ে ফেলা হল, তাদের জায়গা হল হুগলি চুঁচুড়া মিউনিসিপ্যালিটির ভাগাড়ে। এখনও কেউ যদি মিউনিসিপ্যালিটি যান, দেখতে পাবেন, মেন গেটের ঠিক ডানপাশে উলটো হয়ে পড়ে আছে শিম্পাঞ্জি। ওর কোলে বসে আমি খেলা করতাম।

যদিও লিখলাম ‘রাতারাতি’, আসলে কাজটা হয়েছিল প্রায় দেড় বছর ধরে। গাছ কাটা, শিশু উদ্যান খালি করা, কমিউনিটি হলএর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন।

এবং তার পরে সব চুপচাপ। দীর্ঘ দশ বছর। আমরা ভেবে নিয়েছিলাম, যাক, কমিউনিটি হলএর ভূত বোধ হয় এদের ঘাড় থেকে নেমেছে, দক্ষিণ দিকটা বেঁচে গেল।

পুরসভার টনক নড়ল দুহাজার দশ সালে। ঘাড়ের কাছে তখন তৃণমূল কংগ্রেস গরম নিশ্বাস ফেলছে। পুরপ্রধান বুঝে গেছিলেন শেষের সেদিন আগত ঐ। যা খাবার, যা লুটবার এর মধ্যেই লুটে ফেলতে হবে। রাতারাতি টেন্ডার বেরলো, টেন্ডার পাস হল, এবং ফাঁকা জমিতে তৈরি হল, না, কমিউনিটি হল নয়, তৈরি হল মুক্তমঞ্চ। সামনে গ্যালারি স্টাইলে বসার ব্যবস্থা, আর বড়সড় মঞ্চ। দুহাজার এগারোর জানুয়ারি মাসে নাট্যোৎসবের মধ্যে দিয়ে উদ্বোধনও হয়ে গেল, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এলেন নাটক করতে। আমাদের আর কিছুই করার থাকল না। পুরসভা কথা দিল, ভোটে জিতে এলে মুক্তমঞ্চের আশপাশ সমেত আমাদের পাড়ার সৌন্দর্যায়নের ভার তারা নেবে।

কিন্তু ভোটে সব এলোমেলো হয়ে গেল। সিপিয়েম হুশহাশ করে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, কিছুদিনের মধ্যেই বিধানসভা নির্বাচন, তার কয়েক মাস পরেই পুরসভা নির্বাচনে সর্বত্র তৃণমূলের জয়জয়কার। অর্ধেক লাল রঙ হওয়া মুক্তমঞ্চ সেখানেই থেমে গেল। থেমে রইল। এখন তার দেওয়ালগুলো ধীরে ধীরে কালচে হয়ে যাচ্ছে। গ্যালারিতে শুয়ে থাকে কুকুর ও পাগল। রাতের দিকে মঞ্চের ভেতর দিকটায় নেশাভাঙ চলে। এদিকে আগাছা বেড়ে ওঠে, মুক্তমঞ্চের পাঁচিল আর আমাদের বাড়ির পাঁচিলের মধ্যে। সেখানে বেড়ালেরা নির্বিঘ্নে সন্তানের জন্ম দেয়, এবং সময় হলে আগাছার আড়ালে দেহত্যাগ করে।

হুগলি নৈহাটি নাট্যচর্চার জন্য বেশ নামকরা ছিল। প্রতি বছর ডিসেম্বরে উদ্যোগী নাট্যগোষ্ঠীর উদ্যোগে হুগলি গার্লস স্কুলের মাঠে হত সারা বাংলা একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতা। সে এক হইহই রইরই ইভেন্ট ছিল। নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে সে সবে ভাঁটা পড়তে শুরু করে, মূলত উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত জীবন এলোমেলো হয়ে যাওয়ায়। এদের অনেকেই কাজ করতেন ডানলপে, বা আশেপাশের নানান কারখানায়, কেউ ছোটখাটো চাকরি করতেন। তাদের কারখানা লকআউট হয়ে গেল, ঘরে ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেল, নতুন প্রজন্ম থেকে আর কেউ এগিয়ে এল না নাটকের চর্চাটাকে চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। আয়োজনের পয়সায় টান পড়ল। দু হাজার সাল নাগাদ বন্ধই হয়ে গেল উদ্যোগী। জীবন পালটে যাচ্ছিল খুব তাড়াতাড়ি। নাট্যচর্চার গুরুত্ব কমে যাচ্ছিল হু-হু করে। এ হবারই ছিল।

তার পর? তার পর, এই তো সেদিন সকালবেলায়, আমি বাথরুমে ঢুকেছি হাল্কা হতে, শুনি কোথায় যেন খুব চেঁচামেচি হচ্ছে। দুটি পুরুষকণ্ঠ, একটি বামাকণ্ঠ। উচ্চগ্রামে বার্তালাপ। প্রথমে মনে হল ঝগড়া চলছে বোধ হয় আশেপাশের কোনও বাড়িতে, তার পরে মনে হল, না, এ তো ঠিক ঝগড়ার টোন নয় – এমনিই বোধ হয় কথা বলছে, হুগলির জনতার স্বাভাবিক স্বরটাই একটু উচ্চগ্রামে বাঁধা।

মায়ের কাছে শুনলাম, পুজো আসছে, মুন্নি আর তার দলবল ষষ্ঠীর দিন নাটক করবে, তারই রিহার্সাল চলবে মুক্তমঞ্চে। মুন্নিদি, মন্দিরা সোম, আমাদের পাড়ার নাট্যব্যক্তিত্ব, দু একটি টিভি নাটক করেছেন, মানে সেই দূরদর্শন আমলে, আর বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল ইত্যাদিতে উনি থাকেন। পুজোর চারদিন মাইকে যে বিভিন্ন জিনিসের বিজ্ঞাপন শোনা যায় গানের ফাঁকে ফাঁকে, পুজোর আগে বসকো শাড়ি প্যালেস যে রেকর্ডেড বিজ্ঞাপন দেয় রিক্সা চালিয়ে সারা শহর ঘুরে ঘুরে, তাতে ফিমেল ভয়েসগুলো মুন্নিদির।

দোতলার বারান্দা থেকে মুক্তমঞ্চটা পরিষ্কার দেখা যায়। দেখলাম, প্রায়বৃদ্ধ কয়েকটি মানুষ এবং অল্পবয়েসী একটি লোক, নাটকের মহড়া দিচ্ছে। তারাই ঝাঁট দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে মঞ্চের সিমেন্টের মেঝের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের জমা শুকনো পচা পাতা, কুকুরের বিষ্ঠা। সদ্য বৃষ্টি শেষ হয়েছে তখন, চারপাশটা আলোয় ঝলমল করছে, দূরে কোথায় যেন মাইকে বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ভেসে আসছে মহালয়ার টুকরোটাকরা।

পুজো আসছে।

বাবা-কাকাদের প্রতিষ্ঠা করা দুর্গাপুজো, ঘোলাকলের পাশে সর্বপল্লী দুর্গোৎসব। ঘোলাকল ছিল আমাদের মফসসলের একমাত্র কল, যেটা গঙ্গার সাথে যুক্ত ছিল। গঙ্গায় জোয়ার এলে তীব্রধারায় ছ্যাড়ছ্যাড় করে ঘোলা জল বয়ে যেত নিচের এক টুকরো শানবাঁধানো চাতালের ওপর দিয়ে, ভাটার সময় সে কলের মুখ থাকত খটখটে শুকনো। ওই কলের নামে পাড়াটার নামই ঘোলাকল। ঘোলাকল এখন অনেকদিন আর চলে না, হয় তো পলি পড়ে নলের মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছে বহুকাল। সেই ঘোলাকলের পাশে এক চিলতে মাঠে সর্বপল্লীর দুর্গাপুজোর এইবারে ছাপ্পান্ন বছর। এটাই আমাদের পুজো। এখন গাজিয়াবাদে আমাদের সোসাইটিতে দুর্গাপুজো হয় ঠিকই, তবু সেটাকে “আমার পুজো” বলে এখনও ভাবতে পারি না। আমার পুজো মানে ব্যান্ডেল ঘোলাকল, সর্বপল্লী।

তো, নাম যেহেতু সর্বপল্লী, তাই প্রতি বছর ৫ই সেপ্টেম্বর, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিনে পুজো কমিটি কিছু অ্যাকটিভিটি রাখে। বস্তাদৌড়, বসেআঁকো, আলপনা প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। গত কয়েক বছর ধরে এর সাথে যুক্ত হয়েছে রক্তদান শিবির। প্রায়বারই আমার আর আসা হয় না, এইবারে আমি এসেছি পুজোর আগে, তাই পুরনো মুখগুলোকে দেখতে পাবার আশায় রক্তদান করতে পৌঁছে গেলাম সর্বপল্লীর মাঠে। এক দাদা এসে আমাকে বিশালাকার ব্যাজ পরিয়ে দিল। ভেতরে কটি চেয়ার পাতা, তাতে বসে কিছু বয়স্ক এবং মাঝবয়েসী মানুষ, কয়েকজনকে চিনতে পারলাম, প্রাক্তন কাউন্সিলর, বর্তমান কাউন্সিলর। পুরপিতা তখনই তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ করে বসলেন। যদিও কেউ শুনছে না বক্তৃতা, তবে লাউডস্পিকারের কল্যাণে তা দুদিকে পাঁচশো মিটার দূর পর্যন্ত সম্প্রচারের ব্যবস্থা আছে। নাম নথিভূক্ত করিয়ে ক্যাম্পখাটে শুয়ে পড়ে রক্ত দিলাম। ছোটবেলার পাড়ার ছেলে, এখন গালভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি, চোখফুটো কেমন ঘোলাটে হয়ে এসেছে, আমাকে এসে জিজ্ঞেস করল, বুবাই, দুধ খাবি না কফি?

কাগজের কাপে কফি নিয়ে একদিকের শতরঞ্চিতে বসলাম। মিষ্টির প্যাকেট পেলাম, আর রক্তদানের উপহার হিসেবে পেলাম একটা স্টীলের টিফিনবাক্সো। মফসসলের টিপিকাল উপহার। অনেকগুলো ছেলে সামনে ঘোরাঘুরি করছে, মনে হচ্ছে চিনি-চিনি, কিন্তু চিনতে পারছি না কাউকেই। যে লোকটি নাম টুকছিলেন, উঠে যাই তাঁর কাছে, জিজ্ঞেস করি, দাদা, ডোনার কার্ডটা কবে পাওয়া যাবে? উনি বলেন, আপনি গোপালবাবুকে জিজ্ঞেস করুন, গোপালবাবুকে সব পাঠিয়ে দেওয়া হবে সাত দিনের মধ্যে। হাত তুলে উনি গোপালবাবুকে দেখান, আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই, লাস্ট যখন আমি গোপালবাবুকে দেখেছি, তখন তিনি পুজোর সময়ে নতুন জামা, নতুন জুতো আর হাতে টিনের পিস্তলে ফটাস ফটাস করে ক্যাপ ফাটাতে ফাটাতে বাবামায়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বেরোতেন। এখন গোপালবাবু সর্বপল্লী দুর্গাপুজোর জেনারেল সেক্রেটারি। কম কথা?

হঠাৎ মাঠের সামনের সরু রাস্তায় একটি গাড়ি এসে থামে, তার থেকে বেরোয় দুটি পুলিশ এবং লম্বা গেরুয়া পাঞ্জাবী পরা একটি মাঝবয়েসী লোক, তুমুল মোটা, কিন্তু বয়েস মনে হল আমার মতই। পুলিশদুটি তাঁর বডিগার্ড। আসামাত্রই সবাই খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে গেল, বয়স্ক কাউন্সিলর ও প্রাক্তন কাউন্সিলররা পর্যন্ত সন্ত্রস্ত হয়ে “আরে এসো এসো, তাই ভাবছি এত দেরি হচ্ছে কেন, এইখানে বসো, ওরে ভজা এখানে এক কাপ কফি দিয়ে যা” ইত্যাদি শুরু করে দিলেন। গেরুয়া পাঞ্জাবী সবাইকে বরাভয় দিয়ে একটি চেয়ারে বসলেন। পেছনে ঘুরন্ত পেডেস্টাল ফ্যানকে ঘুরিয়ে তাঁর দিকে সরানো হল। তিনি কফি শেষ করে মাইক ধরে বক্তৃতা শুরু করলেন, রক্তদান কেন জরুরি ও সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন কেন নমস্য।

আমার তো স্থানীয় অধিকাংশ খবরের সোর্স আমার বাবা। ঘরে পৌঁছে ডেসক্রিপশন দিলাম। বাবা এমনিতে সর্বপল্লী দুর্গাপুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট, তবে সেদিন শরীর খারাপ থাকায় বেরোয় নি। শুনে খানিক মাথা চুলকে বলল, অভিষেক নয় তো? – অভিষেক কে? বাবা বলল, অভিষেক হচ্ছে মুকুল রায়ের ছেলে। ওরে বাবা, সে তো স্বনামধন্য লোক। বাবাও স্বনামধন্য, ছেলেও তাই। তারা এখানে আসে টাসে নাকি? বাবা বলল, আসার তো কথা ছিল, লোকটা কি চশমা পরে ছিল? মোটামুটি চেহারা?

নাঃ। চশমা তো ছিলই না, চেহারাটিও বেশ দশাসই। বাবা চিনতে পারল না। সন্ধ্যেবেলা খোঁজখবর নিয়ে এসে বাবা জানাল, উটি জয়দীপ মুখার্জি। অল ইন্ডিয়া লিগাল এইড কাউন্সিলের জেনারেল সেক্রেটারি। হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্ট মহল পর্যন্ত ওর প্রচুর চেনাশোনা আছে, মন্ত্রীশান্ত্রী নাকি ওর কাছে প্রায়ই আসে লীগাল অ্যাডভাইস নিতে টিতে, সে থাকে এই রায়বাজারে। এখানে নাকি একমাত্র সে-ই পুলিশ প্রোটেকশন নিয়ে ঘোরে।

========================

আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ট ভদ্রলোক। একটি নিয়েই গলদঘর্ম, ডিউ পার্টেতে নেইকো লোক। তা সেই আমা-হেন শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকের গলাতেই আরেকটি মেয়ে ঝুলিয়ে দিচ্ছিলেন প্রায়, একজন ঠাম্মা। গল্পটা বলি, শুনুন।

এ আমার বন্ধু। সেই ক্লাস সেভেনে, আমি প্রথম যখন হুগলিতে আসি, তখন থেকে। স্কুলের হিসেবে এক ক্লাস নিচে, কিন্তু আমরা সমবয়েসী। এ তখন পড়ত সিক্সে। পাড়ার রাস্তার ক্রিকেট, সাইকেল নিয়ে এদিক সেদিক চষে বেড়ানো, একসাথে গঙ্গায় সাঁতার কাটা, প্রথম আমাকে সুমন শোনানো, প্রথম ইজাজতের গান শোনানো, প্রথম মাইকেল জ্যাকসন শোনানো আমার ছেলেবেলার বন্ধু।

লেখাপড়া খুব ভালোভাবে হয় নি, এখানেই বিভিন্ন ইনশিওরেন্সের এজেন্সি করত, কোনো রকমে একটু টাকাপয়সা হাতে জমিয়ে বিয়ে করল। কয়েক বছরের মাথায় একটি সন্তান হল। দুর্দিনের সেই শুরু তার।

মেয়েটি স্প্যাস্টিক। মেরুদণ্ডের জোর নেই। জন্মেছিল মস্তিষ্কে জল নিয়ে, সেই জল বের করতে গিয়ে মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিক বৃদ্ধির ক্ষমতা হারায়। মেয়েটি জড়ভরত হয়ে বেঁচে রয়েছে, যাকে বলে ভেজিটেটিভ স্টেট। মেরুদণ্ডে জোর নেই। বাবা মাকে কষ্ট করে চিনতে পারে, আর কাউকে চিনতে পারে না। তার চিকিৎসার জন্য সামান্য ইনশিওরেন্স এজেন্ট বাবা সর্বস্ব বিক্রি করে এখানে ওখানে দৌড়েছে, গুরুর টইতেও আমি একবার ফান্ড রেইজিং এর জন্য রিকোয়েস্ট জানিয়েছিলাম, তাতেও একপ্রস্থ চিকিৎসা হয়েছিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হবার নেই। কপর্দকশূন্য অবস্থায় আমার বন্ধুটি ম্যাক্স হেলথকেয়ার লাইফ ইনশিওরেন্সের থেকে একটা অফার পায় দুবাই গিয়ে এজেন্সি চালাবার। দিল্লিতে ইন্টারভিউ দিতে এসেছিল, তখন তার সাথে আমার দেখা হল – সে ২০১২ সালের কথা। আমি সদ্য দুবাই ঘুরে এসেছি তখন। তাকে যথাসম্ভব মোটিভেট করেছিলাম, সে আমার কথায় ভরসা করে বউ বাচ্চা ছেড়ে দুবাই চলে গেল। দু বচ্ছর দাঁত কামড়ে ওখানে লড়াই করবার পরে এখন সে মোটামুটি পায়ের তলায় মাটি পেয়েছে। ওখানেই একটা বেটার চাকরি পেয়েছে, জয়েন করার আগে বাড়ি এসেছে সবার সাথে দেখা করতে – সেটা জানলাম ফেসবুক থেকে। সঙ্গে সঙ্গে পরদিন দৌড়লাম তার সাথে দেখা করতে। প্রায় কুড়ি বছর বাদে তার মা বাবার সাথে দেখা হল। এক সময়ে তাদের বাড়িতে পড়ে থাকতাম দিনের পর দিন।

বন্ধু নিয়ে চলল তার শ্বশুরবাড়ি। কাছেই। পিপুলপাতি ছাড়িয়ে এইচ আই টি, মানে হুগলি পলিটেকনিকের পাশেই গড়ে উঠেছে হুগলি ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ অ্যান্ড টেকনোলজি। সেখানে কচি কচি হবু ইঞ্জিনীয়াররা ঢুকছে বেরুচ্ছে দেখে এলাম। অবশেষে পৌঁছনো গেল বন্ধুর শ্বশুরবাড়ি। বউকে দেখলাম, মেয়েকে দেখলাম।

প্লেটে কাজু, বিস্কুট, চানাচুর নিয়ে বসেছি, এক খুনখুনে বৃদ্ধা, বন্ধুর দিদিশাশুড়ি এসে দাঁড়ালেন। অ ছেল্যা, তোমার বাড়ি কোথায় গ’? বললাম, বালির মোড়ের কাছে। – সেটা কোথায়?

কী মুশকিল। পিপুলপাতির কাছে বসে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বালির মোড় কোথায়, তাকে আমি কী বোঝাবো? ভেবেটেবে বললাম, ব্যান্ডেল চার্চ চেনেন? তার কাছে আমার বাড়ি।

ঠাম্মা ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেললেন, “আমি কিছু চিনি না এখেনকার, বুঝেচো? আমি গ্রামদেশে থাকি ত’, শহরের পানে এদিগটা কিছু চিনি না” – বলে আবার ভেতরে চলে গেলেন। আমি আবার গল্প জুড়লাম বন্ধুর সাথে, খানিক বাদে ঠাম্মা আবার বেরিয়ে এলেন এবং এসেই সোজা আমার সামনে দাঁড়িয়ে, “আমার হাতে একটা ভালো মেয়্যা আছে, বুঝলে -“

বুঝলাম ঠাম্মার বয়েস হয়েছে, অতঃপর বন্ধুপত্নীর স্বীয় দিদিমার প্রতি তাকিয়ে চোখটিপুনি এবং ঠাম্মা সেই যে ভেতরে গেলেন, আর বেরুলেন না। আমারও আর তাঁর হাতের মেয়ে সম্বন্ধে কিছুই জানা হল না।

==============

যে কাজ নিয়ে এসেছিলাম, তা সম্পন্ন হল নির্বিঘ্নে। রোববার সাত তারিখে আমার ফেরার ট্রেন। ততদিনে জানলাম, হুগলির অটোরিক্সা ইউনিয়ন পুরসভাকে জানিয়েছে রাস্তা অবিলম্বে সারানো না হলে তারা অটো তুলে নেবে রাস্তা থেকে, পুজোতেও অটো বের করবে না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বৃষ্টির মধ্যেই পুরসভা রাস্তা সারাইয়ের কাজে নেমে পড়েছে। দেবীপার্ক থেকে চকবাজার পুরো সারানো হচ্ছে, পাঙ্খাটুলী থেকে পিপুলপাতিও সারানো শুরু হবে শিগগিরই।

ব্যান্ডেলের কাল হল শেষ। আপাতত সেই ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়েই ফিরে যাওয়া, এবং একটি ফাঁকা ব্যান্ডেল লোকালের জানলার ধারের সীটে গিয়ে বসা। এবারে আর কোনও গায়ক ওঠে নি ট্রেনে। রিষড়ার কাছে আমাদের ট্রেনকে ওভারটেক করে গেল গ্যালপিং ডাউন মেমারী লোকাল, দেখলাম তার একটা কামরার তিনটে জানলায় তিনটে ছোট, আর দরজায় একটা বড় সাইজের পতাকা। বিজেপি, পদ্মফুল। ট্রেন ছুটেছে ফুলস্পিডে।

মনে পড়ল, আজ কলকাতায় অমিত শাহের জনসমাবেশ। ব্রিগেডে মিটিং হবে, গ্রাম থেকে আসা মুখ।

আমি বসে থাকি একলা, ভিড়ের মাঝে। কিছু মুখ পিছু পিছু ধাওয়া করে, পিছু ছাড়ে না। তবু ফিরতে হয়। এক যুগ থেকে আরেকটা যুগে। আমার টাইম ট্র্যাভেল শিড্যুলড দুপুর দুটো পাঁচে, হাওড়া স্টেশনের আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে।

Advertisements

2 thoughts on “স্মৃতির সরণী বেয়ে –

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s