একটি অতিসাধারণ ভ্রমণকাহিনি – চতুর্থ পর্ব

পর্ব ১পর্ব ২ আর পর্ব ৩-এর পরে

আমি কি বাড়িতে বা পাড়ায় খুব উষ্ণ অভ্যর্থনা আশা করেছিলাম? আমাদের এ পাড়ায় বাস বহুকালের, সেই ১৯৮৮ সাল থেকে এইটা আমাদের বাড়ি। আশপাশের সমস্ত লোকজনকে আমি চিনি, নিতান্তই ছাপোষা মফস্বলী বাঙালির দল। আমি কি ভেবেছিলাম যে, তারা সবাই বাড়ি বয়ে আমাকে এসে বলবে, সিকি, কী করেছিস রে? তুই গাড়ি চালিয়ে একেবারে সেই দিল্লি থেকে এখেনে চলে এস্‌চিস? ভেবেছিলাম নিশ্চয়ই, নইলে – এলাম, বাবা শান্তমুখে বাইরের গেটে তালা লাগাল, আমি আর সিকিনী মিলে লাগেজপত্র নিয়ে বাড়ি ঢুকলাম, ঠিক সে রকম কোনও উষ্ণ উচ্ছ্বাসভরা আওয়াজ পেলাম না – এমনটা মনে হচ্ছে কেন? অনেক রাত হয়ে গেছে বোধ হয়।

খেয়েদেয়ে একঘুমে সকাল। পূর্ব ভারত, এখানে ভোর হয় তাড়াতাড়ি। সোয়া ছটাতেই ঘুম ভেঙে গেল। দোতলার গ্রিলের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম বাড়ির বাইরে গাড়িটা সকালের আলোয় ঝিকমিক করছে, আর তার সামনে চার চারটি সন্তানকে নিয়ে কুকুরী মা প্রাতঃকালীন খেলাধুলো, আদর এবং দুধ খাওয়ানো একসাথেই চালাচ্ছে।

dsc_0262dsc_0256dsc_0258

খানিক বাদেই ভরপেটে দুটি ছানা গুটিশুটি মেরে ঢুকে গেল গাড়ির নিচে, আরামসে ঘুমিয়ে পড়ল একে অন্যের ঘাড়ে ল্যাজে মাথা রেখে। আমি নিচে নেমে এলাম।

dsc_0263dsc_0375dsc_0376

উঠোনে, যেমন চিরদিনই দেখে আসছি, শিউলি ফুল আর টগর ফুলেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ভূতো একসাথে এতগুলো শিউলি ফুল তো কখনও দ্যাখে নি আগে, তাই খুব খুশি, কোঁচড়ে ভরে শিউলি আর টগর কালেক্ট করল, করে ঠাম্মির কাছে বায়না করল ছুঁচসুতোর জন্য, মালা গাঁথবে। সে মালা কার গলায় পরাবে জিজ্ঞেস করাতে অবশ্য প্রচণ্ড রেগে গেল – তা আমার আর বেশি ঘাঁটাবার সময় ছিল না। বেরোতে হবে।

এখান থেকে বহরমপুর যাবার একটিই মূল রাস্তা – এন এইচ ৩৪। রাণা এবং আমার বাবা – দুজনেই বলে দিয়েছিল গাড়ি নিয়ে একেবারে যাবার চেষ্টা না করতে, গাড়ির অ্যাক্সেল আর আমার শিরদাঁড়া – দুটোই নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এই দুশো কিলোমিটারের জার্নিতে। অগত্যা, ট্রেনই ভরসা। নৈহাটি থেকে লালগোলা প্যাসেঞ্জার ছাড়বে আটটা পঞ্চাশে – শিয়ালদা থেকে এসে। বহরমপুর পৌঁছবে বারোটা চল্লিশে। ঘণ্টাচারেক রাণার বাড়িতে কাটিয়ে বিকেলের ট্রেন ধরে ফেললে রাত্তিরের মধ্যেই আবার বাড়ি ফিরে আসব।

ছোটবেলায় তিন বছর আমার কেটেছিল মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জে। বাবার তখন পোস্টিং ছিল সেখানে। তিন বছরে আমি বেশ কয়েকবার বহরমপুর গেছি। ধূলিয়ান, ফারাক্কা, হাজারদুয়ারী, পলাশী সমস্ত ঘুরেছি সেই সময়ে। কিছু বেড়ানোর ছলে, কিছু আবৃত্তি কম্পিটিশনের হিড়িকে। ছোটবেলায় আবৃত্তি করতাম, মূলত মায়ের উৎসাহে। এখানে ওখানে প্রতিযোগিতায় নাম দিতাম, আর আবৃত্তি করতাম বীরপুরুষ, কিংবা লিচু-চোর, নয় তো কাস্তে। ফার্স্ট সেকেন্ড প্রাইজ জিতে আসতাম। কখনও কখনও জঙ্গীপুর-রঘুনাথগঞ্জের বাইরেও আবৃত্তি কম্পিটিশন থেকে ডাক আসত, রঘুনাথগঞ্জের অগ্নিফৌজ অ্যাথলেটিক ক্লাব থেকে তখন আমাদের মত বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া হত বহরমপুর। আবৃত্তি করে, কখনও প্রাইজ জিতে, কখনও কিছুই না জিতে ফিরে আসতাম। খুব আবছা মনে আছে বহরমপুর টাউনটা।

সাতটা চল্লিশে বেরিয়ে পড়লাম। আটটা দশের ব্যান্ডেল নৈহাটি লোকালে বসে রাণাকে ফোন করে জানালাম, আমি বেরিয়ে পড়েছি, মোটামুটি পৌনে একটা নাগাদ বহরমপুর কোর্ট স্টেশনে পৌঁছব। রাণাও খুব খুশি – বলল, আরামসে চলে এসো, বেলডাঙা ছাড়ালে আমায় একটা কল কোরো, আমি স্টেশনে চলে আসব তোমায় নিতে।

পশ্চিমবঙ্গের, বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের এই সব স্টেশনগুলোতে কী যেন একটা আছে, পুরনো দিনের অনেক অনেক স্মৃতি হু-হু করে উস্‌কে দেয়। এই চার্ম দিল্লির কোনও রেলওয়ে স্টেশনে হয় না। এই যে ঘষে যাওয়া কাচের বাক্সে সাজানো বিস্কুটের প্যাকেট, তিনদিনের বাসী প্যাটিস আর ক্রিম রোল, লাল রঙের শালু দিয়ে ঢাকা পানপাতা, আর চা-ওলার হাতে ইয়াব্বড়ো কেটলি আর সারিসারি মাটির ভাঁড়েরা – এদের আমি খুব চিনি। অনেক দুপুর, অনেক বিকেলের সঙ্গী ছিল এরা আমার। এখন আমি অন্য জীবন যাপন করি।

একটু দূরে লোকাল ট্রেন থেকে নামল তিনটে লোক, তাদের হাতে বাঁশের লাঠির দুপ্রান্তে বাঁধা খেজুরপাতার ঝাঁটার গুচ্ছ, তাদের ধরেছে একটা লোক, প্লেন ড্রেসের লোক, সে কিছু একটা পয়সা ডিম্যান্ড করচে, যেটা দিতে এই তিনজনেই নারাজ। ঝাঁটাওলাদের একজন অনুরোধের ভঙ্গিতে সেই লোকটির বুকপকেটে একটা একশো টাকার নোট গুঁজে দিল, এত দূর থেকে কথা তো শোনা যাচ্ছে না, বুঝলাম রফা করতে চাইছে, তিনজনের জন্য একশো টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দিতে। ট্রেনে ঝাঁটা নিয়ে আসা নিষিদ্ধ কিনা জানি না, কেন এই তিনজনকে ধরেছে – ঝাঁটার জন্য নাকি বিনা টিকিটে আসার জন্য, তা-ও জানা নেই। আমি শুধু দেখছি, লোকটি টাকাটা নিচ্ছে না, বুকপকেট থেকে বের করে আবার ঝাঁটাওলার হাতে থাবড়ে ধরিয়ে দিচ্ছে, আর আরও রেগে গিয়ে কিছু বলছে।

আমার মাথার ভেতরে দুলছে একটা কবিতা। উৎপলকুমার বসুর কবিতা।

ঐ ছেলেটা বাবু ঐ হারামজাদা দু টাকা চায় ব্যাটা ছেলে খেটে খা না আমরা
মেয়েমানুষ বালবাচ্চা আছে কোথায় পাব দু টাকা সেদিন দিইছি তাই বলে
হপ্তায় হপ্তায় তোদের কি
হারামজাদা মদ খাস বদমাইসি করিস আর আমাদের কাছে জুলুম আজ
একটাকা কাল দু টাকা এই সেদিন দিলুম বাবু বিশ্বেস করুন বলে টাকা না দিলে
চাল ফেলে দোবো পেটাবো তা মার না শালা হারামী ঘরে মা-বন নাই
বাজারে এসে তোর রোয়াব এ চাদর গায়ে ছেলেটা কাল এস্‌ছিল বললুম
পয়সা কোথায় পাবো বল সবাই রেশন ধরে আজকাল বিক্রি নাই কখনো
কখনো কেউ আসে ইদিকে বলে চাল আছে গোবিন্দভোগ আছে কত কিজি
বউনির সময় তার মধ্যে ঐ শালা মুখ গলিয়ে বলে দুটো টাকা দেরে মাগী
নইলে এখানে বসতে পাবিনি জমিটা কি তোর রে হারামী লেকবাজার কি
তোর বাপের তুই ব্যাটা ছেলে খেটে খা না পুলিশের কাছে প্রতিকার নাই ধরে
নে যায় ঘুষ খায় আর ছেড়ে দেয় ক’বার হাজত ঘুরে এলি বল না বাবুকে এই
শালা এই মড়াখেকো আর কদিন মস্তানি করবি সাগরেদ হইচিস চোরের
সাগরেদ ন্যায্য কথা বলি এত লোগ খেটে খায় আর তুই তোর মরণ হয় না
দু’কেজি আট আনা লাভ তোর ঘরে মা বোন নেই রে বলিস পেটাবি চাল
ফেলে দিবি তোর মরণ হয় না রে বাঁদর ।

[সই লুডো খেলা, উৎপলকুমার বসু]

আটটা পঞ্চাশ কখন পেরিয়ে গিয়ে নটা বাজল, লালগোলা প্যাসেঞ্জারের দেখা নেই। চা-ওলাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম অল্পবিস্তর লেট এ ট্রেনে হয়ই। এসে যাবে। মনে ভয় পেলাম। শিয়ালদা থেকে নৈহাটি আসতেই যদি এত লেট করে, তা হলে বাকি রাস্তা কেমন যাবে কে জানে!

লালগোলা প্যাসেঞ্জার, এই আমার দ্বিতীয়বার। প্রথম সফরের একটা ঝাপসা স্মৃতি আছে, অনেক দিন আগের – উনিশশো তিরাশি। আমি তখন সবে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছি, ছ বছরের বাচ্চা। একদিন বাবা তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বাড়ি চলে এল, আর আমরা রিক্সা করে চললাম জঙ্গীপুর রোড স্টেশনের দিকে, ব্যান্ডেল যেতে হবে। বাবার মুখটা থমথমে। ট্রেন এল। লালগোলা প্যাসেঞ্জার। বসে জানলাম, ঠাকুমা মারা গেছেন। বাবার মা। তখনও মৃত্যু বোঝার বয়েস হয় নি, ব্যান্ডেল যাচ্ছি, সেখানে জ্যাকা আছে, মেজজেঠু আছে, ছোটকা আছে, কত মজা হয়, সেই আনন্দেই আমি মশগুল ছিলাম।

সে বড় ভয়ঙ্কর জার্নি ছিল। তখন সিঙ্গল লাইন, আর লালগোলা ছিল প্রায় অল-স্টপেজ খুব লো-প্রায়োরিটির ট্রেন। মে মাসের তীব্র গরম। কয়লার ইঞ্জিন। মায়ের সঙ্গে করে আনা জল সম্ভবত ফুরিয়ে গেছিল। আমার চোখে কয়লার গুঁড়ো পড়ে আমি চীল চিৎকার করে কাঁদছি, মা আমাকে ভোলাবার চেষ্টা করছে। আমার খুব তেষ্টা পেয়েছিল, কিন্তু জল তো নেই, মা শসা কিনে খাওয়াবার চেষ্টা করছিল। ট্রেন চলার থেকে থেমেই আছে বেশি। বাইরে তখন লু বইছে। জানলা নামাবার উপায় নেই, কারণ আমরা যে কামরায় বসেছিলাম, তার সবকটা কাঠের জানলা গায়েব। … তখন ট্রেনের জানলা কাঠের হত। অতএব, বসে বসেই শুকনো কাঠ গলায় শসা চুষতে চুষতে লু-এর ঝাপটা সইতে সইতে ব্যান্ডেল পৌঁছেছিলাম রাত নটায়। আমার কাকা জ্যাঠারা তখন সবে দাহ করে ফিরেছে। বাবার আর মাকে শেষ দেখা হয় নি। তখন তো মোবাইল ফোন ছিল না। ট্রাঙ্ক কল বুক করতে হত। রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে আর খবর দেবার উপায় থাকত না, তাই কাকা-জ্যাঠারা বিকেলের পর আর অপেক্ষা করতে পারে নি বাবার জন্য। ঠাকুমা যেখানটায় শুত, সেইখানটায় বিছানা আঁকড়ে ধরে বাবা আর জ্যাকার হাউহাউ কান্না আমার এখনও মনে আছে।

লালগোলা প্যাসেঞ্জার শুনলেই আমার এইসব মনে পড়ে যায়। যদিও এ সব প্রায় তেত্রিশ বছর আগেকার স্মৃতি।

এখন, দু হাজার পনেরো সালের নভেম্বর মাসে আমি নৈহাটির লাটফরমে দাঁড়িয়ে লোক গুনছি, আর ঘড়ি দেখছি।

লালগোলা এল নটা পঁচিশে। পাক্কা পঁয়ত্রিশ মিনিট লেটে। উঠে বসার জায়গা পেলাম না, ঠাসা ভিড়, কোনও রকমে একটা চ্যানেলের মধ্যে নিজেকে সেঁধিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

রাণাঘাট পেরোবার পরে সামনে বসা একটা ছেলে, তার এক চোখ অন্ধ, আমাকে বলল, আপনি বসুন, আমি ভাবলাম সে বোধ হয় সামনে নামবে। বসলাম। কিন্তু ছেলেটা নামল না, দাঁড়িয়েই রইল। ঘণ্টাখানেক দাঁড়াবার পরে আবার আমার গায়ে হাত দিয়ে ডাকল ছেলেটা – এইবারে আমাকে একটু বসতে দেবেন? অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছি।

বোঝো কাণ্ড। এমন প্যাসেঞ্জারও হয় এই লাইনে? পালা করে বসা-দাঁড়ানো করতে করতে – বেলডাঙা আসতেই রাণাকে ফোন করে দিলাম। আর দেড়টার সময়ে বহরমপুর কোর্ট স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন থেকে বেরোতেই তার দেখা পেয়ে গেলাম। মোটরসাইকেলের পেছনে আমাকে লোড করে বহরমপুর শহর ঘোরাতে ঘোরাতে একসময়ে নিয়ে পৌঁছল রাণার বাড়িতে। প্রায় তিন যুগ বাদে দেখে বহরমপুরের একটা কিচ্ছু আমি আর চিনতে পারলাম না।

গতকাল সদ্যই শেষ হয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠান। সারা বাড়ি জুড়ে তার চিহ্ন বিরাজমান। কিছু অতিথি আত্মীয় তখনও রয়েছেন, কেউ কেউ চলে যাচ্ছেন। রাণা আর তার ভাই ব্যস্তসমস্ত হয়ে সবকিছু সামলাচ্ছে। খানিক বাদে রাণা বসার সময় পেল। বসলাম, খানিক গল্প হল। সশরীরে আসার পরে রাণার বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র হাতে পেলাম। বেশ সুন্দর ডিজাইন, আর তুমুল মজাদার লেখা।

রাণা তখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না, আমি সত্যিই গাড়ি চালিয়ে এতটা এসেছি। … এই তো, এই ধরণের কথা শোনার জন্যেই তো আমি কাল থেকে মুখিয়ে ছিলাম। প্রশংসা শুনতে, আত্মশ্লাঘা অনুভব করতে কে না ভালোবাসে?

সিকিনীও মাঝে মাঝে প্রশ্নটা করে – কী পাস এত লম্বা লম্বা সময় ধরে গাড়ি চালিয়ে? কিছু তো এনজয় করা যায় না, তোর বোরিং লাগে না? টায়ারিং লাগে না? রাণাও সেই লাইনেই প্রশ্ন করল।

আমি সবাইকেই প্রশ্ন ধরে ধরে উত্তর দিই। কী পাই, সে জানি না। ভালো লাগে। না, বোরিং লাগে না, টায়ারিং লাগে না, বরং ড্রাইভিং বা রাইডিং – আমার কাছে রিফ্রেশিং।

একটু পরেই ওপর তলা থেকে খাবার ডাক এল। গিয়ে দেখি ক্ষুদ্র আয়োজন, কিন্তু তত ক্ষুদ্র নয়। মাটন বিরিয়ানি এবং মাটন কোর্মা। না হয় বিয়ের খাবার খাবো বলেই এসেছি, না হয় ট্রেনে শুধু এক ঠোঙা ঝালমুড়িই খেয়েছি সকাল থেকে, তাই বলে পেটের খোলস তো অনন্ত নয়! সে কথা কে বোঝাবে রাণাকে আর রাণার মা-কে! বিরিয়ানির থালা অর্ধেক শেষ না হতেই আবার বিরিয়ানি দিয়ে ভর্তি করে দেন, মাংসের বাটি শেষ হবার অপেক্ষা, পরক্ষণেই সেখানে আবার চারপিস মাংস, এবং স্বভাবোচিত বিনয়, এটুকু তো তুমি খেতেই পারবে, এ আর এমন কি!

একটা সময়ে হাত তুলতেই হল, গলা পর্যন্ত মাটন আর বিরিয়ানি ঠাসা। রাণা ততক্ষণে বেশ হিংস্র হয়ে উঠেছে। হাত মুখ ধুয়ে আসতে না আসতেই দেখি আবার একটা প্লেট, তাতে রসগোল্লা, পান্তুয়া, আর দই।

প্লেট নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে বসলাম। যাকে দেখার জন্য এতদূর আসা, সেই শ্রীমতি রাণার এতক্ষণে আবির্ভাব ঘটল। না, ওর নাম সায়ন্তিকা নয়, ওটা নিতান্তই রাণার কলমের দেওয়া নাম, তবে আসল নামটা আমি আপনাদের বলছি না, ওটা আপনারা রাণার থেকে জেনে নিন গে। মিষ্টি, বাচ্চামতম একটা মেয়ে, নেহাত শাড়ি পরে একটু বড় দেখাচ্ছে। বেশ মিশুকে, অনেকক্ষণ গল্পগুজব হল।

চারটে বাজল, এবার যাবার পালা। এক প্রস্থ চা খেয়ে ঘুমটাকে তাড়া দিলাম, তারপরে রাণা আমাকে আবার মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে হুশ করে পৌঁছে দিল বহরমপুর কোর্ট স্টেশন। এবার ফেরা ভাগীরথী এক্সপ্রেসে। এটা আবার রাণাঘাটের পরে কলকাতা স্টেশনে গিয়ে দাঁড়াবে, তাই আমাকে রাণাঘাটে নেমে ট্রেন পালটে নৈহাটি আসতে হবে।

সাড়ে সাতটা পৌনে আটটা নাগাদ রাণাঘাট স্টেশনে এসে নামলাম। নৈহাটির ট্রেন আসবে আটটার একটু পরে। অলস চোখে দেখতে থাকলাম স্টেশনটাকে। ছোটবেলায় একবার এসেছিলাম বাবার সাথে, এখানে। বাবার মামাবাড়ি এই রাণাঘাটে। এখন সব স্টেশনের মতই রাণাঘাটও আধুনিক হয়েছে। হুইলার স্টলে বই বিক্রি হচ্ছে। এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে মহিলা চেকার একজন বিনা টিকিটের যাত্রীকে ধরেছেন, শার্টের হাতা ধরে তাকে নিয়ে যাচ্ছেন টিকিট কালেক্টর অফিসের দিকে – আর আজ আমার কী হয়েছে, থেকে থেকে মাথায় ঝাপটা মারছে কবিতারা। এই রাণাঘাটও তো আমার এক প্রিয় কবির একদা বাসস্থান। আমার বাড়ি আছিল রাণাঘাটে, … তার আগে কী ছিল যেন?

স্টেশন মাস্টার, আপনি দয়া করে এই
লোকটিকে ছেড়ে দিন, বুড়ো লোকটার
ত্রিসংসারে কেউ নেই।

একজন আছে বটে, দূর সম্পর্কের – সেও টিকিটবিহীন –
খুড়ো-বলে-ডাকা-সেই-সৌদাসের ছোট্ট ছেলেটা,
খুড়ো বলে ডাকে কেন ঈশ্বর জানেন। খুব ক্ষীণ,

আরো একজন আছে, হয় তো দূরতর সম্পর্কের,
অথচ আত্মীয় ওর, আমি সেইজন।
আরো একজন, আপনি, আপনি ছাড়া ওর কেউ নেই।

তা ছাড়া আপনার নয় একচেটিয়া ক্যানিং স্টেশন।

[যুক্তি, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত]

ট্রেন এসেছিল সময়মত, বেসুরে বাউল গান শুনতে শুনতে পৌঁছলাম নৈহাটি, সেখান থেকে আবার ট্রেন বদলে ব্যান্ডেল। এইবারে সত্যি ক্লান্ত লাগছে। ছাঁদা বেঁধে খানিক বিরিয়ানি আনতে পারলে মন্দ হত না, দুপুরের খাওয়া কখন হজম হয়ে গেছে।

আমি ঘুমোতে যাই, আপনারা বরং এই নেমন্তন্নপত্রটা পড়ে ঠোঁট চাটুন। রাণার লেখা। সত্যিই লা-জবাব।

মান্যবরেষু,

আগামী এতই কার্তিক, ১৪২২শে, আমি সজ্ঞানে সসম্মতিতে সশরীরে সায়ন্তিকাকে (ঐ আসল নাম যা, তার বদলে) তার সম্মতিক্রমে বিবাহ করতে চলেছি। এই উপলক্ষ্যে কিঞ্চিৎ (???) ভোজনাদির আয়োজন করা হয়েছে। না এলে মটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাপের অভিশাপ পাবেন। সুতরাং, পত্রপ্রাপ্তি মাত্রই এতই নভেম্বর বৌভাতে চলে আসার জন্য প্রস্তুত হোন। পত্রদ্বারা আমন্ত্রণের ত্রুটি অমার্জনীয়।

পুনশ্চঃ উপহারস্বরূপ থালা বাটি গ্লাস কিছু আনার দরকার নেই। কারণ, ডিএ পাচ্ছি না বলে আমি থালা বাটি গ্লাসের রিসেল মার্কা ব্যবসা করতে যাচ্ছি না। তবে, বই দিলে কিছু আপত্তি করব না। এটাই আগাম জানিয়ে দিলাম।

পাত্র এবং পাত্রী, দুজনেই উপস্থিত থাকার কথা। এসে দেখে নেবেন।

মুদ্রণসহায়কের সংযোজনঃ কাটা পাঁঠা সবসময়েই বেশি করে ছটফট করে। প্রাণের বন্যা ভাবার কোনও কারণ নেই।

Advertisements

One thought on “একটি অতিসাধারণ ভ্রমণকাহিনি – চতুর্থ পর্ব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s