গুজরাত ফাইলসঃ গোপনীয়তার কাটাছেঁড়া -২

সাধারণভাবে একটা চেষ্টা সবসময়ে আমার তরফ থেকে থাকে, কারুর সমালোচনা করার আগে আমি সমালোচিত ব্যক্তিটির জুতোয় নিজের পা গলিয়ে দেখতে চাই। যেচে তো কেউ সমালোচিত হতে চায় না, কারুর ব্যবহার, প্রকৃতি অন্য কারুর পছন্দ না হলে সমালোচনার ছুতো এসে পড়ে।

রাণা, গত আড়াই মাস ধরে আমার সাথে যা করলেন, সেটাকে আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে পর্যালোচনা করেও ঠিক “ভদ্রতা”র পর্যায়ে ফেলতে পারি নি। বোঝার চেষ্টা করেছি বার বার, একজন লেখিকা, অনেক লড়ে, প্রায় নিজের লাইফ রিস্ক নিয়ে একটা বই লিখেছেন, এবং মেনস্ট্রিম মিডিয়ার প্রায় কোনও রকমের কভারেজ ছাড়াই তিনি সারা ভারতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন নিজের লেখা, আজ জয়পুর, কাল তিরুঅনন্তপুরম, পরশু হায়দ্রাবাদ দৌড়ে বেড়াচ্ছেন, সেখানে হয় তো এক নয়, একাধিক লোক তাঁকে ফোন বা মেসেজ করে চলেছেন, বইয়ের অনুবাদ বা পাবলিসিটি বা অন্য কোনও আবদার নিয়ে, বিরক্ত হওয়া স্বাভাবিক। তবে বিরক্তিরও একটা লজিকাল এন্ড থাকা উচিত বলে আমার মনে হয়, যদি একই লোকের কাছ থেকে বার বার কোনও অনুরোধ আসতে থাকে এবং লেখিকা সেটা নিজে না চান, দ্বিতীয়বারে বলে দিলেই হত যে আমি ইচ্ছুক নই। অতটা অভদ্র আমি নই যে তার পরেও ঘ্যান ঘ্যান করে যাবো।

রাণার সাথে আমার তিনবার ফোনে কথা হয়েছে, রাণা বার বার বলেছেন যে অনুবাদের ব্যাপারটা তাঁর “ব্যাক ইন দা মাইন্ড”-এ রয়েছে, খুব শিগগিরই আমার সাথে কথা বলবেন। … এবং কথা তো তিনি বলেনই নি, এর পরে তিনি যেটা করেছেন সেটা হল, আমার ফোন ওঠানো বন্ধ করেছেন, এবং হোয়াটস্যাপে আমাকে ব্লক করেছেন। অন্য নম্বর থেকে ফোন করে আবার কথা বলাই যেত, কিন্তু আমি সেটা চাই নি।প্রসঙ্গত, আমি রাণাকে ফোন করেছিলাম কেবলমাত্র সপ্তাহে একদিন করে, শনি বা রবিবার। দিনের বেলায়। বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে।

যাক সে দীর্ঘ অজুহাত। রাণার বক্তব্য ছিল যে তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত, পরে যেদিন দিল্লি আসবেন সেদিন আমার সাথে আলোচনা করতে পারবেন। দিল্লিবাসী একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও এই ব্যাপারে আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন, আমি তাঁর কাছেও কৃতজ্ঞ, কিন্তু দুজনের চেষ্টার পরেও রাণা আমাকে জানান নি যে তিনি দিল্লি কবে আসছেন, বা আদৌ আসছেন কিনা।

অবশেষে এ মাসের গোড়ায়, আমি রাণাকে মেল করলাম – যে, আমারও সময়ের দাম আছে। দু মাস ধরে চেষ্টা করছি, কোনও রকমের ফলাফল ছাড়াই, এটা আমার কাছে একটু কস্টলি মনে হচ্ছে এইবারে। আমাকেও অনেক কাজকর্ম সেরে তবে অনুবাদের জন্য সময় বের করতে হয়। এবং আমি বার বার যখন জিজ্ঞেস করেছি, আপনি জানান আমি অনুবাদ চালাবো নাকি আপনার সাথে আলোচনা হওয়া পর্যন্ত কাজ থামিয়ে রাখব, আপনি বার বারই বলেছেন, “পরে আলোচনা করবেন” এবং “অবশ্যই অনুবাদের ব্যাপারটা ভেবে দেখবেন”।

দ্বিতীয় পর্বটা বেশ বড় ছিল, আমার ব্যস্ত কাজকর্মের মধ্যে এটা অনুবাদ করতে বেশ অনেকটা সময় লেগেছে। আমি আমার এই প্রচেষ্টাটাকে বিফলে যেতে দিতে পারি না। রাণাকে লিখেছিলাম, আমি পনেরোই আগস্ট এটা আমার ব্লগে প্রকাশ করব, আপনার যদি কোনও আপত্তি থাকে, আমাকে মেলে, হোয়াটস্যাপে বা কল করে জানাবেন, আমি প্রকাশ করব না। আপনার তরফ থেকে এর পরেও কোনও উত্তর না এলে বুঝব যে আপনার অমত নেই, আমি পনেরো তারিখে দ্বিতীয় পর্বের অনুবাদটা প্রকাশ করব। আর এখানেই আমার আপনার বইয়ের অনুবাদের কাজ শেষ। এর পরে আপনার তরফ থেকে আর উৎসাহ বা সম্মতি না পেলে আমি আর কাজ এগবো না।

আগের সমস্ত মেলের মতই, এই মেলেরও, কোনও উত্তর আসে নি রাণার কাছ থেকে। আমার তরফ থেকে, গুজরাত ফাইলসের, এটাই তাই শেষ অনুবাদ। যাঁরা বাংলা অনুবাদ পড়ার জন্য বসে ছিলেন, তাঁদের বলি, আপনারা ইংরেজি বইটাই কিনে নিন। লেখিকার অসহযোগিতার পরেও আমি বইটির প্রতি একই রকমের অনুরক্ত, এখনও। এটা অনেক অনেক বেশি লোকের পড়া দরকার বলে আমি এখনও মনে করি। সব মানুষ সমান হয় না, তাই আমি লেখিকার ব্যবহারকে মনে না রেখে লেখিকার লেখাকেই মনে রাখতে চাই।

প্রথম পর্বের পর …

512tmzfj1ol-_sx339_bo1204203200_

গভীরে ঢুকে তদন্ত করার প্ল্যান সম্বন্ধে বিস্তারিত জানিয়ে সিনিয়রদের মেল করার সাথে সাথেই উৎসাহব্যঞ্জক উত্তর এসে গেল – আমাকেও ভাবনাচিন্তা শুরু করে দিতে হল। গুজরাতে তিন মাস থেকে যে পরিস্থিতিতে বিভিন্ন লোকেদের কাছ থেকে আমি খবরাখবর এবং তথ্যাবলী পাবার প্রতিশ্রুতি পেয়েছি, তাতে করে এটা আমার কাছে স্পষ্ট ছিল যে, সামনের রাস্তা খুবই কঠিন। ক্ষমতার বিভিন্ন অলিন্দে থাকা একেকজন লোকের কাছ থেকে সত্যটাকে ছেঁকে বের করে নেওয়া খুব সহজ কাজ ছিল না, বিশেষত যারা সত্যিটাকে জেনেবুঝে চেপে রেখেছে। আমার সহকর্মী আশিস খৈতান এই ধরণের কিছু হাড়হিম করা ঘটনা এক্সপোজ করেছিলেন বাবু বজরঙ্গী এবং স্থানীয় কিছু বিজেপি আর ভিএইচপি নেতাদের মুখ থেকে, তারা নিজের মুখে জানিয়েছিল ২০০২-এর দাঙ্গায় তাদের ঠাণ্ডা মাথায় ঘটানো কার্যকলাপের কথা। কিন্তু আমি তো ঠিক সেই ধরণের দাঙ্গাকারীদের সাথে কথা বলতে যাচ্ছিলাম না, যাদের সামান্য উসকে দিলেই গড়গড় করে নিজের বীরত্বের কথা ফলাও করে বলে যাবে;  আমি যাচ্ছিলাম খুব সীজনড, সিনিয়র আইপিএস অফিসারদের সঙ্গে কথা বলতে, যাদের অনেকেই র এবং আইবির সঙ্গে যুক্ত।

এরা সব মোটা চামড়ার ডিপ্লোম্যাট, এদের সাথে কথা চালাবার জন্য বিশেষ স্কিল এবং ব্যক্তিত্ব লাগে, সঙ্গে লাগে ক্ষমতা আর অথরিটি। এর কোনওটাই আমার ছিল না। প্ল্যানিং-এর পাশাপাশি পুরো স্টিংটা করবার দায়িত্বও ছিল একা আমার ওপরে। এটুকু আমি জানতাম যে এই কাজে আমি আমার অফিস থেকে কোনও জুনিয়রকে নিতে পারব না, তাতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে। আমাকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল অফিস থেকে যে আমার এডিটররা আমার গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখবেন, কিন্তু বাকি সমস্তই আমাকে নিজেকে করতে হবে। প্রতিবার আমি ট্র্যান্সক্রিপ্ট পাঠাতাম আর বদলে সোমা আর তরুণের কাছ থেকে উৎসাহব্যঞ্জক রিপ্লাই পেতাম – ‘এক্সেলেন্ট, কীপ অ্যাট ইট’ কিংবা ‘স্টানিং রিভিলিশন’। উৎসাহ আমি পেতাম ঠিকই, কিন্তু সাথে সাথে এটাও জানতাম যে এই ময়দানে আমি একলা সৈন্য। আমাকে নিজের খেয়াল নিজেকেই রাখতে হত, তার সঙ্গে এটাও খেয়াল রাখতে হত আমি যা জোগাড় করতে চলেছি তা হতে হবে সৎ, নিখুঁত আর তথ্যনির্ভর প্রমাণ।

এমন কিছু লোক ছিলেন যাঁরা সত্যিটাকে জানতেন এবং সেগুলোকে নিজের মধ্যেই চেপে রেখে এমনভাবে জীবন কাটিয়ে চলেছিলেন, যেন ২০০২ সালে যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এখানে চলেছিল, তা কখনোই তাঁদের কেরিয়ারের অংশ ছিল না। তেহেলকার মত একটা ইনভেস্টিগেটিং অর্গানাইজেশনের জার্নালিস্ট হিসেবে আমি জানতাম, যে যে দরজাগুলোয় ধাক্কা দিলে আমার সাহায্য পাবার সম্ভাবনা আছে, সেই সমস্ত দরজা আমার জন্য বন্ধ। একটাই রাস্তা আমার কাছে খোলা ছিল, যা সত্য উদ্ঘাটনের শেষ উপায় হিসেবে যে কোনও সাংবাদিক বেছে নেবেন। গো আন্ডারকভার। আমি ছাব্বিশ বছরের একটা মেয়ে, বিশেষত একটা মুসলিম মেয়ে। আমি কখনও আমার এইসব পরিচয় নিয়ে মাথা ঘামাই নি, কিন্তু ধর্মের নামে মেরুকরণ ঘটে যাওয়া একটা রাজ্যে এই ধরণের কাজে নামতে গেলে এই পরিচয়গুলোকে নিয়ে সচেতনে মাথা ঘামাতেই হয়। আমার বাড়ির লোককে জানাতে হবে, আমি কী করতে চলেছি, কী হতে চলেছি।

আমি একটা নামকরা মাস কমিউনিকেশনের কোর্স করেছিলাম, সেইটা এবার কাজে এল। আমার ক্লাসমেটদের মধ্যে একজন উঠতি নায়িকাও ছিল যে ইদানিং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ নাম করে ফেলেছে। রিচা চাড্ডা এখন একজন নামকরা হিরোইন, সম্প্রতি একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিল যে, সে আমার কেরিয়ার গ্রাফ আর অভিজ্ঞতা দেখেই নাকি একটা ফিল্মে রিপোর্টারের রোল করবার অনুপ্রেরণা পেয়েছিল। এই রকম আরেকজন প্রিয় বন্ধুকেও ফোন করে ফেললাম, যার সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ করা হয়ে ওঠে নি। বন্ধুর সাহায্যে আমি তার মেক-আপ ম্যানের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করলাম। পরের দিন, আমি মুম্বাই শহরতলীর একটা স্টুডিওতে বসে চা খেতে খেতে সঠিক পরচুলা পছন্দ করার টেকনিকালিটির ব্যাপারে জ্ঞান আহরণ করছিলাম। মেক-আপ আর্টিস্টের অভিজ্ঞতা অনেকদিনের, তিনি আমাকে তাঁর স্টকের পরচুলা দেখালেন। পরচুলা পরে আলাদা লাগছিল আমাকে, কিন্তু ঠিক যেন খাপ খাচ্ছিল না, বড় বেশি নকল নকল লাগছিল। পরচুলা আমার ঠিক কাজে এল না।

তখন মাথায় বুদ্ধিটা এল, চুল না বদলে, নিজের পুরো পরিচয়টাই বদলে ফেললে কেমন হয়? …ভাগ্যক্রমে এই সময়েই আমি একটা গ্রুপ আইডিতে একটা মেল পেলাম, পাঠিয়েছিল আমার এক সময়ের কলেজের ক্লাসমেট যে পরে লস অ্যাঞ্জেলসের নামকরা আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিট্যুট কনসার্ভেটরি জয়েন করেছিল। আমার মাথায় বুদ্ধি খেলল, এ-ই হবে আমার আইডেন্টিটি। আমেরিকা থেকে আসা একজন ফিল্মমেকার, যে গুজরাতে এসেছে কিছু একটা ফিল্ম বানাতে। আইডিয়াটা মারাত্মক, কিন্তু রূপায়ণ করা খুব অসম্ভব ছিল না।

পরের কয়েকদিন ধরে আমি সেই কনসার্ভেটরি, তার কাজকর্ম, অ্যালামনি, তাদের বানানো ফিল্ম এইসব নিয়ে পড়াশোনা করলাম, পাশাপাশি গুজরাত নিয়ে কী কী ধরণের ফিল্ম বানানো হয়েছে আজ পর্যন্ত, এবং তাতে গুজরাতের কীসে কীসে বেশি ফোকাস রাখা হয়েছে, তা নিয়েও খোঁজাখুঁজি করলাম। অবশেষে, আমি ঠিক করলাম আমার ফিল্মের বিষয় নির্দিষ্ট কিছু থাকবে না, যে চরিত্রের সঙ্গে আমি দেখা করতে যাব, তাদের কে কেমন ব্যবহার করে তার ওপর ভিত্তি করে আমি আমার ফিল্মের স্ক্রিপ্ট বা বিষয় বদলে দেব। আমাকে একটা নাম বাছতে হবে, ঘরোয়া, কনজার্ভেটিভ কিন্তু এমন নাম যা দিয়ে আমার কাজ চলে যাবে।

এখানে একটা কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো, আমি সিনেমার পোকা, এবং সেটা আমাকে বিশালভাবে সাহায্য করেছিল। হিন্দি ফিল্ম দেখতে আমি খুব ভালোবাসি আর যদ্দূর মনে পড়ছে, ওই সময়ে আমি যে হিন্দি ফিল্মটা দেখেছিলাম, সেটা ছিল রাজকুমার সন্তোষীর “লজ্জা”। দিল্লি থেকে মুম্বাই আসার পথে একটা ফ্লাইটে বসে আমি সিনেমাটা দেখেছিলাম। সিনেমাটার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তার বলিষ্ঠ মহিলা চরিত্রগুলো, যা দুর্দান্তভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন মাধুরী দীক্ষিত আর মনীষা কৈরালা। সেখানে মনীষার অভিনীত চরিত্রটির নাম ছিল ‘মৈথিলী’, ভারতীয় মেয়েদের জাত আর লিঙ্গপরিচয়ের ভিত্তিতে যে বৈষম্য সহ্য করে যেতে হয়, সেটাই এই চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। মৈথিলী,  শ্রীরামচন্দ্রের ধর্মপত্নী সীতার আর এক নাম। নামটার মধ্যে কিছু একটা জিনিস ছিল যেটা আমার মনে বসে গেল। সেই জন্য আমি যখন নিজের জন্য দ্বিতীয় একটা নাম খুঁজছিলাম, যেটা পদবীর ভারে ভারাক্রান্ত থাকবে না, আর নামটাও ব্রাহ্মণ বা দলিত-ঘেঁষা হবে না, ‘মৈথিলী ত্যাগী’ নামটা আমি ফাইনালি পছন্দ করলাম। আমার ভিজিটিং কার্ড তৈরি হলঃ মৈথিলী ত্যাগী, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার, অ্যামেরিকান ফিল্ম ইনস্টিট্যুট কনজার্ভেটরি।

কিন্তু, দ্বিতীয়বার গুজরাত যাবার প্রস্তুতি শুরু করবার আগে আমার দরকার একজন সহকারী, যাকে আমি পেয়েও গেলাম খুব তাড়াতাড়ি এবং যার অস্তিত্ব আমার জীবনে এক গভীর ছাপ রেখে গেছে। মাইক (নাম পরিবর্তিত) ছিল ফ্রান্সের এক বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র, সে ভারতে এসেছিল কোনও স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে। মাইক চাইছিল কোনও ভারতীয় সাংবাদিকের সঙ্গে থেকে ভারতে কাজ করতে। আমি তাকে একটা ইমেল লিখলাম, আমার ইনভেস্টিগেশনের বিষয়-লক্ষ্য সম্বন্ধে খুব বিশদ বিবরণ ছাড়াই, যদিও আমি যতটুকু লিখেছিলাম, তাতে আমি কোনও অসত্য কথা লিখি নি।

আমি জানিয়েছিলাম আমি একজন অ-ভারতীয় সহকারী চাইছি, যে আমার সাথে একটা ফিল্ম শুট করার কাজে সাহায্য করবার অভিনয় করতে পারবে। আমি তাকে আরও জানিয়েছিলাম যে, এটা একটা অনেক বড়, খুবই স্পর্শকাতর ইনভেস্টিগেশনের অংশ হিসেবে জরুরি, কিন্তু মাইক কখনওই সেই স্পর্শকাতর বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ জানতে চেষ্টা করবে না। আর এটাও জানিয়েছিলাম, তাকে আমার সঙ্গে কাজ করতে হবে আমার একজন “ফিরঙ্গ্‌, সাদা-চামড়া” সহকারীর মুখ হয়ে, যাতে আমার পরিচয়ে কেউ কখনও কোনও সন্দেহ না করে।

এর পর, ভিজিটিং কার্ড ব্যাগে ভরে, চোখে ছাই-ধূসর রঙের লেন্স লাগিয়ে, হেয়ার স্ট্রেটনার আর রঙবেরঙের বাঁধনী নিয়ে, আর কিছু রেকর্ডিং ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে আমি আহমেদাবাদে ল্যান্ড করলাম। মাইকের আসার কথা আরও দিন দুয়েক বাদে। পৌঁছনোর সাথে সাথেই আমি মৈথিলী ত্যাগী নামে একটা সিম কার্ড কিনলাম। আমার আহমেদাবাদের তথাকথিত “গার্জিয়ান ফ্যামিলি”র দেওয়া ডকুমেন্ট দিয়ে ব্যাপারটা এত সহজে হয়ে গেল, দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। এই ইনভেস্টিগেশন অনেক লম্বা সময় ধরে চলবে। আমি বা আমার সংস্থা, কেউই অত দিন ধরে কোনও নামীদামী হোটেলে আমার থাকাখাওয়ার খরচ বইতে সক্ষম নয়। তার ওপর আমি অভিনয় করছি একজন স্ট্রাগলিং ফিল্মমেকারের, যার খুব অঢেল টাকাপয়সা নেই। এই রকমের একটা চরিত্রের জন্য থাকার জায়গার ব্যবস্থা করতে পারে একমাত্র স্থানীয় কনট্যাক্ট। এইবারে আমাকে সাহায্য করলেন আমার এক শিল্পী বন্ধু, যাঁর আহমেদাবাদের সাহিত্যিক এবং শৈল্পিক মহলে খুব ভালো জানাশোনা আছে। ভাগ্য ভালো তিনি আমাকে খুব বেশি কোনও প্রশ্ন করেন নি। আমিই সেই জার্নালিস্ট যার জন্য গুজরাতের হোম মিনিস্টারকে জেলে যেতে হয়েছে, এই তথ্যটুকুই তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিল, তিনি সহজেই তাঁর প্রভাব খাটিয়ে নেহরু ইনস্টিট্যুশন নামে একটা এডুকেশনাল ইনস্টিট্যুটে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।

হস্টেল ওয়ার্ডেনের কাছে আমার পরিচয় দেওয়া হল একজন ফিল্মমেকার হিসেবে, উনি আমার দিকে তাকিয়েও দেখলেন না, কেবল খুব হাত পা নাড়িয়ে আমার বন্ধুর সঙ্গে গল্প করে গেলেন। হস্টেলের একটা ২৫০ স্কোয়্যার ফিটের একটা ঘরে, ওয়াশরুম সংলগ্ন, আমার খুব সহজেই থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল, দৈনিক আড়াইশো টাকার কড়ারে। এর সাথে সাথে, আমার আশেপাশের ঘরের বোর্ডাররাও আমার ইনভেস্টিগেশনের কাজে খুব সাহায্যে এসেছিল। এরা ছিল ইওরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীর দল – জার্মানি, গ্রীনল্যান্ড, লন্ডন।

হস্টেলে আমার প্রথম পরিচিতি ছিলেন মানিক ভাই (নাম পরিবর্তিত), হস্টেলের ডীন বা ম্যানেজার। “ম্যাডাম এখানে গুজরাত নিয়ে একটা ফিল্ম বানাতে এসেছেন” বলে আমার বন্ধু তাঁর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। “বাঃ, দারুণ”, বলেছিলেন মানিক ভাই, “আমার শহর আর আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর সম্বন্ধে ভালো ভালো কথা বলবেন কিন্তু। আমাদের আহমেদাবাদ কিন্তু সত্যিই একটা সুন্দর শহর।” একনিশ্বাসে কথাগুলো বলেই উনি আমাকে শহরটা ঘুরিয়ে দেখাবার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। আমার ছোট্ট ঘরে একটা খাট, একটা টেবিল আর একটা বইয়ের স্ট্যান্ড ধরে যাবার মত জায়গা ছিল। কিন্তু জায়গার অভাব পুষিয়ে দিয়েছিল হস্টেলের লোকেশনটা। গুজরাতের অন্যতম একটা কর্মব্যস্ত শহরের ঠিক মধ্যিখানে এই হস্টেলটা পরের ছ মাসের জন্য আমার ঘর হয়ে গেছিল।

মাইক এল পরদিন সকালে, ফর্সা দীর্ঘকায় এক ফরাসী কিশোর, উনিশ বছর বয়স্ক, একমাথা এলোমেলো চুল। ওকে হস্টেলে নিয়ে আসার আগে আমি ওর সাথে দেখা করলাম এক বন্ধুর বাড়িতে, ওকে মোটামুটি ওর রোল সম্বন্ধে বোঝালাম।

মানিক ভাইয়ের অশেষ দয়ার শরীর, উনি আমার পাশের ঘরেই পরের এক মাসের জন্য মাইকের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। অবশ্য মাইক যে তার আগেই “কেম ছো” বলে তাঁর মন জিতে নিয়েছিল, সেটাও এখানে বলে রাখা উচিত। মাইক ছিল একজন শিক্ষার্থী, নিজে নিজেই সংস্কৃতি শিখে নেবার এক অদম্য প্রচেষ্টা তার মধ্যে কাজ করত, যদিও তার বিশেষ নজর ছিল খাওয়াদাওয়ার প্রতি। আমরা প্রথম সন্ধ্যেয় ডিনার সারলাম পাকওয়ান নামে আহমেদাবাদের বিখ্যাত থালি জয়েন্টে। বেশ মনে আছে, মাইক প্রায় দু ডজন পুরি আর ছ বাটি হালুয়া খেয়েছিল একসঙ্গে, আমি হাঁ করে দেখেছিলাম।

খেয়েদেয়ে আমরা হস্টেলের সিঁড়ি দিয়ে যখন উঠছিলাম, মাইক আমায় জিজ্ঞেস করল, ‘তো – আশেপাশে যখন আর কেউ থাকবে না, তখন কি আমি তোমায় রাণা বলে ডাকতে পারি?’

‘না। আমার নাম মৈথিলী, যতক্ষণ তুমি এই দেশে আছো।’

মাইক কথা রেখেছিল। যেদিন সে শেষবারের মত প্যারিস চলে গেল, তার একদিন আগে আমার জন্য হিন্দিতে একটা ছোট্ট নোট লিখে রেখে গেছিল, ‘প্রিয় মৈথিলী, ভালো থেকো – মাইক।’

নতুন জীবনের সাথে মানিয়ে নেবার জন্য প্রথম কয়েকদিন আমরা নেহরু ফাউন্ডেশনের ভেতরেই কাটালাম। মাইক তার ঘরে বসে একটা ফ্রেঞ্চ-হিন্দি ট্রানস্লেশনের বই নিয়ে বসে আমাকে পরের পর প্রশ্ন করে চলত, আর তার সাথে সাথেই মার্ক টালির একটা বই পড়ত। বয়েসের তুলনায় মাইক ছিল খুব পড়ুয়া, নিজস্ব মতবাদ তৈরি হওয়া, খোলা এবং যুক্তিপূর্ণ মননের একজন মানুষ। খুব দ্রুত সে কোনও বিষয়ে বিস্তারিত পড়ে ফেলতে পারত। আমাদের ফাউন্ডেশনে একটা ক্যান্টিন ছিল যেখানে লাঞ্চের থালি পাওয়া যেত ২৫ টাকায়। তার সামনেই ছিল একটা বাঁকানো সিঁড়ি, আর সেই সিঁড়ির প্রান্তে ছিল ইনস্টিট্যুটের টেরেস, সেই টেরেসের অন্যপ্রান্তে ছিল ছবির মত একটা জঙ্গল। প্রত্যেকদিন দুপুরে মাইক আর আমি টেরেসে চলে যেতাম ল্যাপটপ নিয়ে, লাঞ্চ করতে করতে কাজ করতাম। মাইক আমায় প্রায়ই প্রশ্ন করত, ‘তো মৈথিলী, এবার আমাদের প্ল্যান কী? কার সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে?’ আর আমি জবাব দিতাম, ‘সঠিক সময় এলেই আমি তোমায় জানাবো।’

সন্ধ্যের দিকে মাইক আর আমি ক্যামেরা নিয়ে পুরনো সিটিতে ঘুরতে বেরোতাম, ফটো তুলতাম। আমাদের দুজনেরই ফটোগ্রাফিতে শখ ছিল, আর আমাদের দুজনেরই একই মডেলের এসএলআর ক্যামেরা ছিল। আমাদের এই ফটো তুলতে ঘোরার সাথে যদিও আমাদের প্যাশনের কোনও সরাসরি সম্পর্ক ছিল না, আমরা শুধু যে পরিচয়ে অভিনয় করছি, সেই পরিচয়টাকেই পোক্ত করার তাগিদ ছিল, যাতে, যদি আমাদের কেউ লুকিয়ে ওয়াচ করে থাকে, সে বা তারা কোনওভাবেই আমাদের সন্দেহ না করে। যদি কখনও কোনও উঁচু পদের অফিশিয়ালের সাথে আমাদের দেখা করতে হয়, তখন তার আগে তো আমাদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেকিং হবেই – বিশেষত আমরা যে এলাকায় রয়েছি, সেই এলাকায় আমাদের নামে খোঁজখবর নেওয়া হবেই। আমরা চাইছিলাম আহমেদাবাদে আমাদের নিজেদের একটা সামাজিক পরিচয় তৈরি করতে – যেটা পরে আমাদের নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করবে।

আমদাবাদ নি গুফা – বিখ্যাত চিত্রকর মকবুল ফিদা হুসেনের প্রতিষ্ঠিত এই বিখ্যাত আর্ট মিউজিয়ামটা এই ব্যাপারে আমাদের খুব কাজে এল। মিউজিয়ামটার চারপাশে ঘিরে আছে একটা বিশাল পার্ক, একপ্রান্তে একটা ক্যাফে যেখানে মূলত আর্টিস্ট আর ফোটোগ্রাফাররা ভিড় জমায়। কেউ হয় তো গীটার বাজাচ্ছে, কেউ তার কাজের প্রোমোশন করছে। এ ছাড়াও কিছু উঠতি ফিল্মমেকার, ফোটোগ্রাফার আর থিয়েটার আর্টিস্ট সেখানে আসা-যাওয়া করে। সন্ধ্যেবেলায় সেখানে গিয়ে মৈথিলী হিসেবে আমি, আর মাইক খুব এনজয় করতাম।

লাল দরওয়াজা, পুরনো গুজরাতের খুব নামকরা একটা জায়গা, মাইকের খুব পছন্দ ছিল। প্রত্যেক বৃহস্পতিবার সেখানে হাট বসে। নানা ধরণের ঘুড়ি আর মাটির জিনিস নিয়ে লোকজন বসে সেখানে। সারাদিন সেখানে ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যেবেলায় ফিরে এসে মাইক কিছু দারুণ দারুণ শট দেখাত, আর তারপরেই তার চিরাচরিত প্রশ্ন হত, ‘আজ রাতে আমরা কোথায় খেতে যাচ্ছি?’ মাইক খেতে কিছু ভালোবাসত, আর এই বিষয়ে গুজরাত তার জন্য ছিল আদর্শ জায়গা।

এই সময়ে এক অ্যাক্টিভিস্ট বন্ধুর ইমেলের মাধ্যমে প্রথম সাহায্য এল। আমি কয়েকজন বড় বড় অফিসারের সাথে কনট্যাক্ট বানাবার চেষ্টা করছিলাম, তাঁদের মধ্যে প্রথম নামটা ছিল জি এস সিঙ্ঘল-এর; তিনি তখন গুজরাত এটিএস-এর সর্বেসর্বা। সিঙ্ঘলের বিরুদ্ধে তখন তদন্ত চলছিল, ইশরাত জাহান ফেক এনকাউন্টারের ঘটনায় তাঁর ভূমিকাকে কেন্দ্র করে। আমার সাংবাদিক আর অফিসার বন্ধুদের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে আমি শুধু এটুকুই জানতে পেরেছিলাম, উনি নিজেকে একদম গুটিয়ে নিয়েছেন, বন্ধুর সংখ্যাও কমিয়ে দিয়েছেন, আর মিডিয়াকে একেবারেই এন্টারটেইন করেন না। জানতে পেরেছিলাম, এখন উনি প্রায় সকলকেই সন্দেহের তালিকায় রাখেন। ওনার কাছে পৌঁছবার তা হলে উপায় কী?

ইমেলে ছিল নরেশ আর হিতু কানোদিয়ার নাম, গুজরাত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দুই নামকরা অভিনেতা। নরেশ কানোদিয়াকে বলা হয় গুজরাতের অমিতাভ বচ্চন। হিতু এঁরই ছেলে, দক্ষিণ মুম্বাইতে পড়াশোনা করার পরে বাবার রাস্তাই বেছে নিয়েছেন, কারণ হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সফল হতে গেলে অনেক বেশি সময় লেগে যেতে পারত।

ইমেলে লেখা ছিল এই দুই কানোদিয়া দলিত সম্প্রদায়ের এবং সিঙ্ঘল সমেত বিভিন্ন অফিশিয়ালের সঙ্গে এঁদের ওঠাবসা আছে। ঘটনাচক্রে সিঙ্ঘল নিজেও একজন দলিত। আমি সাথে সাথে নরেশ কানোদিয়াকে ফোন করলাম এবং উনি আমাকে পরদিন সকালে আহমেদাবাদ জিমখানায় দেখা করতে বললেন। যদিও দেখা করে বিশেষ কিছুই লাভ হল না। আমি এত কায়দা করে ইংরেজিতে অ্যাকসেন্ট এনে কথা বলতে লাগলাম, আর উনি ভাবলেশহীন মুখে বসে রইলেন। এওবার উঠে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, চুলে একবার চিরুনি চালালেন আর তার পরে খুব নিস্পৃহ গলায় আমাকে বললেন, ‘বেন, হিন্দি মে বোলো না, আর একটু আস্তে বলো, বহুত ফাস্ট হো তুম।’

আমার হোমওয়ার্ক ঠিক ছিল না। পরবর্তী এক ঘণ্টা ধরে আমি আমার ফিল্মের বিষয় নিয়ে তাঁকে বিস্তারিত বোঝালাম – গুজরাতের যে সব বিষয় নিয়ে লোকে কম জানে, যেমন, গুজরাতি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, আর গুজরাতের দলিত বর্গের সাফল্যের কাহিনি,সেইগুলো আমি তুলে ধরতে চাই আমার ফিল্মে। মনে হয় কথাগুলো ওনার মনে দাগ কাটল, চোখে ঝিলিক দেখতে পেলাম। একজন লোক যে নিজেকে ‘স্টার’ মনে করে, কিন্তু হিন্দি সিনেমার দাপটে যার জনপ্রিয়তা নিজের রাজ্যেও খুব বড়মাপের কিছু নয়, তার কাজের স্বীকৃতি দিচ্ছে একজন ‘বিলায়েতি’ ফিল্মমেকার, এর একটা প্রতিফলন তো পড়বেই তার চোখের দৃষ্টিতে।

কানোদিয়া আমাকে নিমন্ত্রণ করলেন, পরদিন ১০০ কিলোমিটার দূরের একটা গ্রামে যেতে, ফিল্মের সেটে তাঁর কেরামতি দেখবার জন্য। সেদিন কথা শেষ করে আমি যখন ঘরে ফিরেছিলাম, বিছানায় বসে বসে কেবল ভাবছিলাম, কেন এই নিষ্ফল কাজকর্মে জড়াচ্ছি নিজেকে। যে সম্ভাবনার পেছনে দৌড়চ্ছি, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু এ ছাড়া তো আমার আর কোনও উপায়ও নেই। … আমার এসএলআর ক্যামেরা আর নোটবুক নিয়ে আমি পরদিন সকালে বেরোতেই মাইক আমাকে আটকাল। ‘তুমি লেন্স নিতে ভুলে গেছো।’ … আমি অভিনয়ে এখনও অতটা দক্ষ হয়ে উঠি নি।

ফিল্মের সেট সাজানো হয়েছে শহরের একদম বাইরে একটা গ্রামে, হাজারো মানুষ ভিড় করে শুটিং দেখতে এসেছে। কানোদিয়ার ছেলে হিতু, দক্ষিণ মুম্বাইয়ের ঝকঝকে গ্রাজুয়েট একটা কয়েদীর পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে, আর বাবার পরণে পুলিশের পোশাক।

আমাকে একটা চেয়ার দেওয়া হল, বসে বসে শুটিং দেখবার জন্য। আমি মন দিয়ে নোট নিতে থাকলাম আর শুটিংয়ের বিভিন্ন সিকোয়েন্সের ফটো তুলতে লাগলাম। অবশ্য আমি একলা ছিলাম না – একজন সদ্য তিরিশ ছোঁয়া যুবককে দেখলাম, ট্রাইপড আর লেন্স নিয়ে কিছু সিকোয়েন্সের দুর্দান্ত সব শট নিচ্ছে। হাবভাবে তো মনে হল না সে এই শুটিং ইউনিটের কেউ। কানোদিয়া মাঝে একবার এসে আলাপ করিয়ে দিয়ে গেলেন যুবকটির সাথে, ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার হিসেবে, সে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে একবার আমার আর মাইকের দিকে তাকিয়ে দেখল শুধু। তার নাম অজয় পঞ্জওয়ানি (নাম পরিবর্তিত), যার সাথে পরের কয়েক মাসে আমার এক অদ্ভূত সখ্যতা হল, এক এমন গভীর বন্ধুত্ব যা হয় তো আমি আমার আসল পরিচয় নিয়ে করতে পারতাম না। কিন্তু মৈথিলী পারল, হয়তো মৈথিলীর এই বন্ধুত্বটা দরকার ছিল।

পরের কয়েকদিন আমার এইভাবেই কাটল, কানোদিয়ার ফিল্মের সেটে যাওয়া, গল্পগুজব করা, ফিল্ম জগতের বিষয়ে কিছু আলোচনা করা, আর ‘ইউনিট কি চায়’তে চুমুক দেওয়া।

অজয়ও রোজ আসত ফিল্মের সেটে, গুজরাতি ফিল্মের ওপর ডকুমেন্টারি বানানোর কাজে, সে খুব মার্জিত ব্যবহার করত আমাদের সাথে, সময়মত জানিয়েও দিয়েছিল কোনও সাহায্যের প্রয়োজন হলে তাকে জানাতে। এই রকমই একদিন আলোচনার মধ্যে আমি আসল কথাটা পাড়লাম, যে আমি গুজরাতের কয়েকজন নামকরা পুলিশকর্তার সাথে দেখা করতে চাই, বিশেষত যাঁরা দলিত সম্প্রদায়ের থেকে উঠে এসেছেন। আমি কানোদিয়াকে বলেছিলাম, যদি এই রকমের কোনও অফিসার খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনও পদে আসীন থাকেন, যেখানে খুব সাহসিকতার প্রয়োজন হয়, যাঁর কাজকর্মের মাধ্যমে গুজরাতের সুরক্ষা, নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদের একটা আভাস পাওয়া যায়, তা হলে তিনি আমার খুব কাজে আসবেন।

শেষ লাইনে ম্যাজিকের মত কাজ হল। ‘আপনার তো তা হলে মিস্টার সিঙ্ঘলের সাথে দেখা করা উচিত, অন্যতম সেরা অফিসার, প্রচুর সন্ত্রাসবাদীকে উনি মেরেছেন।’ আমি প্রাণপণ চেষ্টা করলাম নিজের অভিব্যক্তি স্বাভাবিক রাখতে, এমন ভাব দেখালাম যেন নামটা আমি এই প্রথম শুনছি।

‘তো এই অফিসার সিঙ্ঘল কী করেন স্যর, মানে কী ধরণের কাজ করেন?’ অত্যন্ত নিরীহ মুখে আমি প্রশ্নটা করলাম। আমার ফিল্মি বন্ধুদের কাছ থেকে এটাই তো আমি চাইছিলাম, একটা এন্ট্রি পয়েন্ট, এমন একটা রেফারেন্স যেটা কোনও সন্দেহের উদ্রেক ঘটাবে না, সিঙ্ঘল আর যাই হোক, একজন টপমোস্ট রিজিওনাল ফিল্মমেকারের রেফারেন্সে আসা আরেকজন ফিল্মমেকারকে কোনওভাবেই সন্দেহ করবেন না।

প্রায় একই সময়ে আমার আহমেদাবাদের সোর্স, যাকে আমি আমার সাহায্যের ধরণ সম্বন্ধে আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম, আমাকে আরেকটা ইমেল পাঠালেন। তাতে ছিল আরেকটা কনট্যাক্ট, শহরের এক অন্যতম একজন খ্যাতনামা স্ত্রীরোগ-বিশেষজ্ঞ, যাঁর নাম আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই না।

আমার ইউনিনর মোবাইলের নেটওয়ার্ক ঘরের মধ্যে সবসময়ে কাজ করত না, তাই বেশির ভাগ সময়েই আমাকে বাইরে টেরেসে এসে কথা বলতে হত, যেখানে হস্টেলের বাসিন্দারা চা সিগারেট নিয়ে সবসময়েই ঘোরাফেরা করত। মাইকও তাদের মধ্যে একজন ছিল। সেদিন আমি টেরেসে দাঁড়িয়ে সেই গাইনিকোলজিস্টকে ফোন করলাম, নিজের পরিচয় দিলাম ফিল্মমেকার হিসেবে, বললাম আমি গুজরাতের ওপর ফিল্ম বানাতে চাই এবং তাতে গুজরাতের হেলথ সেক্টরও দেখাতে চাই। ডাক্তারটি সহৃদয় ব্যক্তি, আমাকে সেদিন সন্ধ্যেবেলাতেই তাঁর হাসপাতালে আসতে বললেন। আমিও তো সেটাই চাইছিলাম। আমি বেরোবার প্রস্তুতি নিতেই মাইক দৌড়ে এল, ‘মৈথিলী, একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?’ ও বলে চলল, ‘মৈথিলী, এইভাবে তো কাজ করা যায় না। তুমি যার সাথেই দেখা করছো তাকেই বলছো তুমি নাকি একটা ফিল্ম বানাচ্ছো, কিন্তু অন্তত আমাকে তো সত্যি কথাটা বলো!’ আমি চেষ্টা করলাম মাইকের কৌতূহলকে পাশ কাটাতে, কিন্তু মাইক অত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়, সে যেন আমার পাশ কাটানোতে আহত হল। ‘আমি তো বাচ্চা ছেলে নই, আমি প্রচুর পড়াশোনা করি, জীবনে কিছু একটা করেছি আমি। তুমি আমাকে বলো, তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো? নাকি আমি তোমার কাছে স্রেফ একটা বিদেশী মুখ, যাকে তুমি একটা অ্যাকসেসরি হিসেবে জায়গায় জায়গায় দেখিয়ে বেড়াচ্ছো?’ আমি প্রথমে ভাবলাম, এগুলো বোধ হয় ও অনেকবার ঝালিয়ে এসে তবে আমাকে বলছে, কিন্তু ওর এই ফেটে পড়া ভাবে এমন একটা কিছু ছিল, যে আমাকে ওর বিশ্বাস ধরে রাখবার জন্য আমার আসল তদন্তের ব্যাপারে ওকে কিছু জানাতে হল। মিটিংয়ে বেরোবার আগে আমি ওকে কিছু লিঙ্ক ফরোয়ার্ড করে পড়তে বলে গেলাম যাতে আমি ফিরে আসতে আসতে ও আমার তদন্তের বিষয়বস্তুর পুরো ব্যাকগ্রাউন্ডটা বুঝে ফেলতে পারে।

ডাক্তারের সাথে দেখা করাটা আমার খুব কাজে এল। উনি আমাকে সাহায্য করতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আগ্রহী ছিলেন। আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম যদি কোনও মহিলা ডাক্তারের সাথে উনি যোগাযোগ করিয়ে দেন; এমন কেউ যিনি গুজরাতে বেশ জনপ্রিয়, যাঁকে আমি আমার ফিল্মের জন্য শুট করতে পারি। আমি উত্তরটা আন্দাজ করেছিলাম, এমনি এমনি কি আর আমি একজন গাইনিকোলজিস্টের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম? ২০০২-এর গুজরাত দাঙ্গা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রে একটা দগদগে ঘা হয়ে আছে, এই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ উস্কানিদাতাদের মধ্যে একজন ছিলেন মায়া কোদনানি, আহমেদাবাদের একজন এমএলএ, দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকের জবানবন্দীতে যাঁর নাম বার বার উঠে এসেছে। কোদনানি আমার জন্য একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন, কারণ আমি আশা করেছিলাম যে স্টোরির খোঁজে আমি এসেছি, তার গভীর পর্যন্ত আমাকে যেতে সাহায্য করতে পারেন ইনি।

সেদিন সন্ধ্যেতেই আমার উপস্থিতিতে ডাক্তার মায়া কোদনানিকে কল করে জানালেন, ইউএসএ থেকে আসা, দারুণ প্রোফাইলের একজন ফিল্মমেকার এসেছেন তাঁর ইন্টারভিউ নিতে এবং তিনি নিজে এর প্রতিভা সম্বন্ধে সংশয়হীন। আমার অভিনয় নিখুঁতভাবে বজায় রাখবার জন্য আমি এর পরেও সপ্তাহে একদিন করে ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে আসতাম, আমার ‘রিসার্চ ওয়ার্ক’এর জন্য।

সেদিন সন্ধ্যেয় আমি যখন হস্টেলে ফিরে এলাম, দেখি মাইক ততক্ষণে একটা কাগজে আমার জন্য অনেক প্রশ্ন টুকে রেখেছে, সব পড়ার পরে ওর যাদের “ক্রিমিনাল” মনে হয়েছে, তাদের নাম সমেত। মাইকের কথাই ঠিক, ওকে যে স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের এ দেশে নিয়ে আসা হয়েছে, তার কারণ আছে। সেই সন্ধ্যেয় ও আমার সমস্ত কথা মন দিয়ে শুনল, সঠিক সময়ে সঠিক প্রশ্ন রাখল, আর সঠিক তথ্য নথিবদ্ধ করল। আমি ওকে জানালাম আমি কীভাবে আমার প্ল্যান দরকার মত পাল্টাবো যদি আগের প্ল্যান ঠিকমত কাজে না আসে। ও জিজ্ঞেস করল, কীভাবে প্ল্যান করা হবে। আমি বললাম, “কালকে, কালকে আমরা বসব আমাদের প্রথম প্ল্যান টেস্ট করতে।’

পরের দিন আমাদের মায়া কোদনানির সাথে দেখা করার ছিল। ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হবার সুবাদে আমার এটা জানা ছিল যে, কোনও জায়গা থেকে তথ্য প্রথম থেকেই বেরোতে শুরু করে না, আর যখন তা বেরোয়, তখন খুব বেশি আগ্রহ প্রকাশ করতে নেই। আমি মাইককে প্রস্তুত করলাম সেইমত। ‘আজ আমাদের ফিল্মমেকার সাজতে হবে, জাস্ট ফিল্মমেকার।’ নারোদার মেন রাস্তার ওপরে মায়াবেনের ক্লিনিক। নারোদা-পাটিয়ার কুখ্যাত হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছিল এই তিনবার এমএলএ হওয়া ডাক্তারের ক্লিনিক থেকে ঢিল-ছোঁড়া দূরত্বে – যে হত্যাকাণ্ডে একশোরও বেশি লোককে নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হয়েছিল। এঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এটাই, যে হত্যাকারীরা সেদিন প্ররোচনামূলক শ্লোগান দিতে দিতে মুসলিমদের কচুকাটা করছিল, সেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইনিই।

মাইক আর আমি কোদনানির ক্লিনিকে গিয়ে দেখলাম স্থানীয় মহিলারা তাঁর কেবিনের বাইরে, সরু সরু বেঞ্চের ওপর বসে অপেক্ষা করছেন। ঢোকার মুখে হাট্টাকাট্টা চেহারার দুজন লোক দাঁড়িয়ে, একজনের হাতে বন্দুক। আমাদের দেখে বন্দুকধারী দাঁড় করাল, মোবাইলে বসের সাথে কথা বলে নিঃসন্দেহ হল, তার পরে আমাদের ভেতরে যেতে দিল। ইনি মায়া কোদনানির দেহরক্ষী, এসআইটি (স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম) মায়া কোদনানির পেছনে পড়ার দিন থেকে যিনি এই ক্লিনিকটিকে সুরক্ষা প্রদান করে আসছেন। বিল্ডিংটি দোতলা, আরও নানা ডাক্তারের ক্লিনিক রয়েছে সেখানে। কোদনানির ক্লিনিকের পাশেই রয়েছে একটা অপারেশন থিয়েটার।

প্রতি বৃহস্পতিবারে এখানে নিম্নবিত্ত ঘর থেকে আসা রোগীদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। একটা ডিসপ্লে প্লেটে লেখা আছে, ‘বৃহস্পতিবারের ফী পঞ্চাশ টাকা মাত্র’। কম্পাউন্ডার আমাদের খুব সন্দেহের চোখে দেখল, তার পরে ব্জানাল এই ক্লিনিকে শুধু স্থানীয় মানুষদেরই চিকিৎসা করা হয়। আমি বললাম, আমরা ফিল্মমেকার, ম্যাডামের সাথে দেখা করতে এসেছি।

আমি নোটবুকে কিছু লেখালিখির চেষ্টা করতে থাকলাম, ততক্ষণ মাইক একমনে বসে টিভিতে সংস্কার চ্যানেল দেখতে থাকল। এক বয়স্কা মহিলা তাঁর পুত্রবধূকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, তিনি সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হয়ে টিভিতে দৃশ্যমান বাবাকে শ্রদ্ধা জানালেন। মাইক পুরো হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকাল। আমি ওর দিকে মুচকি হেসে নোটবুকের ওপর নজর সরিয়ে আনলাম আবার।

ঠিক সেই সময়েই, ‘মৈথিলী কৌন ছে’ বলে হাঁকলেন কোদনানির অ্যাসিসট্যান্ট, আর কোদনানি স্বয়ং কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। হাত নেড়ে আমাকে আর মাইককে ভেতরে ডাকলেন। আমি খাঁটি আমেরিকান উচ্চারণে নিজের আর মাইকের পরিচয় দিলাম। অতঃপর একটি উষ্ণ করমর্দন।

‘তোমার নামটা খুব সুন্দর, জানো, এটা সীতাজির নাম’, কোদনানিকে দেখেই মনে হচ্ছিল তিনি খুব উচ্ছ্বসিত। ‘ওহ্‌ ইয়েস ম্যাম, আমার বাবা সংস্কৃতের শিক্ষক, তাই আমাদের বাড়িতে সকলেরই এমন সুন্দর সুন্দর নাম।’ এ কথায় কোদনানি এতটাই আশ্বস্ত হলেন যে মাইকের দিকে উনি আর দ্বিতীয়বার ফিরেই তাকালেন না, যদিও মাইক তাতে খুবই বিরক্ত হয়েছিল। কোদনানির ডেস্কে রাখা আছে কিছু মেডিসিন আর গাইনিকোলজির বই, কিছু বিজেপির প্যামফ্লেট আর কিছু গুজরাতের সিন্ধী কমিউনিটির প্যামফ্লেট। তার পাশেই ছেলে আর তার বউয়ের ছবি, তারা এখন আমেরিকায় স্থায়ী বাসিন্দা। আমরা তাঁর কেরিয়ার নিয়ে আলোচনা চালালাম, উনি ওঁর পরিবার সম্বন্ধে কিছু বললেন, মাঝে কোল্ডড্রিঙ্কস এল।

মায়াবেন কিছুদিন স্বাস্থ্য ও শিশুবিকাশ মন্ত্রী ছিলেন এ রাজ্যে, সেই প্রসঙ্গ তুলে আমি খুব খানিক প্রশংসা করলাম, মহিলাদের ভালো করার জন্য তাঁর অবদানের কথা বললাম। ‘তো বলো, কী দরকার আমার সাথে?’ অবশেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমি জাস্ট আপনার সম্বন্ধে আরও জানতে চাই ম্যাম, আমরা আপনাকে আমাদের ফিল্মের একজন প্রোফাইল বানাতে চাই, গুজরাতের একজন অ্যাচিভার হিসেবে।’ সাধারণ ভাবে সুস্থ কোনও মানুষই নিজের সম্পর্কে ভালো ভালো, মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনতে বা নিজেদের মহান হিসেবে দেখতে একেবারে অপছন্দ করেন না, রাজনীতির সাথে যুক্ত মানুষরা তো আরোই না। উনি সাথে সাথে আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন, এবং আমরা পরের রবিবার ওঁর অ্যাপার্টমেন্টে দুপুরে লাঞ্চের নেমন্তন্ন পেলাম। ‘দ্যাট উড বি পা-ফেক্ট’ – প্রাণপণে “আর”-গুলোকে জিভ গুটিয়ে উচ্চারণ করে বললাম।

কেবিন থেকে বেরোবার আগে আমি মনে করে কোদনানির শাড়ি আর গয়নার উচ্চ প্রশংসা করলাম। বেরোবার সময়ে সিকিওরিটির লোকটিকে দেখে মনে হল না সে খুব একটা খুশি হয়েছে। আমরা একটা অটো ধরে সোজা পাকওয়ানে পৌঁছলাম। মাইক দৃশ্যতই খুব অসন্তুষ্ট, ‘দেখলে, উনি আমার দিকে একবার তাকালেন না পর্যন্ত’। আমি ওকে সান্ত্বনা দেবার আগেই হালওয়া আর রাবড়ি এসে গেল। গুজরাতে থালি অর্ডার করলে, ডেজার্ট সবার প্রথমে দেওয়া হয়। মাইক কোদনানির কথা ভুলে গিয়ে খাবারে মন দিল, আর পাকওয়ানের মহারাজ মাইককে শিখিয়ে দিতে থাকলেন কোন খাবারের কী নাম, কী রকম উচ্চারণ। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

রাত প্রায় দশটার সময়ে আমরা হস্টেলে পৌঁছলাম। ঘরে পা দিতেই কী রকম একটা যেন লাগল, কিছু যেন একটা ঘটেছে ঘরে। আমি বিছানা পরিপাটি করে গুছিয়ে রেখে বেরিয়েছিলাম, কিন্তু এখন বেডশীটটা কোঁচকানো, আমার ল্যাপটপ অন করা। সুটকেস আর ড্রয়ারে যদিও মনে হল কেউ হাত দেয় নি, কিন্তু এটুকু বোঝা যাচ্ছিল আমার অবর্তমানে কেউ এ ঘরে ঢুকেছিল। আমি অবাক হই নি, আমি আন্দাজ করেছিলাম এ রকম কিছু একটা ঘটবে, আর এই আন্দাজের ভিত্তিতেই আমি গুজরাতে আসার আগে আমার ল্যাপটপ রি-ফর্ম্যাট করেছিলাম, আর অ্যাডমিন নেম সেট করেছিলাম মৈথিলী ত্যাগী। ডেস্কটপে রাখা রয়েছে ফিল্মমেকিং-এর ওপরে কিছু ফাইল আর গুজরাত মিউজিয়ামের ওপরে কিছু রিসার্চ পেপার। ডেস্কটপের ওয়ালপেপার হিসেবে রেখেছি ভগবান কৃষ্ণের ছবি। পরিষ্কার বোঝা গেল কেউ এসে আমার ঘরে জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেছে, এবং অভাবনীয় কিছুই তারা শেষমেশ খুঁজে পায় নি। খেলা তো সবে শুরু!

পরদিন সকালে জি এল সিঙ্ঘলের সঙ্গে একটা টেলিকন্‌ ছিল। মোবাইলে দেখলাম অজয়, আমার সেই ফোটোগ্রাফার বন্ধু,  একটা মেসেজ পাঠিয়েছে, আমি আমদাবাদ নি গুফায় একটা ফোটোগ্রাফি এক্সিবিশন দেখতে যেতে রাজি আছি কিনা জানতে চেয়ে। আমি ফোনটা পাশে রেখে দিলাম।

মাইক দরজায় টোকা দিল। ও ফাউন্ডেশনের রাস্তায় একটা চক্কর মারতে বেরোচ্ছিল, আমি যেতে চাই কিনা জানতে এসেছিল।

গুজরাতে ডিসেম্বরের সন্ধ্যেগুলো খুব সুন্দর আর ঠাণ্ডা হয়। যদিও ২০১০এর শীত গুজরাতে খুব জাঁকিয়েই পড়েছিল, তার ওপরে আমাদের হস্টেল ছিল একদম ফাঁকা, জঙ্গল এলাকায়।

হস্টেলে আমাদের শুধু একটাই ব্ল্যাঙ্কেট দেওয়া হত। রাতের দিকে আমাদের সুটকেস খুলে, টি-শার্ট, শার্ট, সোয়েটার, জিনস, সমস্ত পরিধেয় গায়ে চাপিয়ে গরম থাকতে হত।

সেদিন রাতে গায়ে একটা বাড়তি জ্যাকেট চড়িয়ে, মাইক আর আমি ফাউন্ডেশন বিল্ডিং-এর পাশে জঙ্গলের ধার ধরে হাঁটতে বেরোলাম। আমি মাইকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওর মুখ চিন্তামগ্ন। ও আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার অভিনয় কি ঠিকঠাক হচ্ছে, মৈথিলী?’ ‘অবশ্যই’, আমি ওকে আশ্বস্ত করলাম, ‘তুমি একদম কনফিডেন্ট দেখাচ্ছিলে, মিসেস কোদনানির ব্যবহার নিয়ে চিন্তা কোরো না, উনি আসলে কথাবার্তা আর ওনার প্রশংসায় একেবারে ডুবে গেছিলেন। ’

রাতে ঘুমোতে যাবার আগে অজয়কে টেক্সট করে দিলাম, ‘কাল এক্সিবিশনে দেখা হচ্ছে।’

পরদিন সকালবেলায় ক্যান্টিন বসে উপমা খেতে খেতে আমি জি এল সিঙ্ঘলকে ফোনটা করেই ফেললাম। উনি তখন খুবই টালটামাল অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলছেন। হাইকোর্টের অ্যাপয়েন্ট করা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (এসআইটি) তখন ইশরাত জাহান এনকাউন্টারের তদন্ত করছে এবং সমস্ত তদন্তকারীর নজরের কেন্দ্রে ছিলেন সিঙ্ঘল। আরও দুই অফিসারের সঙ্গে ইনিই ইশরাত জাহানকে* গুলি করে মেরেছিলেন ‘এনকাউন্টারে’। এনকাউন্টারের পরের দিন গুজরাতের পুলিশ সুপার এবং এটিএসের চীফ ডিজি বানজারা একটা প্রেস কনফারেন্স ডেকেছিলেন। খবরটা বিশালভাবে চর্চিত হয়েছিল সেই সময়ে, ইশরাতের রক্তমাখা মৃতদেহ, বাকি তিনজনের সাথে শোয়ানো ছিল রাস্তাতে। বলা হয়েছিল, সে ছিল একজন মহিলা ফিদায়েঁ, ভারতে প্রথম, যে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে খুন করতে এসেছিল এলইটির তরফে।

ইশরাতের গল্প তখন সবার মুখে, কাহিনি লেখা হচ্ছে কীভাবে জিহাদী মৌলবাদ মাথা চাড়া দিচ্ছে, ২০০২ দাঙ্গার বদলা নেবার উদ্দেশ্যে। ডিজি বানজারা পাচ্ছেন নায়কের মর্যাদা, রাতারাতি তিনি তখন বিখ্যাত। তাঁর সাথে খ্যাতির রোশনাই ভাগ করে নিচ্ছেন আরও তিনজন অফিসার, এন কে আমিন, তরুণ বারোট, আর গিরিশ সিঙ্ঘল, যাঁর কাছে আমি এখন পৌঁছতে চাইছি।

*ইশরাত জাহান নামে একটি ১৯ বছরের মেয়েকে আরও তিনজন লোকের সাথে ১৫ই জুন ২০০৪ সালে আহমেদাবাদ শহরের কাছে কয়েকজন পুলিশ অফিসার গুলি করে মারেন। স্থানীয় আহমেদাবাদ পুলিশ সেই সময়ে দাবি করেছিল নিহতদের সকলেই নিষিদ্ধ পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদী সংস্থা লশকর-এ-তোইবার সদস্য ছিল, এবং গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল। নিহত বাকি তিনজনকার নাম ছিল জীশান জোহর, আমজাদ আলি আর জাভেদ শেখ।

ইতিমধ্যে ইশরাতের পরিবার তাদের মেয়ে ইশরাতের হত্যার বিচার চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দাখিল করেছে। গুজরাত হাই কোর্ট জুডিশিয়াল কমিটি গঠন করেছে যারা তাদের তদন্তের ফল প্রকাশ করেছে ২০০৮ সালে। হাইকোর্টের একজন প্রাক্তন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জাস্টিস তামাং কমিটি সারা দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে এই বলে, ‘ইশরাত জাহানের হত্যা একটি ফেক এনকাউন্টার। এর আরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’

মানবাধিকার কর্মীরা আর আইনজ্ঞরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ক্ষমতার এই অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে, যা নিরপরাধের প্রাণ নেয়। এর পরেও কেস খুব বেশি এগোয় নি যতদিন না ইশরাতের পরিবার তদন্ত চালিয়ে যাবার অনুরোধ করে গুজরাত হাইকোর্টে পিটিশন দাখিল করেছিল। এর পরে তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ তৈরি হয় এই এনকাউন্টারের তদন্ত করার জন্য। পরে, ২০১৩ সালে, গুজরাত হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে সিবিআই এই ঘটনার তদন্ত করে এবং তারাও জানায় যে এটা ফেক এনকাউন্টার ছিল, আর গুজরাত পুলিশের এই শীর্ষস্তরের অফিসারদের দোষী সাব্যস্ত করে।

এরই মধ্যে ২০১০ সালে, যখন সুপ্রিম কোর্টের আদেশে এসআইটি এই ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে, সেই সময়ে আমি আহমেদাবাদে বসে সিঙ্ঘলের সাথে দেখা করবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ফোন বাজল, আমি আমেরিকান অ্যাকসেন্টের ইংরেজিতে নিজের পরিচয় দিলাম। খুব একটা উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম না। সিঙ্ঘল আমাকে পরে ফোন করতে বললেন। আমার সমস্ত আশা ভরসা এই লোকটিকে ঘিরে। এঁকে দিয়েই আমি আমার অনুসন্ধান শুরু করতে চাইছিলাম। সমানে চিন্তা করে যাচ্ছিলাম, কীভাবে এগনো যায়। সেদিন সকালের খবরের কাগজেই এসআইটির হাতে সিঙ্ঘলের সম্ভাব্য গ্রেফতারির খবর বেরিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, এই রকমের পরিস্থিতিতে সিঙ্ঘল নিজেকে বাঁচানোর সবরকমের আইনি পদ্ধতির সদ্ব্যবহারেই ব্যস্ত থাকবেন, কোনও আমেরিকা-ফেরত ফিল্মমেকারের সাথে কথা বলার বদলে।

আমি মাইককে জানালাম যে আজ সারাদিনের জন্য আমার আর ওকে দরকার নেই। মাইক অবশ্য এর মধ্যেই হস্টেলের বাকিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলেছে, তাদের মধ্যে একজন ছিল পারনাঙ্গুয়াক লিঞ্জে, গ্রীনল্যান্ডের নাগরিক একটা মিষ্টি মেয়ে যাকে আমরা আদর করে পানি বলে ডাকতাম। আমার মনে হচ্ছিল মাইক বোধ হয় একটু বেশিই অনুরক্ত হয়ে পড়ছিল ওর প্রতি। সেদিন সারাদিনের জন্য আমার ওকে দরকার ছিল না বলে মাইক পানিকে নিয়ে ফোটোগ্রাফি ট্রিপে বেরিয়ে পড়ার অফার দিল, আর পানিও দিব্যি এক কথায় রাজি হয়ে গেল!

আমার সেদিন নিজের একলা একটা ফোটোগ্রাফি ট্রিপে যাবার ছিল, সন্ধ্যেবেলায়। সেই মুহূর্তে আমার বিশেষ কিছু করার ছিল না বলে আমি নিজের ঘরে বসে নোটবুকে গত কয়েকদিনের ঘটনাবলী লিখে রাখতে বসলাম।

সন্ধ্যেবেলায় আমি যখন অজয়ের এক্সিবিশনে পৌঁছলাম, অজয় অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত ছিল। ও আমাকে সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিল, আমেরিকা থেকে আসা একজন ফিল্মমেকার হিসেবে। সাথে সাথে আমার দিকে ছুটে এল একগাদা টেকনিকাল প্রশ্ন, “কে তোমার ক্যামেরা এডিট করছে, কোন ক্যামেরা ইউজ করছো, শুটিং কবে শুরু করবে?” আমি এই ধরণের প্রশ্ন আসতে পারে আশা করে আগেই উত্তর তৈরি করে রেখেছিলাম, এবং খুব শান্তভাবে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে গেলাম। অজয়কে দেখে মনে হল ও বেজায় ইমপ্রেসড। ও আমাকে আমদাবাদ নি গুফা ঘুরিয়ে দেখাল, আর অল্প কথায় আমাকে শোনাল এই জায়গাটার ইতিহাস। এর পরে আমরা এক জায়গায় বসে কফি আর সামোসা খেলাম।

আমাদের পাশেই কলেজের একটা গ্রুপ বসে ছিল, ওদের মধ্যে একজন গীটারে সুর তুলছিল। আরেকটু দূরে একজন তার প্রেমিকার সাথে নিমগ্ন বসে ছিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল, এইটুকু দৃশ্যের জন্য বাকি সব ভুলে যাওয়া যায়, ওই পুলিশ অফিসারদের, আমার এই ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা, আর যে কাজ নিয়ে আমি এসেছি, সেই সংক্রান্ত নার্ভাসনেস। এই সময়টুকুর জন্য আমিও ওদের মতই একজন ছাত্রী। আমার আব্বু-আম্মির কথা মনে পড়ল, তাদের সঙ্গে অনেকদিন কথা বলা হয় নি, তারা হয় তো খুব উদ্বেগে আছে আমার এই ব্যবহারের পরিবর্তন লক্ষ্য করে, আমার সেলফোন সুইচ অফ পেয়ে। আমি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতাম কাছের সাইবারক্যাফেতে গিয়ে – মেল করে, তাও খুব নিয়মিত করা হয়ে উঠছিল না। যেদিন থেকে আমি অমিত শাহের কীর্তিকলাপ ফাঁস করেছি, তারা ভীষণ, ভীষণ চিন্তিত ছিল আমার নিরাপত্তা, আমার ভালো-থাকা নিয়ে।

ফেরার পথে অজয়কে বললাম আমাকে হস্টেলের কাছাকাছি কোনও একটা বাজার এলাকায় ছেড়ে আসতে, আমার কিছু কেনাকাটা করার আছে। অজয় আমাকে স্যাটেলাইট রোডের শপিং এরিয়াতে ড্রপ করে দিল। কেনাকাটার অজুহাতে বাজারে ঘোরাঘুরি করলে অভিনয়টা এরও গ্রহণযোগ্য হয়। আমি একটা সুপারমার্কেটের ভেতর ঢুকলাম, কিছু কেনাকাটা সেরে পাশেই একটা পিসিও বুথে ঢুকলাম। এটাই বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। বাড়ির ল্যান্ডলাইন নম্বর ডায়াল করলাম। আমার মা, আমার সমস্ত শক্তির উৎস, যার থেকে আমি লড়বার শক্তি পেয়েছি, ফোনটা তুলল। মা চাইছিল আমি সব ছেড়েছুড়ে বাড়ি ফিরে আসি। যে কাজ বাড়ির লোকের সাথে যোগাযোগ রাখার রাস্তাও বন্ধ করে দেয়, চুলোয় যাক সেই জার্নালিজম। আমি মাকে যতটা সম্ভব বোঝালাম, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কথা শেষ করে ফোনটা ছাড়লাম, আর বুঝতে পারলাম, আমি ভেতর থেকে রিক্ত, দীর্ণ হয়ে গেছি।

পরদিন সকালে আমি সিঙ্ঘলকে আবার ফোন করলাম, এইবারে তিনি ফোন তুললেন, এবং, তিনি রাজি হলেন আমার সাথে দেখা করতে। আমার তদন্ত যে ভয়াবহ রাস্তার দিকে মোড় নিতে শুরু করল এর পরে, সেই রাস্তায় যাত্রা আমার অবশেষে শুরু হল।

Advertisements

4 thoughts on “গুজরাত ফাইলসঃ গোপনীয়তার কাটাছেঁড়া -২

    1. There will be no next part, as I mentioned above. Rana has not cooperated with me, and without her further approval I cannot proceed.

      For Ishrat Jehan and David Hadley’s claim about her, you can read this.

      https://achalsiki.com/2016/02/13/%e0%a6%87%e0%a6%b6%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%a4-%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%83-%e0%a6%a4%e0%a6%a5%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%96%e0%a7%8b%e0%a6%81%e0%a6%9c/

      Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s