বরফ ঢাকা স্পিতি – প্রথম পর্ব

সেই যে ভোররাতে একলা বেরিয়ে পড়েছিলাম লাদাখের উদ্দেশ্যে, সে ছিল দু হাজার পনেরো সাল। সে-ও দেখতে দেখতে এক বছর পেরিয়ে দেড় বছর হয়ে গেল, আর তেমন করে কোথাও বেরনো হয়ে উঠছিল না। জীবনে অন্যান্য জটিলতা ক্রমেই বেড়ে যেতে লাগল, আর তেমন করে নতুন কোনও নিরুদ্দেশের দিকে বেড়াতে যাবার প্ল্যান ক্রমেই জীবনের প্রায়োরিটি লিস্টের নিচের দিকে নেমে যেতে লাগল। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম না এলে ঝলক দিয়ে যায় বটে নির্জন হাইওয়ে – কিন্তু কই, তেমন করে তো আর ডাক শুনতে পাই না!

দু হাজার ষোলর শেষাশেষি আমার কেমন ভয় লাগতে শুরু করল – তা হলে কি আমার মানসিকতা পালটে যাচ্ছে? বয়েস হয়ে যাচ্ছে মনের?

গেছোদাদার সঙ্গে এমনিই একদিন কথা হচ্ছিল অফিসে বসে ফোনের মাধ্যমে, কাজের চাপ সেদিন কম ছিল, তা প্রস্তাবটা গেছোদাদাই দিল, একটা দু সপ্তাহের প্ল্যান বানাও, নর্থ ইস্ট। আসাম, অরুণাচল আর মেঘালয় মিলিয়ে একটা চমৎকার প্ল্যান হয়ে যাবে, আমিও যাবো তোমার সঙ্গে, দারুণ একটা ব্যাপার হবে।

বার খাওয়াতে যতটা দেরি, আমি অমনি পড়াশোনা শুরু করে দিলাম। আরও বার কয়েক ফোন চলবার পরে সময় ফাইনাল হল ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ। আমি তিন দিনে গৌহাটি পৌঁছবো, আর গেছোদাদা সেখান থেকে চলতে শুরু করবে আমার সাথে। ঘোরা হলে আমি বাইক ট্রেনে তুলে দিয়ে ফ্লাইটে ফেরত আসব।

উত্তম প্রস্তাব। যত রকমের আইটিনেরারি, ট্র্যাভেলগ পাওয়া যায়, সমস্ত পড়ে ফেললাম। অনেকদিন বাইক নিয়ে বেরনো হয় নি – তাই দিওয়ালির পরের দিন একটা “ড্রাই রান” মারব বলে বেরিয়ে পড়েছিলাম শিমলার উদ্দেশ্যে। ঘোরাঘুরি নয় – একদিনে কতটা বাইক চালাতে পারি ক্লান্ত না হয়ে – সেটাই দেখা উদ্দেশ্য ছিল। আমার এর আগের লেখা “একলা পথে চলা আমার”-এ আমার সেই ছোট্ট জার্নি নিয়ে লিখেছি। … তা দেখলাম, এখনও ধকল সয়। সকাল পৌনে পাঁচটায় শুরু করে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত প্রায় সাতশো কিলোমিটার লাগাতার যাওয়া এবং আসার পরেও খুব বেশি ক্লান্তি গ্রাস করে নি আমাকে। এবার তা হলে লম্বা জার্নির প্ল্যান করে ফেলাই যায়।

মাথায় একবার ঘোরার পোকা চেপে গেলে তখন কি আর ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ধৈর্য ধরে বসে থাকা যায়? ঘরের লোকজনের সাথেই তাই একটা ছোটোখাটো প্ল্যান করে ফেললাম – শীতকালে শুনেছি, বরফ পড়ে মানালি একেবারে শ্বেতশুভ্র হয়ে যায়, সেইটা একবার দেখে আসলে কেমন হয়? মানালি পর্যন্ত তো রাস্তা দিব্যি খোলা থাকে।

যে কথা সেই কাজ। মানালি আমাদের বার কয়েক যাওয়া আছে, কিন্তু শীতকালের মানালির সৌন্দর্যই আলাদা। জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে তাই বেরিয়ে পড়লাম।

কিন্তু কপালে বোধ হয় অন্য কিছু নাচছিল সেদিন। কুলুর খানিকটা আগে, মানালির থেকে ঠিক সত্তর কিলোমিটার আগে, উল্টোদিক থেকে আসা একটা পাঞ্জাব রোডওয়েজের বাসকে যতক্ষণে দেখতে পেলাম, ততক্ষণে ব্রেকে পা দাবিয়েও কিছু বিশেষ লাভ হল না, ভগ্নাংশ সেকেন্ড আগে শুধু বুদ্ধি করে স্টিয়ারিংটা উল্টোদিকে মোচড় দিতে পেরেছিলাম, তাই হেড অন কলিশন হল না, বাসটা আমার গাড়ির সামনের ডানদিকটা তীব্র বেগে স্ম্যাশ করে দিয়ে বেরিয়ে গেল – আমি ড্রাইভারের সীটে বসে ছিলাম, আমার ঠিক পাশের দরজাটাও বেঁকে গেল। গাড়িটা ইমপ্যাক্টে ছিটকে গেল রাস্তার বাঁ দিকে, সৌভাগ্য, সেদিকে খাদ ছিল না, আমি সাথে সাথে আবার স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সেটাকে রাস্তায় উঠিয়ে আনতে পেরেছিলাম।

অনেক কিছুই হতে পারত, কিছুই হয় নি, আমাদের কারুর গায়েই একটাও আঁচড় লাগে নি, কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষত যেখানটায় তৈরি হয়ে গেল, সেটা হল – আমার আত্মবিশ্বাস। এর পরে সেই ভাঙা গাড়ি নিয়েই কোনওরকমের মানালি পৌঁছেছিলাম, এবং অবিশ্রান্ত তুষারপাতের মধ্যে ওই ভাঙা দরজা সমেত গাড়ি চালিয়ে ফিরে আসা সম্ভব নয় জেনে গাড়ি মানালির হোটেলের সামনে রেখেই ফিরে আসা, অবশেষে জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে তুষারপাত কমার পরে, মানালির রাস্তা আবার খোলার পরে সেখান থেকে গাড়ি টো করিয়ে মানেসার নিয়ে আসা, এবং মানেসার থেকে দিল্লি আবার টো করিয়ে নিয়ে আসা – কারণ তিন সপ্তাহ বরফের নিচে চাপা থাকার ফলে গাড়ির ব্যাটারি একেবারে ডিসচার্জ হয়ে গেছিল, এবং তার পরে মারুতির ওয়ার্কশপে আরও তিন সপ্তাহ যত্নআত্তি করিয়ে ফাইনালি এই সেদিন যখন গাড়ি আবার আমার বাড়িতে ফিরল, টের পেলাম প্রায় চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা আমার এর মধ্যেই বেরিয়ে গেছে।
নর্থ ইস্ট বেড়াতে যাওয়া ক্যানসেল করতেই হল, কারণ অত লম্বা ট্রিপে যাবার মত খরচা আর করবার বিলাসিতা আমার আর নেই – সম্ভবই নয়।

মানালি বেড়াবার দুদিনের ছুটি গিয়ে দাঁড়াল অর্ধেক লাখ টাকার লোকসানে, মানসিক আতঙ্ক এবং, সবচেয়ে বড় ব্যাপার, ট্রমা। যে নিয়মিত গাড়ি আর মোটরসাইকেল চালায়, তার পক্ষে এই কনফিডেন্স উড়ে যাওয়াটা যে কী ভয়ঙ্কর, সে বলে বা লিখে বোঝানো মুশকিল। বাড়ি থেকে আমার অফিস মাত্র সাত কিলোমিটার, পিক ট্র্যাফিকেও কুড়ি মিনিটে পৌঁছে যাই, কিন্তু গোটা জানুয়ারি মাস ধরে আমার হাত পা বাইকের ক্লাচ গিয়ার কন্ট্রোল করছিল ঠিকই, অথচ আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার ফোকাস সরে যাচ্ছে। ব্যাক ইন দা মাইন্ড খালি ফিরে ফিরে আসছে ঐ কয়েক সেকেন্ডের স্মৃতি, পাহাড়ী রাস্তার বাঁকে হঠাৎ বাসটার চলে আসা, এবং ব্রেকে পা লাগানোর সাথে সাথেই বুঝতে পারা, আর সময় নেই, আমি স্টিয়ারিংটা না ঘোরালে আমি, আমার মেয়ে – কেউ বাঁচত না। চেনাই যেত না আমাদের শরীর। … পরক্ষণেই আবার ঝাঁকুনি দিয়ে বাস্তবে ফিরে আসছি, বাইক চালানোয় মন দিচ্ছি।

আশ্চর্যের ব্যাপার, বাড়িতে থাকলে বা অফিসে বসে থাকলে এসব কিছুই হচ্ছে না, হচ্ছে খালি যখনই আমি বাইক নিয়ে রাস্তায় বেরোচ্ছি। গাড়ি তখনও মানালি থেকে আসে নি, দিল্লিতে বাইকই ভরসা।

গেছোদাদার সঙ্গে বার দুয়েক কথা হল, বললাম আর যেতে না পারার কথা, কিন্তু মাথার পেছনে অন্য খেলাও শুরু হতে লাগল, তা হলে আমি হার স্বীকার করে নেব? কনফিডেন্স কমে গেছে, সেটাকেই মেনে নিয়ে লং জার্নি একেবারে বন্ধ করে দেব? অ্যাক্সিডেন্ট তো কত লোকেরই হয়, দিল্লির রাস্তাতেই তো রোজ কত অ্যাক্সিডেন্ট হয়, আমি নিজে বার তিনেক স্পট ডেথ দেখেছি, অন্তত পাঁচবার রান-ওভার হওয়া মৃতদেহ দেখেছি, আগে তো কখনও এমন হয় নি! ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসার তা হলে রাস্তা কী?

রাস্তা তো একটাই, হিট দ্য রোড আগেইন। রাস্তায় না নামলে কনফিডেন্স বাড়বে না। এক নাগাড়ে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত বাইক না চালাতে পারলে, সফল আরেকটা জার্নির নতুন স্মৃতি মনের মধ্যে বসিয়ে দিতে না পারলে – এই স্মৃতিকে ওভাররাইট করে ফেলা সম্ভব নয়।

কোথায় যাওয়া যায়? …

… অফিসের সেই পঞ্জাবী ছেলেটির সাথেই একদিন দেখা হয়ে গেল লাঞ্চ ব্রেকে। সেই ছেলেটি, যে আমাকে শোগি যাবার প্ল্যান দিয়েছিল। ও একটা বুলেট ওনার্স গ্রুপের মেম্বার, চণ্ডীগড়ের। গ্রুপটার নাম বুলেট ক্যাফে। চণ্ডীগড়ের কাছে জিরাকপুর বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে এদের একটা ছোট রেস্টুরেন্টও আছে, বাইকের বিভিন্ন অ্যাক্সেসরিজ দিয়ে ডেকোরেশন করা সেই রেস্টুরেন্ট। তো, সে যাই হোক, সেই ছেলেটিই আমাকে কথায় কথায় জানাল, ওরা ফেব্রুয়ারি মাসের পঁচিশ তারিখে স্পিতি ভ্যালি যাচ্ছে। বরফে মোড়া – হোয়াইট স্পিতি। পা-জি, আপনে চলনা হ্যায় ক্যা?

নট আ ব্যাড আইডিয়া। ঠিক দু দিন লাগল নিজের মনকে বশ করতে – এটা আমাকে করতেই হবে, এবং ক-র-তে-ই হবে। যেতে পারব কি পারব না সেটা পরের ব্যাপার, কিন্তু ইনফর্মেশনগুলো তো আগে থেকে কালেক্ট করে ফেলা দরকার! জিজ্ঞেস করলাম, তোরা কবে যাচ্ছিস? কদিনের জন্য যাচ্ছিস? কী রকম খরচার প্ল্যান করছিস?

পঞ্জাব দা মুন্ডা আমাকে তাদের পুরো প্ল্যান দিয়ে দিল, পাঁচদিনের প্ল্যান। ওরা শুরু করছে পঁচিশে ফেব্রুয়ারি, শিমলা ফিরছে পয়লা মার্চ রাতে। তার পরে যারা যারা চণ্ডীগড় ফেরার বা দিল্লি ফেরার, তারা সবাই নিজের নিজের বাড়ি ফিরবে দু তারিখে। হাজার পাঁচেক পারহেডে হয়ে যাবে, আশ্বস্ত করল আমাকে ছেলেটি।

পাঁচ হাজার – হুঁ, এটুকু বোধ হয় খরচা করার মত অবস্থায় আছি, তবে আর দেরি কেন?

স্পিতি – স্থানীয় ভাষায় শব্দটির মানে হচ্ছে মধ্যবর্তী অঞ্চল, মিডল ল্যান্ড। হিমাচল প্রদেশের উত্তর পূর্ব দিকে এই এলাকাটি ভারত আর তিব্বতের মধ্যবর্তী অঞ্চল। অনেকটা লাদাখের মতই এই এলাকাটাও শীতল মরুভূমি টাইপের, গাছপালা নেই, রুক্ষ পাথর আর পাহাড়ের মাঝে ছোট ছোট উপত্যকা। এর বেশির ভাগটাই পড়ে হিমাচল প্রদেশের কিন্নৌর জেলায় – তাই এটাকে কিন্নৌর ভ্যালিও বলা হয়। উপত্যকাটি তৈরি হয়েছে মূলত শতদ্রু বা সাটলেজ নদের অববাহিকায়।

ছোট করে আগে ম্যাপটা দিয়ে দিই – তা হলে বোঝার সুবিধে হবে।

spiti-map

স্পিতি ভ্যালি যাবার দুটো রাস্তা আছে। সবচেয়ে সহজ রাস্তাটা শিমলা দিয়ে। শিমলার পরে নারকন্ডা, রামপুর, করছাম, রিকং পিও হয়ে নাকো, টাবো, কাজা – তার পরে আরও একটু এগিয়ে লোসার হয়ে পড়ে কুনজুম পাস, এইটা পেরোলেই আমাদের সবার পরিচিত রোহতাং পাস – বাঙালিরা যার উচ্চারণ করে “রোটাং” পাস, মানালির শুরু। এর পরে মানালি দিয়ে আবার চণ্ডীগড় বা দিল্লি ফিরে আসা যায়। পুরোটা ঘুরে ফেলাকে বলা হয় ফুল সার্কিট, কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাস, যখন সদ্য বরফ গলেছে, বেশির ভাগ রাস্তাই খোলে নি, কুনজুম পাস খোলার তো কোনও প্রশ্নই নেই, তখন ওই একটাই দিক দিয়ে যাওয়া আসা সম্ভব হয়, শিমলা। যাওয়া যায় যতদূর পর্যন্ত রাস্তা খোলা পাওয়া যাবে, ততদূর পর্যন্ত। শীত কমার সাথে সাথে ধাপে ধাপে গ্রামগুলোতে যাবার রাস্তা খোলে।

শুধুই মূল রাস্তাটা জার্নি নয় কিন্তু, জায়গায় জায়গায় দেখুন, ব্র্যাঞ্চিং বেরিয়েছে, করছাম থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে সাংলা আর চিটকুল যাবার রাস্তা। এই চিটকুল হচ্ছে তিব্বত সীমান্তে শেষ ভারতীয় গ্রাম। আবার করছাম থেকে একটু এগিয়ে রিকং পিও থেকে রাস্তা চলে যাচ্ছে আরেকটা গ্রামের দিকে – কল্পা। প্রতিটা জায়গাই মনমুগ্ধকর। তবে শীতকালের মধ্যে সব সৌন্দর্যই এক রকমের – দুধসাদা। হোয়াইট স্পিতি।

নরেন্দ্র কুমার গৌতম, ওরফে মাস্টারজি দিল্লির নজফগড় এলাকার একটি স্কুলের মাস্টারমশাই। ফি বছর গরমের ছুটিতে উনি একটি এলএমএল স্কুটার নিয়ে লাদাখ বেড়াতে যান, প্রতি বছর। লাদাখের আনাচকানাচ মাস্টারজির মতন কেউ চেনে না। স্পিতিও উনি গেছেন অনেকবার, এই ইনিই এ বছর জানুয়ারি মাসের শেষদিকে একা একা স্কুটার চালিয়ে ঘুরে এসেছেন হোয়াইট স্পিতি।

মাস্টারজিকে ফোন লাগালাম একদিন। উনি ধৈর্য ধরে বিস্তারিত বোঝালেন, কোথাকার রাস্তা কেমন, কোনদিন কতটা করে গেলে জার্নিটা সুবিধেজনক হবে, কী কী সাবধানতা নিতে হবে যাওয়া আসার পথে। দুটি জিনিসে উনি জোর দিলেন – ঠাণ্ডা প্রচণ্ড, এমনিতে মাইনাস কুড়ি ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, তবে বাইক চালাবার সময়ে ওটা ফীল লাইক মাইনাস তিরিশও হতে পারে, অতএব, একটা গ্লাভসে হবে না। পারলে ডবল লেয়ার গ্লাভস প’রো। হাতের সেন্সিটিভিটি কমে যেতে পারে, ক্লাচ অ্যাক্সিলারেটর হয় তো আরামসে কন্ট্রোল করতে পারবে না। কিন্তু ধীরেসুস্থে চালালে সেটা তেমন কোনও সমস্যা তৈরি করবে না। আর দুই, বাইক নিয়ে যাচ্ছো, পারলে স্নো চেন জোগাড় করে নিয়ে যাও। স্নো চেন লাগিয়ে যত সহজে বাইক চালানো যায় বরফের মধ্যে, সেটা বিনা স্নো-চেনে সম্ভব হয় না।

স্নো-চেন যে দরকার হয় বরফে চালাতে গেলে, সে আমি গাড়ি নিয়ে মানালি পৌঁছে বিলক্ষণ টের পেয়েছিলাম। সেদিন ছিল ছয়ই জানুয়ারি, মাত্রাতিরিক্ত তুষারপাতের ফলে মানালির রাস্তায় রাস্তায় পুরু বরফ, এবং তার নিচের লেয়ার জমে শক্ত হয়ে গেছে, যাকে বলে হার্ড আইস। আর একবার হার্ড আইস/ব্ল্যাক আইস জমে গেলে সে জিনিসের মত ভয়ঙ্কর আর কিছু হয় না, আমি টের পাচ্ছিলাম প্রতি পদে। দুপুরেই অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গাড়ির দরজা বেঁকে গেছে, অবিশ্রান্ত তুষারপাতের একটা অংশ এসে পড়ছে ড্রাইভারের সীটে বসে থাকা আমার গায়ের ওপরে, আর এক ইঞ্চি গাড়ি এগোতে গেলেই বুঝছি গাড়ি আমার কন্ট্রোলে নেই – ডানদিকে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ক্লাচ ছাড়ছি, গাড়ি স্কিড করে যাচ্ছে বাঁদিকে, ব্রেক মারতে গেলে আরও হুড়মুড়িয়ে স্কিড করে যাচ্ছে। অন্তত তিনবার চারপাশের লোকজন বাইরে থেকে আমার গাড়িকে ধরে আমাকে নিশ্চিত পরবর্তী অ্যাক্সিডেন্টের হাতে থেকে বাঁচিয়েছিলেন। অতএব, স্নো-চেন মাস্ট।

মাস্টারজি যে বাইকার্স গ্রুপে নিজের জার্নির ছবিটবি পোস্ট করেন, সেখানেই আরেকটি ছেলে তার নিজের তৈরি স্নো চেনের বিজ্ঞাপন দিয়েছিল সম্প্রতি। জয়পুরে থাকে, স্নো চেন লাগিয়ে তারাও এক গ্রুপ জনতা আগের সপ্তাহেই স্পিতি ভ্যালি ঘুরে এসেছে। অতএব, অর্ডার দিয়ে দিলাম নিজের বাইকের চাকার স্পেসিফিকেশন সমেত, এবং বানাবার পরে জয়পুর থেকে দিল্লিতে তার ডেলিভারি হয়ে গেল ঠিক এক দিনের মাথায়।

মাইনাস টুয়েন্টির গ্লাভস তো ছিলই আমার কাছে, লাদাখে কেনা সেই গ্লাভস, যেটা প্রায় খাদে নেমে গুরদীপ উদ্ধার করে দিয়েছিল আমাকে, একদিন দিল্লি ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে আর্মি স্টোর থেকে উলের মোটা গ্লাভস আর একটা স্লিপিং ব্যাগও কিনে নিয়ে এলাম। প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পূর্ণ।

ছ দিনের প্ল্যান বানালাম। যাব আমি একাই, পঞ্জাবী ছেলেপুলের গ্রুপের সঙ্গে নয়। লাদাখে যে রকম মাঝরাস্তায় সঙ্গী মিলে গেছিল, আশা করি এবারেও কেউ না কেউ মিলে যাবেই যাত্রাপথে। অফিসের সেই ছেলেটির চণ্ডীগড়ের গ্রুপ বেরোবে পঁচিশ তারিখ, শনিবার। এদিকে চব্বিশ তারিখ শুক্রবার শিবরাত্রির একটা ফ্লেক্সি হলিডে আছে। ওদিকে দোসরা মার্চ আমার মেয়ের জন্মদিন। ওদের পাঁচদিনের প্ল্যান, আমার ছ দিনের। তা হলে একটা কাজ করা যায় – আমি শিবরাত্রিরও আরেক দিন আগে বেরোই – অফিসে একটা ক্যাজুয়াল লিভ ফিরে এসে নিয়ে নিলেই হবে। তেইশে বেরোব, আঠাশে ফিরব। এক তারিখটা বাফার থাকবে, যদি কখনও কোথাও আটকে পড়ি, তো লেটেস্ট এক তারিখে ফিরব।
প্ল্যান দাঁড়াল এই রকমঃ

  • ২৩শে ফেব্রুয়ারিঃ দিল্লি – জিওরি
  • ২৪শে ফেব্রুয়ারিঃ জিওরি – নাকো
  • ২৫শে ফেব্রুয়ারিঃ নাকো – কাজা
  • ২৬শে ফেব্রুয়ারিঃ কাজা – আশেপাশে – নাকো
  • ২৭ ফেব্রুয়ারিঃ নাকো – রামপুর
  • ২৮শে ফেব্রুয়ারিঃ রামপুর – দিল্লি
  • ১লা মার্চঃ বাফার দিন

এই সময়েই আরেকটা গ্রুপের সঙ্গে কথা হল অন্য একটা বাইকার্স গ্রুপে – তারা চণ্ডীগড় থেকে স্টার্ট করছে তেইশ তারিখ বিকেলে, রাতের মধ্যে তারা রামপুরে পৌঁছবে। রামপুর থেকে জিওরি মাত্র বাইশ কিলোমিটার, ওরা চব্বিশ সকালে জিওরিতে এলে আমি ওদের সাথেই বাকি রাস্তাটা যাবো – এই রকম প্ল্যান করা হল। গ্রুপের লিডার, জীবন সোঁধি (বাংলা করলে হয় তো হবে জীবনসন্ধি) আমাকে তার নম্বর টম্বর দিয়ে খুব আশ্বস্ত করল, চিন্তা মত্‌ করিও – জিওরি থেকে হম একসাথ চলেঙ্গে।

আমার মনে পড়ে গেল, প্রায় দু বছর আগে, এই রকমই আরেক পঞ্জাব দা পুত্তর আমাকে আশ্বস্ত করেছিল, আম্বালা চলে আইও, বাকি ম্যায় সাম্ভাল লুঙ্গা। তারপরে কোথায় রইল সে, আর কোথায় আমি – কেমন একটা মনে হচ্ছিল, এবারেও সে রকমই কিছু হতে চলেছে। জীবনসন্ধির সাথে আদৌ জিওরিতে দেখা হবে কিনা – কে জানে!

বাইশ তারিখ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে এসে গোছগাছ শেষ করে ঘুমোতে গেলাম, সকাল চারটেয় উঠে তৈরি হয়ে বেরোতে হবে।


5 thoughts on “বরফ ঢাকা স্পিতি – প্রথম পর্ব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.