বরফ ঢাকা স্পিতি – তৃতীয় পর্ব

প্রথমদ্বিতীয় পর্বের পর

চব্বিশে ফেব্রুয়ারি, দিন ২

আদতে আমি আর্লি রাইজার, তাই সাড়ে ছটার সময়েই ঘুম ভেঙে গেল, অ্যালার্ম দিয়ে না রাখা সত্ত্বেও। আসলে, রাত সাড়ে নটা থেকে ভোঁসভোঁসিয়ে ঘুমোচ্ছি, আর কাঁহাতক ঘুমনো যায়? আমি কি বুনান নাকি?

সাড়ে সাতটার মধ্যে তৈরি হয়ে নিলাম। অতঃপর সর্দারজির খোঁজ। সর্জারজি তখন সদ্য ঘুম থেকে উঠেছেন, আমাকে দেখে একমুখ বিস্ময় নিয়ে বললেন, নাহা লি হো তুস্‌সি?

তা আর নাইব না? একে তো বাথরুমের জানলায় পর্দা নেই, যা করবার ভোর ভোরই করে ফেলতে হবে, তার ওপরে আগামী কদিন চান করার সুযোগ জুটবে না, কে জানে! চানটি তাই সকালেই সেরে রেখেছি, নাশতা পাওয়া যাবে?

সর্দারজি মাথা নাড়লেন। না, ব্রেকফাস্টের কিছু মিলবে না, নিচে প্রচুর দোকানপাট আছে, সেখানে গিয়ে খেয়ে নাও গে।

শুনে খুব আশ্বস্ত হলাম। কাল রাতে যা হরিবল খেয়েছি, সকালেও যদি বরবটি আর গাজর টাইপের কিছু বানিয়ে দেয়, আমি একেবারে না খেতে পেয়ে মরে যাবো।

আটটার সময়ে জীবনকে ফোন করে জানলাম, তারা বেরোচ্ছে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে। বলে দিলাম – জিওরির যে মোড় থেকে সারাহানের দিকের রাস্তাটা ওপরে উঠে যাচ্ছে, আমি বাইকসমেত ওখানেই থাকব। লাগেজপত্তর বেঁধে নিলাম ধীরে ধীরে। সর্দারজিকে পাঁচশো টাকা ধরিয়ে দিতে তিনি যারপরনাই খুশি হয়ে আমাকে এক কাপ গরম চা খাইয়ে দিলেন। বললাম, কদিন বাদেই ফিরছি, এখানেই এসে থাকব কিন্তু, আবার ফোন করে বুক করতে হবে, না চলে এলেই থাকতে দেবেন?

সর্দারজি বললেন, না, এই রেস্ট হাউস আজ থেকেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, রিনোভেশনের জন্য। কাল থেকে আর বুকিং নেওয়া হবে না। থাকতে হলে অন্য জায়গা দেখতে হবে।

20170224_073836

জিওরির মোড়ে ফিরে এলাম। সকাল সাড়ে আটটা, দোকান খুলেছে একটা দুটো করে। পেটপুরে চমৎকার ডিম চাউমিন আর কফি খেয়ে ফেললাম, এখন সারাদিনের জন্য নিশ্চিন্তি।

ঠিক নটায় চারখানি বুলেট এসে থামল। পঞ্জাব আর চণ্ডীগড়ের নাম্বার প্লেট। দুজন সর্দার, একেবারেই খোকা সর্দার, বাকিরা পাগড়িবিহীন। পাগড়িবিহীন অথচ একমুখ দাড়ি, চোখে গোল সানগ্লাস এমন একজন এগিয়ে এসে জানাল, তারই নাম জীবন সোঁধি। বাকিরা সুখদীপ, বিশাল, আর একটা মোটরসাইকেলে দুজন – তারা বোধ হয় দুই ভাই, নামেও বেশ মিল, সুনীল আর অনিল মিত্তল। মোটরসাইকেল চার (আমাকে বাদ দিয়ে), আওর আদমি পাঁচ। এটা ইনসাফি না না-ইনসাফি, তখনও বুঝতে পারি নি, জানা গেল, তার নাকি ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়ে পড়েছে, ব্রেকফাস্ট করে নি।

বোঝো! ব্রেকফাস্ট না করেই যদি তেইশ কিলোমিটার আসতে বেলা নটা বাজে, তা হলে … বললাম, এক কাজ করো, এখানে তোমরা ব্রেকফাস্ট করো, আমি পেট্রল পাম্প থেকে চট করে ট্যাঙ্ক ফুল করিয়ে আনি।

জিওরি থেকে রামপুরের দিকে দেড় কিলোমিটার পিছিয়ে গেলেই পেট্রল পাম্প। রাস্তায় আগেও পেট্রল পাম্প পড়বে বেশ কয়েকটা, কিন্তু পাম্প থাকলেই যে তাতে পেট্রল থাকবেই, এমন কোনও গ্যারান্টি নেই, তাই শুরুতে ভরিয়ে নেওয়াই ভালো। সঙ্গে আমার ছ লিটার পেট্রল রিজার্ভ আছে অবশ্য, তিনখানা দু লিটারের কোকের বোতলে। নিতান্ত অসুবিধেয় পড়লে ওই তেলে দুশো কিলোমিটার পর্যন্ত চলে যাওয়া যাবে।

ধীরেসুস্থে পেট্রল ভরিয়ে আবার যখন জিওরির মোড়ে ফিরলাম, তখনও তাদের ব্রেকফাস্ট পর্ব শেষ হয় নি। অনিল-সুনীল দুই খোকা কিছুই খায় নি, কারণ নাকি তাদের “ডাইজেশন মে দিক্কত” হচ্ছে। লে পচা, সর্দারদেরও পেট খারাপ হয়?

পৌনে দশটার সময়ে অবশেষে স্টার্ট করতে পারলাম। কথায় কথায় জানা গেল, অনিল সুনীল আর বিশালের নাকি এই প্রথম লং ট্রিপে বেরনো, সদ্য কুড়ি হয়েছে কি হয় নি, চণ্ডীগড়ের কোন এক কলেজের সেকেন্ড আর থার্ড ইয়ারের ছাত্র সব। জীবনের  নিজস্ব বিজনেস আছে, আর সুখদীপ চাকরি করে।

সামহাউ, টিমটাকে দেখে প্রথম থেকেই আমার কেমন একটা জুতের লাগে নি। কারণ বলতে পারব না, “টিম” বলতে যা বোঝায়, সেই ধরণের মেন্টালিটি বা অ্যাটিট্যুড – কিছু একটার কমতি ছিল মনে হল এদের মধ্যে। দিনের জার্নি শুরু করবার আগে বার বার করে ওদের কিছু টিপস দিতে চাইলাম উপযাচক হয়ে – পাহাড়ী রাস্তার জার্নিতে গ্রুপে সাধারণত যে ধরণের কমন নিয়ম সবাই মেনে চলে – হেডলাইট আর ব্লিঙ্কার অন করে চলা, এবং দলছুট না হয়ে পড়া। আগে প্রচুর খারাপ রাস্তা আছে, কোনও কারণে কেউ অসুবিধেয় পড়লে যাতে বাকিরা তাদের কানেক্ট করে নিতে পারে। এর পর একটা জায়গার পর থেকে মোবাইলের কানেক্টিভিটিও থাকবে না, তখন একসাথে থাকাটা খুবই জরুরি। সামনে এগিয়ে যাওয়া কাউকে থামবার সঙ্কেত দিতে চাইলে কী ভাবে হর্ন বাজানো উচিত, পেছনে থাকা কাউকে থামতে বললে কীভাবে ইন্ডিকেটর ব্লিঙ্ক করা উচিত – তবে মনে হল না তাদের মাথায় কিছু ঢুকছে বলে। বেসিকালি, পুরো দলটাকেই কেমন লাগছিল জলিয়ন ওয়াগের নাটকের দলের মত, জাস্ট মস্তি করবে বলে বুলেট নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। ইন ফ্যাক্ট, আমার সাথেও আলাপ করতে তাদের কেউই খুব বেশি উৎসাহী বলে মনে হল না। অতএব, বেরোলাম।

আজকের গন্তব্য, নাকো। দূরত্ব মোটামুটি দুশো কিলোমিটার। খানিক এগোতেই ভাবানগর।

গতকাল, নারকন্ডা পেরোনর পর থেকেই শতদ্রু নদী আমার সঙ্গ নিয়েছিল, এখন পুরো রাস্তাটাতেই শতদ্রু আমার সাথে সাথে চলবে। জায়গায় জায়গায় ড্যাম বানানো, হাইড্রোইলেকট্রিক প্ল্যান্টের জন্য, নীলচে সবুজ জল নেচে নেচে চলেছে পাশে পাশে।

20170223_171657

ভাবানগর থেকে একটু এগোতেই এসে গেল শিমলা জেলার শেষ আর কিন্নৌর জেলার শুরুর বাউন্ডারি। আর খানিক এগোতেই বাঁকের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল কিন্নৌরের গেটওয়ে – স্পিতি বেড়াবার সমস্ত ট্র্যাভেলগে এই ছবি পাবেন। পাহাড় কেটে বানানো স্বপ্নের মত রাস্তা।

20170224_09262920170224_09372120170224_095414

এই রাস্তায় চালানো এক দারুণ অভিজ্ঞতা।

দেখতে দেখতে এসে গেল ওয়াংটু। বুলেটবাজদের দল যে কখন কোথায় পিছিয়ে পড়েছে, তাদের আর দেখা নেই। দু মিনিট দাঁড়ালাম, তাতেও পাত্তা নেই – ধুত্তেরি বলে এগোতে থাকলাম। এর পরে করছাম, রিকং পিও, পুহ্‌, পর পর আসবে।

কিন্তু ওয়াংটুর পরেই রাস্তা ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করল। যাচ্ছি পর পর সব হাইড্রোইলেকট্রিক প্ল্যান্টের পাশ দিয়ে, যেখানে যেখানে এদের অফিস ইত্যাদি, সেখানে একেবারে ঝকঝকে রানওয়ের মত রাস্তা, তার পর একটু এগোলেই একেবারে নেই-রাস্তা। মোটামোটা পাথর মুড়ি – এসবের ওপর দিয়ে যাওয়া, একটানা পনেরো-সতেরো, খুব বেশি হলে কুড়ি কিলোমিটারের স্পিডে চলতে থাকা। বিরক্তি এসে যায়। কিন্তু বিরক্ত হয়ে তো লাভ নেই – এর চেয়ে বড় লেভেলের অফরোডিং করেছি লাদাখে, এ তো কিছুই না, আর স্পিতির রাস্তাকে বলা হয় দুনিয়ার সবথেকে খারাপ রাস্তা, ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ট্রেচারাস রোড, তার নমুনা দেখতে পাচ্ছি আস্তে আস্তে। গাছপালা কমে আসছে, রুক্ষ পাহাড় চারদিকে, দূরে দূরে বরফের চূড়ো দেখা যাচ্ছে – মনে হচ্ছে আরেকটু গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে, আর ততোধিক খারাপ রাস্তা। জায়গায় জায়গায় নোটিস বোর্ড – শুটিং স্টোন এরিয়া, ড্রাইভ কেয়ারফুলি। এই সব জায়গায় ভালো রাস্তা মেনটেন করাই যায় না – মাঝে মাঝেই পাহাড়ের ওপর থেকে ছোটমেজবড় বিভিন্ন সাইজের পাথর ঝরে ঝরে পড়তে থাকে। সাবধানে গাড়ি চালানোটা এখানে মাস্ট। এমনকি, যে সব জায়গায় রাস্তা ভালো, সেখানেও প্রায়ই দেখা যায় – ঝকঝকে রাস্তার মাঝে একটা দুটো দশটা পাথর পড়ে রয়েছে ইতস্তত। কাটিয়ে কুটিয়ে এগোতে হয়।

করছাম পৌঁছলাম বেলা সাড়ে এগারোটায়। পেছনে কারুর পাত্তা নেই। এখান থেকে সাংলা আর চিটকুলের রাস্তা বেঁকে গেছে ডানদিকে, কিন্তু আমি যাবো সোজা স্পিতি ভ্যালির দিকে। পুলিশ চেকপোস্টে দাঁড় করালো আমাকে জনাসাতেক পুলিশ।

হিমাচলের পুলিশ খুবই নিরীহ, কারণ এদের ম্যাক্সিমামই ট্যুরিস্টদের হ্যান্ডল করতে হয়। যাত্রাপথে এই প্রথমবার সেই টিপিকাল প্রশ্নসমূহের মুখোমুখি হলাম – দিল্লি সে চালা কে আ রহে হো? আকেলা? বললাম পাঁচজন আরও আছে, পেছনে পড়ে গেছে। তো পুলিশ বলল, তা হলে একটু দাঁড়িয়ে যাও, সবাই এলেই এগিও একসাথে, আগে রাস্তা তো ভালো নয়।

তো দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়েই রইলাম। বুলেটবাজরা আর আসে না। জীবনকে ফোন করলাম, ফোন বেজে গেল, তুললই না।

আধঘণ্টার মাথায় দুটি বুলেট দেখা গেল দূরে। জীবন আর সুখদীপ আসছে। বাকিরা কোথায়?

যা শুনলাম, নেহাত ছেলেগুলো নতুন পরিচিত না হলে ওখানেই খ্যাঃ খ্যাঃ করে হেসে উত্তাল আওয়াজ দিতাম। ব্যাটা পঞ্জাব দা পুত্তরের দল – যা ভেবেছি ঠিক তাই, কলেজ স্টুডেন্ট, বাড় খেয়ে বেরিয়ে পড়েছে স্পিতির রাস্তায় চালাবে বলে, জীবনে এর আগে তারা কোনওদিন পাহাড়ের রাস্তায় চালায় নি – করছাম পর্যন্ত এসে উঠতে পারে নি তারা, ওয়াংটুর পরে “টাপরি” বলে একটা জায়গা পড়ে, সেই পর্যন্ত এসেই তাদের দম বেরিয়ে গেছে, খারাপ রাস্তা আর পাহাড়ি রাস্তার আঁকবাঁক সামলাতে গিয়ে নাকি অনিল সুনীল দুই খোকার দম বেরিয়ে গেছে। তাদের সর্‌ চক্কর খাচ্ছে।

অতএব, তারা ফিরে গেছে।

মানে?

মানে তাই, ওরা ধীরে ধীরে আজ আবার রামপুর ফিরে যাবে। ওখানে একদিন রেস্ট নিয়ে মাথার চক্কর খাওয়া থামাতে পারলে তবেই তার পরের দিন আবার চণ্ডীগড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। জীবন আর সুখদীপ অন্তত তাইই বলল, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ওরাও খোরাক করছে হয় তো, একটু পরেই বাকিরা এসে পড়বে, কিন্তু যে রকম সিরিয়াস মুখ করে সমস্ত ন্যারেশন দিল – বিশ্বাস না করেও উপায় ছিল না, আর হেসে ফেলার তো উপায় নেইই।

অতএব, পাঁচ প্লাস এক, ছয় থেকে আমরা এখন তিন। তিনটি লোক, তিনটি মোটরসাইকেল। হাঁ, আব ইনসাফি হুয়া। হিসাব বরাবর হ্যায়।

করছামের পর থেকে রাস্তা উত্তরোত্তর খারাপ হতে লাগল। মানে এতই খারাপ রাস্তা যে রাস্তা ছাড়া আর কিছু দেখার উপায় নেই। চারদিকে সৌন্দর্য উত্তরোত্তর ডাক দিচ্ছে, কিন্তু আমাকে সমানে নুড়ি-পাথর-বোল্ডার দেখে চালিয়ে যেতে হচ্ছে, দেখতে দেখতে আবারও দেখি জীবন সুখদীপ পেছনে কোথায় হারিয়ে গেছে।

মরুক গে যাক, দেখা ঠিকই হয়ে যাবে পরে, আমি যখন আগেই আছি, তখন মিস হবে না।

রিকং পিও এলাম বেলা একটাতে। চট করে ঘরে একটা ফোন করে নিয়ে আবার এগোলাম। সকালে ভরপেট ব্রেকফাস্ট করেছি, এক্ষুনি আর খাবার দরকার নেই, আর খেতে চাইলেও খাবার পাচ্ছি কোথায়? এ তো দেখছি এমনি একটা তেমাথার মোড়, সোজা পুহ্‌র রাস্তা, আর বাঁদিকে ওপরে রাস্তা উঠে যাচ্ছে, সেইটা ধরে বেশ খানিকটা গেলে রিকং পিও গ্রাম, সেই রাস্তা পরে বেরিয়ে যাচ্ছে কল্পার দিকে। আমি ডাইভার্সনে যাবো না, দেখা যাক, আরও এগোই, পুহ্‌তে কিছু খাবারের জায়গা পেলে সেখানে খেয়ে নেব।

অনেকটা যাবার পরে রাস্তার অবস্থা একটু ভালো হল। পুহ্‌ আর পঁচিশ কিলোমিটার।

20170224_121530

স্পিড বাড়ালাম। কুড়ি-আঠেরো-ষোল … পুহ্‌ যখন বারো কিলোমিটার বাকি, তখন শতদ্রুর ওপর এল একটা ছোট্ট ব্রিজ। ডানদিকে বেঁকে ব্রিজটা পেরোলাম, কিন্তু ব্রিজের অন্যপারে দুদিকে দুটো রাস্তা গেছে। কোনটা পুহ্‌ যায়?

মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই, ম্যাপ কাজ করছে না।

দু মিনিট দাঁড়ালাম। চারদিকে কেউ কোত্থাও নেই। ভালো করে দু দিকের রাস্তা দেখলাম, বাঁদিকে অনেকগুলো গ্রামের নাম লেখা, সামসো না কী সব যেন, কিন্তু হায়, অন্যদিক সম্বন্ধে কবি কিছুই বলেন নাই। পুহ্‌ জায়গাটার কথা আশেপাশে কোথাও লেখা নেই।

বাঁদিকের রাস্তাটা ভালো, ডানদিকেরটা ভাঙাচোরা। যা হয় হোক, বলে বাঁদিকের রাস্তা নিলাম।

চলছি, চলছি, আস্তে আস্তে আবার রাস্তা খারাপ হচ্ছে। কিন্তু একটি জনমনিষ্যির দেখা নেই। প্রায় সাত কিলোমিটার চলে এসেছি। আরও এগোব? নাকি ফিরে গিয়ে সেই ব্রিজের ধারে অপেক্ষা করব?

আরও এক কিলোমিটার এগোলাম, উল্টোদিক থেকে একটা বাস এল, তাতে লেখা রিকং পিও। সে ঠিক আছে, রিকং পিও যাচ্ছে, কিন্তু আসছে কোথা থেকে?

এই সময়ে দেখি একটা লোক রাস্তার ধারে একা একা হাঁটছে। জয়গুরু, সোজা তার পাশে গিয়ে বাইক থামালাম। জিজ্ঞেস করে বুঝলাম, যা ভেবেছি, ঠিক তাই। ব্রিজ বেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা ছিল পুহ্‌-এর জন্য। আমাকে আবার ফিরতে হবে। এতক্ষণে প্রায় ন কিলোমিটার চলে এসেছি হয় তো, আবার বাইক ঘোরালাম, এবং খানিক বাদে আবার ন কিলোমিটার উলটো চলে সেই ব্রিজের ধারে এসে পৌঁছলাম। সেই জনশূন্য ব্রিজে এখন একটু আগে দেখা সেই বাসটা পার হচ্ছে, আর উল্টোদিকের রাস্তা, যেটা সাপোজেডলি পুহ্‌ যাবার রাস্তা সেদিক থেকে একটা ডাম্পার আসছে বাসের পেছনে ব্রিজ পেরোবে বলে, আর তিন মাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে দুটি পুলিশ, খাকি উর্দি পরা।

আমাকে দেখেই তারা ইশারা করল থামতে। কোত্থেকে আসছো?

বললাম, বুঝতে না পেরে ওদিকে চলে গেছিলাম, যাবো তো নাকো, আপাতত পুহ্‌ যাবার আছে। পুলিশ মনে হল না আমার কথা বিশ্বাস করল, বলল, এখান দিয়েই যখন গেছো, আমাদের জিজ্ঞেস করলে না কেন যাবার সময়ে?

লে হালুয়া। কেউ ছিলই না, তোমরাও ছিলে না এখানে আধঘণ্টা আগে। বললাম, এইবারে মনে হল কনভিন্সড হয়েছে, কারণ ওরা তো জানে ওরা এখানে ছিল না। কথা বাড়াল না আর, হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল, এই রাস্তায় চলে যাও, পুহ্‌ আর দশ কিলোমিটার।

20170224_121910

তিনটের সময়ে পুহ্‌ পৌঁছলাম। কোথাও কিছু নেই, একটা ছোটখাটো মিলিটারি এসট্যাবলিশমেন্ট। রাস্তার ধারে দুটো মিলিটারি ট্রাক অলসভাবে ঝিমোচ্ছে, তার ড্রাইভার সিটে দুটি ফৌজি, সামনে একটা গাড়ি সারাবার ওয়ার্কশপ, সেটা কাঁচা হাতের সাইনবোর্ড দেখে বোঝা যায়, ঝাঁপ বন্ধ। খাবারের কোনও দোকান টোকান নেই।

ট্রাকের সিটে বসে থাকা ফৌজিকে জিজ্ঞেস করলাম, এখান দিয়েই নাকো যেতে হয় তো?

ফৌজি বলল, নাকো? হ্যাঁ, একদম সিধা রাস্তা। চলে যাও। … দিল্লি থেকে আসছো?

বললাম, হ্যাঁ।

এখন কোথা থেকে আসছো?

আজ বেরিয়েছি তো জিওরি থেকে।

দুপুরের খাওয়া হয়েছে?

হেসে ফেললাম, নাঃ, খাওয়া হয় নি, খাবারের জায়গা খুঁজছি, আছে নাকি এখানে কিছু?

ফৌজি নড়েচড়ে বসল, এখান দিয়ে এক কিলোমিটার চলে যাও, দেখবে আর্মির এসট্যাবলিশমেন্টের গেট আছে – ট্রাইপিক লেখা। ওখানে জিজ্ঞেস কোরো, ক্যাফেটেরিয়াতে খাবার পেয়ে যেতে পারো।

ছেলেটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এগোলাম। বুলেটবাহী দুই মূর্তির কোনও দেখা নেই, আমি তো টোটাল আঠেরো কিলোমিটার ভুল রাস্তায় চালিয়ে এসেছি, কে জানে, ওরা এখন আগে বেরিয়ে গেছে না পেছনে পড়ে আছে।

ঠিক এক কিলোমিটার এগোতেই দেখলাম Tri-Peak লেখা একটা মিলিটারি এসট্যাবলিশমেন্টের দরজা। সেন্ট্রি বসে ছিল মেন এন্ট্রান্সে, গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, খানা মিলেগা ভাইয়া?

রুটিন কিছু পুছতাছ সেরে হুকুম হল, গাড়ি ইধার লাগা লো, আরেকজন আর্মিম্যান দাঁড়িয়ে ছিল পাশেই, সে আমাকে বলল, আও মেরে সাথ।

গেলাম, কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এদের এসট্যাবলিশমেন্টেরই ডাইনিং হল। এদের লাঞ্চ আওয়ার শেষ, খাবার কিছু বেঁচে ছিল, তাই দিয়ে এখন অতিথি সৎকার হবে। ওদের কেতামাফিক।

প্রথমে হুকুম হল, ওইখানে হাত ধুয়ে নাও। – নিলাম। স্ট্যান্ডে পর পর প্লেট রাখা আছে, একটা প্লেট নিয়ে নাও। – তাও নিলাম। এইবারে ঢুকলাম কিচেনে। সেখানে ইয়া ইয়া গামলায় অবশিষ্ট খাবার দাবার রাখা। প্রথম গামলা থেকে বেরোল ফ্রায়েড রাইস। বেশ কাজু কিশমিশ দেওয়া। তার পরে ডাল। পনীরের তরকারি।

ব্যস ব্যস, এতেই আমার হয়ে যাবে। থালায় খাবার ভরে চলে এলাম ডাইনিং হলএ। খানিক বাদে সেই আর্মিম্যানটি এসে আমাকে একটা প্লাস্টিকের গ্লাস ভর্তি ক্ষীর (আসলে সেমাইয়ের পায়েস) দিয়ে গেল – ইয়ে ভি লে লো, মিঠা হ্যায়।

গুরু, আর কী চাই জীবনে? হ্যাঁ, জীবন। জীবনকে ফোন লাগালাম, ফোন লাগল না, কভারেজ ক্‌ষেত্র সে বাহার হ্যায়। দু তিনবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলাম। বাড়িতে ফোন লাগালাম, আপডেট দিলাম।

পেটপুরে খেয়ে ভাবছিলাম কাউকে জিজ্ঞেস করব কিনা খাবারের পয়সা দিতে হবে কিনা ইত্যাদি, তো কাউকেই দেখতে পেলাম না। গুটিগুটি হাত ধুয়ে থালাটিকে এক সাইডে জমা করে ব্যাগ নিয়ে ওপরে উঠলাম। সেন্ট্রি তখনও একভাবেই বসে আছে, ওটাই ওর ডিউটি আর কি। খানিক খেজুর করলাম, তার পর তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার এগোলাম।

20170224_122154

রাস্তা ভালোয় মন্দয় মিশিয়ে। এর পরে আর মাইলস্টোনে নাকো-র নাম দেখতে পাবেন না কোথাও। মালিং বলে একটা জায়গার নাম পাবেন, আর পাবেন কাজার দূরত্বের হিসেব। কিন্তু কাজা তো আজ যাবার নেই, আজ পৌঁছতে হবে নাকো।

বরফের পাহাড়েরা খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। রাস্তার ধারে ধারে বরফ দেখা যাচ্ছে।

20170224_12302820170224_123550

রাস্তাতেই দুইমূর্তির সাথে আবার দেখা হল, তারা তখন দাঁড়িয়ে ফটো তুলছিল। ওদের ফটো আবার বেশির ভাগই সেলফি – প্রকৃতির ছবিছাবা তোলায় ওদের বিশেষ উৎসাহ ইত্যাদি নেই।

এর পরে আর সঙ্গ ছাড়লাম না, একসাথে পৌঁছে গেলাম নাকো গ্রামে, তখন বাজে বিকেল ঠিক পাঁচটা। আজকের মত জার্নি শেষ, থাকার জায়গা খুঁজতে হবে।

তা খুঁজতে খুব একটা হল না। সামনেই পর পর সাইনবোর্ড লাগানো, অমুক হোমস্টে, তমুক হোমস্টে। সামনের চাতালে বসে ক্যারম খেলছিল জনাচারেক ছেলে, তাদেরই একজন বলল, আইয়ে, বলে দেখিয়ে দিল হোমস্টে-র জায়গা।

অমর হোমস্টে। একদিকে বিস্তৃত বরফের চাদর, এমনিতে বোধ হয় চাষের ক্ষেত, এখন সাদা বরফে ঢাকা, তার মাঝে একটা ইউকো ব্যাঙ্ক, ব্যাঙ্কের পেছনে সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে সারি সারি কয়েকখানা চৌকো টাইপের ঘর, তাতে চৌকি আর মেগা মেগা সাইজের লেপতোষক ভাঁজ করে রাখা রয়েছে। গোটা ঘর থেকে কেমন একটা বদ্ধ, চামসে টাইপের গন্ধ বেরোচ্ছে। মেঝে মাটির, তার ওপরে প্রাচীনকালে একটা কার্পেট পেতে দেওয়া হয়েছিল, সে আর ওঠে নি, এখন জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, লেপগুলোও কোনওদিন কাচাকুচি বা ড্রাইওয়াশ করানো হয়েছে বলে মনে হল না। তা কী আর করা, এ সব জায়গায় হোমস্টে এই রকম জায়গাতেই হয়।

20170224_165010

হোমস্টে-র ছেলেটি বলে দিল, জল পাওয়া যাবে না, সুতরাং টয়লেটের কাজ বাইরে খোলা জায়গায় সেরে আসতে হবে। শোনামাত্র আমি নো-টয়লেট মোড অন করে নিলাম। এক রাতের তো ব্যাপার।

দু খানা বুলেট আর একখানা পালসার সাইডে পার্কিং করে ফেললাম ঝটপট। সেখানে ইতিমধ্যেই আরেকটা বুলেট দাঁড়িয়ে ছিল। হোমস্টে-র ছেলেটি নিজেই বলল, কেরালা থেকে দুজন এসেছে। ওরা একটা বাইক এখানে রেখে আরেকটা বাইকে দুজনে চেপে গেছে কাজা। ওখানে থাকবে না, দুপুরে পৌঁছে ঘুরে টুরে আবার বিকেলেই চলে আসবে। আসার সময় প্রায় হয়ে এসেছে।

তাই নাকি? কাজা দিনের দিন ঘুরে চলে আসা যায়? ছেলেটা বলল, হ্যাঁ, কেন নয়? মাত্র তো একশো সোয়াশো কিলোমিটার। আপডাউন মিলিয়ে দুশো পড়বে। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লে সন্ধ্যের মধ্যেই ফিরে আসা যায়।

রাস্তা কেমন?

এই যেমন এলেন, এই রকমই।

রাস্তা খোলা আছে কাজা পর্যন্ত?

হ্যাঁ, দুদিন আগেই খুলেছে। বরফ পাবেন প্রচুর, তবে রাস্তা খোলা আছে।

জীবন আর সুখদীপের সাথে জলদি বৈঠক সেরে নিলাম। কেমন যেন ছাড়া ছাড়া পাবলিক, কোনও আলোচনাতেই উৎসাহ নেই, নিজেদের মতন নিজেরা থাকে, তিনজন যে ফেরত চলে গেল, তাই নিয়েও উচ্চবাচ্য নেই, আমি একতরফাই চেষ্টা করে যাচ্ছি আলাপ জমানোর, অন্য তরফে কোনও তাগিদ নেই।

যাই হোক, আলোচনাতে এটুকুই স্থির হল যে, আমরাও কাল সকালবেলা লাগেজ সমস্ত এখানেই রেখে কাজা যাবো। সন্ধ্যের মধ্যে আবার ফিরে চলেও আসব। একটা দিনও বেঁচে যাবে, আর কাজাতে থাকার জন্য আলাদা করে খুঁজতেও হবে না জায়গা কাল রাতে এখানেই এসে থাকব। পরশু এখান থেকে আবার রামপুর ফিরে যাবো।

হোম-স্টে-র ছেলেটা বলল, এই কাছেই নাকো লেক আছে, যান না, দেখে আসুন। ও-ই যে লাল রঙের বাড়িটা দেখছেন, ওর পেছনেই নাকো ঝিল। এখন পুরো জমে বরফ হয়ে আছে।

আমার মোবাইলে সিগন্যাল নেই, এখানে শুধু বিএসএনএল চলে, তাই ছেলেটার থেকে ফোন চেয়ে নিয়ে বাড়িতে একটু কথা বলে নিলাম। তার পরে আমি একাই বাইক নিয়ে এগোলাম নাকো লেকের দিকে। জীবন আর সুখদীপ খুব “ক্লান্ত”, তারা তাই “আয়েশ” করতে চায়, লেক কাল কাজা থেকে ফেরার পথে দেখে ফিরবে।

দেড় কিলোমিটার দূর, হেঁটে যাওয়াই যায়, তবে এখানে অক্সিজেনের অভাবটা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে একবার ওঠানামা করলেই হাঁফ ধরে যাচ্ছে, আমার তো এমনিতেই দম কম, ফুসফুস ড্যামেজড, তাই আর হাঁটার রিস্ক নিলাম না।

অবশ্য বাইকও কম রিস্কি ছিল না। একটু এগোতেই পেলাম হাল্কা চড়াই, সেখানে বরফ ঢাকা, কিছু জুতোর দাগ রয়েছে, সেখানে গেল বাইক দাঁড়িয়ে। যতই অ্যাক্সিলারেটর বাড়াই, পেছনের চাকা বাঁইবাঁই করে ঘুরে যায় বরফে স্কিড করে, বাইক আর এগোয় না। দু পায়ে ভর করে, পা দিয়ে ঠেলে এক ইঞ্চি, আধ ইঞ্চি করে একটু এদিক ওদিক করতে বাইক আবার বরফের অন্য টেক্সচার পেল, যেখানে টায়ার বসার সুযোগ পেল, বাইক এগোল। আর থামার চান্স নিলাম না, কারণ বরফে ব্রেক দাবানোটা বেশ বিপজ্জনক, এখানে চলতে হয় শুধু গিয়ারে।

লেকে আসার মুখ পেলাম না, একটা ঘিজিমিজি বাড়ি-ওলা গ্রামের মধ্যে এসে রাস্তাটা শেষ হয়ে গেল। ওখানেই বাইকটা রেখে একটা বাচ্চা ছেলেকে জিজ্ঞেস করে এর বাড়ির গোয়াল তার বাড়ির উঠোনের মধ্যে দিয়ে নাকো লেকের সামনে এসে পৌঁছলাম।

নাকো লেকের এমন ছবি যা দেখেছি, সেগুলো জল থাকা অবস্থায় তোলা। ফ্রোজেন লেক এমন কিছু আহামরি লাগল না, তার ওপর লেকে নামার কোনও রাস্তাই নেই, চারদিকে বাউন্ডারি লাগানো। হতে পারে লেকে পা রাখাটা “অপবিত্র” বা বিপজ্জনক কিছু। সাধারণভাবে যখন লেকে জল থাকে, তখন উল্টোদিকের পাহাড়ের ছায়া পড়ে লেকের জলে, সেটা একটা মারকাটারি দৃশ্য হয় – অনেকটা এই রকমঃ

nako-lake2

আর এখন যা দেখলাম, তা হল এই –

20170224_17122220170224_171229

সরু গলির এক কোণায় দাঁড় করানো ছিল বাইকটা। সেখান থেকে ঘুরিয়ে আনতে গিয়ে হাল্কা করে পা পিছলে গেল বরফে, ব্যালেন্স হারালাম, এবং বাইকটা উল্টোদিকে উলটে পড়ল। আমি ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাইকটাকে পড়ে যেতে দেখলাম।

এবার কী করণীয়? এমনিতেই দমে কুলোচ্ছে না, এখন এই একশো কিলোর বাইককে চাগাড় দিয়ে তুলি কী করে? আশেপাশে দু চারটে বাচ্চা বাচ্চা ছেলে ছাড়া আর কেউ নেই।

মিনিট তিনেক দাঁড়িয়ে দম নিলাম, নিশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হলে উল্টোদিকে গিয়ে খুব জোর করে বাইকটাকে তুলে সোজা করবার চেষ্টা করলাম। দম একেবারে আটকে যাচ্ছে, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসবে মনে হচ্ছে, হৃদ্‌পিণ্ডটা প্রায় গলার কাছে এসে আটকে গেছে, এতটা কষ্টকর কাজ একটা শুয়ে থাকা বাইককে তুলে দাঁড় করানো? … আবার শরীরের সমস্ত জোর লাগালাম। আবার, আবার – তিন বারের চেষ্টায় বাইক সোজা হয়ে দাঁড়ালো, ঝটিতি সাইড স্ট্যান্ড দিয়ে আমি বাইকের গায়েই হেলান দিয়ে পুরো জিভ বের করে হ্যা-হ্যা করে হাঁফাতে লাগলাম।

যতক্ষণে আবার স্বাভাবিক হতে পারলাম ততক্ষণে দিনের আলো মরে গেছে, সন্ধ্যে নেমে গেছে। এখনও একটা ছোট স্ট্রেচ পার হবার আছে, যেখানে বরফ পড়ে আছে। ধীরেসুস্থে বাইকে স্টার্ট দিলাম।

নামতে খুব একটা কষ্ট হল না। হোমস্টে-তে পৌঁছলাম সন্ধ্যে পৌনে সাতটায়। ইউকো ব্যাঙ্কের পাশেই ছেলেটার বিশাল কিচেন, সেখানে একটা উনুনে আগুন জ্বালিয়ে বেশ কয়েকজন আগুন পোয়াচ্ছে। আমিও দলে ভিড়ে গেলাম।

কেরালার ছেলেদুটো কাজা জয় করে এখনও ফেরে নি। কে জানে কতক্ষণে ফিরবে। বলে রাখলাম, ফিরলে যেন একবার আমার সাথে কথা বলিয়ে দেয়।

অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনলাম। নাকো থেকে একটু এগোলেই চাংদো, আর তার পরে সুমদো বা সম্‌দো বলে একটা জায়গা আছে, যেখানে বাইক বা গাড়ি নিয়ে এন্ট্রি করতে হয় আর্মির চেকপোস্টে। এই চাংদো আর সম্‌দোর মাঝের কয়েক কিলোমিটার স্ট্রেচটা খুবই বিপজ্জনক। কালও পাথর গড়িয়ে পড়েছে ওপর থেকে – একটা মারুতি জিপসি যাচ্ছিল, বড় একটা বোল্ডার তার ওপরেই পড়েছে। পাঁচজন সওয়ারীর মধ্যে তিনজনেই একেবারে সাথে সাথে থেঁতলে গেছে। এত বড় পাথর, যে তাদের দেহ কেটে কেটে বের করতে হয়েছে, পাথর সরানো যায় নি। ড্রাইভার একেবারে বিনা আঘাতে বেঁচে গেছে, দুজনের আঘাত গুরুতর, তাদের নিচে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

আমার কাল ঐ রাস্তায় যাওয়া। দেখি, কী আছে কপালে।

ঘরে ঢুকে দেখি, দুই মক্কেল বোতল খুলে বসেছেন।

মাথাটা বেশ গরম হয়ে গেল। চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে আবার গিয়ে দাঁড়ালাম বরফের মধ্যে। না, এদের সঙ্গ ছাড়াতেই হবে। পোষাচ্ছে না। অ্যাপারেন্টলি এদেরও আমাকে পোষাচ্ছে না – হতেই পারে।

ফিরে এসে ঘরে ঢোকার আগে আশেপাশের ঘরগুলো একবার চেক করে নিলাম। সবকটাই ফাঁকা, একটাতে কিছু লাগেজ রয়েছে, মনে হয় ওই কেরালিয়ান ছেলেদুটো এই ঘরেই আছে। এর মধ্যে আর কেউ আসে নি, আর কেউ নেই-ও, মানে, অন্য ঘরগুলো ফাঁকা আছে।

আমি চুপচাপ আমাদের ঘরে ঢুকে ছোট ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পাশের অন্য একটা ঘরে ঢুকে গেলাম। এদের সাথে ঘুমনো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

রাত নটা নাগাদ খাবার এল, গরম গরম এগ চাউমিন। ঠাণ্ডার কামড় তখন সারা গায়ে বসাতে শুরু করেছে, হাত জমে যাচ্ছে সমানে, চাউমিন খেয়ে আবার ফিরে গেলাম কিচেনে, খানিক আগুন পুইয়ে ফিরে এলাম আমার নতুন ঘরে। নিশ্বাস নিতে হাল্কা সমস্যা হচ্ছে, যা-ই করছি, মনে হচ্ছে হাঁফিয়ে যাচ্ছি। জ্যাকেটটা ছাড়লাম, খানিক হ্যা-হ্যা করে হাঁফিয়ে নিলাম, ব্যাগের চেন খুলে দু একটা জিনিস বের করলাম, ঢোকালাম, আবার হ্যা-হ্যা করে হাঁফানো, ভাঁজ করা গন্ধমাদন লেপটাকে বিছানায় ছড়াতে গিয়ে দেখি বিছানা একেবারে হিমশীতল।

ধড়াচুড়ো পড়ে মনে গুচ্ছ সাহস সঞ্চয় করে গিয়ে লেপের তলায় ঢুকলাম। ঘুম, ঘুম, ঘুম।


2 thoughts on “বরফ ঢাকা স্পিতি – তৃতীয় পর্ব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.