ধর্মবিশ্বাসের সাথে আমার পথ চলার গল্পঃ আরাস্তু জাকিয়া

আরাস্তু জাকিয়া বর্তমানে দিল্লি নিবাসী। একটি স্টার্ট-আপ সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা। সম্প্রতি ফেসবুকে তিনি শেয়ার করেছিলেন তাঁর জীবনের গল্প। আহমেদাবাদে একজন মুসলমান হিসেবে বড় হয়ে ওঠার গল্প, প্রথমে ১৯৯২, তার পরে ২০০২এর দাঙ্গা নিজের চোখে দেখার গল্প।

তাঁর অনুমতিক্রমে, আমি লেখাটির বাংলা অনুবাদ তুলে দিলাম আমার ব্লগে। মূল লেখাটি এইখানে


তখন আমি আহমেদাবাদের একটা নামকরা জেসুইট স্কুলের ক্লাস টু-এর ছাত্র। একদিন আমাদের ক্লাস টিচার মিসেস সিনহা এসে প্রশ্ন করলেন, “এই ক্লাসে হিন্দু কতজন?”।

সম্ভবত সরকারি কিছু গণনা চলছিল, যদ্দূর মনে পড়ে। ক্লাসের বেশির ভাগই তাদের হাত তুলল। তার পরে তিনি প্রশ্ন করলেন, “কতজন মুসলিম আছে ক্লাসে?” কয়েকটা হাত উঠল আবার। তিনি আরও দু একটা প্রশ্ন করেছিলেন। আমি কোনও প্রশ্নেই আমার হাত তুলি নি। আমি জানতামই না এই শব্দগুলোর মানে কী, আমি জানতামই না “আমি কী”। আমার বেঞ্চে বসা সহপাঠী এটা খেয়াল করেছিল, এবং প্রশ্ন করা শেষ হলে দিদিমণির কাছে নালিশ করেছিল, “ম্যাম, ও হাত তোলে নি।” “তোমার ধর্ম কী?” মিসেস সিনহা ধমকে জিজ্ঞেস করলেন আমাকে। “আমি জানি না।” আমি উত্তর দিয়েছিলাম। তিনি আমার অ্যাডমিশনের কাগজপত্র দেখে এসে জানালেন, “তুমি মুসলিম!” সে দিন আমি বাড়ি ফিরে মা-কে সব জানালাম। আমি মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “মাম্মা, মুসলিম কী?” “এটা একটা নাম, সোনা, আমরা মুসলিম”, মা উত্তর দিয়েছিল। সেদিন আমি প্রথম ধর্ম চিনতে শিখেছিলাম।

আহমেদাবাদের এক খানদানি এলাকায় আমার জন্মানো আর বড় হয়ে ওঠা, যেটা মূলত ছিল হিন্দু-অধ্যুষিত; কিন্তু অন্যান্য ধর্মেরও কিছু লোক থাকত সে মহল্লায়। প্রথম কয়েক বছর আমরা থাকতাম ‘শ্রীকৃষ্ণ অ্যাপার্টমেন্টস’ এ যেখানে ৩০০টি অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে আমরা ছিলাম একমাত্র মুসলিম পরিবার। যদিও সেটা কখনওই কোনো সমস্যা হয়ে ওঠে নি আমাদের প্রতিবেশিদের কাছে। তাঁরা আমাদের ভালোবাসতেন আর আমরাও তাঁদের ভালোবাসতাম। তার পর, ১৯৯২ সালে, আহমেদাবাদের আরেকটা মিক্সড এলাকায় আমার ঠাকুরদার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হল। এলাকাটা বিখ্যাত আইআইএম আহমেদাবাদের ঠিক পেছনদিকে। পরে জেনেছিলাম, এই আগুন লাগানো আর লুঠপাটের কাজে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদেরই কিছু প্রতিবেশি। এই সময়েই আমি আরও জেনেছিলাম যে, ওল্ড আহমেদাবাদ শহরে আমার প্রপিতামহের বাড়িও গত কয়েক দশকে অন্তত ৫-৬ বার পুড়েছে।

ফিরে আসি আমার বর্তমান সময়ে, ১৯৯২ সালে। আমার প্রতিবেশিরা তবুও আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যদিও আশপাশের এলাকা থেকে কিছু লোক এসে দেখে গিয়েছিল যে, আমরা মুসলিম, এবং আমাদের সেই জায়গা ছেড়ে চলে যাবার জন্য বাবা-মা-কে হুমকি দিতে শুরু করেছিল। ওরা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত, আমরা যখনই ঢুকতাম বা বেরোতাম, ওরা আমাদের হুমকি দিত। কিরণ ভাই, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের বিল্ডার, আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, বলেছিলেন, “একদম চিন্তা করবেন না। ওদের আমি সামলে নেব।”

কিন্তু কিছুই বন্ধ হল না। কয়েক দিন বাদে, আমার বাবা গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন, এক জায়গায় প্রচুর জ্যামে গাড়ি থামাতে হল। একটু বাদে জানা গেল, সামনে কিছু বিজেপি/ভিএইচপি কার্যকর্তা প্রত্যেকটি গাড়ি থামাচ্ছে এবং প্রত্যেকটি গাড়ির ওপরে চড়ে তাদের উইন্ডশিল্ডে স্বস্তিক চিহ্ন এঁকে দিচ্ছে। অবধারিতভাবেই বাবা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছিলেন কিন্তু তিনি শান্ত হয়ে রইলেন, যখন তাঁর গাড়ি সামনে এল, শান্তভাবে উইন্ডস্ক্রিনে স্বস্তিক আঁকতে দিলেন এবং তারপর উন্মাদের মত উর্ধ্বশ্বাসে গাড়ি চালিয়ে ভাগলেন সে জায়গা থেকে।

আরেক রাতের কথা, চারদিকে গুজব ছড়াচ্ছে আরও আরও দাঙ্গা হচ্ছে আহমেদাবাদ জুড়ে, আমরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এক পারিবারিক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। তিনি আইআইএম আহমেদাবাদে পড়াতেন, তাই আমার বাবা-মা হয় তো ভেবেছিলেন আইআইএম ক্যাম্পাসের মধ্যে তাঁর বাড়ি খুব সুরক্ষিত থাকবে, তাই ওখানে লুকনোই নিরাপদ। সেখানে আমরা তাঁর সঙ্গে কথা বলছি, এমন সময় জোরে জোরে আওয়াজ শোনা যেতে লাগল, মনে হচ্ছিল যেন একসাথে বিশাল সংখ্যক লোক দূর থেকে এদিকেই এগিয়ে আসছে। আমার বাবা-মা প্রায় নিশ্চিত ছিলেন যে একদল দাঙ্গাবাজ জনতা আইআইএম ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়েছে, এবং তারা বোধ হয় আমাদের এখানে লুকিয়ে থাকার কথা জেনে ফেলেছে। আমাদের আশ্রয়দাতাও খুব ভয় পেয়ে গেছিলেন, তাঁর ভয় পাওয়ার কারণ যে আমাদেরই উপস্থিতি সেটাই আমার বাবা-মা-কে আরও লজ্জিত করে তুলছিল। অবশেষে তাঁর মাথায় বুদ্ধি খুলল, তিনি বললেন “আমি বরং গেটের ওয়াচম্যানকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি এই দাঙ্গাবাজরা কোথা দিয়ে আসছে।” ফোন করার পরে তিনি জানতে পারলেন যে আওয়াজটা আসছে ক্যাম্পাসের মধ্যেই একটা বাস্কেটবল ম্যাচের মাঠ থেকে।

পরিস্থিতি ক্রমশ বদলাতে লাগল। একদিন রাত্রে যখন আমরা বাড়ি ফিরলাম, দেখলাম আমাদের দরজায় একটা কাগজ আটকানো আছে, তাতে এই রকম কিছু লেখা ছিলঃ “শেষ সুযোগ! পালাও, নয় তো …!” দরজার গোড়ায় এই বিপদ চলে আসার পর আমার বাবা-মা নড়েচড়ে বসলেন। তবুও, আমার মা এক গোঁ ধরে বসেছিলেন, তিনি কিছুতেই আমাকে কোনও ধর্মীয় ঘেটোতে বড় হতে দেখতে চান না। তাই আমরা কয়েকদিন বাদে আরেকটা মেইনস্ট্রিম এলাকায় উঠে এলাম, এলাকাটা বিখ্যাত এনআইডি-র কাছেই। আমাদের গলিটায় ছিল হিন্দু মুসলমানের পাশাপাশি বসতি। প্রথম যে প্রতিবেশির সাথে আলাপ হয়েছিল, তাঁরা ছিলেন এক চমৎকার ভিন্নধর্মী দম্পতি – প্যারিসে পড়াশোনা করা দুই ভারতীয় আর্কিটেক্ট। কোনও এক হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকাতে তাঁদের বাড়িও সম্প্রতি আক্রান্ত হয়েছিল এবং তাঁরাও সে জায়গা ছেড়ে এসে এই নতুন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন।

কিন্তু এতক্ষণ যা যা বললাম, তার পরেও আমার কখনও মনে হয় নি যে আমি নির্দিষ্ট কোনও একটা ধর্মাবলম্বী। আমার পরিবারের কেউ কখনও নামাজ পড়ে নি, আমরা কখনও রোজা রাখি নি। কেবলমাত্র ঈদের দিন সকালবেলায় বাবা আমাকে একটা মসজিদে নিয়ে যেতেন, এবং আমি আশপাশের লোকজনকে দেখে হাঁটু গেড়ে বসতাম, উঠতাম আর বিড়বিড় করে আশপাশের লোকজন যা বলছে তা-ই নকল করার চেষ্টা করতাম। ১৯৯২ সালের পর, আমরা যে নতুন সোসাইটিতে উঠে এলাম, ক্রমে ক্রমে সেখান থেকে সমস্ত হিন্দু অন্যত্র সরে গেল আর আমাদের গলিটা পুরোপুরি মুসলমান মহল্লা হয়ে গেল। মানে পাড়ার সমস্ত ছেলে একসাথে নামাজ পড়ত, রোজা রাখত আর মসজিদের আশপাশে ঘোরাঘুরি করত। আমি কখনও করি নি। ওরা আমার পেছনে লাগত সময়ে সময়ে, অবশ্য তার জন্য আমার বাবার জনপ্রিয়তার অভাবও অনেকাংশে দায়ী। আমার মনে আছে, ওরা এমনকি আমাকে খাটো প্যান্ট পরা নিয়েও উত্যক্ত করত। “মৌলানা আমাদের খাটো প্যান্ট পরতে মানা করেছেন”, ওরা বলত, “মৌলানা আমাদের টিভি দেখতেও মানা করেছেন”। কখনও কখনও মৌলানাসাহেব যখন কাছের মাদ্রাসা থেকে সাইকেল চালিয়ে আমাদের পাড়া দিয়ে যেতেন, ছেলেরা ক্রিকেট খেলা ছেড়ে কাছের কার পার্কিংয়ে গিয়ে লুকিয়ে থাকত, উনি চলে না যাওয়া অবধি। একমাত্র আমিই বাইরে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করতাম, ব্যাপারটা হচ্ছেটা কী! আমাদের খুব সুন্দর সুন্দর দুটো কুকুর ছিল এবং সেই কারণে অনেক নালিশ জমা পড়ত আমাদের বাড়িতে, কারণ কুকুর এবং কুকুরের বর্জ্য, দুটোই ইসলামে না-পাক, অপবিত্র। মনে আছে, আমাকে কাফির বলে ডাকা হত, একাধিকবার, আমার বড় হয়ে ওঠার দিনগুলোতে।

ধর্মের সাথে আমার সম্পর্ককে সম্ভবত একটা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় – ‘উদাসীন’।

সেই সময়ের আরো দুটো ঘটনা আমার মনে আছে । একবার আমরা আমাদের এক মুসলিম প্রতিবেশির বাড়ি গেছিলাম, যেখানে এমনিতে খুব কমই যাওয়া হত, আর সেখানে সেই প্রতিবেশির কন্যা একটা শোনা-কথা সত্যি কিনা, আমার কাছে জানতে চেয়েছিলঃ “তুমি নামাজ পড়ো না?” আমি বলেছিলাম, “না”। মেয়েটি বলেছিল, “তুমি জানো না, দুই জুম্মা (শুক্রবার) নামাজ না পড়লে মুসলমান আর মুসলমান থাকে না?” আমার অতি-প্রতিবাদী বাবাও এই কথা শোনার পর অদ্ভূতভাবে চুপ করে রইলেন এবং কেমন একটা মুখ করে বসে রইলেন। “নামাজ না পড়লে এই হবে, সেই সাজা পাবে, অমুক পাপ হবে” – এসব কথা আমি অসংখ্যবার শুনেছি, কিন্তু পড়লে কী ভালো হবে, অথবা, পাপ- সাজার ভয়ে নয়, ভালোবেসে ভক্তিভরে নামাজ পড়তে হয় – এমন কথা কোনওদিন কাউকে বলতে শুনি নি। একবারও না।

দ্বিতীয় ঘটনাটা ছিল যখন আমি ফুটবলের মাঠে আমার এক সহপাঠীর সাথে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। সে আমাকে মাটিতে ফেলে ঠেসে ধরেছিল, আর চীৎকার করে বলেছিল, “শালা মিয়াঁ, তোর ঘরে আগুন লাগিয়ে দেব”। আমার মনে আছে, এই কথা শুনে আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল এই রকমঃ ‘শিট্‌, এবার বাকিরাও জেনে গেল যে আমি মুসলমান’। যে তথ্যটুকু আমি আপাতভাবে ঢেকে রাখতাম, কারণ আমার নামটা কিছুটা সেকুলার-ঘেঁষা (ইচ্ছাকৃতভাবেই, আমার মা চাইতেন আমার এই রকমের নাম হোক) এবং আমার চেহারা বা অ্যাকসেন্ট দিয়ে কোনও মুসলমান স্টিরিওটাইপের সাথে আমাকে মেলানো যেত না।

আমার মনে পড়ে না আমাদের পাড়ায় আমি ১০-১২ বছর বয়েসের বেশি কোনও মুসলিম মেয়েকে কখনও দেখেছি। হয় তারা বোরখা পরে বেরোত, অথবা ঘরের ভেতরেই থাকত। কয়েকজনকে আমি তাদের বিয়ের সময়ে দেখেছি, কিন্তু সেখানেও তাদের মুখ-মাথা ঢাকা থাকত। এই সময়কার আরেকটা ঘটনা আমার মনে পড়ছে। আমি মা-কে “মুম্মা” বলেই ডেকে এসেছি চিরকাল, কখনও সখনও আদর করে শুধু “মু” বা “ম” বলে ডাকতাম, যা “মা”-এরই সংক্ষিপ্ত রূপ ছিল। স্কুলের অটো এসেছিল এবং তাতে ওঠার আগে আমি হাত নেড়ে বলেছিলাম, “বাই ম”। অটোয় বসা একটি মুসলিম বিশ্রীভাবে হেসে বলেছিল, “এ তো হিন্দুদের মত আম্মাকে ‘মা’ বলে ডাকে”!

তার পর ১৯৯৮ সালে, আমার মনে পড়ছে, একদিন আমি শুনলাম আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর বাবার জেনারেল স্টোর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শহরে কোথাও কোনও দাঙ্গা লাগে নি, স্রেফ একটা পাতি সাম্প্রদায়িক গুজব উঠেছিল কোথাও, আর তার ফলে স্রেফ একটা দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেল। মনে আছে, আমি তার পরের দিনই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দোকানে গেছিলাম কিছু জিনিস কেনার ছিল বলে। আমি যখন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, দোকানের মালিক তখন আরেকজনের সাথে এই রকমের কথোপকথন চালাচ্ছিলেন, “দেখেছো আমি কী করেছি?” “হুঁ, কেরোসিনটা কিন্তু আমিই এনে দিয়েছিলাম”।

এই সময়েই আমি একদিন আবিষ্কার করলাম, আমার বাবা, যাঁর অভ্যেসই ছিল ক্ষমতাশালী লোকজনের সাথে যোগাযোগ বানানো, তিনি ইনল্যান্ড লেটারে চিঠি দেওয়া নেওয়া করছেন আরএসএসের তৎকালীন অধ্যক্ষ কে এস সুদর্শনের সাথে। বাবা সবসময়ে এই ধরণের কিছু চিঠি নিজের কাছে রাখতেন কারণ কখনও কোথাও সাম্প্রদায়িক গুজব ছড়ালে এই চিঠিগুলো তাঁকে বাঁচাতে পারে বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর ধারণা ছিল চিঠিগুলো তাঁকে কোনও মারমুখী জনতার হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

সুদর্শন আমাদের একদিন ডিনারে ডেকেছিলেন আহমেদাবাদের কাছেই কোনও এক আরএসএসের হেডকোয়ার্টারে। একটি গাড়ি আমাদের এসকর্ট করে নিয়ে গেছিল, সন্ধ্যে সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা সেখানে পৌঁছলাম। মনে আছে, ঢুকতে গিয়ে দেখেছিলাম ২০-৩০ জন খাকি চাড্ডি পরা লোক হাতে লাঠি নিয়ে ড্রিল করছে সেখানে, বাচ্চা হিসেবে সে দৃশ্য দেখে আমি বেশ ভয়ই পেয়ে গেছিলাম। আমরা ভেতরে ঢুকে দেখলাম, সুদর্শন একটি ছিমছাম সাদামাটা ঘরের মধ্যে বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে ৩-৪ জন লোক বসে ছিলেন। আমাদের প্রথম প্রশ্ন করা হল, “আপনার বাড়ি আর অফিস কোন এলাকায়?” – আমার বাবা জবাব দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বসে-থাকা লোকেদের মধ্যে দুজন উঠে পাশের ঘরে চলে গেলেন, খানিক পরে ফিরে এলেন। আমার আজ অবধি ধারণা, তারা ঐ ঠিকানাদুটো নোট করতে গেছিল, কারণ তার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে কোনও হামলা হয় নি।

এই আলাপচারিতার ফল আমরা টের পেয়েছিলাম কয়েক বছর বাদে। ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০০২, বিকেল তখন সাড়ে চারটে হবে। আমি টিউশনে যাবার জন্য বেরোচ্ছিলাম, হঠাৎ আমার মা অফিস থেকে আমাকে ফোন করলেন। “বাবা, আজ যাস না, দাঙ্গা লাগার খবর পাওয়া যাচ্ছে, আমরাও তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছি।” ততদিনে আমি শিখে গেছিলাম দাঙ্গার খবর পেলে কী করতে হয়। আমি সমস্ত কাজ বাতিল করে ঘরেই রইলাম। মনে আছে, খানিক পরেই আমার বাবা-মা এসে গেছিলেন এবং সেই রাতে আমরা আধো-ঘুমে জেগে ছিলাম সারারাত। পরদিন সকালে যখন আমরা ঘুম থেকে উঠে আমাদের একতলা বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালাম, দেখলাম দূরে দু-তিন জায়গা থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। তাদের মধ্যে একটা বেশ কাছেই মনে হল, সামনের মোড়ের উল্টোদিকেই। একটু পরেই প্রতিবেশিদের থেকে খবর পেলাম ওখানকার বিল্ডিংয়ে আমার বাবার অফিসটি বাদ রেখে বাকি প্রত্যেকটি মুসলিম ঘর বা অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কে জানে, সে হয় তো সেদিনের সেই দুটো লোকের নোট লিখে রাখার ফল। হয় তো বা অন্য কোনও কারণ।

স্থানীয় কেবল চ্যানেলে সেদিন ‘গদর’ দেখানো হচ্ছিল। তার পরেই প্রতিবেশিরা দলবদ্ধভাবে গলির মুখে এসে দাঁড়াল। এক বদমেজাজি বাবার সন্তান হিসেবে বড় হয়েও সেদিনকার সেই উৎকণ্ঠা চোদ্দ বছরের আমার কাছে নতুন ছিল। হঠাৎ করে আমাকে চেপে ধরেছিল প্রাণের ভয়, কারণ হঠাৎ করে সেদিন কিছু লোক আমার নামের সঙ্গে মেলে এমন যে কাউকে খুন করার কথা বলছিল। আমার চারপাশের লোকজন যে ভাষায় কথা বলছিল, আমি সে ভাষা বুঝতে পারছিলাম না। তারা আলোচনা করছিল আমরা কোনদিক দিয়ে পালাতে পারি, কার বাড়ি কোনদিকে, কোন ধর্মের লোক কোন গলিতে থাকে। আমার চারপাশ সম্বন্ধে এত বেশি তথ্য আমি এর আগে কোনওদিন পাই নি। মহিলা আর বাচ্চাদের ছাদে পাঠিয়ে দেওয়া হল কেরোসিনের বোতল বানিয়ে রাখার জন্য, যাতে দাঙ্গাবাজ জনতা এলে সেগুলো তাদের ওপর ছোঁড়া যায়। কিছু অতি-উৎসাহী লোক এসে এ-ও দাবি করল যে তারা আমাদের গলির দু দিকে দাঁড়িয়ে পাহারা দেবে। “তারপর মব এসে গেলে করবে-টা কী?” উত্তরে হিসহিসিয়ে উঠল একজন।

gulberg_647_060216092814

মনে আছে, সেদিন সন্ধ্যেবেলায় বাবা মনে সাহস আনার চেষ্টা করতে করতে গলির এক মাথায় হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন। খুব তাড়াতাড়িই তিনি ফিরে এলেন এবং জানালেন হরেন পান্ডিয়া (যিনি পরে খুন হয়েছিলেন) একটা বড় মব জড়ো করছেন উল্টোদিকের রাস্তার মোড়ে। এর বেশ কয়েক বছর পরে বাবার সঙ্গে হরেন পান্ডিয়ার আবার দেখা হয়েছিল এবং তিনি বাবাকে বলেছিলেন, “সেদিন সন্ধ্যেবেলায় যদি আমি ওখানে না থাকতাম, তোমার গলি সেদিনই পুড়ে ছাই হয়ে যেত, আমি তখন ওখানে দাঁড়িয়ে ঐ মবকে শান্ত করে অন্যদিকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছিলাম”। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই সেদিন ঐ মব দেখে বাবা ভয় পেয়ে গেছিলেন।

ইতিমধ্যে আমার মা এক পারিবারিক বন্ধু, এক সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে ফোন করছিলেন। এর আগে যতবার এই ধরণের ঘটনা ঘটেছে, আমরা ওঁকে ফোন করতেই উনি সাথে সাথে আমাদের গলির মুখে পুলিশ পোস্টের ব্যবস্থা করে দিতেন। কিন্তু সেদিন, আমার মা-কে অবাক করে তিনি বললেন, “দুঃখিত, এইবারে আমার করার কিছুই নেই”। মা তখনই বুঝেছিলেন, এবারের ঘটনা আলাদা কিছু। দশ বছর পরে আমাদের আবার পালিয়ে যাবার সময় এসেছে। সেই ভিন্নধর্মী দম্পতি, যাঁদের সঙ্গে আমাদের সবার প্রথমে আলাপ হয়েছিল, তাঁরা এসে জানালেন তাঁদের এক বন্ধু যিনি পুলিশ অ্যাকাডেমির অধিকর্তা, থাকেন আহমেদাবাদের জুহাপুরা নামের এক মুসলিম এলাকায়, তিনি তাঁর ফার্মহাউসে আমাদের আশ্রয় দেবার অফার করেছেন।

আমরা আশপাশের কিছু পরিবারকে জিজ্ঞেস করলাম তাঁরাও আমাদের সাথে যেতে চান কিনা, কারণ আমরা ছাড়াও আরও কয়েকজনের জায়গা হয় তো হয়ে যেতে পারে। কেউই রাজি হলেন না। কেউ বললেন তাঁরা ঘরে রাখা ক্যাশ টাকা আর জুয়েলারির জন্য ঘর ছাড়তে পারবেন না, কেউ বললেন তাঁরা পালাতে চান না, আর কেউ কেউ রাজি হলেন না, কারণ তাঁরা আমার বাবাকে পছন্দ করতেন না।

পুলিশ অ্যাকাডেমির অধিকর্তা যথেষ্ট স্মার্ট, তিনি তাঁর বাড়ির চৌকিদারকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে পুলিশের গাড়ি সমেত আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা সেই পুলিশের গাড়ির পিছুপিছু আমাদের গাড়ি নিয়ে, আবার বাড়ি ছাড়লাম। মনে আছে, যেতে যেতে দেখছিলাম আমাদের গলির ঠিক বাইরে এক মুসলিম কাকুর স্টেশনারি দোকান দাউ দাউ করে জ্বলছে, আর দেখেছিলাম ৪-৫ জন করে লোকের একেকটা দল চলেছে রাস্তায়, সবার কপালে গেরুয়া ফেট্টি, সবার হাতে ত্রিশূল। হঠাৎ জুহাপুরা নামে সেই অচেনা জায়গাটা আমাদের খুব নিরাপদ বলে মনে হতে লাগল। আমি এর আগে কখনও জুহাপুরা আসি নি। যেই আমরা সেই এলাকায় ঢুকলাম, গাড়িতে বসা একজন বলে উঠল, “ইয়ে বর্ডার হ্যায়। আমরা জুহাপুরা এসে গেছি।” কখনও না-দেখা একটা জায়গায় পৌঁছে যে নিরাপত্তার আভাস আমরা পেয়েছিলাম, সে স্মৃতি আজও আমার কাছে অমলিন।

পরের কয়েকটা রাত আমার মনে আছে। আমরা আমাদের আশ্রয়ের বারান্দায় অনেক রাত পর্যন্ত বসে থাকতাম। দূরে হয় তো কোথাও কিছু জ্বলছে, তার হলদেটে আভা আমরা দেখতে পেতাম, আর শুনতে পেতাম জড়ো হওয়া জনতার গোলমাল আর শ্লোগানের আওয়াজ।

দিনের বেলা সব এক রকম। যখন তখন দূরে কালো ধোঁয়ার মেঘ দেখা যেত আর আমরা বসে বসে আন্দাজ করতাম, “ঐ কার্গো মোটর্স জ্বলছে”, “ঐটা অমুক দোকান পুড়ছে বোধ হয়” – আর অতি অবশ্যই ফোন বেজে চলত অক্লান্তভাবে। গুজরাতি খবরের কাগজগুলোও তাদের ভূমিকা পালন করে চলেছিল। একটা জনপ্রিয় গুজরাতি খবরেরে কাগজের প্রথম পাতায় একদিন একটা ছবি ছাপানো হল, যাতে অনেক দূর থেকে তোলা একটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা মানুষের অস্পষ্ট অবয়ব, যার পরণে সাদা রঙের কিছু আর হাতেও কিছু একটা জিনিস ধরে আছে বলে মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে – তার নিচে হেডলাইন (অনুবাদে), “কে এই বন্দুকধারী মুসলিম?”

প্রায় এক সপ্তাহ পরে আমরা আমাদের বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম। আমি ঢুকতে যাবো ঘরে, ঠিক তখনই এক পাশের বাড়ির লোক আমাদের দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “লো ভগোড়ে আ গয়ে ওয়াপস”।

আমাদের গলিতে কারুর কোনও ক্ষতি হয় নি কিন্তু কাছাকাছি কয়েকটা বাড়িতে লুঠপাট হয়েছিল। তাদের মধ্যে একটা ছিল আমার এক সহপাঠীর বাড়ি। “আমাদের এক প্রতিবেশি আমাদের টিভিটা উঠিয়ে নিয়ে গেল”, অনেক পরে সে জানিয়েছিল।

ফিরে আসার কিছুদিন বাদে আমার মা আমাদের আগের বাড়ি – যে বাড়ি থেকে আমরা ১৯৯২ সালে চলে এসেছিলাম, সেখানকার এক পারিবারিক বন্ধুকে ফোন করছিলেন। তিনি জানালেন, তাঁরা খুব আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিলেন, এমনকি সকালের বেড়ানোও বন্ধ করে দিয়েছিলেন কারণ সবসময় তাঁদের এলাকায় জোরালো গুজব ছড়াত, জুহাপুরা থেকে নাকি ট্রাকভর্তি মুসলিম আসছে সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেবার জন্য। আমি শুনে প্রায় হেসে ফেলেছিলাম। মনে আছে, এরও অনেক মাস পরে, এক রাতে আমি আর বাবা, মা যে ঘরে রাতে শোয়, সেই ঘরের দরজা খুলে ঢুকতে গেছিলাম, আর মা সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে উঠে প্রচণ্ড ভয়ে চিল-চীৎকার করতে শুরু করেছিলেন। ভেবেছিলেন আমরা বোধ হয় কোনও দাঙ্গাবাজ, রাতের অন্ধকারে তাঁকে খুন করতে ঢুকেছি। মা-কে শান্ত করে আমরা হেসেছিলাম, সে হাসির রেশ তারপর বহু বছর পর্যন্ত আমরা বজায় রেখেছিলাম।

এই সময়ের আরও দুটো স্মৃতি মনে আসছে। তখন বোধ হয় ২০০২এর মার্চ মাস হবে। আমরা তখন সদ্য ঘর ছেড়েছি, চারপাশে তখন একটা দমবন্ধকর পরিস্থিতি। আমার এক সহপাঠী আমাকে ফোন করে তার জন্মদিনের পার্টিতে আমাকে নেমন্তন্ন করল। আমি তার মানসিক অবস্থান সেদিন বুঝে উঠতে পারি নি, হয় তো সে-ও আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারে নি। … দ্বিতীয় স্মৃতি আমার জীবনের আরও একটা বড় পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত। আমার বাবা-মা আমাকে আমার প্রিয় স্কুলে আর পড়ানোর সাহস করেন নি কারণ সেটি হিন্দু এলাকায় ছিল। মনে রাখতে হবে, সেটা ছিল মার্চ মাস, ফাইনাল পরীক্ষার সময় আর আমি তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র। আমার বাবা স্কুলের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে কয়েকবার ফোন করেছিলেন, তাঁরা পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে আমাকে পরের ক্লাসে প্রোমোশন দিয়ে দিয়েছিলেন। পরের ক্লাসের জন্য আমাকে ভর্তি করা হল ওল্ড আহমেদাবাদের এক জেসুইট স্কুলে, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগুরু ছিল। আমাকে অনেকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে, আমি কেন আগের স্কুল ছাড়লাম, কারণ আগের স্কুলটা এত নামকরা ছিল, সবাই সেখানে নিজের সন্তানকে ভর্তি করাতে চাইত। আমি একেকবার একেক রকমের গল্প বানিয়ে বলতাম।

খুব শিগগিরই, আমার বাবা-মা একটা রায়ট-রিলিফ ক্যাম্পে কাজ করা শুরু করলেন। আমি সেখানে একবার গেছিলাম, কোনও এক এনজিও বাচ্চাদের নিয়ে এসেছিল ছবি আঁকার জন্য। একটা মেয়ে একটা লাল-চুলো দৈত্যের ছবি এঁকেছিল। কিছুদিন পরেই আমার বাবা আগের এনজিও ছেড়ে এই কাজের সঙ্গে পুরোদমে যুক্ত হয়ে গেলেন মায়ের সাথে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বাবা সার্ভে করতেন পথচারীদের প্রশ্ন করে। একটা প্রশ্ন ছিল, “জুহাপুরা সম্বন্ধে আপনার কী মনে হয়?” কারুর উত্তর হত, “ওটা একটা মিনি-পাকিস্তান” কারুর বা বক্তব্য হত “ওখানে একটা হেলিপ্যাড আছে, যেখানে পাকিস্তান থেকে হেলিকপ্টারে করে মিসাইল আনা হয় ইন্ডিয়ার সাথে যুদ্ধ করার জন্য”। মনে আছে একবার কোথা থেকে যেন হাতে একটা পামফ্লেট পেয়ে থতমত খেয়ে গেছিলাম। ভিএইচপি/বজরং দল সেগুলো ছাপাত, তাতে এই রকম কিছু লেখা থাকত গুজরাতিতেঃ “এই মুসলমান ছেলেগুলো খুব হ্যান্ডসাম দেখতে হয় আর ওরা ভুলিয়ে ভালিয়ে হিন্দু মেয়েদের পটিয়ে নেয়, তার পরে তাদের বিয়ে করে ধর্মান্তরিত করে নেয়। আমাদের হিন্দু এলাকাতেও তাই জিম আর বিউটি সেন্টার খোলা উচিত যাতে আমাদের ছেলেরাও হ্যান্ডসাম হয়ে ওঠে।”

জীবন এগিয়ে চলে। ধীরে ধীরে কিছু সোশাল অ্যাক্টিভিস্টদের সাথে পরিচিতি বাড়ে, তাঁরা আমাদের বাড়ি আসা-যাওয়া শুরু করেন, কিছু ফিল্মের সাথে যুক্ত মানুষজনও আসতে শুরু করেন, কাজকর্মের পরিধি বাড়ে। এক বছর বাদে আমি আর মা, আমার বাবাকে ছেড়ে চলে আসি। অনেক পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, অনেক বছর অন্য একজনের ছায়ায় বেঁচে থাকতে থাকতে মা একদিন নিজের ভেতরের শক্তি চিনতে পেরেছিলেন, যা তাঁকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। মা একবার আমাকে জানিয়েছিলেন, একবার এক রিলিফ ক্যাম্পে এক মহিলা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে বলেছিলেন, “আপ এডুকেটেড মুসলিম ঔরত হ্যায়, আপ হমারি হালত দেখো, আপ হমারি মদদ নহি করেঙ্গে তো কওন করেগা!” সেই মুহূর্তে, তিনি নিজেকে স্বাধীনতা দেন। ২০০২এর সেই বেদনা, সেই অপরিচিত মহিলার বেদনার আলোড়ন, তাঁকে লড়াই করবার শক্তি জোগায়। মা মনে করতে থাকেন, তাঁর আর কিছু বয়ে চলবার দরকার নেই। তাঁর বেদনা সবচেয়ে বড় বেদনা নয়, তিনি মুক্ত হয়ে তাঁর ভেতরের জাগ্রত শক্তিকে অন্যদের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে পারেন, আর এর মাধ্যমেও তিনি সুখে থাকতে পারেন।

অতঃপর তিনি একটি আইএনজিওর সাথে যুক্ত হন এবং ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন গড়ে তোলেন (আপনারা হয় তো সাম্প্রতিক হাজি আলি এবং তিন তালাক কেসের ব্যাপারে এই সংগঠনটির নাম শুনে থাকবেন)। বাবাকে যখন ছেড়ে চলে আসি তখন আমার বয়েস ছিল পনেরো। সেই ঘেরাটোপ ছেড়ে চলে আসার পর জীবন হঠাৎ করে অনেক সহনীয় হয়ে ওঠে। জীবন সত্যিই সুন্দর হয়ে উঠেছিল, কারণ আমার দ্বারা কিছু হবে না এমনটা আমি কখনওই মনে করতাম না, বরং আমাকে বোঝানো হয়েছিল যে আমার মধ্যে কিছু না কিছু কুশলতা আছে, আর আমাকে অনেকে ভালোও বাসে। এই ঘটনার পরে আমার চেনাপরিচিত অনেকেই তাঁদের নিজের নিজের ঘরোয়া সমস্যার কথা আমার সাথে শেয়ার করেন এবং আমি বুঝতে পারি, আমি একা নই। দীর্ঘ এক সময় ধরে স্বার্থপরের মত কেবল নিজেকেই নিপীড়িত বঞ্চিত হিসেবে চিনে ওঠার পর, আমি শক্তি সঞ্চয় করলাম আর নতুন প্রজন্মকে শক্তি জোগানোর লক্ষ্যে একটি অলাভজনক সংস্থা চালু করলাম। টানা ৬ বছর ধরে প্রায় ৬০০০ কলেজের যুবকযুবতীদের সাথে কাজ করেছি, তাদের শিখিয়েছি সাম্প্রদায়িকতা কী জিনিস, লিঙ্গবৈষম্য কী, নাগরিকত্ব কী – এমনকি হ্যাপিনেস কী।

মনে আছে, একবার এক নামকরা কলেজের একদল হিন্দু ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আমি গেছিলাম জুহাপুরা, সেখানে প্রায় ২০ জন স্থানীয় মেয়েদের সাথে কথা বলেছিলাম। মীটিংয়ে যাবার আগে ছাত্রছাত্রীদের অনেকেরই বাবা-মা আমাকে বার বার সাবধান করেছিলেন, “আপনি নিশ্চিত ওখানে যাবার ব্যাপারে?”, “সাবধান, ওটা কিন্তু বদ লোকেদের আখড়া”, ইত্যাদি। অনেকেই এসেছিল, তাদের নিয়েই আমি গেছিলাম। সেই সাক্ষাৎকার ছিল আমার জীবনের অন্যতম এক সেরা মুহূর্ত। এই ছেলেমেয়েগুলো সেই মেয়েগুলোর সাথে বিভিন্নভাবে ইন্টার‍্যাক্ট করে। নিজেদের জীবনের টুকরোটাকরা শেয়ার করা, জোকস শেয়ার করা, সেই মেয়েগুলো বলছিল তারা জুহাপুরার বাইরের পৃথিবীটাই দেখে নি কোনওদিন, আর এই কিশোরকিশোরীরা বলছিল তাদের নিজেদের জীবনের সমস্যাগুলোও কত এক রকমের! ফিরে আসার আগে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেছিল, নিজের নিজের ঘরের অনুষ্ঠানে একে অপরকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল। দেয়ালটা ভেঙে পড়েছিল, অন্তত সেই ১০-১৫ জন যাদের আমি নিয়ে গেছিলাম সেই সন্ধ্যেয়, তাদের দেয়াল আমি ভেঙে পড়তে দেখেছিলাম। মনে আছে এই একই দলকে আমি আরেকদিন নিয়ে গেছিলাম নারোদা-পাটিয়াতে, দাঙ্গায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজনেদের কাছে। প্রতিটা ক্ষতিগ্রস্ত লোক, ব্যতিক্রমবিহীনভাবে বলেছিল, “হিন্দুরা আমাদের সমস্যা নয়। ভালো আর খারাপ লোক দুই দিকেই আছে। এই দাঙ্গা ঘটেছে রাজনীতি আর রাজনীতিকদের প্রত্যক্ষ মদতে। তারাই আসল সমস্যা।”

উল্টোদিকে, সেবারে আমার দাদু আমাদের বাড়িতে এলেন একদিন বিকেলে। যদিও এককালে তিনি গর্ব করে নিজের ধর্মাচরণ না করার কথা ফলাও করে বলে বেড়াতেন, এখন এই বয়েসে এসে তিনি লম্বা দাড়ি রেখেছেন, এবং সবসময়ে ট্র্যাডিশনাল কুর্তা-পাজামা পরে থাকেন। তিনি এসে মা-কে বললেন, “বেটা এই এনজিওর কাজকর্ম তো ঠিক আছে, কিন্তু আরাস্তুকে বল্‌ একটু দীন (ধর্ম)-এর কাজও করতে।” মা সোজা উত্তর দিয়েছিল, “বাবা, তুমি সারাজীবনে ধর্মের জন্য যতটা কাজ করেছো, আমার ছেলে এই বয়েসে তার থেকেও বেশি কাজ করে রেখেছে এই এনজিও-র মাধ্যমে।” কখনও কখনও তবলিগি জামাত গোষ্ঠীর সদস্যরা আমাদের বাড়ি এসে উপস্থিত হত। এদের কাজ ছিল লোকজনকে ইসলামের পথে, ইসলামের আরও কাছে নিয়ে আসা, যদিও তারা জানত আমি কখনও নামাজ পড়ি নি, কখনও রোজা রাখি নি, তবু তারা আসত আর চেষ্টা করত আমাকে মসজিদের পথে নিয়ে যাবার। এদের দলের এক এলিট সদস্য একবার আমাকে বলেছিল, “আজকাল মুসলমানের বাচ্চাদের নজর খুব বেশিমাত্রায় সায়েন্স আর টেকনোলজির দিকে চলে গেছে। সে সব তো ঠিক আছে কিন্তু দীনের পথে নজর দেওয়াটা সবার আগে জরুরি।”

সময়ের সাথে সাথে অবশেষে মায়ের সাথে এক সুন্দর অনুভূতিপ্রবণ মানুষের দেখা হল, মা তাঁকে বিয়ে করলেন। মানুষটি এক হিন্দু ব্রাহ্মণ। তিনি চিকেনের ভক্ত, আর আমার মা ভালোবাসেন দোসা। এদিকে আমার কাজকর্ম ভালোভাবেই চলছিল। ব্যাংককের এক ওয়ার্কশপে ভারতীয় ডেলিগেটদের একজন হিসেবে আমাকে পাঠানো হয়েছিল, সেই আমার প্রথম বিদেশযাত্রা। একদিন আমি ফ্লি-মার্কেটের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম, হঠাৎ আমার সামনে ঝুলন্ত হাঁস আর শুওরবোঝাই একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। কী রকম যেন একটা ঘেন্না লাগল আমার। সেই ট্রিপে আমার খাওয়াদাওয়া নিয়ে বিস্তর অসুবিধে হয়েছিল। যে আমি বাড়িতে কট্টর আমিষাশী, সেই আমাকে ব্যাংককে ঘুরে ঘুরে পাতি চিকেন খুঁজে বেড়াতে হয়েছিল, কারণ ব্যাংককে আমার চারপাশে খাদ্য হিসেবে সেইসব প্রাণীই দেখা যেত যেগুলো আমি খাই না। এই সময়ে সম্পূর্ণ ভেজ-ননভেজ সংক্রান্ত বিতর্ক, বিশেষত গুজরাতে তার সাথে যেভাবে ধর্মের মিশেল লাগে, তা আমার কাছে এক নতুন রূপে প্রকাশ পেল। আমি বুঝলাম, খাদ্যাভ্যাসের কোনও ঠিক বা ভুল হয় না, ধর্মের সাথেও তার কোনও সম্পর্ক নেই, এটা সম্পূর্ণই খাদ্যের “অভ্যাস”।

এর কিছু সময় পরেই, আমেরিকান এমব্যাসির পাবলিক অ্যাফেয়ারস ইউনিট আমাদের এনজিওকে সাহায্য দেওয়া শুরু করল। কিছু সময় বাদে তারা আমাকে তাদের ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটর লিডারশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত করে আমাকে আমেরিকায় একটা ট্রিপে পাঠাল। আমরা সেখানে সেনেটরদের সাথে দেখা করলাম, ইউএন এবং আমেরিকান সরকারের প্রতিনিধিদের সাথে পরিচিত হলাম, আরও কিছু আইএনজিও-র সাথে আলাপ হল। ট্রিপ যখন শেষের মুখে, আমি আবিষ্কার করলাম অতিথিদের পরিচিতির যে পাতাটা দেওয়া হয়েছিল সবাইকে, সেখানে আমার নামের পাশে লেখা রয়েছে “২০০২ রায়ট সারভাইভার হু ওয়াজ ওয়র্কিং উইথ মুসলিম ইউথ অন প্রিভেন্টিং দেম গেটিং র‍্যাডিকালাইজড।” এমনিতে সবাই আমার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করছিল, আমি যেন একজন স্টার। আসলে, আমি ওখানে এক “পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন”এর শিকার হয়েছিলাম। কিন্তু আমার সেই পরিচিতি আসলে সত্যের ধারেকাছেও ছিল না। আমি “রায়ট সারভাইভার” নই, এমন অনেক লোক ছিল যাদের নিকট পরিজন মারা গেছেন সেই দাঙ্গায়, যাদের বাড়ি, সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। আমার তো কিছুই হয় নি! আর আমি মোটেই মুসলিম যুবকদের সাথে কাজ করি নি তাদের “র‍্যাডিকালাইজড” হবার পথ থেকে সরিয়ে আনার জন্য। আমি মূলত কলেজে কলেজে যেতাম হিন্দু যুবকযুবতীদের সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি বিষয় সম্বন্ধে শেখাতে। আমি এক আমেরিকান বন্ধুকে শেষে বলেছিলাম, “আমাকে আমেরিকায় এসে যেভাবে মুসলিম হিসেবে পরিচিত হতে হল, ভারতে আমাকে কখনো এইভাবে পরিচিত হতে হয় নি”।

ট্রিপের শেষদিকে, একদিন আমেরিকা থেকে আমি মা-কে ফোন করে বললাম, “মা, যথেষ্ট হয়েছে, আমি এই নন-প্রফিট জগত থেকে সরে আসছি।” “তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই তোমার জন্য ঠিক হবে, বেটা”, মা বলেছিলেন।

আমার এক প্রাক্তনী আমাকে বারবার বলত, “তু মুসলিম নহী হ্যায়। প্লিজ! ম্যায়নে বোল দিয়া ব্যস!” সে আমাকে ঐভাবে ভাবতেই বেশি স্বচ্ছন্দ ছিল। ধর্ম নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা হবার পরেই আমার রোমান্টিক আলাপচারিতা শুরু হত, কখনও কখনও হয় তো তা শুরুই হয় নি ঐ ধর্মের কারণেই আর আমি জানতাম সামনের পথ আরও বেশই সংগ্রামসংকুল। মুসলিমদের সম্বন্ধে একগাদা অপমানজনক কথাবার্তা বলার পরে আমাকে প্রায়ই বলা হত “… কিন্তু তুই তো ঠিক ঐ রকমের নয়”। আমার বান্ধবীর এক বন্ধু আমাদের সাথে একটা ছোট আউটস্টেশন ট্রিপে যাবার আগে ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ইয়ার, একটা মুসলমানের সাথে যাবো?” কলেজে একবার থিম বেসড ফ্যান্সি ড্রেস ইভেন্ট হয়েছিল। আমি একটা টার্কিশ রঙের কুর্তা আর নীল জিনস পরেছিলাম, একজন ছাত্র এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমহারে গ্রুপ কি থিম আল-কায়দা হ্যায় কেয়া? কুর্তা পরেছো যে!!!”

সেই থেকে, আজ পর্যন্ত কুর্তা পরতে আমার অস্বস্তি হয়।

জীবনের এই পর্বে এসে আজ আমি জানি, আমি নাস্তিক। কট্টরভাবে একজন নাস্তিক যার মত আর বদলানো সম্ভব নয়। অনেকদিন আগে একবার আমি ট্রেকিং ক্যাম্পে গেছিলাম, মানালিতে, একজন সহযাত্রী আমাকে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনার রিলিজিয়ন কী, ভাই?” আমি বলেছিলাম, “আন্দাজ করুন”। ওরা সব রকমের চেষ্টা করেছিল আন্দাজ করতে – হিন্দু, মুসলিম, ক্রিশ্চান, শিখ, পারসি, বৌদ্ধ, এমনকি “ইন্ডিয়ান” এবং “হিউম্যান”ও, কিন্তু কেউই “অ্যাথেইস্ট” আন্দাজ করতে পারেন নি। আমি এইভাবেই বাঁচি। আমার স্পষ্টভাবে মনে আছে আহমেদাবাদে ফিরে আসার পরের ঘটনা। আমরা বাস থেকে নেমে অপেক্ষা করছিলাম, মায়েরা এসে আমাদের নিয়ে যাবে। একটি ছেলে কিছুতেই তার ঘ্যানঘ্যানানি থামাচ্ছিল না, ভাইয়া, বলো না তোমার ধর্ম কী?” আমি এদিক ওদিক করে তাকে এড়াবার চেষ্টা করছিলাম। কিছুক্ষণ পরে তার বাবা এলেন স্কুটারে চেপে, ছেলেকে বসিয়ে স্কুটার স্টার্ট দিল, পেছনের সীটে বসে ছেলেটি আমার দিকে ঘুরে শেষবারের মত চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়াআআআআ বোলো না কেয়া অ্যানসার হ্যায়…??”

সময়ের সাথে সাথে আমার পরিবারের বিভিন্ন লোকের বিয়ে হতে দেখলাম, হিন্দুর সাথে, ক্রিশ্চানের সাথে, এমনকি দলিতের সাথেও। এক সময় আমি স্রেফ স্টাইল মারার জন্য এক হাতে শিখদের কড়া পরতাম। এক সময়ে আমার পকেটে সবসময়ে একটা ছোট্ট বুদ্ধমূর্তি ঘুরত। ঘরে বিভিন্ন হিন্দু ভগবানের মূর্তি আছে যেগুলো বিভিন্ন সময়ে আমাকে কেউ না কেউ উপহার দিয়েছে, আমার ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো আছে অসামান্য সুন্দর মধুবনী পেন্টিং, তার পাশেই রয়েছে আরেকটা অসামান্য সুন্দর জায়নামাজ। আমি সারাজীবনে যত না মসজিদে গেছি, তার থেকে অনেক বেশিবার বিভিন্ন মন্দিরে গেছি,বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে গিয়ে, স্রেফ “না” না-বলে। লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরে বা মসজিদে ঢুকেছি তাদের অনুরোধে, তাদের ভালো লেগেছে, আর তাদের ভালো লাগায় আমার কোনও অসুবিধে হয় না।

এর পর, ২০১২ সালে আমি একটি স্টার্ট-আপ শুরু করলাম। তিনজন কো-ফাউন্ডারের মধ্যে আমি একমাত্র ফাউন্ডার ছিলাম, অফিস লিজ এগ্রিমেন্টে যার নাম দেওয়া যায় নি। আমার নাম দেওয়া হলে আমরা ঐ জায়গাটা লিজে পেতাম না। আজ পর্যন্ত আহমেদাবাদে আমার প্রচুর হিন্দু বন্ধু জানেই না যে এই রকমের মনোবৃত্তির মুখোমুখি আমাকে আজও হতে হয়, যখন তারা শোনে, তাদের বিস্ময়াহত মুখ দেখে আমি মজা পাই। আজ কুড়ি কুড়ি বছরের পার পেরিয়ে এসেও আহমেদাবাদ তার মুসলিম বাসিন্দাদের সাথে যোগাযোগ রাখে না, কারণ প্রথমে ১৯৯২ আর তারপর ২০০২ সালের পরে, সেখানে ঘেটো বানানোর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। যে সব মুসলিম পালিয়ে বেঁচেছিল তারা কেবলমাত্র মুসলিমদের ঘেটোতে থাকতেই বাধ্য হয়, এবং হিন্দুরা থাকে হিন্দুদের ঘেটোতে। আহমেদাবাদের একটা ম্যাপ নিয়ে বসলে আমি দেখিয়ে দিতে পারি ঠিক কে কোথায় থাকে; দু একটার বেশি তার ব্যতিক্রম হবে না। শুধু আহমেদাবাদ নয়, মুম্বইতে আমার এক ভাইঝিকে একবার এক টিভি ডিবেটে আনা হয়েছিল, আর তখন তার ওপর যথেচ্ছ ট্রোলিং চলছিল, কারণ সে মুখ ফুটে বলেছিল তার ধর্মের কারণে সে কীভাবে বাড়িভাড়া পাচ্ছে না মুম্বইতে। আমার স্টার্টআপের এক কো-ফাউন্ডারকে তার এক বন্ধু সাবধান করেছিল, “সাবধান, তুমি এক মিয়াঁভাইয়ের সাথে ব্যবসা করতে যাচ্ছো।”

৯/১১-র পর থেকে, দুনিয়া জুড়ে বিভিন্ন আতঙ্কবাদী হামলার পর থেকে, বিশেষত এখন ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরে, আমাকে এখন কোনও কোনও বন্ধু জিজ্ঞেস করে “আরে তুই তো সিলিকন ভ্যালিতে চলে যাবার কথা বলতিস, তাই না? তোর কী মনে হয়, এখন তোকে আর যেতে দেবে?” মুসলিম বন্ধুবান্ধবের সাথে নিরন্তর বিতর্ক চালিয়েছি, অনলাইনে আর অফলাইনে, কেন ধর্মের নামে নিরপরাধ মানুষকে মারা সম্পূর্ণ ভুল একটা অপরাধ, আর তা ইসলামকেই কলূষিত করে, ইসলামেরই ক্ষতি করে। ‘ইসলাম আসলে খারাপ নয়, কিছু ইসলামিক লোক এই ধর্মের বদনাম করছে’ জাতীয় অজুহাত আমি প্রায়শই পাই। রাজনীতির আলোচনায় “কংগ্রেস না বিজেপি?” জাতীয় প্রশ্ন আমার কাছে প্রায়ই রাখা হয়, প্রশ্নকারীরা আশা করে আমি প্রথমটা বেছে নিয়ে উত্তর দেব। একবার একটা ফেসবুকের পোস্ট পড়েছিলাম, যা গোটা ব্যাপারটাকে সাম আপ করেঃ “ম্যায় মুসলমান হুঁ। আমি মরতে চাই না, তাই আপাতত আমি করাপশন মেনে নিয়ে চলছি।” ২০০২এর পরে, গৌরবযাত্রা এবং আরও অনেক কিছুর পরে আমার দিকে অনেক কিছু ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল, অনেক কিছু আমি শুনেছি, সয়েছি, তবে আজ এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় যেন এসব কিছুই ঘটে নি কখনো। মনে আছে, ট্রেনের এক কম্পার্টমেন্টে এক গুজরাতি হিন্দু ভদ্রলোক পাশের এক অগুজরাতি সহযাত্রীকে কিছু বলছিলেন। সেই কম্পার্টমেন্টে আমিও ছিলাম, সাল ২০০৩। তিনি বলছিলেন, “মুসলমানদের সহবত শিক্ষা দেওয়াটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল, বুঝলেন। ওরা আমাদের গরু মারত, আমাদের মেয়েদের ধর্মান্তরিত করত, এখন ওরা সব ভয়ে কাঁপছে। হ্যাঁ এই মেয়েদের আর বাচ্চাদের সাথে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু ওভারঅল একদম ঠিক হয়েছে।” অন্য ভদ্রলোকটি যখন তাঁর সাথে একমত না হবার কথা জানিয়ে ওয়াশরুমে গেলেন, তখন এই হিন্দু ভদ্রলোকটি পাশে বসা অন্য লোকদের বললেন, “মনে হচ্ছে মালটা মুসলিম!”

গত বছরের শেষদিকে, তিন তালাক নিয়ে যে আন্দোলন আমার মা এবং তাঁর সাহসী সহকর্মীরা চালাচ্ছিলেন তা একটু গতি পেল। দেশ জুড়ে লাখে লাখে মুসলিম মহিলাদের সাথে কথা বলে তাঁরা বোঝাতে পেরেছিলেন ধর্মের নামে কীভাবে মেয়েদের ভবিষ্যত নষ্ট করা হয়ে চলেছে। যে, এমনকি কোরানও তিন তালাকের বিষয়ে কিছুই বলে না, এই বোজাতে পারাটাই তাঁদের আন্দোলনে গতি এনে দিল। এর জবাবে, শয়ে শয়ে মুসলিম পুরুষ, এমনকি কিছু মহিলাও আমার মা এবং তাঁর সহকর্মীদের বিভিন্ন ইভেন্টে, মিটিংয়ে, টিভি ডিবেটে আক্রমণ করতে লাগলেন। হোয়াটস্যাপ মেসেজ ছড়াতে লাগল শুধু তাঁকে নিয়ে নয়, তাঁর “নাস্তিক ছেলে আর হিন্দু স্বামীকে” নিয়েও। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং বিজেপিও এই ইস্যুতে বক্তব্য ছড়ানো শুরু করলেন। সেই প্রতিবাদকারী মুসলিম পুরুষেরা এইবারে ভয় পেয়ে নতুন একটা অস্ত্র খুঁজে নিলেন আমার মা এবং তাঁর সহকর্মীদের বিরুদ্ধেঃ “আরএসএস এজেন্ট”। জীবন নতুন দিকে মোড় নিল, একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল যেন! সারাজীবন ধরে যেই লোকগুলোকে আমরা আমাদের জীবনের পক্ষে বিপজ্জনক বলে জেনেছি, হঠাৎ আমাদের তাদেরই বন্ধু বানিয়ে দেওয়া হল। সময়ের নিয়মে একটা সময়ে এই রাজনৈতিক শ্লোগানবাজি বন্ধ হল ঠিকই, কিন্তু তাঁর সংগ্রাম, তাঁদের সংগ্রাম এখনও চলছে এবং চলতে থাকবে।

এই লেখাটা লিখতে বসার আগে আমি মাকে ফোন করে বলেছিলামঃ “মম্মা, আমি যদি ধর্মের সাথে আমার সম্পর্কের ওপর একটা লেখা লিখি , তা কি তোমার কাজের ক্ষতি করতে পারে?” “তোমার চিন্তাপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ তোমার নিজের এবং তুমি অবশ্যই তা শেয়ার করতে পারো, নির্ভয়ে এবং খোলাখুলিভাবে। একদম চিন্তা কোরো না” – মা সাথে সাথে উত্তর দিয়েছিলেন। সেই দিন আমি আমার বাবার সেকুলার পদবি ত্যাগ করে মায়ের প্রথম নামটা বেছে নিয়েছি আমার পদবি হিসেবে। আমি জানি আমার পরিচয় এর ফলে আরও বেশিমাত্রায় প্রকাশিত হবে, কিন্তু মানুষটাকে আমি যতটা সম্মান করি, তার তুলনায় এ খুবই সামান্য একটা প্রতিদান।

ধর্মের সাথে শেষ সংঘাত হয় আমার মাত্র কদিন আগে, যখন আমি আমার নতুন সহকর্মী/বন্ধুদের নিয়ে জন্তর মন্তরে গেছিলাম #নটইনমাইনেম প্রতিবাদ ধর্ণায় অংশ নিতে। ধর্মের নামে প্রচুর নিরীহ মানুষকে স্রেফ পিটিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়েছে, এইবারে কারণটা ছিল “বীফ”। আর তার কিছুদিন পরেই, নিরীহ হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ওপর আতঙ্কবাদীদের হামলা, অমরনাথ যাত্রার পথে – আমার মধ্যে সেই পুরনো চেনা অনুভূতিগুলো ফিরে আসছে আবার!

কার সাথে আমি যুদ্ধ করছি, কাকে আমি ঘেন্না করি, আমার কাছে এখন সব সমান, তাদের নাম বা চেহারা যা-ই হোক না কেন, কে আমার দলে, কে অন্য দলে, সমাধান কী, আদৌ কোনও সমাধান আছে কিনা, কোনও একটা ধর্ম নিয়েই সমস্যা, নাকি সমস্ত ধর্মই সমস্যার মূলে, নাকি ধর্ম জিনিসটা নিজেই একটা সমস্যা, কে জানে! ধর্ম যদি না থাকত, খুনেদের কি অজুহাতের অভাব ঘটত কাউকে ভিন্নমতের নামে খুন করার জন্য?

আমি কোন দলে, আমার কি কোনও দল আছে, আমি কে আসলে? আশ্চর্যের ব্যাপার, এই প্রশ্নের উত্তরগুলো আমার কাছে বেশি স্পষ্ট। অন্য প্রশ্নগুলো আমার কাছে ধোঁয়াটে লাগে।

আমার বেশির ভাগ ভালো বন্ধুই আজ হয় নাস্তিক, কিংবা ধর্মহীন, বেশির ভাগই ভীতসন্ত্রস্ত, বেশির ভাগেরই তাদের নিজেদের নিজেদের গল্প আছে। আমি বসে বসে ধর্মের খেলা দেখি আর এই লেখাটা আমার অ্যাকাউন্ট, ধর্ম আমার সাথে যা যা করেছে তার একটা বিবরণ। দেখি, তোমার ঝুলিতে আরও কী কী আছে, হে রিলিজিয়ন!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s