দুই দেশ, ছয় রাজ্য, দুই চাকা, পাঁচ হাজার একশো কিলোমিটার ও এক পাগলঃ পর্ব ১

ভুটান মতলব ও লাদাখ কে পাস জো গাঁও হ্যায় না? উধার জানে কে লিয়ে স্মার্ট কার্ড নেহি চাহিয়ে হোতা হ্যায়।

উপক্রমণিকা

অর্থাৎ কিনা, যখন বেরিয়ে পড়ার উপক্রম করছি, বেরোই নি, তখনকার গল্প। আপনারা যাঁরা অ্যাদ্দিন ধরে আমার লেখা পড়ছেন, তাঁরা দিব্যি জানেন যে আমার বেড়ানোর গল্প শুরু হবার শুরুতে তার প্রস্তুতির গল্প থাকে। একেবারেই প্রথম দিন শেষরাতে বেরিয়ে পড়া দিয়ে শুরু করি না।

তো, গল্পের শুরু ২০১৬র শেষদিক থেকে। নর্থ ইস্ট যাবো, এবং মোটরসাইকেল নিয়েই যাবো, এই রকম একটা চিন্তাভাবনা দানা বাঁধছিল, গেছোদাদাও তাতে যথেচ্ছ ধুনো দিচ্ছিল। প্ল্যান তৈরি, মোটামুটি তাতে তারিখ বসানো বাকি, এই সময়ে নিয়তান্তই অপ্রয়োজনে শীতকালের বরফঢাকা মানালি দেখতে পরিবার নিয়ে বেরোলাম গাড়ি নিয়ে, এবং কুলু পৌঁছনোরও আগে, একটা ভয়ঙ্কর অ্যাক্সিডেন্টে গাড়িটাকে প্রায় অর্ধেক নষ্ট করে ফেলেছিলাম। আমি আর আমার মেয়ে, অ্যাপারেন্টলি আমাদের যা কিছু হয়ে যেতে পারত, কেবল সেদিন মরা ভাগ্যে লেখা ছিল না বলে মরি নি।

সে গল্প লিখেছি আমার স্পিতির ট্র্যাভেলগে। কনফিডেন্স শূন্যে নেমে গেছিল, আর একটা ট্রমা তাড়া করে বেড়াত সব সময়ে, যখনই রাস্তায় বাইক চালাচ্ছি, খালি ফিরে ফিরে আসত সেই মুহূর্তটার স্মৃতি। ফোকাস সরে যেত, কনসেন্ট্রেশন নষ্ট হয়ে যেত ক্ষণে ক্ষণে। সে এক অসহনীয় অবস্থা। গাড়ি সারানোর খরচাতেই এত টাকা বেরিয়ে গেল, যে ফেব্রুয়ারিতে নর্থ ইস্ট বেড়াবার প্ল্যানকে তখনই মাটিচাপা দিতে হল। … অবিশ্যি মাটিচাপা দেবার আরও একটা কারণও ছিল, আরও বেশ কিছু বিশেষ বন্ধুর সাথে নর্থ ইস্টের সেই সব জায়গা ঘুরতে যাবার একটা প্ল্যান চলছে এখনও, সে প্ল্যান সামনের বছরের আগে মেটিরিয়ালাইজ হতে পারবে না। কিন্তু, নর্থ ইস্ট না হয় না-ই হল, তাই বলে কি এই ট্রমা নিয়েই আমাকে থাকতে হবে?

ট্রমা কাটাতে সাহায্য করল ফেব্রুয়ারির স্পিতি যাত্রা। আবার আমি নর্মালসিতে ফিরে এলাম। বরফের মাঝে পড়েছিলাম, একবার নয়, চার-পাঁচবার, কিন্তু সে পড়া ছিল অন্য। আসল কথা যেটা, কনফিডেন্স ফিরে পাওয়া – সেইটা হল। আস্তে আস্তে সেদিনের অ্যাক্সিডেন্টের স্মৃতি ঝাপসা হয়ে এল।

নর্থ ইস্ট বলতে, আমরা বুঝি পূর্বোত্তরের সাতটা রাজ্য – আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড আর ত্রিপুরা। সেভেন সিস্টার্স। কিন্তু এর বাইরেও যে উত্তরের আরও কিছু সুন্দর জায়গা আছে, সে আমি জেনেছি কলেজে পড়ার সময়েই। তরাইয়ের কোলে ছিল আমার কলেজ।

সিকিমটা ঠিক কীভাবে আমার বাকেট লিস্টে ঢুকল, এখন আর মনে পড়ছে না, বোধ হয় ব্ল্যাঙ্কি বা অরিজিৎই বলেছিল নর্থ ইস্ট না গিয়ে আপাতত সিকিমটা মেরে এসো। ব্ল্যাঙ্কি একটা টেনটেটিভ প্ল্যানও বানিয়ে দিয়েছিল। আর বলেছিল পারমিট ফারমিটের ব্যাপার আছে, হোটেল হোমস্টে বুকিংয়ের ব্যাপার আছে, সেগুলো তাড়াতাড়ি শুরু করতে। সময় সেট করেছিলাম অক্টোবরের শেষে, কালীপুজোর পরে।

প্ল্যান বানালাম দু সপ্তাহের, হেসেখেলে নেমে যাবে। শুধু দিল্লি থেকে শিলিগুড়িটা দুদিনে যাবো না তিনদিনে, তাই নিয়ে মাথা ঘামাবার জন্য খানিকটা সময় রেখে দিলাম। এইবারে পারমিটের জন্য খোঁজখবর করা। প্লাস, এতটা লম্বা ট্যুর, একা একা বেশ বোরিং হওয়াটাই স্বাভাবিক, একটা দুটো পার্টনার খুঁজে বের করতেও হবে।

‘লাদাখ রিটার্ন’ নামে একটা ফেসবুক গ্রুপ আছে, আমি তার সদস্য। আমার বাড়ির কাছেই থাকেন মিস্টার ডিকে পণ্ডিত নামে একজন সত্তর বছরের যুবক, তিনি এই গ্রুপের মডারেটর। তাঁকে একদিন ফোন করলাম, ফেসবুকের গ্রুপে পোস্টও করলাম, পার্টনার চাই – এই মর্মে। ডিকে পণ্ডিত শুনলেন আমার প্ল্যান, বললেন, এ তো তোমার দশদিনে নেমে যাবে, এত টাইম নিচ্ছো কেন, তার চেয়ে ওখান থেকে তো ভূটান কাছে, সিকিম সেরে ভূটানটাও ঘুরে এসো না। থিম্পু আর পারো সেরে এসো – পনেরো দিনে আরামসে নেমে যাবে। আমি তোমাকে ওখানকার এজেন্টের নাম ঠিকানা দিয়ে দেব, পারমিট পেতে তোমার কোনও অসুবিধে হবে না।

– বলে উনি আমাকে প্ল্যানটা রিভাইজ করে দিলেন। সিকিমের সাথে ভূটানও ঢুকল আমার বাকেট লিস্টে। তার সাথে আরেকটা জিনিসও ঢুকে গেল বাই ডিফল্ট।

আমার কলেজ। জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ। উত্তরবঙ্গ বলে একটা ধারাবাহিক লিখতাম অনেকদিন আগে, সেটা আর শেষ করা হয়ে ওঠে নি, এমনিতে খুব একটা ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট নেই আমার, কলেজের সঙ্গে, বিশেষ কোনও সুখস্মৃতিও নেই, তবু, এতদিন পরে ঐ তল্লাটে গেলে, একবার কি না দেখে আসা যায়? আমাদের কলেজ থেকে এদিকে সিকিম যতটা দূর, ওদিকে ভূটানও ঠিক ততটাই দূর, বরং আরও কাছে। কলেজে থাকাকালীন তিনবার গ্যাংটক আর তিনবার ফুন্টশোলিং গেছি। তবে তখন সে এমনিই ঘোরা ছিল, বেড়ানোর পোকা একেবারেই আমার মাথায় কিলবিল করত না তখন। জাস্ট কিছু স্মৃতি, সেগুলোকে ফিরে দেখার একটা ছোট ইচ্ছে। এইটুকুই।

প্ল্যান দাঁড়াল এই রকমঃ

দিন ১ – দিল্লি – গোরখপুর
দিন ২ – গোরখপুর থেকে শিলিগুড়ি
দিন ৩ – শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক
দিন ৪ – গ্যাংটক থেকে লাচেন
দিন ৫ – লাচেন থেকে গুরুদোংমার লেক এবং লাচেনে ফেরা
দিন ৬ – লাচেন থেকে লাচুং হয়ে ইয়ুমথাং, জিরো পয়েন্ট দেখে গ্যাংটক ফেরা
দিন ৭ – গ্যাংটক থেকে চাঙ্গু, নাথুলা হয়ে জুলুক
দিন ৮ – জুলুক থেকে শিলিগুড়ি
দিন ৯ – শিলিগুড়ি থেকে জয়গাঁও / ফুন্টশোলিং
দিন ১০ – পারমিট নিয়ে পারো
দিন ১১ – টাইগার নেস্ট – পারো
দিন ১২ – চেলে লা পাস, থিম্পু হয়ে পারো
দিন ১৩ – পারো – ফুন্টশোলিং – জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ
দিন ১৪ – জলপাইগুড়িতে একদিন রেস্ট এবং বর্তমান ছাত্রদের সাথে খেজুর
দিন ১৫ – জলপাইগুড়ি – গোরখপুর
দিন ১৬ – গোরখপুর – দিল্লি

এইবার এই প্ল্যান আরও কয়েক হাত ঘুরবে, আমার কাছে এক এক করে আরও কিছু এজেন্টের নাম ও ফোন নম্বর যুক্ত হবে, যারা সিকিম বা ভূটানের পারমিটের জন্য সাহায্য করে, যাতে আমাকে পারমিটের জন্য লাইন দিয়ে দিন নষ্ট না করতে হয়। বিস্তারিত বিবরণে গেলাম না সেসবের, তবে প্রত্যেকের সাথে কথা বলে বুঝলাম, এই পারমিটের এজেন্সির ব্যাপারটা অল্পবিস্তর খরচাসাপেক্ষ, তাতে যে হবেই এমন কোনও গ্যারান্টি নেই, আর বেশির ভাগ এই পারমিট ‘করে দেওয়া’ লোকজনই একটু কমবুদ্ধিসম্পন্ন। উদাহরণস্বরূপ, শিলিগুড়ির এক বাঙালিকে পেলাম, যে সিকিমের পারমিটের ব্যবস্থা করে দেবে, সে আমার প্ল্যানটাকে আরও একটু মডিফাই করে দিল, খুব প্রফেশনালি কথা বলল টলল, কিন্তু তার পরে আমি যখন আমার বাইকের পেপার ইত্যাদি স্ক্যান করে পাঠালাম – তখন সে উত্তরে তার কাছে অ্যাভেইলেবল মোটরসাইকেলের রেন্টিং চার্জ ইত্যাদি নিয়ে একটা মেল করে বসল। আবার আমাকে বোঝাতে হল যে আমি ওর কাছ থেকে মোটরসাইকেল ভাড়া নিচ্ছি না, আমি নিজের মোটরসাইকেল দিল্লি থেকেই চালিয়ে আসব। তাতে সে খুবই দমে গেল এবং আমাকেও বুঝে নিতে হল যে সে কেবল নিজের বাইকের পারমিট বের করার ব্যাপারেই সিদ্ধহস্ত, অন্য বাইকের পারমিট বের করার ব্যাপারে তার বিশেষ ফাণ্ডা নেই।

ভূটানেও বিভিন্ন কেস। এক এজেন্ট বলল, অনলাইন অ্যাপ্লাই করা যায়, করে নাও। আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আজ পর্যন্ত অনলাইন পারমিটের কোনও লিঙ্ক খুঁজে পাই নি। সেটা জানাতে সে এজেন্ট বলল, ঠিক আছে, আসার আগে বলবেন, আমি অনলাইন পারমিট বের করে দেব। এর কদিন পরেই তার ফোন একেবারেই নট রিচেবল হয়ে যায়। এর পর সন্ধান পেলাম এক ভূটানিজ এজেন্টের। তিনি, আমি একা আসছি শুনেই আর উৎসাহ দেখালেন না, কারণ ভূটানে সোলো ট্র্যাভেলারদের পারমিট দেওয়া হয় না। এদিকে, আমি শুনেছি যে যদি স্থানীয় কোনও ভূটানিজ নাগরিক লিখিত অ্যাসুওরেন্স দেয় যে ভূটানে এই ট্যুরিস্টের আসা থাকা ঘোরা সমস্ত আমার দায়িত্বে হবে, তা হলে আর কোনও সমস্যা হয় না। তা আমি বিনীতভাবে সেই ভূটানিজ এজেন্টকে বললাম, আপনি কি আমাকে এই রকমের একটা লেটার করে দিতে পারবেন? ভয় নেই, আমি নিজের মতই ঘুরব, আপনার ঘাড়ে চাপব না, জাস্ট ফর্ম্যালিটি হিসেবে পারমিট পাবার জন্য যদি চিঠিটা করে দেন – যথারীতি, তিনি আর উত্তরই দিলেন না। একেবারেই না।

এসব যখন ঘটছে, তখন মে জুন মাস। আমি টার্গেট করছি অক্টোবরের একুশ তারিখে স্টার্ট করার। লম্বা ছুটি, শেষ মুহূর্তে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তাই জুন মাসেই ছুটি অ্যাপ্লাই করে ফেললাম, ম্যানেজারদের সাথে কথা বলে।

ভূটান দেশে ঢোকার তিনটে রাস্তা। একটা তিব্বত / চীন দিয়ে, আর দুটো ভারত দিয়ে। ভারতের দুটোর মধ্যে একটা আসাম দিয়ে, আর অন্যটা পশ্চিমবঙ্গের জয়গাঁও দিয়ে। এই জয়গাঁও, আমি শেষ যখন ফুন্টশোলিং গেছিলাম, তখন একটা ছোটখাটো গঞ্জ মত ছিল। খবর পেলাম আমার কলেজের বন্ধু স্বরাজ, এখন জয়গাঁও থানার ওসি।

ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের গ্র্যাজুয়েট কীভাবে পুলিশের ওসি হয়, সে সম্বন্ধে আমার একেবারেই কোনও ধারণা ছিল না, কিন্তু ফেসবুকের কল্যাণে যোগাযোগ হয়ে গেল, আর স্বরাজও বলল, চলে আয়, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে, চিন্তা করিস না।

জুন জুলাই মাসটা গেল একটা একটা করে ডেস্টিনেশন ধরে থাকার জায়গা বুক করতে।

আপনারা যারা আমার ‘সর্ষেদানায় ইচ্ছেডানায়’ বইটা উল্টেপাল্টে দেখেছেন বা আমার লাদাখ আর স্পিতি বেড়ানোর গপ্পো পড়েছেন, তারা সকলেই জানেন, প্রথম রাস্তায় বেরিয়ে কীভাবে লাগেজ নিয়ে আমি সারারাস্তা নাকানিচোবানি খেয়েছিলাম। উত্তাল ছড়িয়েছিলাম, তাই নিয়ে হাসাহাসি করে ভালো লেখা হয়, লোকে পড়ে আনন্দ পায়, কিন্তু দ্বিতীয়বার সেই এক্সপিরিয়েন্স করার ইচ্ছে আমার একেবারেই ছিল না। তাই ঠিক করলাম এইবারে আমার বাইকের পেছনে একটু খরচা করব। বেড়ানোর খরচা একটা পরিমাণ লাগবে, এক লপ্তে তো অত টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়, তাই প্রতি মাসে একটু একটু করে সেই হাতখরচের টাকা জমাবার মত করে টাকা সরিয়ে সরিয়ে রাখছিলাম, যাতে অক্টোবর মাসে গিয়ে পরিমাণমত টাকা জমে যায়। তার বাইরে এই বাইকের সাজসজ্জা।

প্রথমেই, লাগেজ ক্যারিয়ার। বাইকের জগতে যার নাম, লাদাখ ক্যারিয়ার। যদিও লাদাখে যাচ্ছি না এইবারে, এবং যদিও এই ক্যারিয়ারটি মূলত এনফিল্ড বুলেটেই লাগানো যায়, স্পেশালি তার জন্যই তৈরি – কিন্তু আমি থাকি দিল্লির মত একটা জায়গায়, যেখানে করোল বাগ বলে একটা অদ্ভূত মায়াবী জায়গা আছে। সেইখানে বাইক নিয়ে গিয়ে যে কোনও রকমের মডিফিকেশন করিয়ে নেওয়া যায়। তো, প্রতি মাসে একবার করে করোল বাগে গিয়ে একটা একটা করে জিনিস কিনে ফিট করিয়ে আনা শুরু করলাম।

  • হেলমেটে ব্লুটুথ – যাতে গাড়ি চালানোর সময়ে ফোন এলে কথা বলতে কোনও সমস্যা না হয়। অসাধারণ জিনিস, আমি সমস্ত বাইকারকে এই ব্লুটুথ হেডসেটটা রেকো করলাম।
  • বাইকের স্টক হেডলাইট – যেটা হলদে রঙের আলো দেয়, বদলে এলইডির জোরালো সাদা লাইট লাগালাম।
  • হ্যান্ডেলে দুটো ফগ লাইট লাগালাম, মানে আরও জোরালো দুটো এলইডি প্যানেল।
  • মোবাইল মাউন্ট। এর আগের বারে একটা কী জিনিস লাগিয়েছিলাম, মাঝরাস্তায় মোবাইল সমেত ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে মোবাইল পড়েছিল ট্রাকের সামনে। এইবারে যেটা লাগালাম, একেবারে শক্তপোক্ত জিনিস, ভাঙবার কোনও চান্সই নেই।
  • স্টোব লাইট – সামনে আর পেছনে অনবরত ব্লিঙ্ক করার জন্য। হাইওয়েতে চলার সময়ে অন্যান্য গাড়ির কাছে বাইকের ভিজিবল থাকাটা জরুরি।
  • বাইকের ব্যাটারি বদলালাম, প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল, স্টার্ট নিতে সমস্যা হচ্ছিল স্পিতিতে।
  • রিয়ার টায়ার বদলাতে হল, পুরনো হয়ে গেছিল, ঘন ঘন পাংচার হচ্ছিল। পিরেলির নতুন টায়ার লাগালাম, কী শস্তায় পাওয়া গেল রে ভাই করোল বাগে! আর কী অসাম জিনিস।
  • অ্যামাজন থেকে দুটো জিনিস কিনলাম, একটা হল পাংচার কিট – টিউবলেস টায়ার পাংচার হলে সেটা সারানো খুব সোজা।
    আরেকটা হল, টায়ার ইনফ্লেটর। হাওয়া কমে গেলে হাওয়া ভরার জন্য।
  • এইটা চালাবার জন্য পাওয়ার সোর্স লাগে একটা লাইটার পয়েন্ট থেকে, আর সেটা গাড়িতে থাকে, বাইকে নয়। কিন্তু আমি কিনা দিল্লিতে থাকি, আর দিল্লিতে কিনা করোল বাগ নামে একটা অদ্ভূত মায়াবী জায়গা আছে, তাই সেটাও লেগে গেল এক উইকেন্ডে আমার বাইকে।
  • অ্যামাজন থেকে আরেকটা জিনিস কিনলাম, সেটা হচ্ছে অ্যামাজন বেসিকস ব্যাকপ্যাক। এমনিতে অফিস ব্যাকপ্যাক, কিন্তু বিশাল স্টোরেজ ক্যাপাসিটি, আর খুব টেঁকসই।

লাদাখ ক্যারিয়ারটা লাগালাম একদম শেষে, যাবার ঠিক এক সপ্তাহ আগে, দুর্গাপুজোর পরে।

001

লাদাখ ক্যারিয়ার লাগানোর আরও একটা কারণ ছিল, সেটা হল গেছোদাদা। এই ট্রিপে শিলিগুড়ি থেকে গেছোদাদার আমার সাথে যোগ দেবার কথা ছিল, ফলে পেছনের সীটটা খালি রাখতে হত। এমনিতে পেছনে ভায়াট্রার স্যাডল ব্যাগ বাঁধা হয়, কিন্তু এবারে আর সেটা করার উপায় নেই, তাই লাদাখ ক্যারিয়ার। অবশ্য, যতদিনে এটা লাগিয়েছি, তার বেশ কিছুদিন আগেই, দুর্গাপুজোরও আগে গেছোদাদা ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে যে সে আসতে পারছে না, তার ছুটি অ্যাপ্রুভাল নিয়ে সমস্যা হচ্ছে।

দুঃখ পাওয়াই উচিত, কিন্তু ততদিনে আমি নিজের মনকে পুরোপুরি সোলো জার্নির জন্য তৈরি করে ফেলেছি, ফলে – গেছোদাদা আমার সাথে জয়েন করতে পারছে না শুনে আমার অবস্থাটা হল খানিকটা এই রকম – ক্যাপ্টেন প্যাডলক, না না, ক্যাপ্টেন মারডক, থুড়ি, ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মতঃ

Haddock and Bianca

(গেছোদাদা এটা পড়ে মারাত্মক দূঃখ পাবে, রেগে যাবে, কিন্তু কী করি, সইত্যের পথ থেকে বিচ্যুত ইত্যাদি … সরি গেছোদাদা, তুমি সঙ্গে গেলে তো ভালো লাগতই, কিন্তু না যাওয়াতে এই পুরো ট্রিপটা একা করে আমার যে অন্য রকমের আনন্দ হয়েছে, সেটা আর কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়)

তবে, গেছোদাদা আসছে না জানা সত্ত্বেও লাদাখ ক্যারিয়ার আমি লাগিয়েছি, এবং তার পরে পিঠে ভর্তি ব্যাগ নিয়ে বাইকে বসে বুঝতে পেরেছি, এই অবস্থায় পেছনে কাউকে বসানো একেবারে সম্ভব ছিল না।

অন্যদের মতই সুকুমার রায়কে আমি প্রফেট মানি, তাঁর বানানো হযবরল দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে পারলে আমরা সকলেই যারপরনাই খুশি হতাম, কিন্তু আমরা থাকি বাস্তবের দুনিয়ায়, আমাদের কারুর শ্বশুরের নাম বিস্কুট নয়, আমাদের বয়েস চল্লিশের পরে কমে না, কেবল বেড়েই চলে। আর চল্লিশ পেরিয়ে গেলে আমাদের কর্পোরেট আমাদের একটু বাড়তি যত্নআত্তি করে। বিনামূল্যে ফুল বডি চেক আপ হয়। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত।

কর্পোরেট অফিসের জন্য কর্পোরেট হাসপাতাল। এক শনিবার, আগস্ট মাসে, আমি আর সিকিনী চলে গেলাম সেখানে, সারাদিনের জন্য চেক আপ করাতে। সেখানে আলট্রাসাউন্ডের জন্য বিক্ষিপ্ত লাইন, নাম রেজিস্টার সিরিয়াল মেনটেন করেই করা হয়েছে, সকলেই ঘনঘন জল খাচ্ছেন, কিন্তু সকলের ব্লাডার তো এক সময়ে এক সিকোয়েন্সে ফুল হয় না, ফলে সেইখানটিতে এসে লাইন ভেঙে যাচ্ছে, পরের জন আগে চান্স পেয়ে যাচ্ছেন, আগের জন তখনও “প্রেসার” না আসায় করুণ মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

এক সময়ে আমার ডাক এল। অল্পবয়েসী সুদর্শনা ডাক্তার আমার জামা গেঞ্জি তুলে পেটে কীসব লোশন মাখিয়ে আলট্রাসাউন্ডের ছবি তুলতে লাগলেন। আমি শুয়ে শুয়ে শুনছি, বাইরে গুঞ্জন প্রবলতর হচ্ছে, বাইরের যিনি অ্যাটেনডেন্ট, তিনি আর সামলে উঠতে পারছেন না – আমার পেটে হাত বোলানো সুদর্শনা তরুণী ডাক্তার কঠিন মুখে অ্যাটেনডেন্টকে ডেকে বললেন, পেশেন্টস কো বোলো কি না চিল্লায়েঁ। ইয়ে প্রাইভেট হসপিটাল হ্যায়, ইসকো সরকারি হসপিটাল না বানায়েঁ – বোলো উনকো।

অ্যাটেনডেন্ট বাইরে গিয়ে ঠিক এই কথাটিই বললেন – আপনারা শান্ত হয়ে অপেক্ষা করুন, সবাইকার ডাক আসবে – ‘সরকারি হাসপাতালের’ মত ‘শোর’ করবেন না।

আমি, বেডে শুয়ে শুয়ে মাটিতে মিশে যেতে চাইলাম, সুদর্শনা ডাক্তারের চেহারায় মুহূর্তের জন্য দেখলাম কর্পোরেটের দম্ভ, অহঙ্কার। এটা প্রাইভেট হসপিটাল। সরকারি নয়। চেঁচাবেন না। কী অপরিসীম তাচ্ছিল্য। বাইরে তখন বসে আছে সিকিনী, একজন সরকারি কর্মচারি। তার দুটো বড় অপারেশন হয়েছে দিল্লির সরকারি হাসপাতালেই।

সেই মুহূর্তে চলে আসতে পারলেই খুশি হতাম। কিন্তু পারি নি। প্রতিবাদ করতে পারি নি। খারাপ লাগে আজও সে জন্য।

আলট্রাসাউন্ড হল, ট্রেডমিল টেস্ট হল, এক্সরে হল, চোখের দাঁতের হাড়ের সর্বাঙ্গের চেক আপ হল। পরের শনিবার রিপোর্ট নিতে গিয়ে শুনলাম – আমার দূরদৃষ্টি আর নিকটদৃষ্টি – দুটোই কমেছে। চশমা নিতে হবে। আর, আর, কিডনিতে জমেছে কুচি কুচি পাথর। খুব বেশি জল খেলে হয় তো এমনিই সেরে যাবে, নইলে – ছুরির তলায় শুতে হবে একবার।

ফুসফুস তো ক্ষতিগ্রস্ত ছিলই, সুতরাং, সেটা নতুন কোনও খবর নয় আমার কাছে।

রিপোর্ট দেখে টেখে প্রথম যে প্রতিক্রিয়াটা এল মনে, সেটা হল, যাঃ, তা হলে বুড়ো হয়েই গেলাম? এমনিতেও মাথার চুল পাতলা হয়ে আসছে – টাকের আভাস দেখা যাচ্ছে ব্রহ্মতালু ঘেঁষে। তাই বলে এত তাড়াতাড়ি সবকিছু?

সম্ভবত, সেই মুহূর্তেই মনস্থির করে ফেলেছিলাম, চশমা তো নিতে হবেই, কিডনিরও যত্ন নিতে হবে, কিন্তু আমি সমস্ত করব ফিরে আসার পরে। এই আমি, এই মুহূর্তে ঠিক যেমনটি আছি, সেই অবস্থায় সিকিম আর ভূটান ঘুরে আসতে চাই, তার পরে এসে হাসপাতালের চেয়ারে বসে লালনীল লেন্স পরব। তার আগে নয়। দূরের দৃষ্টি যতই ঝাপসা হোক, ট্র্যাফিক না দেখতে পাবার মত কিছু খারাপ হয় নি এখনও। শরীরে কোনও রকমের ইমিডিয়েট মেরামতি না করে আমি এই ট্রিপটা করতে চাই।

তাই করেছি। তাই করতে পেরেছি। এই শনিবার যাচ্ছি চোখ দেখাতে, কিছুদিনের মধ্যেই চোখে চশমা উঠবে।

আরও একটা গল্প না লিখলে আসল গল্পে ঢুকতে পারছি না। ড্রাইভিং লাইসেন্সের গল্প।

আমার ড্রাইভিং লাইসেন দুখানি। একটা টু হুইলারের, সেই ভুবনেশ্বরে দু হাজার এক সালে বানানো, কুড়ি বছরের ভ্যালিডিটি। দ্বিতীয়টি ফোর হুইলারের, গাজিয়াবাদে বানানো দু হাজার ছয় সালে। টু হুইলারেরটা তাও ইংরেজিতে লেখা, ফোর হুইলারেরটা আদ্যোপান্ত হিন্দিতে লেখা। মানে, মোদ্দা কথা, এই দুটি লাইসেন্সই স্মার্ট-কার্ড জমানার আগে তৈরি, বুকলেট টাইপের দেখতে। এমন কি, পুরনো দিনের মানুষ কিনা, আমার প্যান কার্ডটাও একটা ল্যাতপ্যাতে ল্যামিনেটেড চৌকো কাগজের টুকরো, আজকালকার মতন স্মার্ট কার্ড নয়। আমরা যে সব প্রি-ডিজিটাল যুগের জনতা।

এইবারে, যাচ্ছি ভূটানে, সেখানে এই ধরণের হাতে লেখা ড্রাইভিং লাইসেন্স দিলে তারা পারমিট দেবে কিনা – সেইটা একটা চিন্তার বিষয় হতেই পারে। চিন্তাটা আমার মাথায় যখন এল, তখন অলরেডি আগস্ট মাস পড়ে গেছে। হাতে আর ঠিক দু মাস সময়। ঝটপট পড়াশোনা শুরু করলাম কীভাবে নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়। তো, লাইসেন্স যাঁরাই বানিয়েছেন, তাঁরাই জানেন, এটা দু ভাবে বানানো যায়, এক, নিজে ফী জমা দিয়ে, ড্রাইভিং টেস্ট দিয়ে, আর দুই, দালালকে টাকা দিয়ে।

সময় যে হেতু খুবই কম, তাই নিজে ড্রাইভিং টেস্ট দিয়ে নতুন লাইসেন্স পাবার রিস্ক নেওয়া উচিত হবে কিনা ভাবতে ভাবতে কয়েকজন এজেন্টের সাথে কথা বললাম। এখন আমার দিল্লির পিনকোডে একটি ঠিকানা হয়েছে, ফলে লাইসেন্সটা দিল্লিতেই অ্যাপ্লাই করব। আর দিল্লিতে এখন সব কিছুই অনলাইন হয়ে গেছে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবার প্রসেস, ফী জমা দেওয়া – সমস্ত অনলাইনে করা যায়। শুধু নির্দিষ্ট দিনে আরটিও অফিসে গিয়ে টেস্টটা নিজে দিয়ে আসতে হয়। আগে এই সব আরটিও অফিসের সামনে দালালদের রমরমা ছিল, অনলাইন হয়ে যাবার ফলে গত সাত আট বছরে দালালদের ভাত মারা গেছে। ফলে রেট সাংঘাতিক উঁচু। দু চারজন এজেন্টের সাথে কথা বলে আমি চার হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত কোটেশন পেলাম। এদিকে দিল্লি গভর্নমেন্টের সাইটে দেখছি লাগে শুধু নশো প্লাস তিনশো। বারোশো টাকা। তাতেই টু প্লাস ফোর হুইলারের লাইসেন্স একসাথে হয়ে যায়।

একবার গাজিয়াবাদে ট্রাই করে দেখি। এখানেও তো স্মার্ট কার্ড সিস্টেম হয়ে গেছে। যদি কম নেয়। – গেলাম পাড়ার মোটর ট্রেনিং স্কুলে। সে লোকটি মহাজ্ঞানী। জিজ্ঞেস করলাম, আমার তো ভ্যালিড লাইসেন্স রয়েছে, গাজিয়াবাদেরই। আমাকে কি আবার লার্নার থেকে শুরু করতে হবে? লোকটি শুনে খুবই অবাক হয়ে বলল, লা লাইসেন্স আছে তো আবার স্মার্ট কার্ড করাচ্ছো কেন? ওটা দিয়েই চালিয়ে নাও। বললাম, ভূটান যাবো, এই এই ব্যাপার। শুনেই সে খুব উত্তেজিত হয়ে বলল, আচ্ছা আচ্ছা, ভূটান মতলব ও লাদাখ কে পাস জো গাঁও হ্যায় না? উধার জানে কে লিয়ে স্মার্ট কার্ড নেহি চাহিয়ে হোতা হ্যায়।

মহা মুশকিল। তাকে বলতে গেলাম ওটা ফরেন কান্ট্রি, তাতে সে আরও অবাক হয়ে গেল। ফরেন কান্ট্রি মে আপ আপনি গাড়ি লে জাওগে? কিঁউ? উধার বাইক নেহি মিলতি?

অতঃপর বাংলায় “ধোর বাল” বলে বাড়ি ফিরে অনলাইনে ড্রাইভিং টেস্টের জন্য আবেদন করে ফেললাম।

প্রথমে লার্নার লাইসেন্স। তাতে একটা অনলাইন টেস্ট দিতে হয়, দশটা কোশ্চেন। এইবারে সেই কোশ্চেনেয়ারও দিল্লি গভর্নমেন্টের সাইটে পাওয়া যায়, প্রায় চারশো কোশ্চেন আর তার অ্যানসার সমৃদ্ধ এক চোতা। পিডিএফটা নামালাম, আর প্রথম নব্বইটা কোশ্চেন দেখে বুঝলাম সবই বেসিক রোডরুলের ওপর আর বিভিন্ন সাইনেজ বিষয়ক, আমি মোটামুটি সবই জানি।

পাঁচই সেপ্টেম্বর সকাল সকাল পৌঁছে গেলাম আরটিও অফিসে। সেখানে ফর্ম ভরে লাইনে দাঁড়িয়ে ফটো তুলে ফর্ম জমা দিয়ে একটা কাগজের স্ট্যাম্প মারা টুকরো পেলাম। চারদিকে ভিড়ে থিকথিক করছে, মূলত বাস, ট্রাক, ট্যাক্সি আর অটো ড্রাইভার, দালালরাও ইতিউতি ঘুরছে, কিন্তু আমার দালালের দরকার নেই। আমি পরের লাইনে দাঁড়ালাম, যেখানে অনলাইন টেস্টটা হবে।

লাইনে আমার আগে পিছে জনা তিনেক অটো ড্রাইভার। তাঁরা আমাকে “ভদ্রলোক” পেয়ে ফাণ্ডা নেওয়া শুরু করলেন – কী কোশ্চেন করবে? কম্পিউটার কী করে অন করব? ঠাণ্ডা মাথায় বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে প্রশ্ন তো এদের ওয়েবসাইটেই রাখা আছে, আর কম্পিউটার অনই থাকবে, আপনাকে নিশ্চয়ই কেউ দেখিয়ে দেবে, তাতে তাঁদের মুখ আরও শুকিয়ে গেল। এঁরা এমন একটা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, যেখানে ওয়েবসাইট, কোয়েশ্চেনেয়ার, ইংরেজিতে লেখা প্রশ্ন – এগুলো ভিনগ্রহের জিনিস। কিছুই বোঝেন না। হাতে এমনকি স্মার্টফোনও নেই। সদ্য কোনও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দিল্লি এসেছেন রোজগারের আশায়।

কী আর করব। লাইন ধীরে ধীরে এগোল। বারোটার সময়ে একটা ঘরে ঢুকে বসে পড়লাম একটা কম্পিউটার টার্মিনালের সামনে। হিন্দি বা ইংরেজি, যে কোনও একটা ভাষা পছন্দ করে নেওয়া যায় শুরুতে। দশটা প্রশ্ন, দশ মিনিট সময়। আমি তিন মিনিটে দশটা প্রশ্ন শেষ করে অন স্পট জেনে গেলাম দশটাই ঠিক উত্তর দিয়েছি। উঠে পড়তে যাবো, এমন সময়ে পাশের টার্মিনালে বসা কমবয়েসী ছেলেটা আমাকে খুবই করুণ আর শুকনো মুখে বলল, ভাইসাব, ইসকা আনসার কেয়া হোগা –

আমি তাকিয়ে দেখলাম, সে হিন্দি স্ক্রিনের সামনে বোকা মুখে বসে আছে। হিন্দি আমি পড়তে পারি না তা নয়, তবে প্রশ্নগুলো এমনই শুদ্ধ হিন্দিতে লেখা যে আমি দুবার পড়েও বুঝতেই পারলাম না কী প্রশ্ন করেছে। বিনীতভাবে বললাম, ভাই, আমি হিন্দি ভালো পড়তে পারি না, সরি, বলে টুক করে বেরিয়ে এলাম।

বাইরে রোদের তেজ যথেষ্টই। দুটো নাগাদ হাতে হাতে লার্নার লাইসেন্স পাওয়া যাবে। খিদেও পেয়েছে – কিন্তু একদম লাইসেন্স নিয়েই যাবো।

কোলাপসিবল গেট সামলাচ্ছিলেন যে দারোয়ান, তিনি পৌনে দুটোর সময়ে বেরিয়ে এলেন হাতে একগুচ্ছ কাগজ নিয়ে, এই বারে নাম ডেকে ডেকে লাইসেন্স দেওয়া হবে। অপেক্ষারত লোকজন ঘিরে ধরল দারোয়ানবাবুকে, এবং তাতে তিনি যারপরনাই বিরক্ত হয়ে বললেন – আরে ইয়ার, কুত্তোঁ কে তরহ্‌ কিঁউ চিল্লামিল্লি কর রহে হো? মুঝে বাঁটনে দো না – সব লোগ মিলকে কুত্তোঁ জ্যায়সা ভৌঁক রহে হ্যায়।

উপস্থিত জনতা, আগেই বলেছি প্রায় সকলেই কমার্শিয়াল গাড়ির ড্রাইভার গোত্রের, কেউ একটা প্রতিবাদও করল না। সবাইকেই লাইসেন্স পেতে হবে।

আমাকেও তো। আমিও শুনলাম। কোনও প্রতিবাদ করলাম না। উপস্থিত জনতাকে ‘কুকুর’ বলা লোকটির হাত থেকেই এক সময়ে আমি আমার লার্নার লাইসেন্স নিলাম। ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলাম আরটিও চত্ত্বর থেকে। চারপাশে তখন ভিড় হাল্কা হয়ে গেছে। ইতিউতি ঘুরছে শুকনো কিছু মুখ, যারা অনলাইন টেস্ট পাস করতে পারে নি। লার্নার লাইসেন্স পায় নি। তাদের আবার দশদিন বাদে চেষ্টা করতে হবে।

বাড়ি এসে শুনলাম, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেদিন তাঁর অধীনস্থ রাজ্য সরকারি কর্মচারিদের বলেছেন, “ঘেউ ঘেউ করবেন না। ঘেউ ঘেউ করে কোনও লাভ হবে না”। কর্মচারিরা মহার্ঘ্যভাতার দাবিতে সরব হয়েছিলেন সেদিন।

এক মাস বাদে পার্মানেন্ট লাইসেন্সের জন্য টেস্ট দিতে পারব। অর্থাৎ ছয়ই অক্টোবর বা তার পরে। আমি সাত তারিখ, শনিবারের জন্য সকালের স্লট বুক করলাম। আমার যাবার তারিখ বিশে অক্টোবর। তার আগে কি লাইসেন্স হাতে পাবো?

এক মাস সময়। সমস্ত ওয়েবসাইট, ব্লগ পড়ে ফেললাম, কী কী জিজ্ঞেস করে পার্মানেন্ট টেস্টের সময়, সেগুলো জানার জন্য, বোঝার জন্য। দেখলাম, খুব শক্ত কিছু নয়। গাড়ি চালাতে জানলে, আর বেসিক রোড রুল আর সাইনেজ জানলে যে কেউ এটা পাস করতে পারে।

আমার লাইসেন্স দুটো গাড়ির জন্যেই, একসাথে, দু চাকা আর চার চাকা। দুটো গাড়ি তো একা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। অতএব, গাড়ির জন্য একজন ড্রাইভার ভাড়া করতে হল একবেলা। ছশো টাকার কড়ারে তিনি এলেন, গাড়ি নিয়ে বাইকে বসা আমার সাথে সাথে চললেন আরটিও, সেখানে সবার প্রথমে আমার বাইকের টেস্ট নেওয়া হল। কিছুই না, খানিক দূরে দূরে দুটো ট্র্যাফিক কোন বসিয়ে বললেন, এদের চারপাশ দিয়ে ইংরেজি আট বানিয়ে ঘুরতে হবে, মাটিতে পা না ফেলে।

করে ফেললাম। দেড়বার করার পরেই ইনস্পেক্টর বললেন, ব্যস, থামো, বাইক সাইডে করো, গাড়িতে বসো।

বসলাম। ইনস্পেক্টর বললেন, হুই যে কালো গাড়ি দেখছো, ঐখান পর্যন্ত যাও, আর ওখান থেকে ব্যাক গিয়ার লাগিয়ে ফিরে এসো ঠিক এইখানে।

গেলাম, এবং ফিরেও এলাম। জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে বললেন, ব্যাক গিয়ারে চলবার সময়ে হ্যাজার্ড লাইট অন রাখা উচিত ছিল। সেটা রাখো নি। যাই হোক, তোমার টেস্ট হয়ে গেছে। লাইসেন্স পেয়ে যাবে বাই পোস্ট।

সোমবার নয়ই অক্টোবর দুপুরে এসএমএস এল – তোমার লাইসেন্স স্পিড পোস্টে পাঠানো হয়েছে। এগারোই অক্টোবর আমার দিল্লির ঠিকানায় সকাল সকাল লাইসেন্স এসে গেল, চকচকে স্মার্ট কার্ড। ঠিক চার দিনের মধ্যে।

ইতিমধ্যে প্ল্যানে আরও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। মূল কারণ, আমার লেখা বই, সর্ষেদানায়, ইচ্ছেডানায়। প্রকাশিত হবে, তো হুগলিতে কেন নয়? আর আমি সেই সময়েই যখন শিলিগুড়ি বা জলপাইগুড়িতেই থাকছি, অতএব একদিনের জন্য হুগলি না এসে থাকি কী করে? পশ্চিমবঙ্গে এসেও বাবা মায়ের সাথে দেখা না করেই ফিরে যাবো, এটা তাদেরও ঠিক মনঃপূত হচ্ছিল না, তাই পাকাপাকি ভাবে এই প্ল্যানটা ফাইনাল করলাম –

দিন ১/২০ অক্টোবরঃ দিল্লি থেকে গোরখপুর – ৮০৬ কিলোমিটার
দিন ২/২১ অক্টোবরঃ গোরখপুর থেকে শিলিগুড়ি – ৬৩৫ কিলোমিটার
দিন ৩/২২ অক্টোবরঃ শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক – ১২০ কিলোমিটার
দিন ৪/২৩ অক্টোবরঃ গ্যাংটকেই থাকা এবং নর্থ আর ইস্ট সিকিমের জন্য পারমিট নেওয়া (পুরো দিন লেগে যাবেই, তাই একদিন থাকা)
দিন ৫/২৪ অক্টোবরঃ গ্যাংটক থেকে লাচেন – ১০৮ কিলোমিটার
দিন ৬/২৫ অক্টোবরঃ লাচেন থেকে গুরুদোংমার হয়ে আবার লাচেন হয়ে লাচুং। ১৮০কিলোমিটার।
দিন ৭/২৬ অক্টোবরঃ লাচুং থেকে ইয়ুমথাং, জিরো পয়েন্ট সেরে আবার লাচুং হয়ে গ্যাংটকে ফেরত। ২০৪ কিলোমিটার।
দিন ৮/২৭ অক্টোবরঃ গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেক, নাথুলা পাস হয়ে নাথাং ভ্যালিতে রাত্রিযাপন – ৯০ কিলোমিটার।
দিন ৯/২৮ অক্টোবরঃ নাথাং থেকে রোরাথাং বলে একটা জায়গায় – পশ্চিমবঙ্গ-সিকিম বর্ডার – রাত্রিযাপন – ৫০ কিলোমিটার।
দিন ১০/২৯ অক্টোবরঃ রোরাথাং থেকে জয়গাঁও। ২১০ কিলোমিটার।
দিন ১১/৩০ অক্টোবরঃ পারমিট নিয়ে ফুন্টশোলিং থেকে পারো। ১৬০ কিলোমিটার।
দিন ১২/৩১ অক্টোবরঃ টাইগার্স নেস্ট ট্রেক। সারাদিন লেগে যাবে। ২৫ কিলোমিটার।
দিন ১৩/১ নভেম্বরঃ পারো এবং থিম্পু শহর দেখা। পারলে চেলে লা পাস দেখে আসা। ১০০ কিলোমিটার।
দিন ১৪/২ নভেম্বরঃ পারো থেকে ফুন্টশোলিং, জয়গাঁও পেরিয়ে সোজা জলপাইগুড়ি। ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে রাত কাটানো। ৩৩০ কিলোমিটার।
দিন ১৫/৩ নভেম্বরঃ জলপাইগুড়ি থেকে হুগলি। ৫৬০ কিলোমিটার।
দিন ১৬/৪ নভেম্বরঃ হুগলিতে আমার বইয়ের উদ্বোধন। হইহল্লা। গজল্লা।
দিন ১৭/৫ নভেম্বরঃ হুগলি থেকে বারাণসী।
দিন ১৮/৬ নভেম্বরঃ বারাণসী থেকে দিল্লি।

দুই সপ্তাহের প্রোগ্রাম গিয়ে দাঁড়াল আঠেরো দিনে। এমনিতে, দুই সপ্তাহ মানে পাঁচ পাঁচ দশ দিনের ছুটি। আগে, পিছে, মাঝে তিনটে উইকেন্ডের ছ দিন জুড়লে হয় ষোল দিন – এটাকে আঠেরো করতে হলে আমাকে আগে আর পিছে দুটো দিন গুপি করতে হয়। মানে শনিবারের বদলে শুক্রবার স্টার্ট করো, আর রবিবারের বদলে সোমবার ফেরো।

তাই হোক। বৃহস্পতিবার উনিশে অক্টোবর কালীপুজো, দিওয়ালি, আমি শুক্রবার কুড়ি তারিখে বেরোব। ফিরব ৬ই নভেম্বর, সোমবার রাতে।

অল সেট?

অলমোস্ট!

 


6 thoughts on “দুই দেশ, ছয় রাজ্য, দুই চাকা, পাঁচ হাজার একশো কিলোমিটার ও এক পাগলঃ পর্ব ১

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.