দুই দেশ, ছয় রাজ্য, দুই চাকা, পাঁচ হাজার একশো কিলোমিটার ও এক পাগলঃ পর্ব ১৩

দ্বাদশ পর্বের পরে

অনেক বেলায় ঘুম ভাঙল কেমন একটা ঘোরের মধ্যে। ক্ষিদে পেয়েছে। না, শরীরের ব্যথা আর নেই। পেনকিলারের এফেক্ট, কিন্তু ভারী পর্দায় ঢাকা ঘরের মধ্যে বোঝা যাচ্ছে না বেলা কত হল। চোখ খুলতে হবে, কিন্তু চোখের পাতার ওজন মনে হচ্ছে কয়েক কিলো বেড়ে গেছে।

নির্জীবের মত পড়ে রইলাম আরও খানিকক্ষণ। তার পরে আস্তে করে উঠে মোবাইলটা জ্বাললাম – স্ক্রিনের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল, কোনওরকমে সময়টা পড়তে পারলাম, দুটো বেজে তিন মিনিট। মাথা ভারী হয়ে আছে, পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে।

একটা দিন পুরো ওয়েস্ট। কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই। ভালো করে একটু চান খাওয়া করে আরেকবার ঘুমোবার চেষ্টা করতে হবে – যতটা রেস্ট নিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা তার চেয়েও বড়; আগে চান, না আগে খাওয়া? ক্ষিদে পেয়েছে সাঙ্ঘাতিক, ওদিকে চান করাটাও জরুরি। আজন্ম সংস্কার আমাকে শিখিয়ে এসেছে চান করেই দুপুরের খাওয়া খেতে হয়, কিন্তু সংস্কার না মানাটা আমার এমনই অভ্যেস হয়ে গেছে, বার তিনেক মাথা চুলকে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম, আগে খেয়ে আসি। খেয়ে এসে চান করব আরামসে।

রুম থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে দু পা এগোতেই হোটেলের রেস্টুরেন্ট, একই ফ্লোরে, লোকজনের ভিড়ে গমগম করছে। এক থালা বিরিয়ানির অর্ডার দিলাম। জয়গাঁওয়ের বিরিয়ানি কেমন হবে জানি না, কিন্তু খেতে হবে। … তা, মন্দ বানায় নি। খেতে শুরু করলাম।

একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। পশ্চিমবঙ্গের নম্বর।

অন্যপ্রান্তের আওয়াজটি পরিচয় দিলেন – আমি কুমার কৌস্তুভ রায়, লোনলি হাইওয়ে নামে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটার আমি মডারেটর। তুমি করেই বলছি ভাই, তোমার বইয়ের প্রকাশ হচ্ছে তো চার তারিখ? আমি অমুক জায়গা থেকে আসব, তোমার অনুষ্ঠানের ভেনুতে কী করে পৌঁছব …

আলাপ করে খুব খুশি হলাম। তখনও জানি নি লোকটার মধ্যে কতগুলো গল্প ফোল্ড করে ঢুকিয়ে রাখা আছে, সে সব জেনেছিলাম আরও পরে – সে গল্প যথাসময়ে হবে। ডিরেকশন দিলাম হুগলি চুঁচুড়া মিউনিসিপ্যালিটি আসার, সেখানেই হচ্ছে কিনা আমার ট্র্যাভেলগের বই হিসেবে আত্মপ্রকাশ, যে বইটাকে আমি নিজেও চোখে দেখি নি এখনও।

খেয়ে দেয়ে ফিরে এলাম ঘরের দিকে। লম্বা করিডরের অন্যপ্রান্তে রিসেপশন, সেখানে গিয়ে বলে এলাম, আজকেও থাকছি – পারিমিট পাই নি, ফুন্টশোলিংয়ে সমস্ত বন্ধ আজ।

কিছু টুরিস্ট এসেছেন, সম্ভবত অন্ধ্র বা তেলেঙ্গানা থেকে। তাঁদের সঙ্গে এসেছে একতাড়া লাগেজ, সেসব টপকে আমি ঘরের দিকে এগোতে গিয়ে … থমকে গেলাম ছ নম্বর রুমের সামনে। আমার ঠিক পাশের রুমটা।

গান ভেসে আসছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত। পুরুষ কণ্ঠ, উদাত্ত।

আমি তোমায় যখন খুঁজে ফিরি, ভয়ে কাঁপে মন –
প্রেমে আমার ঢেউ লাগে তখন।
তোমার শেষ নাহি, তাই শূন্য সেজে
শেষ করে দাও আপনাকে যে–
ওই হাসিরে দেয় ধুয়ে মোর বিরহের রোদন …

… ও মোর ভালোবাসার ধন …

বিক্রম সিং শুনেছি। বারবার। কিন্তু এ যেন অন্য লেভেলের গায়কী। টপ্পাঙ্গের গান, প্রতিটা সুরের ভাঁজ শুধু নিখুঁত লাগছে, তাই নয়, সুরের প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে কী রকম যেন মনে হচ্ছে একটা কান্না ঝরে ঝরে পড়ছে। বিক্রমের গলায় এই গানে আমি বিষণ্ণতা পেয়েছি, এখানে একটু অন্য রকম মুড়কি লাগছে – কিন্তু কে গাইছে এমন করে?

আমার চারপাশ থেকে মুছে গেছে সবকিছু, সামনে রেস্তরাঁ, পেছনে রিসেপশনের কোলাহল এক ঝটকায় মুছে দিয়েছেন রবিঠাকুর, আসা যাওয়ার পথের মাঝে সরু করিডোরে অন্য রুমের সামনে আমার একলা দাঁড়িয়ে থাকাটা বেখাপ্পাই লাগছিল হয় তো, কিন্তু আমার তখন সে হুঁশ নেই, আমি শুনছি ভেতরের উদাত্ত গলাটা পরের গান ধরেছে, শুনি ওই রুনুঝুনু পায়ে পায়ে নূপুরধ্বনি, চকিত পথে বনে বনে …

কী মনে হল, গানটা শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করলাম। তার পরে থাকতে না পেরে দরজাতে নক করলাম।

দরজা খুলল একটা ছেলে, মানে কমবয়েসী একজন, খুব বেশি হলে ছাব্বিশ সাতাশ বছর বয়েস হবে। প্রথমেই নজর কাড়ে ছেলেটার চোখ, প্রচণ্ড গভীর, এক দৃষ্টিতে যেন সামনের জনের ভেতরটা দেখে নিতে পারে, এই রকমের তীব্র।

ছেলেটা দরজা খুলে তাকালো আমার দিকে, চোখেমুখে প্রশ্ন, আমিই প্রথম কথা বললাম – নমস্কার, আমি পাশের রুমেই আছি। আপনার ঘর থেকে এইমাত্র একটা গান শুনে দাঁড়িয়ে গেছিলাম, আপনিই গাইছিলেন?

ছেলেটা খুব হতচকিত ভাব নিয়ে বলল, হ্যাঁ, কেন বলুন তো?

একটু ইতস্তত করে বলেই ফেললাম, আমি কি ভেতরে এসে একটু বসতে পারি? আপনার গান আমার প্রচণ্ড ভালো লেগেছে, যদি আরও একটা দুটো গান শোনান – আপনি চাইলে আমার ঘরেও এসে বসতে পারেন। আমি জাস্ট আপনার গলায় আরও কটা গান শুনতে চাই, মানে – এই রকম ভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত আমি আগে কখনও শুনি নি। যদি আপনার আপত্তি না থাকে …

ছেলেটা একগাল হেসে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল –আসুন। বসুন।

পরের তিনটে ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল – জানি না। কিন্তু যেটুকু যা শুনলাম ছেলেটির সম্বন্ধে, হাঁ হয়ে যাবার পক্ষে যথেষ্ট। সমীরণ তার নাম (আসল নাম নয় অবশ্য)। নৈহাটিতে থাকত এককালে, বাবা জুটমিলের কর্মচারী ছিলেন। খুব স্বাচ্ছন্দ্যের সংসার ছিল না জুটমিল সংলগ্ন কলোনিতে, এমনকি পরিবেশও খুব একটা ভদ্রস্থ ছিল না, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তার অসম্ভব অনুরাগ দেখে মা তাকে নিয়ে যান কাঁঠালপাড়ার এক দিদির কাছে গানের তালিম নিতে, যে দিদি ছিলেন দক্ষিণীর ছাত্রী। পড়াশোনার পাশাপাশি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গান শেখা সেই দিদির কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের হাতেখড়ি বেশ চলছিল, হঠাৎ জুটমিলের ভেতর অ্যাক্সিডেন্টে বাবা মারা যান পরিবারটিকে একেবারে রাতারাতি পথে বসিয়ে। সমীরণ তখন ক্লাস এইট। সঞ্চয় বলতে প্রায় কিছু ছিল না। জুটমিল নিজেই তখন বন্ধ হবার মুখে – একটি টাকা পয়সাও পাওয়া যায় নি।

এর পর? মায়ের বাপের বাড়ি শিলিগুড়িতে – কয়েক মাসের মধ্যে সেইখানে গিয়ে ওঠা, এবং মামার দয়ায় কোনওরকমে মাধ্যমিক পাশ করা। এর পরে আর মামাবাড়িতে ঠাঁই হয় নি। ফুলবাড়ি এলাকায় একটা শস্তার এক কামরার ঘর ভাড়া নিয়ে মা আর ছেলের পরের স্ট্রাগল শুরু হয়। সমীরণ পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিল, কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে পড়াশোনা করা ছিল নিতান্ত বিলাসিতা। প্রথমে দরকার ছিল ঘরটুকু ধরে রাখার চিন্তাআর পেটের দুটো নুনভাত ফ্যানভাতের জোগাড় করার চিন্তা।

প্রথমে ফুলবাড়ি এলাকার একটা ভাতের হোটেল, পরে শিলিগুড়ির একটা মধ্যমানের রেস্তরাঁয় ওয়েটারের চাকরি। সামান্যই মাইনে, কেবল খাওয়াটা ফ্রি। রেস্তরাঁ খোলে সকাল এগারোটায়, বন্ধ হয়ে বেরোতে বেরোতে রাত বারোটা। রাতের খাবার মায়ের কাছে নিয়ে পৌঁছনো যেত না, সকালেও মায়ের খাবারের বন্দোবস্ত করা যেত না সময়মত, তাই মালিককে অনুরোধ করে রেস্তরাঁতেই রাতে শোবার বন্দোবস্ত করা, আর রেস্তরাঁরই আরেক ওয়েটার দাদাকে ধরে রাত নটার মধ্যে মায়ের কাছে মায়ের একার মত ভাত তরকারি পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করে সে। পুরো ব্যবস্থাই হয় সেই দাদার উৎসাহে। এর পর সেই দাদার উৎসাহে ভর করেই পরের স্বপ্নের উড়ান। দাদাই তাকে স্বপ্ন দেখতে শেখান। …

… আমি স্রেফ হাঁ হয়ে শুনছিলাম, মাঝেমধ্যে দু একটা প্রশ্ন করেছিলাম বলেই হয় তো আজ এতটা ডিটেলে লিখতে পারছি। ফিকশনও বোধ হয় এতটা টানটান উত্তেজনার হয় না। রেস্তরাঁতে কাজ করতে করতে সমীরণ একটা নাইট স্কুলে ভর্তি হয়, ক্লাস ইলেভেনে। আর্টস। সপ্তাহে একদিন ছুটির বন্দোবস্ত হয় রেস্তরাঁ থেকে, স্কুলেরই একজন স্যার তাকে দুটো সাবজেক্ট পড়ানোর দায়িত্ব নেন। এবং, টানা দু বছর সে দাঁতে দাঁত চেপে রেস্তরাঁর কাজ চালাতে চালাতে পড়াশোনা শেষ করে, প্রথম বারের প্রচেষ্টাতেই হায়ার সেকেন্ডারি উতরে যায়।

জেদ বেড়ে যায় সমীরণের। এর পরে সে জোগাড় করে আরেকটা চাকরি – এটিএমের সিকিউরিটি গার্ডের। ছোটাছুটি নেই, কাজ বলতে সে রকম কিছু নেই, কেবল টুলে বসে থাকা, দিনে দশটি ঘণ্টা। মাইনে একটু বেশি। এতটুকুই বেশি, যে মা-কে শিলিগুড়িতে এনে একটা ঝুপড়ি ঘরে রাখা যায়।

চাকরিটা সমীরণ এই কারণেই বেছে নিয়েছিল – ও পড়তে চেয়েছিল। পড়তে পারবে – এই ভয়ঙ্কর আত্মবিশ্বাসটা ও পেয়ে গেছিল উচ্চমাধ্যমিকের জন্য দু বছর লড়েই। আর এটিএমের সিকিওরিটি গার্ডের চাকরিতে পড়াশোনা করবার জন্য অফুরন্ত সময়। শিলিগুড়ির এক কলেজে ইকোনমিক্স নিয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় তাকে, লোকাল পার্টির দাদাকে ধরেকয়ে, অবশ্য, মাঝে একটা বছর নষ্ট হয়েই গেছিল, প্রথম বারে হয় নি।

“সেদিনও, আর আজও, বুঝলে দাদা, গান আমার একমাত্র এন্টারটেনমেন্ট। যখন পড়তে বসে বোর হয়ে যেতাম, দুটো একটা গান গেয়ে নিলেই ফ্রেশ। যে পরিবেশ থেকে বেড়ে উঠেছি, ও গান না থাকলে ঐসব জায়গার আর পাঁচটা ছেলে যেভাবে বয়ে যায়, আমিও সেইভাবেই বয়ে যেতাম। ঐ এক রবিঠাকুরের গান আমাকে কী রকম জাদু করে রাখত, আজও রাখে। বন্ধুবান্ধব পাড়ার লোক অনেকের কাছে হ্যাটা খেয়েছি এই বাজারে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে পাগলামো করার জন্যে – আর সেসব থেকে দূরে সরতে গিয়ে ঐ রবীন্দ্রসঙ্গীতকেই নিয়ে ভেগেছি।”

গ্র্যাজুয়েশনের ফাইনাল পরীক্ষার দু মাস আগে, মা মারা যান। টিবি হয়েছিল, ছেলেকে টের পেতে দেন নি, ছেলে যতক্ষণে টের পায়, ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে অনেকটাই, সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করার দু দিনের মধ্যেই মা মারা যান।

“দুঃখ পেয়েছিলাম, মানে যতটা পাওয়া যায় আর কি – বুঝলে। মায়েরও আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না, আমারও মা ছাড়া আর কেউ রইল না। মামাদের সাথে বেরিয়ে আসার পরে আর কোনও সম্পর্ক রাখি নি। শেষ কাজও আমি একা হাতেই করেছি। আর, সবকিছু মিটে যাবার পরে, সবার প্রথমে যে জিনিসটা আমার মাথায় এল – সেটা হচ্ছে, আর দেড় মাস বাকি পরীক্ষার। এবং, আমার আর কোনও পিছুটান রইল না। আগে তাও মায়ের জন্য দিনে একবার বাড়িতে ফেরার গল্প ছিল, এখন আর সেটাও রইল না – তো বুঝলে দাদা, পরীক্ষাটা দিয়েই ফেললাম। আর বলতে নেই, ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলাম। আমাদের কলেজ থেকে মাত্র তিনজন ইকোনমিক্স অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল, বুঝলে।”

পাশ করার ছ মাসের মাথায়, সদ্য পাঁচদিন আগে সমীরণ একটা চাকরি পেয়েছে, কলকাতায়। সামান্য চাকরি, কিন্তু এটা ওকে ওর পরের স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করবে। পরের স্বপ্ন, মাস্টার্স করা, কলকাতা থেকে, এবং ছোটবেলাতেই থেমে যাওয়া গানের তালিম আবার শুরু করা। কাঁঠালপাড়ার সেই দিদির সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়েছে, তিনি এখন কলকাতাতেই গান শেখান। শিলিগুড়ির পাট চুকিয়ে ডিসেম্বর মাসেই সমীরণ কলকাতা চলে যাবে, তাই এটিএম গার্ডের চাকরি থেকে পাকাপাকি ছুটি নিয়ে একলা ঘুরতে বেরিয়েছে। টাকাপয়সা জমেছে কিছু। পাড়ার একজনের কাছ থেকে একটা স্কুটারও জোগাড় হয়েছে। ওরও ভুটান যাবার ছিল আজকেই। ইমিগ্রেশন বন্ধ থাকার জন্য যেতে পারে নি। কাল সকালে যাবে।

আমি মোটামুটি কথা হারিয়ে ফেলেছিলাম। এ রকমের গল্প তো জাস্ট সিনেমা টিনেমায় হয় বলে শুনেছি – এই লাইফ কাটিয়ে আসা একজন ছেলে, সত্যি সত্যি আমার সামনে বসে আছে?

আরও খানিকক্ষণ গল্প হল। আমিও আমার গল্প বললাম – সেই টিবির কবল থেকেই বেঁচে ফেরার গল্প। আমার বেড়ানোর গল্প। এবং, গল্পের মাঝে মাঝে গান হল। সে অবশ্য একতরফা। অসম্ভব সাধা গলা সমীরণের, শুনলে জাস্ট গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এই ছেলেটি তো কাল আমার যাত্রাপথের সঙ্গী হতে পারে! জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাবে প্রথম? কী প্ল্যান ভুটানে?

সমীরণ বলল, প্রথমে থিম্পু যাবো, ওখানে আমার পাড়ার একজন চাকরি করে। ওর কাছে দুদিন থেকে পারো ঘুরে ফিরে আসব। এসে দার্জিলিং যাবো আবার।

তা – থিম্পু আর পারোর তো বেশির ভাগটাই একই রাস্তা। যাবে আমার সাথে? কাল আমিও পারমিট নিতে বেরোব তো সকালে।

সমীরণ একটু ফ্যাকাসে হাসল, দাদা, একটা কথা বলি – কিছু মনে কোরো না – আমি একলা ঘুরতে চাই। লোকজনের সঙ্গ ছাড়া।

তড়িঘড়ি বললাম, আরে না না, মনে করার কী আছে, আমি নিজেও তো ঐ রকমই – এই দ্যাখো, এতটা রাস্তা তো একা একাই ঘুরছি – ঠিক আছে, ঠিক আছে, কোনও ব্যাপার না, তুমি তোমার মত বেরিও। আমি আমার মত বেরোব।

এর পরেও গান হল। শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়, লোকগীতিতেও সমীরণের অবাধ দক্ষতা। গোটা দুয়েক ভাওয়াইয়া গান শোনাল। আর অতুলপ্রসাদ।

এক সময়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি পড়াশোনায় খুব ভালো, বুঝলাম, কিন্তু রোজগারের রাস্তা হিসেবে গান কেন বেছে নাও নি কখনও? এত অসাধারণ গানের গলা তোমার, তুমি তো স্বচ্ছন্দে রেডিও টিভিতে অডিশন দিতে পারো। ফাংশন টাংশন থেকে কখনও ডাক আসে নি?

সমীরণ হাসল, না। গান গেয়ে পয়সা আমি এ জীবনে রোজগার করতে পারব না দাদা – ওটা আমার অক্সিজেন। অক্সিজেন বেচতে পারব না আমি, বুঝলে।

***

একা থাকতে আমিও চাই, তাই সাড়ে সাতটা নাগাদ সমীরণের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরে ফিরলাম। একটু বাদে রাতের খাবার খেতে বেরোব, একলাই যাব। তলপেটের ব্যথাটা আবার একটু একটু করে ফিরে আসছে, পেনকিলারের এফেক্ট শেষ হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি খেয়ে আরেকটা পেনকিলার মেরে ঘুমোতে যেতে হবে, যাতে কাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে পারি। বার বার জিজ্ঞেস করে এসেছি, কাল ইমিগ্রেশন খোলা থাকবে, অবশ্য আমার পারমিট হয়েই গেছে, স্রেফ মোটরসাইকেলের পারমিটটা বানানো বাকি, আশা করি বেশি সময় লাগবে না। উগিয়েনের ভাই কাল আরএসটিএর সামনে আসবে সকাল সাড়ে আটটায়।

ঘরে গিয়ে গোছগাছ সেরে নিলাম, আজ আর স্বরাজের কল আসে নি, সাড়ে আটটার সময়ে একাই বেরিয়ে গেলাম। বাইরে একটা ছোট ভাতের হোটেল টাইপের দেখে এসেছি, ওখানেই সেরে এলাম রাতের খাবার, খেয়ে এসে পেনকিলার খেয়ে একটু এপাশ ওপাশ করে, সোজা ঘুম।

কাল কি হবে, ভুটান?


৩১শে অক্টোবর, দ্বাদশ দিন

ঘুম ভাঙল সকাল সাতটায়, একেবারে ফ্রেশ। কোনও সমস্যা নেই শরীরে। ঝটপট উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলাম, আজ তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বেরিয়ে পড়তে হবে। দুদিন পুরো থাকার ছিল পারোতে, সেইটা কমে এক দিন হল, যদি আজ বিকেলের মধ্যে পারো পৌঁছে যেতে পারি, তা হলে পারো শহরটা ঘুরে নেব, প্রশ্ন হচ্ছে কাল কোনটা করব – চেলে লা পাস, নাকি টাইগার্স নেস্ট। যাক গে, আগে তো পৌঁছই, তার পরে দেখা যাবে।

বাইরে বেরিয়ে একবার সমীরণের দরজায় নক করতে গিয়েও, হাত সরিয়ে নিলাম। থাক, পথের আলাপ, পথেই শেষ হয়ে যাওয়া ভালো। ফোন নম্বরও নিই নি। যদি ওরও আজ বেরনোর থাকে তো ওখানে আরএসটিএ অফিসেই দেখা হয়ে যেতে পারে।

মোটরসাইকেলটা থানাতেই রাখা রয়েছে, কাল আর বের করা হয় নি সারাদিনে। ধুলো খেয়েছে গোটা একদিন ধরে, পায়রাতেও নোংরা করেছে খানিক, একবার ধুয়ে নিতে পারলে ভালো হত। কাল সকালের হালকা বৃষ্টিতে ধুলো আরও বসে গেছে সর্বাঙ্গে।

ফুন্টশোলিংয়ের আরএসটিএ অফিসে পৌঁছে উগিয়েনের ভাইকে ফোন করলাম, এখানে আর এয়ারটেল ধরছে না, ভুটানের সিম থেকে এই প্রথম ফোন করলাম। দশ মিনিটের মধ্যেই ভাই এসে পৌঁছে গেলেন। সক্কাল সক্কাল ফিটফাট, ঘো পরিহিত। ভুটানের নিয়ম হচ্ছে, নন–ভুটানিজদের জন্য এমনিতে কোনও ড্রেসকোড নেই, কিন্তু ভুটানিজদের জন্য সরকারি অফিসে, যিনি কাজ করছেন, এবং যিনি ভিজিট করছেন, দুজনকার জন্যই ন্যাশনাল ড্রেস পরে থাকা মাস্ট। নিজেদের সংস্কৃতিকে ওরা প্রচণ্ড ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে জীবনের প্রতিটা পদে।

উগিয়েনের ভাই বার বার লিখতে খারাপ লাগছে, কিন্তু তার নাম সত্যিই মনে নেই, তাই ভাই বলেই চালাই আপাতত। ভাইকে নিয়ে দোতলায় উঠলাম, পারমিটের ঘরটা কালকেই দেখে এসেছি, সেইখানে গিয়ে দাঁড়ালাম, ভাই ভেতরে ঢুকে দেখে এসে বললেন, অফিসার এখনও আসেন নি, একটু দাঁড়ানো যাক।

ঠিক নটায় অফিসার এলেন, একই রকমের ঘো পরা, ভাই তাঁর পেছন পেছন ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন আমার স্ট্যাম্প মারা ভিসা, পাসপোর্ট আর গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে। এবং ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় মুখ চুন করে বেরিয়ে এলেন – পারমিট হয় নি, সেই একই সমস্যা – উগিয়েন স্বয়ং এখানে উপস্থিত না থাকলে ভেহিকল পারমিট দেওয়া হবে না। হবে না তো হবেই না, কোনও ভাবেই এখানে চিঁড়ে ভেজানো যায় নি।

আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আমার অবস্থা দেখে ভাই আবার একবার ভেতরে গেলেন, আবার বেরোলেন, এবং এবার তিনতলায় গেলেন, আবার নেমে এলেন দোতলায়। নাঃ, কাঁধ ঝুলিয়ে ক্ষমাপ্রার্থীর ভঙ্গীতে দাঁড়ালেন ভাই, ভেরি সরি ব্রাদার, আই কুডন্ট ডু দিস।

কোনওরকমে হাসিমুখে ভাইকে বিদায় জানাতে হল। বললাম, আমি ইমিগ্রেশন অফিসে একবার লাইন দিয়ে দেখি, নর্মাল পারমিট প্রসেসে একবার চেষ্টা করে যদি পারমিট বের করে নেওয়া যায়, তা হলে আর এই ই-ভিসার দরকার হবে না, তা হলেই আর গাইডের উপস্থিতির ক্লজটা থাকবে না। এমনি পারমিট পেলে তো সেই পারমিট দেখিয়েই ভেহিকল পারমিট বের করে নেওয়া যায়।

ভাই বললেন, হ্যাঁ, দেখুন ব্রাদার। আমি তো ওদিকের প্রসেস জানি না –

ভাই চলে গেলেন। আমি হাঁটতে লাগলাম ইমিগ্রেশন অফিসের দিকে। সোয়া নটা বেজেছে। ইমিগ্রেশন অফিসের ভেতরের চত্বরে লম্বা লাইন লেগেছে। কাল গেট বন্ধ, শুনশান ছিল জায়গাটা। আজ গমগম করছে। এদিক ওদিক কিছু দালাল ঘুরছে, দেখলেই চেনা যায়। সে রকম একজন দালাল, দাঁড়কাকের মত চেহারা, চোখে কালো চশমা, বিহারী অ্যাকসেন্টে আমাকে জিজ্ঞেস করল, পারমিট করাতে হবে কিনা।

গল্পটা বললাম, এই এই হয়েছে। এখন নর্মাল পারমিট করিয়ে বেরোতে চাই। ই-ভিসায় কাজ হবে না।

দালাল বরাভয় দেখিয়ে বলল, কোনও চিন্তা নেই, কুছ পরোয়া নেই – মহিলাদের একটা দল সামনেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাদের দেখিয়ে বলল, আপনাকে আমি এই গ্রুপের সঙ্গে করিয়ে দিচ্ছি। সাড়ে ছশো টাকা লাগবে, আমি পারমিটের ফর্ম এনে দিচ্ছি।

পারমিটের ফর্ম আমি নিজেই তিন কপি সঙ্গে রেখেছিলাম, ব্যাগ থেকে বের করে বললাম, পাঁচশো দেব।

Bhutan Permit

লোকটা কালো চশমার ফাঁক দিয়ে একবার আমাকে দেখে বলল, একা আছো না? সাড়ে পাঁচশো। এখন একশো টাকা দাও, আর – পাশে ঘো পরা আরেকটা চিমসে মতন ছেলে বাকি দলের ফর্ম ভরতে সাহায্য করছিল – ভুটানি দালাল আর কি – তাকে দেখিয়ে বলল, একে সাড়ে চারশো দিয়ে দিও। এ তোমাকে লাইনে লাগিয়ে দেবে। আমাকে তোমার বাইকের কাগজপত্রগুলো দাও, আমি পারমিট করিয়ে আনছি ততক্ষণে। আধঘণ্টায় চলে আসব, ততক্ষণে এখান থেকে পারমিট বের করে নাও।

ফর্ম ভরে লাইনে দাঁড়ালাম। চারপাশে বিভিন্ন রকমের লোকজন – কেউ জটলা পাকিয়ে অন্য কোনও দালালের সঙ্গে নিগোশিয়েশন চালাচ্ছে, কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে ফর্ম ভরছে, একটা বাইকার গ্রুপ মনে হল দেখে, তারাও ফর্ম ভরছে আরেক দিকে বসে। কেউ যাচ্ছে চাকরির কাজে, কেউ টুরিস্ট, কেউ বিজনেসের ব্যাপারে। সামনে বারান্দা মতন একটা এলাকা, সেইখানে দুজন অফিসার বসে ফর্ম স্ক্রুটিনি করে যাচ্ছেন। আমাদের গ্রুপের ফর্মের বান্ডিলও এক সময়ে গেল সেখানে, এবং প্রায় কিছু না দেখেই ওকে হয়ে ফেরত এল। এর পরে একটা সময়ে আমাদের ডাক এল, বারান্দার পাশেই একটা দরজা দিয়ে ঢুকে সেই মহিলাদের গ্রুপটার পিছু পিছু আমিও ওপরে উঠে গেলাম।

বড় হলঘর, সারি সারি কাউন্টার, সেখানে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করার পর আমাদের ডাক এল সাত নম্বর কাউন্টারে। এক এক করে সমস্ত মহিলার হয়ে যাবার পরে মহিলাদের লিডার টাইপের যে মহিলাটি, কথায় বার্তায় জেনেছিলাম মিজোরাম পুলিশ, তিনি আমাকে কাউন্টারের সামনে এগিয়ে দিলেন।

ফর্ম জমা দিয়ে ছবি তোলা হল, এইবারে পরিচয়পত্র দেবার পালা। পাসপোর্ট বাড়িয়ে দিলাম, সেটাকে খুলেই কাউন্টারের লোকটি বললেন, আপনার তো এন্ট্রি হয়ে গেছে, আর তো হবে না। সিস্টেম চেক করেও বললেন, না, আপনার গতকালই এন্ট্রি হয়ে গেছে, আর তো এন্ট্রি করানো যাবে না।

আবার বোঝালাম তাঁকে ব্যাপারটা। কী বুঝলেন জানি না, বললেন, এই ভিসাটা ক্যানসেল করিয়ে নিচ থেকে অ্যাপ্রুভ করিয়ে আবার ওপরে আসুন, পারমিট হয়ে যাবে।

কী ঝমেলা, জিজ্ঞেস করলাম, আমার ঐ ওপাশের বিল্ডিং থেকে ভিসা হয়েছে, ওটা ওখান থেকেই ক্যানসেল করিয়ে আসব তো? এখানে করানো যাবে না? কাউন্টারের লোকটি বললেন, হ্যাঁ, ভিসা ওখান থেকেই ক্যানসেল করাতে হবে, করিয়ে নিচ থেকে আবার অ্যাপ্রুভ করে ওপরে আসুন।

নিচে নেমে এলাম। দালালটার ফোন নম্বর নিয়ে রেখেছিলাম, তাকে ফোন করলাম একবার – বস, এই এই বলছে, কী করব?

আমার কেস বোধ হয় ইউনিক, সে শোনে নি কখনও ই-ভিসার গল্প, যেমন উগিয়েনের ভাই পারমিটের গল্প জানে না বলেছিল। বলল, আচ্ছা – বলছে যখন, করিয়ে নাও ক্যানসেল। আমি তোমার বাইকের পারমিটটা নিয়ে আসছি আর দশ মিনিটের মধ্যেই।

আমি বেরিয়ে এসে পেট্রল পাম্পটা পেরিয়ে পাশের ইমিগ্রেশন অফিসে গেলাম আবার। পারমিটের ইমিগ্রেশন অফিসটাতে যত ভিড়, এখানে তেমনিই নির্জন, শুনশান। অন্য একজন অফিসার বসে ছিলেন। গিয়ে ভিসার কাগজটা বাড়িয়ে ধরে বললাম, আমাকে ওই ইমিগ্রেশন অফিস থেকে বলছে এটা ক্যানসেল করালে তবে পারমিট দেবে। ক্যানসেল করিয়ে দিন, প্লিজ।

অফিসার, সরু সরু চোখদুটোকে আরও সরু করে বললেন, কালকেই এন্ট্রি করিয়েছো, আজকে এক্সিট করে দেব? আর ইউ শিওর?

আমি বললাম, হ্যাঁ শিওর।

ভদ্রলোক কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, ওকে দেন – বলে স্ট্যাম্প মেরে দিলেন, ভিসায় আর আমার পাসপোর্টে – এক্সিট, ফুন্টশোলিং।

আমি সেটা নিয়ে আর পারমিটের কাগজপত্র নিয়ে আবার ফিরে এলাম আগের ইমিগ্রেশন অফিসে, নিচের কাউন্টারে গিয়ে আবার পারমিটের ফর্ম দেখিয়ে বললাম, ই-ভিসাটা ক্যানসেল করাতে গেছিলাম, এবার ওপরে গিয়ে পারমিট বানাবো, অ্যাপ্রুভ করে দিন।

অফিসার ই-ভিসাটা চেয়ে নিলেন। একবার সেটার দিকে দেখলেন, একবার আমার দিকে দেখলেন, দেখে বললেন, এটা আপনি এইমাত্র ক্যানসেল করিয়ে এসেছেন?

কিছু একটা ভুল হচ্ছে বা হয়ে গেছে – সেন্স করলাম, আস্তে করে বললাম, হ্যাঁ … কেন?

পারমিটের ফর্ম আর ই-ভিসা আমাকে ফেরত দিয়ে বললেন, ফেরত যাও। একবার এক্সিট করে গেলে পনেরো দিনের আগের পরের পারমিট পাওয়া যাবে না।

মানে???

মানে, এটাই নিয়ম। পারমিট হোক বা ভিসা, একবার এক্সিট ছাপ পড়ে গেলে পনেরো দিনের কুলিং পিরিয়ড। তার আগে পারমিট দেবার নিয়ম নেই।

আমার মাথা টলে গেল। আমি জেনেবুঝে আমার পারমিট ভিসা ক্যানসেল করিয়ে এসেছি, করানোর আগে পর্যন্ত আমাকে কেউ এই তথ্যটা দেয় নি, একবার বললে আমি করাতাম না – ওপরের কাউন্টারের লোকটা কী শয়তান! একবার বলল না, ক্যানসেল করালে পনেরো দিনের আগে আর করানো যাবে না! তাই বারবার বলছিল নিচ থেকে অ্যাপ্রুভ করিয়ে ওপরে আসবে, মানে ও জানতি, যে ক্যানসেল করানোর পরে নিচ থেকে আর অ্যাপ্রুভ করবে না!!

সব আশা শেষ। আর কিচ্ছু করার নেই। আমারই বোকামির জন্য আমার ভুটান যাত্রায় এবারের মত ইতি পড়ল।

পেছন ফিরতে দেখি সেই দালাল ঢুকছে গেট পেরিয়ে। আমাকে বলল, এই নাও, তোমার মোটরসাইকেলের পারমিট। তোমার পারমিট হয়ে গেছে?

বললাম। মানে, নিতান্ত অশিক্ষিত লোক একজন, জাস্ট সোজাসাপটা প্রসেসটা জানে, একটু এদিক ওদিক হলে কী নিয়ম কানুন, কিস্যু জানে না। কিস্যু না। সে আবার গেল সেই ডেস্কে, কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু নিয়ম হল নিয়ম। আগের ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে কথা বলো, যদি ওরা কিছু করতে পারে। এখানে কিচ্ছু করা যাবে না।

আর তো কিছু বলারই নেই। লোকটাও আর সাহস করে সাড়ে চারশো টাকা চাইতে পারছে না। আমি বললাম, বাইকের পারমিট নিয়েই বা আমি আর কী করব, ছিঁড়ে ফেলে দাও। আমি ফেরত যাই। আমারই বোকামি।

দালাল লোকটা, কী ভেবে কে জানে, ভেহিকল পারমিটটা ভাঁজ করে আমার জামার পকেটে ঢুকিয়ে দিল জোর করে, বলল, দাঁড়াও, দেখছি। কোথা থেকে সেই চিমসে মতন ভুটানিজ দালাল ছেলেটাকে ধরে আনল। সে এসে আবার আমার কাছে বুঝতে চাইল, কী হয়েছে। আমি আবার বোঝালাম। সে বলল, আচ্ছা, চলো, দেখি কিছু করা যায় কিনা, ওখানে ছোট ইমিগ্রেশন অফিসে আমার এক বন্ধুর ভাই কাজ করে।

তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম আবার সেই ই-ভিসা ইস্যু করার ইমিগ্রেশন অফিসে। সে ভেতরে ঢুকল। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ভেহিকল পারমিটের কাগজটা বের করলাম। উগিয়েনের ভাই আরএসটিএ অফিসে গিয়ে অতক্ষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি করার পরেও পারমিট বের করতে পারে নি, আর এই লোকটা কিনা একশো টাকা নিয়ে ওখানে গিয়ে আমাকে ছাড়াই পারমিট বের করে ফেলল? আমাকে যেতেও হল না?

ভেহিকল পারমিটের কাগজটা বের করে দেখি, তিনি আরেক কীর্তি করে রেখেছেন। মোটরসাইকেলের নম্বরে DLএর জায়গায় সেই দালাল, কিংবা অন্য কেউই হবে, লিখেছে WB।

প্রায় পনেরো মিনিট বাদে সেই চিমসে দালাল বেরিয়ে এসে বলল, কে বলেছিল তোমাকে এটা ক্যনসেল করাবার কথা?

আমি বললাম, ওই ইমিগ্রেশন অফিসের দোতলায় সাত নম্বর কাউন্টারে যিনি বসে আছেন। আমি গেলে চিনতে পারব।

ছেলেটা আমাকে নিয়ে আবার ভেতরে ঢুকল। সেই অফিসারের সঙ্গে, যাঁর কাছ থেকে আমি একটু আগেই ভিসা ক্যানসেল করিয়েছি, তাঁর সাথে অনর্গল ভুটানিজ ভাষায় কিছু বলতে লাগল। দুজনেই খুব উত্তেজিত হয়ে কথোপকথন চালালো, আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে একবার এর মুখের দিকে, একবার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চলেছি। বুঝতে পারছি না কিছুই।

দশ মিনিট কথা চালাচালির পর, ছেলেটা আমাকে ডেকে আনল বাইরে। গলা নামিয়ে বলল, আমি কথা বললাম, ওরা আবার তোমাকে এন্ট্রি করিয়ে নেবে, সিস্টেমে ডেটা চেঞ্জ করে দেবে, কিন্তু টাকা চাইছে।

কত?

ছেলেটা আমার চোখে চোখ রেখে বলল, পাঁচ হাজার।

আমি ঢোঁক গিললাম। দু সেকেন্ড ভেবে নিলাম, কী বলা উচিত। বাইরে বেরিয়েছি, এখনও অবধি বড় কোনও খরচা হয় নি, পাঁচ হাজার আমি দিতেই পারি, কিন্তু আমি একটা বিদেশী রাষ্ট্রের এন্ট্রি পয়েন্টে একজন বিদেশী ইমিগ্রেশন অফিসারকে ঘুষ দিচ্ছি সে দেশে ঢোকার জন্য, কোনওভাবে যদি কেঁচে যায় কেস তো আমার গল্প আজ এখানেই শেষ হয়ে যাবে।

তার পর বললাম, দেব। কিন্তু পারমিট বানিয়ে দিতে হবে।

ছেলেটা বলল, চিন্তা নেই, হয়ে যাবে। এরা তিন হাজার নেবে, আর ওই অফিসে রেকর্ড বদলাবার জন্য দু হাজার দিতে হবে। তোমার কাছে ঐ ভিসার আর কপি আছে?

আছে। নীলাদ্রিদা একসাথে তিন কপি প্রিন্ট আউট দিয়েছিল। বললাম, সে আছে, কিন্তু আমাকে একবার এটিএমে যেতে হবে। পকেটে তো অত টাকা নেই।

চিন্তার কিছুই নেই, সামনেই ভুটান গেট, আর গেট পেরোলেই সবার প্রথমে সামনে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের এটিএম। ছেলেটাকে নিয়ে গেট পেরিয়ে টাকা তুলে আবার ফিরে এলাম, সে টাকা নিয়ে আর আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল, অফিসার আমাকে খুব তম্বি করে বললেন, কেন তুমি ওর কথা শুনে ক্যানসেল করিয়ে গেলে, আমার সাথে একবার কথা বলা উচিত ছিল না তোমার – (যেন আমি আগে থেকেই সমস্ত নিয়ম জেনে বসে আছি, কী আর বলব, দোষ আমারই) – বলে কম্পিউটারে খুটখাট কী সব এন্ট্রি করে আমাকে বললেন, পাসপোর্ট দাও। ভিসার কপি দাও।

দিলাম। তিনি ভিসার নতুন কপিতে, আর পাসপোর্টের যে পাতায় এক্সিট স্ট্যাম্প মারা ছিল, তার পরের পাতায় আবার এন্ট্রি স্ট্যাম্প মেরে দিয়ে বললেন, চলো আমার সাথে।

বলেই হনহন করে হেঁটে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে চললেন পাশের ইমিগ্রেশন অফিসের উদ্দেশ্যে, আমিও চললাম তাঁর সাথে, তিনি সোজা আমাকে নিয়ে বারান্দার সামনে ডেস্ক পেতে বসা সেই অফিসারের কাছে গিয়ে আমাকে দেখিয়ে ভুটানিজ ভাষায় কী সব বলতে লাগলেন। তার পরে আবার, আমার দিকে ফিরে, ফলো মি, বলে পেছনে আরেকটা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে বললেন, এইখানে চুপ করে দাঁড়াও, আমি আসছি।

এটা ঐ বড় ইমিগ্রেশন অফিসের ব্যাক অফিস। মানে যে বিল্ডিংএর দোতলায় পারমিট করানো হয়। সমস্ত ফাইল, সার্ভার, দস্তাবেজ এখানে মজুদ আছে। ডেটা সেন্টার। সেখানে আমার সব কাগজপত্র নিয়ে গেলেন, এবং দশ মিনিট বাদে ফিরে এলেন আমার নতুন ভিসার প্রিন্ট আউটে আরেকটা স্ট্যাম্প মেরে, এসে বললেন, হয়ে গেছে। গুড লাক। এইবারে যাও।

আমি তখন, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেললাম, পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে? একজন ভুটানিজ ইমিগ্রেশন অফিসারকে? এ-ও সম্ভব?

লোকটার সাথে হ্যান্ডশেক করে দুবার থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু বলে আমি বেরিয়ে এলাম। আমার কাজ হয়ে গেছে, এইবারে ফিরে যাই হোটেলে, স্বরাজকে বলে টলে বেরোই। বেলা বারোটা বাজে। সকাল থেকে টেনশনের চোটে খাওয়াদাওয়া কিচ্ছু হয় নি, এইবারে টের পেলাম – পেট একদম খালি।

চিমসে মত ছেলেটা বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল, ওকে আবার ভেহিকল পারমিটের কাগজটা দেখিয়ে বললাম, এখানে আমার মোটরসাইকেলের নম্বর তো ভুল লেখা হয়েছে, এটা আবার ঠিক করাতে যেতে হবে তো? … ছেলেটা এদিক ওদিক তাকিয়ে, আমার কাছ থেকেই পেন চেয়ে নিয়ে WB কেটে দিয়ে, পাশে লিখে দিল, DL। পাশে একটা ঘিজিমিজি ইনিশিয়ালও মেরে দিল। এইভাবেই, এইভাবেই তবে কাজ হয়ে যায়। বেকার শর্টকাট মারতে গিয়ে সবচেয়ে লম্বা প্রসেস, আর সবচেয়ে বেশি টাকা খুইয়ে অবশেষে আমার ভুটান যাওয়া হচ্ছে।

Vehicle Permit

ইমিগ্রেশন অফিসের উল্টোদিকের ফুটপাথেই একটা জেরক্স সেন্টার, তার পাশে একটা ব্রেকফাস্ট করার ছোট রেস্তরাঁ। ভেতরে ঢুকে দেখলাম চমৎকার পরোটা আর ঘুগনি পাওয়া যাচ্ছে, ছখানা পরোটা খেয়ে বুঝলাম খিদে মরেছে। আর বেশি খাবার দরকার নেই, এখনি দেড়শো কিলোমিটার চলা শুরু করতে হবে। সাড়ে বারোটা বাজছে।

ফিরে এলাম জয়গাঁও – প্রথমে স্বরাজকে ফোন করে বললাম, পারমিট হয়ে গেছে রে, আমি এইবারে বেরোচ্ছি। স্বরাজ বলল, ঠিক আছে, আমি এখন সাইটে আছি, দেখা করতে পারলাম না, ভালো করে ঘুরে আয় – আর … হোটেলে কোনও পয়সা দিতে হবে না, আমি বলে রেখেছি। ফিরে এসে সিম কার্ডটা মনে করে ফেরত দিয়ে যাস।

স্বরাজের সঙ্গে আর দেখা হয় নি। দুটো দিন বন্ধুর নিঃস্বার্থ আতিথ্য উপভোগ করে বেরিয়ে পড়লাম, তাকে এতটুকুও প্রতিদান দেওয়া হল না।

ছ নম্বর রুম বাইরে থেকে বন্ধ, তালা মারা। সমীরণ কখন বেরিয়ে গেছে, জানি না। বেরিয়ে যাওয়াই উচিত। দেখা হল না ওর সাথেও।

হোটেল থেকে লাগেজ নামিয়ে বাইকে বাঁধলাম, থানা থেকেই একটা ন্যাকড়া জোগাড় করে বাইকটাকে যতটা সম্ভব পরিষ্কার করে, যখন স্টার্ট দিলাম, ঘড়িতে তখন বাজে সোয়া একটা। প্রচুর দেরি এমনিতেই হয়ে গেছে। ফুন্টশোলিংয়ে তখন প্রচুর গরম, নাকি আমার দৌড়ঝাঁপের চোটে আমার গরম লাগছে, কে জানে, দরদরিয়ে ঘামছি তখন। পরশু রাতে স্বরাজের গাড়ি যে রাস্তা দিয়ে ঢুকেছিল, ঐটা হল ইন্ডিয়ার গাড়ি ভুটানে ঢোকার রাস্তা। রাস্তাটা চিনে রেখেছিলাম, দুপুর বেলার জ্যামজমাট জয়গাঁওয়ের রাস্তা ঠেলে আমি ঢুকলাম ফুন্টশোলিংয়ে। আমার মোটরসাইকেল তা হলে ভারতের বাইরে চাকা ছোঁয়াল অবশেষে।

তবে, পায়ে হেঁটে যে জিনিসগুলো বোঝা যায় না, বাইকে বা গাড়িতে চাপলে সেগুলো চট করে নজরে পড়ে যায়। এতবার ফুন্টশোলিংয়ে ঢুকলাম বেরোলাম, দেখেছি তো বটেই, কিন্তু খেয়াল করি নি, ফুন্টশোলিং নো হঙ্কিং জোন। ওখানে কেউ হর্ন বাজায় না। এবং, নো ওভারটেকিং। মোড় থেকে ট্রাক টার্ন নিচ্ছে, বাঁ দিক দিয়ে গলে বেরিয়ে যাবার জায়গা থাকলেও মোটরসাইকেল নিয়ে তোমাকে পেছনেই দাঁড়াতে হবে, সিগন্যাল সবুজ হবে, ট্রাক বেরোবে, তবে তুমি বেরোবে।

পুরো ভুটানেই এই নিয়ম। ওভারটেকিংএর জন্যেও হর্ন মারা নিষেধ। ডিপার জ্বালিয়ে সিগনাল দাও, পাহাড়ি রাস্তায় জায়গা মিললে সামনের গাড়ি নিজেই সাইড হয়ে তোমাকে যাবার রাস্তা করে দেবে, তখনই তুমি ওভারটেক করতে পারবে।

ভুটান গেট থেকে সোজা রাস্তাটা ছশো মিটার গিয়ে মিশেছে একটা মোড়ের মাথায়, যার বাঁদিকে গেলে আরএসটিএ অফিস, আর ডানদিকে পারো-থিম্পুর রাস্তা। এগিয়ে গেলাম। জাস্ট একটু এগোতেই শহরের ভিড় কমে গেল, পাহাড়ের দৃশ্য শুরু হল, একটা বাঁকের মুখে দাঁড়াতেই হল – ভুটানের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সামনে দিগন্তের শেষ অবধি দেখা যাচ্ছে, বিস্তীর্ণ সমতল জমি – ভারত।

DSC_0291.jpg

মাউন্টে মোবাইল লাগানো আছে, আমার অফলাইনে পারোর হোমস্টে-র লোকেশন আর রুটও সেভ করা আছে, নেভিগেশন চালু করতে গিয়ে দেখি, লে হালুয়া, নেভিগেশনের অপশনটাই নেই আর গুগল ম্যাপে। এ আবার কী কেস? ব্যাক করে এসে, ফোন রিস্টার্ট করে, বহুভাবে চেষ্টা করলাম, কিন্তু না, ম্যাপের সমস্ত ফীচার কাজ করছে, স্রেফ নেভিগেশন কাজ করছে না। এমনি রুট দেখিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু নেভিগেট করতে গেলেই লিখছে, দিস ফীচার ইস নট অ্যাভেইলেবল ইন ইওর কান্ট্রি।

কেসটা কী? দু মিনিট দাঁড়িয়ে গুগল করলাম – হুঁ, যা ভেবেছি, তাইই। ভুটান দেশে মোবাইলে জিপিএসে নেভিগেশন নিষিদ্ধ। তা হলে চিনে পৌঁছব কী করে? … কিছুই করার নেই, এমনি রুট খুলে রাখো, দেখতে দেখতে যাও। সমস্যা হচ্ছে, এইভাবে তো যাওয়া যায় না, নেভিগেশন চালু না হলে স্মার্টফোন একটু বাদে বাদেই বন্ধ হয়ে যায়। তো, সেইভাবেই এগোলাম।

তিন চার কিলোমিটারের মাথায় চেকপোস্ট। পারমিটের কপি দেখানো হল, একটা স্ট্যাম্প পড়ল আবার, এবং আবার চলার শুরু।

উচ্চতা ক্রমে ক্রমে বাড়ছে, আর, রোদের তেজ কমে আসছে, মেঘেরা আবার ভিড় করে আসছে রাস্তার ওপরে। একটা জায়গায় দেখলাম রাস্তার পাশে খানিকটা জমি, সেখানে বেশ কয়েকজন বাইকার দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে রেন গীয়ার পরছে। বৃষ্টি পড়ছে না যদিও, তবে মেঘ এখানে বেশ ঘন, ভেতর দিয়ে যাবার সময়ে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আমিও দাঁড়ালাম একটু দূরত্ব রেখে। আমার রেন গীয়ার পরে নিলাম। ছেলেগুলোর সাথে আলাপ হল – কেরালা থেকে এসেছে। থিম্পু যাচ্ছে।

DSC_0292.jpgDSC_0293a.jpg

ওরা বেরিয়ে গেলে আবার একলা চলা। রাস্তা মোটামুটি ভালোই।

ভুটান, আয়তনে পশ্চিমবঙ্গের অর্ধেকেরও কম। পাহাড়ের ওপর এই ভূখণ্ডের নাম একদা ছিল ভোদন্ত, সরল বাংলায় এর মানে হল তিব্বতের অন্ত। তিব্বতের শেষে এই দেশ। সম্ভবত সেই ভোদন্ত থেকেই দেশটার নাম ভুটান। তবে ভুটানিজদের কাছে তাদের দেশের আরেকটা নাম আছে – ড্রুক য়ুল – ল্যান্ড অফ থান্ডার ড্র্যাগন। মোটামুটি ৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভব, যাঁর তিব্বতী ভাষায় নাম হল গুরু রিনপোচে, তিনি তিব্বত থেকে – রূপকথা অনুযায়ী এক উড়ন্ত বাঘের পিঠে চড়ে এসে পৌঁছন এই দেশে। সেই সময় থেকে এই এলাকার ইতিহাস শুরু। তার আগের খবর জানা যায় না বিশেষ।

আজকের ভুটান অত্যন্ত সুন্দর, শান্ত , ছিমছাম একটা দেশ। তবে প্রায় সমস্ত কিছুতেই তারা ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ভুটানের রাস্তায় ভুটানিজ মিলিটারির পাশাপাশি ইন্ডিয়ান আর্মির গাড়ি আকছারই দেখা যায়। ভুটানের রাস্তাঘাট সমস্তই ব্রো-এর বানানো। ভুটানের সমস্ত পেট্রল পাম্পও হয় ইন্ডিয়ান অয়েল, নয় হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম।

ভুটানের কারেন্সির নাম গুলট্রাম – Ngultrum। শর্টে Nu লেখা হয়। এর মূল্য ভারতীয় টাকার বরাবর। পুরো ভুটানেই ভারতের টাকা অ্যাট পার চলে ভুটানের টাকার সঙ্গে। আগে আমাদের ছাত্রজীবনে জলপাইগুড়ি পেরিয়ে শিলিগুড়িতেও ভুটানের নোট চলত, এখন ভুটানের নোটের সার্কুলেশন ভারতে জয়গাঁওয়ের বাইরে আর কোথাও নেই। ভুটানিজরা ভারতীয় মুদ্রা বেশি প্রেফার করে, কারণ যে কোনও রকমের মেডিকেল এমার্জেন্সিতে তাদের গন্তব্য ভারত – হয় নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ, নয় কলকাতা। ফলে ভারতীয় মুদ্রার একটা চাহিদা সবসময়েই থাকে।

ভুটানের গাড়ির নাম্বারপ্লেট দু রকমের হয়। সাধারণ মানুষের গাড়ির নাম্বারপ্লেট লাল রঙের হয়, আর আরবিপি, বা রয়্যাল ভুটান পুলিশ – তাদের গাড়ির প্লেট হয় নীল রঙের। সরকারি গাড়ির নম্বর হয় লালের ওপর হলুদ রঙে, প্রাইভেট গাড়ির নম্বর লালের ওপর সাদা রঙে লেখা হয়। কমার্শিয়াল অবশ্য আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, হলুদের ওপর কালো।

চুখা পেরোলাম একটা সময়ে, এইবারে আবার খিদে পাচ্ছে, ঠাণ্ডাও পড়েছে ভালোই, আর খালিপেটে ঠাণ্ডা বেশি লাগে – একটু কিছু খেয়ে নিতে পারলে ভালো হয়।

প্রায় সাড়ে তিনটের সময়ে পৌঁছলাম চাপছা নামে একটা জায়গায়। ছোট্ট বসতি, পর পর অনেকগুলো খাবারের দোকান। একটা দোকানে ঢুকে খানিক নুডলস আর কফি খেলাম, কফিটা ঠিক জুতের লাগল না যদিও। কেমন যেন ফ্লেভার্ড ক্রিম দিয়ে বানানো কফি, আর ফ্লেভারটা কেমন স্ট্রবেরি টাইপের। কফি খাচ্ছি বলে মনেই হল না।

চারটের সময়ে উঠে আবার চলা।

সন্ধে নামল একটা জায়গায়, সেখানে আরেকটা চেকপোস্ট, আরেকবার সব পারমিট দেখাতে হল। কেরালার দলটার সাথে আবার দেখা হয়ে গেল। পারমিটে স্ট্যাম্প লাগাবার পরে এইবারে পারোর ফার্মস্টে-তে ফোন করলাম। সম্ভবত ফার্ম সংলগ্ন হোমস্টে। ভদ্রলোককে আজ দুপুরেই জানিয়ে রেখেছিলাম ফুন্টশোলিং থেকে শুরু করার সময়ে। এইবারে ভালো করে ডিরেকশন জেনে নিলাম আরেকবার। খুব সহজ বলে মনে হল না চিনে বের করা। যাই হোক, এটা বুঝলাম, পারোতে ঢুকলে আকটা বড়সড় মার্কেট পড়বে। সেই মার্কেট পেরিয়ে আরও পাঁচ কিলোমিটার গেলে তবে তার হোমস্টে-র রাস্তা পড়বে, সেখানেও প্রায় দু কিলোমিটার মত কাঁচা রাস্তা নাকি।

প্রায় পৌনে সাতটার সময়ে একটা ব্রিজের কাছে এসে পৌঁছলাম, সামনে একটা জমকালো গেট। ব্রিজটা বাঁ হাতে, শুরুতেই একটা বড় করে বোর্ড লাগানো তাতে লেখা বিভিন্ন রাস্তার ডিরেকশন, ব্রিজে না উঠে এই সামনের গেট দিয়ে ঢুকলেই সোজা থিম্পু, ব্রিজ পেরিয়ে ডানদিকে গেলে পঁচিশ কিলোমিটার দূরে পারো, আর ব্রিজ পেরিয়ে বাঁ দিকে গেলে হা ভ্যালি। রাস্তা এখান থেকে বেশ চওড়া হয়ে গেছে, ঘুটঘুটে অন্ধকারেও তাই চালাতে আর কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। একটা সময়ে এসে পৌঁছলাম পারো এয়ারপোর্ট, রানওয়ের ঠিক পাশ দিয়েই সরু রাস্তা গেছে – এটাই ভুটানের মূল এয়ারপোর্ট। বাই এয়ার থিম্পু আসতে গেলেও এই পারোতেই নামতে হয়।

যেহেতু নেভিগেশন কাজ করছে না, তাই পারো শহরে ঢোকার পরে একটু সময় নষ্ট হল সঠিক রাস্তাটা বাছতে, শেষে এক পুলিশকে জিজ্ঞেস করে আবার এগোলাম, আর এগোতেই সামনে পেলাম পারো মার্কেট। ছবির মত সুন্দর ভুটানিজ স্থাপত্যে বানানো কাঠের বাড়ি পরপর সারবাঁধা। রাতের আলোতে আরও মোহময় লাগছিল। মার্কেট পেরোতেই আবার ফোন এল হোমস্টে-র ভদ্রলোকের। বললাম, মার্কেট এলাকা জাস্ট পেরিয়েছি, উনি আবার ডিরেকশন দিলেন, আমি বললাম, আমি সাড়ে আটটার মধ্যে তো পৌঁছচ্ছিই।

DSC_0297.jpg20171031_194141.jpg

নেভিগেশন কাজ না করলেও অফলাইন সেভ করা ছিল লোকেশন, দেখতে পাচ্ছি আর ছ কিলোমিটার দূরে আমার হোমস্টে। বেশ খানিকটা এগোবার পরে দেখলাম ম্যাপ আমাকে বলছে এইখান থেকে বাঁদিকের রাস্তা নিতে। মানে, বাঁদিকে একটা কাঁচা রাস্তাই বটে। এইবারে শুরু হল চাপ, ম্যাপ যেমন যেমন বলছে, আমি তেমন তেমন এগোচ্ছি, ভেতরে কাঁচা রাস্তার অনেক ব্র্যাঞ্চিং হয়েছে, ওদিকে নেভিগেশন চলছে না বলে ফোনও একটু বাদে বাদেই অফ হয়ে যাচ্ছে, আবার গ্লাভস খুলে ফোন অন করতে হচ্ছে, এদিকে ঠাণ্ডাও চূড়ান্ত। … এই করতে করতে শেষমেশ যেখানে ম্যাপ বলল, এই সেই হোমস্টে – আমি দেখলাম এদিকে একটা খাটাল, আর ওদিকে জঙ্গল, সামনে ঘুটঘুট্টে অন্ধকার, কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছে না। ফার্মস্টের ফ-ও নেই কোথাও।

শরীর আর দিচ্ছে না। আজ সারাদিনে আর পেনকিলার খাওয়া হয় নি, পেটের ব্যথা ফিরে আসছে আবার। রীতিমত জানান দিচ্ছে। ভাগ্যি ভালো, ফোনে এখনও নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফোন করলাম ভদ্রলোককে আবার। উনি কিছুই বুঝতে পারলেন না, আমিও বোঝাতে পারলাম না আমি কোথায় আছি।

সভ্যতার এক সাঙ্ঘাতিক আশীর্বাদ হোয়াটসঅ্যাপ। আমি লোকেশন শেয়ার করলাম, উনিও ওনার ফার্মস্টে-র লোকেশন শেয়ার করলেন, দুটো লোকেশনের মধ্যে তুলনা করে বুঝলাম আমি একটু বেশি এগিয়ে এসেছি, দু কিলোমিটার ফিরতে হবে উল্টোদিকে। বললাম, দাঁড়ান, আমি আসছি আস্তে আস্তে।

সড়ে আটটাও বেজে গেছে। ফিরলাম, কিন্তু – যেখানে এইবারে লোকেশন দেখাচ্ছে, সেটা প্রায় রাস্তার ওপরে – এবং, সেখানে লেখা তেনজিং ড্রুক প্রাইমারি স্কুল। ফার্মস্টে কোথায়? ভালো করে ম্যাপ দেখছি, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আরেকবার ফোনই করে নেব তা হলে? বলব, এখানে এসে আমাকে তুলে নিয়ে যেতে?

স্কুলের সামনেই দাঁড়িয়ে গল্প করছিল দুটি কিশোরী মেয়ে। আমাকে খানিকক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটি মেয়ে, অপরূপ সুন্দরী, এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, এক্সকিউজ মি, আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? …

… আমি থাকি দিল্লিতে। সেখানে এই ধরণের অ্যাপ্রোচ দেখতে পাওয়া অভাবনীয়। একটি অচেনা লোক, মোটরসাইকেলে করে একটা নির্জন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাকে সাহায্য করতে যেচে এগিয়ে আসছে এক কিশোরী মেয়ে – এই খুব স্বাভাবিক, খুবই নির্লিপ্ত মানবিকতা দেখার অভ্যেস আমার নেই। মেয়েটিকে দিয়ে প্রথম ভুটান দর্শন হল আমার। পরিচয় পেলাম ভুটানিজদের অতিথিবৎসলতার। সে আমার হাত থেকে ফোন নিয়ে ফার্মস্টে-র লোকটির সাথে কথা বলে আমাকে ফোনটা ফেরত দিয়ে বলল, ফলো মি, আমি নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে। সঙ্গিনীটিকে ভুটানিজ ভাষায় কিছু একটা বলল, বোধ করি বলল – একটু দাঁড়া, আমি এনাকে এগিয়ে দিয়েই আসছি।

এর পরে শুরু করল দৌড়, মেয়েটি দৌড়চ্ছে রাস্তার ধার ধরে, আমি পেছন পেছন মোটরসাইকেল নিয়ে তাকে ফলো করে যাচ্ছি। স্কুলের পাশে মাঠ, কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা, পেছন দিকে কিছু বাড়িঘর থেকে একটা দুটো আলোর রেখা এসে পৌঁছচ্ছে।

প্রায় এক কিলোমিটার দৌড়বার পরে, কাঁটাতারের শেষপ্রান্তে এসে, একটুও না হাঁফিয়ে মেয়েটি এসে আমার মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়াল – ক্যান ইউ সী দ্যাট লাইট আপ দেয়ার? দ্যাট ইজ দা ফার্মস্টে ইউ ওয়্যার লুকিং ফর। জাস্ট গো দিস ওয়ে, অ্যান্ড টার্ন লেফট।

ধন্যবাদ দেবার ভাষা হারিয়ে যায় কোনও কোনও সময়ে। আমার মুখ নাক সব ঢাকা, শুধু চোখদুটো খোলা আছে হেলমেটের ভেতর থেকে। মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, থ্যাংকিউ, থ্যাংকিউ।

মিষ্টি একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে কিশোরীটি বলল, ইউ আর ওয়েলকাম, অ্যান্ড, ওয়েলকাম টু পারো। বলেই পেছন দিকের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল – তার সঙ্গিনী অপেক্ষা করছে স্কুলের কাছে।

আমি ফার্মস্টে-তে ঢুকলাম। রাত নটা বাজে। একটি ছেলে নেমে এল, আমাকে লাগেজ খুলতে সাহায্য করছিল – চটজলদি আলাপ সেরে জানলাম, আমাকে ফোনে সে-ই ডিরেকশন দিচ্ছিল। দিল্লি থেকে ভুটান এসেছি শুনে সে যারপরনাই চমৎকৃত। জিজ্ঞেস করল, রাতের খাবার খাবেন তো?

অবশ্যই খাবো। অবশ্যই।

লাগেজ ওপরে আমার ঘরে তুলে জিজ্ঞেস করলাম, আমার তো একদিন পেরিয়ে প্রায় দুদিন নষ্ট হয়েছে, হাতে স্রেফ কালকের দিনটা রয়েছে, কী করা উচিত, চেলে লা পাস ঘুরে এসে থিম্পু বেড়িয়ে আসব? নাকি টাইগার্স নেস্ট যাব?

ছেলেটা একগাল হেসে বলল, আপনি তো গুরুদোংমার ঘুরে এসেছেন, আর চেলে লা গিয়ে কী করবেন, ছোট্ট এইটুকুনি একটা পাস। বরং টাইগার্স নেস্ট করে আসুন, এখান থেকে চার কিলোমিটার। ঐটা না করলে আপনার পারো বেড়ানো কমপ্লিট হবে না। বিকেলে এসে পারো শহরটা ঘুরে নেবেন বরং।

তুলতুলে নরম বিছানা। শুয়ে পড়তেই চোখ জুড়িয়ে এল – কিন্তু আগে ব্যাকলগ ক্লিয়ার করে নিই – হোয়াটসঅ্যাপের আনরেড মেসেজে চোখ রাখতে দেখি, অনুপের মেসেজ, অ্যাম ইন পারো, গোইং টু টাইগার্স নেস্ট টুমরো, হাউ ইজ ইওর ট্রিপ গোইং?

পৃথিবী সত্যিই গোল। গুরুদোংমারে সঙ্গ দেওয়া সেই অনুপের সাথে আবার দেখা হবে কাল, টাইগার্স নেস্টে।

anup_wa

ভরা পেটে, এক শরীর ক্লান্তি নিয়ে ভরপুর ঘুম।

Advertisements

3 thoughts on “দুই দেশ, ছয় রাজ্য, দুই চাকা, পাঁচ হাজার একশো কিলোমিটার ও এক পাগলঃ পর্ব ১৩

  1. আপনি যদি দ্বিতীয় দিনে আলাদা করে আপনার পারমিট-এর চক্করে না গিয়ে আগের দিনের e-visa আর ওই দালাল-এর করিয়ে দেওয়া ভেহিকল পারমিট নিয়ে পারো যাওয়া শুরু করতেন, তাহলে কি সেটা সম্ভব হত?

    Like

    1. দিব্যি হত। কিন্তু কিছুতেই আগে থেকে বুঝতে পারি নি যে ও অত সহজে ভেহিকল পারমিট করিয়ে দিতে পারবে। কিছুক্ষণ আগেই আমি নিজে দেখেছি ভেহিকল পারমিট দিচ্ছিল না। এর নিশ্চয়ই জানাশোনা আছে, করিয়ে দেয়। একশো টাকাতেই কাজ মিটে যেত। কিন্তু যতক্ষণে জেনেছি, ততক্ষণে ই-ভিসা ক্যানসেল হয়ে গেছে। আমারই বোকামি।

      Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s