ইতিহাসের দলিলে লেখা আরএসএসের দেশপ্রেমের সাক্ষ্য

বেড়ানোর গল্প শেষ হবার পরে পরে এবার একটু বিষয় বদলাই। অনেক দিন আগে থেকেই লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সময়াভাব, এবং বেড়ানোর গল্পের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যাবে বলে এই লেখায় এতদিন হাত দিতে চাই নি।

দেশে এখন ভারতীয় জনতা পার্টির শাসন। এই মুহূর্তে দেশের উনিশটি রাজ্য বিজেপি-শাসিত, এবং আজ, পনেরোই মে, কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোনর দিন যদিও বোঝা যাচ্ছে না, শেষ মুহূর্তে কোন দল বিজয়ী ঘোষিত হবে, তবে এটাও জিতে গেলে দেশের বিশতম রাজ্য বিজেপির দখলে আসবে। সামগ্রিক ট্রেন্ড, ইভিএমের কারসাজি, বিপক্ষের ক্রেডিবিলিটির অভাব – যেভাবেই ব্যাপারগুলোকে ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, দিনের শেষে এটা সুনিশ্চিত যে দেশ জুড়ে একটা দক্ষিণপন্থী ভাবধারার ছায়া পড়ছে, এবং অন্ধকার যত কাছে আসে, ছায়ারা তত দীর্ঘতর হয়। দক্ষিণপন্থার সাথে ফ্যাসিবাদের একটা ঐতিহাসিক যোগাযোগ আছে, সেসব ইতিহাস পড়লেই বোঝা যায়, সেইজন্য দক্ষিণপন্থার বিশেষ আগ্রহ থাকে ইতিহাসের প্রতি, আরও সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে, ইতিহাস বদলে দেবার প্রতি। রাজস্থানে, গুজরাতে, মধ্যপ্রদেশে ইতিমধ্যেই সে কাজ কিছুমাত্রায় সম্পূর্ণ হয়েছে, পুরো দেশে সেভাবে ইতিহাস বদলের সুযোগ তারা পেয়ে যাবার আগেই আমার মনে হয়, আসল ইতিহাসগুলো, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো সঠিকভাবে জেনে রাখা জরুরি। কে বলতে পারে, হয় তো আমাদের সামগ্রিক জ্ঞানই একদিন রুখে দিতে পারে ফ্যাসিবাদকে।
দক্ষিণপন্থার মুখেরা এখন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। অমিত শাহ। অজয় সিং বিশট্‌। … শেষের জনকে চিনতে পারলেন না তো? এটি যোগী আদিত্যনাথের আসল নাম। নব্য হিন্দুত্ববাদের নতুন পোস্টার বয়। এঁদের মধ্যে মিল অনেক। এঁরা বিজেপি। এঁরা আরএসএসের স্বয়ংসেবক, কিংবা অন্যান্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী গ্রুপের ঠেকাদার – যে হিন্দুত্বের সঙ্গে আপনি আমি ছোটবেলায় কখনও পরিচিত হই নি। এঁদের ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে আমরা অনেক নতুন নতুন জিনিস দেখেছি, ক্লোজেট থেকে বেরিয়ে আসা হিন্দুত্ববাদীদের আসল চেহারা, মুসলিমদের ওপর অসম্ভব রাগ, ঘৃণা, মুসলিম নামধারী যে কাউকে ‘বহিরাগত’ বলে ব্র্যান্ড করে দেওয়া, দলিতদের পায়ের জুতোর সমান মনে করা, তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে তাদের মেরে ফেলা, গরুকে মা হিসেবে প্রজেক্ট করার অছিলায় মুসলিম নামধারী যে কাউকে ডেমোনাইজ করে নৃশংসসভাবে মেরে ফেলা, ধর্মের নামে ধর্ষণকে মান্যতা দেওয়া এবং দেশপ্রেমের নিত্যিনতুন সংজ্ঞা বের করা। জাতীয়তাবাদকে রিডিফাইন করা।
আমরা যখন বিজেপির ব্যাকগ্রাউন্ড জানার চেষ্টা করি, আরএসএস সম্বন্ধে খোঁজখবর নিই – টুকরোটাকরা নাম চোখে পড়ে। বীর সাভারকর, গোলওয়ালকর, হেগড়েওয়ার, নাথুরাম গডসে। এঁরা আসলে কারা? কতটা দেশপ্রেমিক ছিলেন? কেমন ছিল সংগঠন হিসেবে আরএসএস? ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কতখানি অবদান ছিল এদের?

পবন কুলকার্নি, একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, কয়েক পর্বে দ্য ওয়্যার পত্রিকায় লিখেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সম্পর্কে, সাভারকর সম্পর্কে, গোলওয়ালকর সম্পর্কে। আমাদের সবার পক্ষে আরএসএসের লিটারেচার পড়ে সঠিকভাবে তাদের আদর্শ এবং তার অন্ধকার দিকগুলো বুঝে ওঠা সম্ভব নয়, পবন সেই কাজটি করে আমাদের জন্য বোঝা সহজ করে দিয়েছেন।
পবনের অনুমতি-সাপেক্ষে, আমি মূল লেখাটি থেকে বাংলা অনুবাদ আমার ব্লগে তুলে দিচ্ছি, পর্বে পর্বে। এটা প্রথম পর্ব।

rss-2-1024x680
বিভিন্ন আকার এবং প্রকারের স্বয়ংসেবক, ইউনিফর্ম আর আদর্শের টানে একত্রিত। ছবিঃ সোম বসু।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরো সময়কাল ধরেই আরএসএসের ইতিহাস ছিল মূলত ব্রিটিশের পা চাটার, কারণ এর নেতৃত্বস্থানীয় লোকেদের কোনও রকম জনআন্দোলনে যুক্ত হবার অনুমতি ছিল না।

rss-reuters
ছবিঃ রয়টার

রামজস কলেজে গত বছরে ঘটা এবিভিপির আক্রমণই ধরুন, বা, দু বছর আগে দু হাজার ষোলর সেই জেএনইউ কাণ্ডের কথাই ধরুন, কিংবা মোদী জমানাতে ঘটে চলা একাধিক “দেশদ্রোহী” সাংবাদিক বা শিল্পীদের ওপর আক্রমণের কথাই ধরুন, প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক – বেশির ভাগ মিডিয়া হাউসই অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এইসব অশান্তির খবর “বাক্‌স্বাধীনতা বনাম জাতীয়তাবাদ” নামক একরকমের ফাঁপা সাদাকালোর বাইনারিতে রাঙিয়ে প্রচার করে এসেছে।

সঙ্ঘ পরিবার সর্বদাই নিজেদের যে মোড়কে প্রচার করে থাকে – সেই স্ব-আরোপিত ‘জাতীয়তাবাদী’ বা ন্যাশনালিস্ট তকমার যে বিরোধহীন, সমালোচনাহীন গ্রহণযোগ্যতা অনেক বরিষ্ঠ সাংবাদিকের কাজে ও কথায় দেখা যায়, তার মাধ্যমে কেবলমাত্র ইতিহাসের ওপর তাঁদের অসম্পূর্ণ জ্ঞানই প্রকাশ পায়। হিন্দুত্ব সংগঠনগুলো এই মোড়কটিকে খুব মূল্যবান সম্পত্তির মত ধারণ করে থাকে, কারণ তারা মনে করে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে লাগাতার বিশ্বাসঘাতকতা চালিয়ে যাবার যে লজ্জাজনক ইতিহাস তাদের কাঁধে চেপে বসে আছে, সেই ইতিহাস এই জাতীয়তাবাদের রঙীন মোড়ক দিয়ে তারা খুব সহজেই ঢেকে দিতে পারবে। এই স্ব-আরোপিত মোড়কটি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) নিজেদের নতুনভাবে রিপ্রেজেন্ট করার কাজে ব্যবহার করে, ভান করে যেন তারা অতি-উগ্র এক দেশপ্রেমিকের দল, দেশের স্বার্থ যাদের কাছে বাকি সমস্ত স্বার্থের উর্ধ্বে।

জাতীয়তাবাদ আর জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্কটি ভারতে অজ্ঞাত। ভারতের আমজনতা যখন ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল থেকে নিজেদের মুক্ত করার জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছে, তখন এইসব স্বনিয়োজিত ন্যাশনালিস্টদের সেইসব আন্দোলনে কী ভূমিকা ছিল, তা একবার ফিরে দেখলেই বোঝা যায় এদের ন্যাশনালিজমের দম কতটা।

ডান্ডি মার্চে আরএসএস
১৮ই মার্চ ১৯৯৯। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী একগুচ্ছ দর্শকের সামনে, যাঁদের অধিকাংশই সঙ্ঘের সদস্য ছিলেন, আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা কে বি হেগড়েওয়ারের ছবি দেওয়া একটি ডাকটিকিটের উদ্বোধন করেন, উদ্বোধনী ভাষণে তিনি হেগড়েওয়ারকে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে বর্ণনা করেন। শামসুল ইসলাম লিখেছেন, “এটি ছিল স্বাধীনতাপূর্ব ভারতে আরএসএসের রাজনৈতিক ভূমিকাকে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রামের ভিত্তিভূমি হিসেবে দেখানোর প্রচেষ্টা, যদিও আসলে আরএসএস কোনওদিনই সাম্রাজ্যবাদী বা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কোনও রকমের সংগ্রামে যায় নি। বরং, ১৯২৫ সালে এর প্রতিষ্ঠার দিন থেকে আরএসএস কেবলমাত্র চেষ্টা করেছে ভারতীয় জনগণের ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইকে ক্রমাগত বিপথগামী করবার।”

420px-dr-_hedgevar-wiki
কে বি হেগড়েওয়ারঃ আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা। ছবিঃ উইকিমিডিয়া কমন্‌স

হেগড়েওয়ার, তথাকথিত স্বাধীনতা সংগ্রামী, আরএসএস গঠনের আগে ছিলেন কংগ্রেসের সদস্য, এবং খিলাফত আন্দোলনে (১৯১৯-১৯২৪) যোগ দেওয়ার অপরাধে তাঁর এক বছরের কারাদণ্ড হয় – সেটাই ছিল তাঁর শেষ স্বাধীনতা সম্পর্কিত কোনও আন্দোলনে যোগদান। সাভারকরের হিন্দুত্বের আদর্শে অনুপ্রাণিত হেগড়েওয়ার এর পর, মুক্তি পাবার পরেই, ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আরএসএসের প্রতিষ্ঠা করেন, এবং এই সংগঠন সেই দিন থেকে শুরু করে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শেষদিন পর্যন্ত ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থেকেছে, শুধু তাইই নয়, ভারতের প্রত্যেকটি স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি অধ্যায়ের সরাসরি বিরোধিতা করে এসেছে।

আরএসএসের প্রকাশিত হেগড়েওয়ারের জীবনী পড়ে জানা যায়, ১৯৩০ সালে গান্ধীজি যখন লবণ সত্যাগ্রহ শুরু করলেন, তিনি “সর্বত্র এই নির্দেশ পাঠালেন যেন সঙ্ঘের কোনও সদস্য এই সত্যাগ্রহে অংশ না নেয়। যদিও কেউ স্বেচ্ছায় অংশ নিতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া হবে না। এর মানে এইই দাঁড়ায় যে সঙ্ঘের কোনও দায়িত্বশীল সদস্য সত্যাগ্রহে অংশ নেবার অধিকারী ছিল না। যদিও এই আন্দোলনে অংশ নেবার জন্য সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের মধ্যে উৎসাহের এতটুকুও কমতি ছিল না। কিন্তু হেগড়েওয়ার এই উৎসাহকে সরাসরি নিরস্ত করেছিলেন। হেগড়েওয়ারের উত্তরসূরী এম এস গোলওয়ালকর এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন যা আমাদের আরএসএসের নেতৃত্বের ভূমিকা বুঝতে সাহায্য করে।

“আন্দোলন চলছিল ১৯৩০-৩১ সাল ধরে। সেই সময়ে অন্য অনেক লোক ডক্টরজির (হেগড়েওয়ার) কাছে গেছিল। তারা ডক্টরজির কাছে অনুরোধ করে বলেছিল, এই আন্দোলন দেশের স্বাধীনতা আনতে সাহায্য করবে এবং এতে অংশ নিতে সঙ্ঘের এতটুকুও দ্বিধা করা উচিত নয়। সেই সময়ে, তাদের মধ্যে জনৈক ভদ্রলোক যখন বলেন, দেশের জন্য তিনি জেলে যেতেও প্রস্তুত, ডক্টরজি তাঁকে বলে, ‘নিশ্চয়ই যাবেন। কিন্তু তারপরে আপনার পরিবারের দেখাশোনা কে করবে?’

ভদ্রলোকটি উত্তর দিয়েছিলেন, আমার যা সম্পত্তি আছে তাতে আমার পরিবারের দুই বছর পর্যন্ত ভরণপোষণ চলে যাবে – শুধু তাইই নয়, তার থেকে আমার মুক্তির জন্য যা খরচ হতে পারে, তারও জোগাড় হয়ে যাবে।

তখন ডক্টরজি তাঁকে বলেন, ‘আপনার যদি এতটাই সম্পত্তি থেকে থাকে, তা হলে চলে আসুন, জেলে যাবার বদলে সঙ্ঘের জন্য দুই বছর সময় দিন।’ এই বাক্যালাপের পরে অবশ্য সেই ভদ্রলোক জেলেও যান নি, আর কখনও সঙ্ঘের সেবা করার জন্যও ফিরে আসেন নি।”

যদিও হেগড়েওয়ার নিজে এই আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন এবং জেলেও গেছিলেন। তবে এইবারে ঠিক স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে নয়। আরএসএস থেকে প্রকাশিত তাঁর জীবনী থেকে জানা যায়, তাঁর জেলে ঢোকার মূল উদ্দেশ্য ছিল “সেখানকার স্বাধীনতাপ্রেমী, আত্মদানকারী কয়েদিদের দলের সাথে মিশে তাদের সঙ্গে সঙ্ঘের উদ্দেশ্য আর কার্যাবলী নিয়ে আলোচনা করা এবং সঙ্ঘের কাজের জন্য তাদের ভবিষ্যতের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা”।

rss_meeting_1939-wiki
১৯৩৯ সালে আরএসএসের এক সভায়। ছবি – উইকিমিডিয়া কমন্‌স

হিন্দু এবং মুসলমান, দুই তরফেরই নিজেদের নিজেদের বিভেদমূলক কার্যকলাপের জন্য কংগ্রেসের সদস্যদের ব্যবহার করা দেখে সতর্ক হয়ে, অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি ১৯৩৪ সালে একটি রেজোলিউশন পাস করে, যার মাধ্যমে কংগ্রেস সদস্যদের আরএসএস, হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লিগে যোগদান করা নিষিদ্ধ করা হয়।

চল্লিশের দশকের শেষদিকে, ১৯৪০ সালের ডিসেম্বর মাসে, যখন গান্ধী ভারত ছাড় আন্দোলনের উদ্দেশ্যে সত্যাগ্রহ শুরু করেছেন, সেই সময়ে বৃটিশ সরকারের গৃহমন্ত্রালয়ের লেখা একটি নোট থেকে জানা যায় যে আরএসএসের নেতারা গৃহমন্ত্রকের সচিবের সাথে দেখা করেন এবং “সঙ্ঘের সদস্যরা আরও বেশিমাত্রায় সিভিক গার্ড হিসেবে যোগদান করবে – এই মর্মে সচিবকে আশ্বস্ত করেন”। এই সিভিক গার্ড নামক পদটি তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ সরকারের “আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা”র প্রয়োজন মেটাতে।

আরএসএস এবং ভারত ছাড় আন্দোলনে তাদের বিরোধিতা
ভারত ছাড় আন্দোলন শুরু হবার দেড় বছর পর, ব্রিটিশ রাজের অধীনস্থ বম্বে সরকার প্রভূত সন্তুষ্টির সাথে একটি মেমোতে লেখেন, যে “সঙ্ঘ যথাযথভাবে নিজেদের আইনের সীমানায় সংযত রেখেছে, এবং ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া দেশজোড়া অশান্তির সাথে কোনওভাবেই নিজেদের জড়ায় নি।”

যাই হোক, ডান্ডি মার্চের সময়ের মতই, আরএসএসের স্বয়ংসেবকেরা এবারেও তাদের নেতৃত্বের ওপর চূড়ান্ত হতাশ হয়ে পড়েছিল, কারণ তাঁরাই তাদের আন্দোলনে যোগদান করতে দেন নি। গোলওয়ালকরের নিজের ভাষায়, “১৯৪২-এও অনেকের মনেই জোরদার সেন্টিমেন্ট কাজ করছিল … যে সঙ্ঘ কেবল অকর্মণ্য লোকেদের আখড়া, অর্থহীন বাগাড়ম্বর করে কেবল; শুধু বাইরের লোক নয়, সঙ্ঘের স্বেচ্ছাসেবকেরাও এইভাবে সঙ্ঘের সমালোচনা করত। তারা প্রচণ্ডভাবে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল।”

কিন্তু আরএসএসের নেতৃত্বের কাছে এই আন্দোলনে যোগদান না করার সপক্ষে এক অদ্ভূত যুক্তি ছিল। ১৯৪২এর জুন মাসে দেওয়া এক বক্তৃতায়, যার কয়েক মাস পরেই ব্রিটিশদের তৈরি করা এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় তিরিশ লক্ষ বাঙালি মারা যায়, গোলওয়ালকর বলেন যে “সঙ্ঘ আজকের সমাজের এই অবক্ষয়ের জন্য অন্য কাউকে দোষ দিতে চায় না। মানুষ যখন অন্যকে দোষ দিতে শুরু করে, তখন বোঝা যায় দুর্বলতা তার নিজের মধ্যেই আছে। দুর্বলের ওপর হওয়া অত্যাচার অনাচারের জন্য সবলকে দোষ দেওয়া বৃথা … সঙ্ঘ তার মূল্যবান সময় অন্যকে দোষারোপ করে বা সমালোচনা করে নষ্ট করতে ইচ্ছুক নয়। আমরা যখন জানিই যে প্রকৃতির নিয়মেই বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে, তখন তার জন্য বড় মাছকে দোষ দেওয়া বৃথা। প্রকৃতির বেঁধে দেওয়া নিয়ম, ভালো হোক বা খারাপ, তাইই পরম সত্য। তাকে “অন্যায়” বললেই সেই নিয়ম বদলে যায় না।”

golwalker
এম এস গোলওয়ালকর। ছবিঃ ইউটিউব

এমনকি, ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসেও, যখন এক বছর আগের নৌবিদ্রোহের জের হিসেবে ব্রিটিশ পাকাপাকিভাবে ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, গোলওয়ালকর তখনও সেইসব সঙ্ঘের সদস্যদের তীব্র সমালোচনায় ব্যস্ত ছিলেন যারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিতে চেয়েছিল। আরএসএসের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেনঃ

 “একবার এক সম্মানীয় ভদ্রলোক আমাদের শাখায় (সকালবেলার শরীরচর্চা) এসেছিলেন। তিনি আরএসএসের স্বয়ংসেবকদের জন্য একটি বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। শাখার স্বয়ংসেবকদের সাথে কথা বলার সুযোগ এলে পরে, তিনি খুব আবেগতাড়িত গলায় বললেন, ‘এখন কেবল একটাই কাজ করার সময়। ব্রিটিশের টুঁটি চেপে ধরো, এলোপাথাড়ি পেটাও আর দূর করে দাও তাদের এ দেশ থেকে। তার পরে যা হবে দেখা যাবে’। এটুকু বলেই তিনি থেমে গিয়ে বসে পড়লেন। এই আদর্শের পেছনে ছিল রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে রাগ আর গ্লানি, এবং ঘৃণাভিত্তিক প্রতিক্রিয়ার চাপানউতোর। আজকের রাজনৈতিক অনুভূতির সবচেয়ে বড় দোষ হল, এর ভিত্তি বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার মিশ্রণে তৈরি – দুঃখ, রাগ, এবং বিজয়ীর ভুলতে বসা বন্ধুত্বের একবগগা বিরোধিতা।”

স্বাধীনতা-উত্তর অ্যান্টি-ন্যাশনালিজম
ভারতের স্বাধীনতা লাভের দিন, ১৯৪৭ সালের পনেরোই আগস্ট, আরএসএসের মুখপত্র দ্য অর্গানাইজারে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে সঙ্ঘ সরাসরি ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকার বিরোধিতা করে, এবং লেখে যে “এটা কোনওদিন হিন্দুদের নিজেদের পতাকা হবে না, হিন্দুরা একে সম্মানও করবে না”। সম্পাদকীয়তে আরও লেখা হয়, “তিন সংখ্যাটা এমনিতেই অশুভ, অতএব তিনটে রঙওলা একটা পতাকা দেশের জাতীয় পতাকা হিসেবে বিবেচিত হলে তা দেশবাসীর ওপর খুবই একটা বাজে মানসিক প্রভাব ফেলবে এবং দেশের প্রতি সেটা ক্ষতিকারকও হবে।”

স্বাধীনতা লাভের কয়েক মাস পরে, ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি, নাথুরাম গডসে – যে একই সঙ্গে হিন্দু মহাসভা আর আরএসএসের সদস্য ছিল – গান্ধীজির বুকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে তিনটে গুলি ফুঁড়ে ঢুকিয়ে দেয়। সেই সময়ে গান্ধীজির ব্যক্তিগত সচিব পেয়ারেলাল নায়ারের সংরক্ষিত লেখাপত্র উদ্ধৃত করে ইতিহাসবিদ এ জি নুরানি লিখেছেনঃ

“সেই শুক্রবারের দিন আরএসএসের সদস্যদের কিছু কিছু এলাকায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল রেডিও সেট চালু করে ‘গুড নিউজ’এর জন্য অপেক্ষা করতে।

“খবরটা ছড়িয়ে পড়ার পরে, আরএসএসের বিভিন্ন শাখায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়”, সর্দার প্যাটেলকে এক যুবকের পাঠানো একটি চিঠি থেকে এ কথা জানা যায়, ‘যে নিজের সম্বন্ধে দাবি করেছিল যে তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আরএসএসে যুক্ত করা হয় … কিন্তু পরে তার মোহভঙ্গ হওয়ায় সে বেরিয়ে আসে’”।

এর কয়েকদিন পরেই আরএসএসের নেতাদের গ্রেফতার করা হয়, এবং দেশজুড়ে এই সংস্থাটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। চৌঠা ফেব্রুয়ারি সরকারের প্রকাশিত এক ঘোষণাপত্রে জানানো হয়ঃ

“যে ঘৃণা আর হিংসার বাতাবরণ এ দেশে তৈরি করা হচ্ছে, আমাদের স্বাধীনতাকে অঙ্কুরে নষ্ট করবার জন্য, তাকে সমূলে উপড়ে ফেলার লক্ষ্যে … ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে বেআইনী ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদস্যরা বেআইনী অস্ত্রশস্ত্রের মদতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুঠপাট, ডাকাতি এবং খুনের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। এমনকি তারা প্রচারপত্র বিলি করে করে লোকজনকে আগ্নেয়াস্ত্র জোগাড় করে হিংসার পথ বেছে নিতে প্ররোচিতও করছে বলে জানা গেছে … সঙ্ঘের এই সব হিংসাত্মক কার্যকলাপের ফলে অনেকের প্রাণহানি পর্যন্ত হয়েছে। সবচেয়ে দামী যে প্রাণটিকে আমরা হারিয়েছি সব শেষে, তিনি হলেন স্বয়ং গান্ধীজি। এই পরিস্থিতিতে এই হিংসার পুনরাবৃত্তি যে কোনও মূল্যে প্রথম সুযোগেই আটকে দেওয়া এই সরকারের জাতীয় কর্তব্য, যে কর্তব্যের বশে চালিত হয়ে সরকার সঙ্ঘকে বেআইনী সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করল।”

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, যাঁকে আজকাল আরএসএস খুব নিজেদের লোক বলে দাবি করে থাকে, তিনি সেই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে গোলওয়ালকরকে একটি চিঠি লিখে আরএসএসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পেছনে কারণগুলি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, আরএসএসে দেওয়া ভাষণগুলো “সাম্প্রদায়িকতার বিষে ভর্তি … যে বিষের দাপটে গোটা দেশ আজ গান্ধীজির মত একজন মহাপ্রাণকে চিরতরে হারিয়েছে। আরএসএসের জন্য এক ফোঁটা সহানুভূতিও আজ সরকারের মনে বা কোনও সাধারণ মানুষের মনে অবশিষ্ট নেই, বরং বিরোধিতা বেড়েছে। বিরোধিতা চরমে ওঠে যখন মানুষ দেখে যে গান্ধীজির মৃত্যুর খবর পেয়ে আরএসএসের লোকেরা আনন্দে লাফাচ্ছে আর মিষ্টি বিতরণ করছে। এই অবস্থায় আরএসএসের বিরুদ্ধে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া সরকারের কাছে আর কোনও বিকল্প রাস্তা খোলা ছিল না।”

এ ছাড়াও ১৮ই জুলাই, ১৯৪৮ সালে লেখা আরেকটি চিঠিতে প্যাটেল হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে লেখেনঃ “আমাদের পাওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী এটা স্পষ্ট যে, এই দুটি সংগঠনের (আরএসএস আর হিন্দু মহাসভা) কার্যকলাপের জন্যই, বিশেষত প্রথমটির জন্য (আরএসএস) এমন একটা বাতাবরণ তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে, যার পরিণতিতে এই ঘৃণ্য নির্মম ঘটনা ঘটা সম্ভব হল।”

trial_of_persons_accused_of_participation_and_complicity_in_gandhis_assassination_in_the_special_court_in_red_fort_delhi

মহাত্মা গান্ধীর হত্যার সাথে সরাসরি এবং অন্যভাবে জড়িত থাকা অভিযুক্তদের নিয়ে মামলার শুনানি লালকেল্লায় শুরু হল ১৯৪৮ সালের সাতাশে মে তারিখে, এক বিশেষ আদালত বা স্পেশাল কোর্ট বসিয়ে। আসুন, একবার দেখে নিই অভিযুক্তদেরঃ  সামনের সারিতে বাঁদিক থেকে – নাথুরাম বিনায়ক গডসে, নারায়ণ দত্তাত্রেয় আপটে এবং বিষ্ণু রামকৃষ্ণ কারকর; পেছনের সারিতে বাঁদিক থেকে দিগম্বর রাম চন্দ্র বাডগে, শঙ্কর (কিস্তায়ার ছেলে), বিনায়ক দামোদর সাভারকর, গোপাল বিনায়ক গডসে এবং দত্তাত্রেয় সদাশিব পারচুড়ে। (সূত্রঃ উইকিমিডিয়া কমন্‌স)

গডসে অবশ্য আদালতে দাবি করেন যে তিনি গান্ধীকে খুন করার আগেই আরএসএসের সংস্রব ত্যাগ করেন, আরএসএসও সেই দাবি করে। যদিও এই দাবির সত্যতা প্রমাণ করা সম্ভব হয় নি, কারণ আরএসএসে “কোনও ঘটনার রেকর্ড, কোনও সদস্যদের রেজিস্টার কখনও রাখা হত না”, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্যাটেলকে ডক্টর রাজেন্দ্র প্রসাদের লেখা একটি চিঠির মধ্যে দিয়ে আমরা এই তথ্য জানতে পারি। এমতাবস্থায় এটা কোনওভাবেই প্রমাণ করা যায় নি যে গডসে আরএসএসের একজন বৈধ সদস্য ছিলেন।

অবশ্য নাথুরামের ভাই গোপাল গডসে, একই মামলায় সহ-ষড়যন্ত্রী হিসেবে তিরিশ বছর জেল খাটার পরে বাইরে বেরিয়ে ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান যে নাথুরাম আদপেই কোনওদিন আরএসএস ছাড়েন নি, তিনি কোর্টে মিথ্যে কথা বলেছিলেন। “সমস্ত ভাইয়েরাই,” গোপালের বক্তব্য অনুযায়ী, “আরএসএসের সদস্য ছিল। নাথুরাম, দত্তাত্রেয়, আমি আর গোবিন্দ। বলতে পারেন, আমরা আরএসএসের মধ্যেই বেড়ে উঠেছিলাম, যতটা না আমরা বাড়ির আবহাওয়ায় বেড়ে উঠেছিলাম। আরএসএস ছিল আমাদের কাছে নিজের পরিবারের মত। নাথুরাম তার জবানিতে বলেছিল যে ও আরএসএস ছেড়ে দিয়েছে। ওকে দিয়ে এটা বলানো হয়েছিল কারণ গোলওয়ালকর এবং আরএসএস গান্ধীহত্যার পরে যথেষ্ট প্রতিকূলতার মুখে পড়েছিল। কিন্তু সত্যিটা হল, ও কোনওদিনও আরএসএসের সংস্রব ছাড়ে নি।” একই দাবি সম্প্রতি ইকোনমিক টাইমসে দেওয়া গডসে পরিবারের আরও এক সদস্যের সাক্ষাৎকারে জানা গেছে।

ফ্রন্টলাইনের ঐ একই সাক্ষাৎকারে গোপাল গডসে এমনকি লালকৃষ্ণ আদবানিকেও দোষারোপ করেন “ভিতুর ডিম” বলে – কারণ তিনি নাথুরামের পক্ষ নিতে অস্বীকার করেছিলেন। “বলতে পারেন, আরএসএস এমন কোনও প্রস্তাব পাস করে নি যাতে লেখা ছিল ‘যাও, গান্ধীকে খুন করে এসো’ – কিন্তু তাই বলে আপনি তাকে অস্বীকার করতে পারেন না।”

কিন্তু গান্ধীহত্যার সময়ে নাথুরামের আরএসএসে যুক্ত থাকার ব্যাপারে গোপাল গডসের এই স্বীকারোক্তির অনেকদিন আগেই, ১৯৪৯ সালে সরকার থেকে সঙ্ঘের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, কারণ সরকার সরাসরি, আইনত নাথুরামের সাথে আরএসএসের যোগ প্রমাণ করতে পারে নি। কেবল নিষেধাজ্ঞা তোলার আগে সর্দার প্যাটেলের তরফ থেকে সঙ্ঘকে জোরদার চাপ দিয়ে তাদের নিজস্ব একটা সংবিধান লিখিয়ে নেওয়া হয়, যাতে স্পষ্টভাবে লেখা হয়, আরএসএস “শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক কার্যকলাপে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবে” এবং রাজনীতির সঙ্গে তাদের কোনও যোগ থাকবে না।

চার মাস বাদে, ১৯৪৯ সালের ৩০শে নভেম্বর, সঙ্ঘের বানানো একটি কমিটি যখন এই সঙ্ঘের সংবিধান লেখা শেষ করে, তখন আরএসএস দ্য অর্গানাইজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে তাদের আপত্তি ব্যক্ত করেঃ

“… কিন্তু আমাদের সংবিধানে প্রাচীন ভারতে প্রণয়ন হওয়া সংবিধানের কোনও উল্লেখই করা নেই … আজ পর্যন্ত তাঁর প্রণীত সেইসব আইনাবলী “মনুস্মৃতি” নামে পরিচিত যা সারা বিশ্বের কাছে এক অমূল্য সম্মানের বস্তু, যা আমাদের স্বতস্ফূর্তভাবে অনুগত এবং একত্রিত হতে অনুপ্রেরণা জোগায়। কিন্তু আমাদের সংবিধান প্রণেতা পণ্ডিতদের কাছে এর কোনও দামই নেই।”

সম্ভবত এই একটা জায়গায় আরএসএস, সংগঠনের, বা সংগঠনের নেতাদের প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতার ব্যাপারে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, যে তাঁরা হয় তো নিজেদের প্রাচীন সংবিধান মনুস্মৃতির থেকেও নিজেদের মহান বলে মনে করতেন – যে সংবিধানে লেখা আছে, শুধুমাত্র ব্রাহ্মণের সেবা করা শূদ্রদের কাছে মহত্তম কাজ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত; এর বাইরে যে কাজই সে করুক না কেন, তাতে তার কোনও ফললাভ হয় না।” একটি প্রাচীনপন্থী দমনমূলক সময়ের প্রতিচ্ছবি – যে সময়ে “সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও শূদ্রের ধন উপার্জন করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হত, কারণ শূদ্র ধন উপার্জন করলে তা ব্রাহ্মণের পীড়ার কারণ হয়”।

আরএসএস এই সময় থেকে পরবর্তী কয়েক বছর ধরে ভারতের সংবিধানের বদলে মনুস্মৃতিকে সংবিধানের মান্যতা দেবার পক্ষে জোরদার সওয়াল চালিয়ে গেছিল, এমনকি ১৯৫০ সালে যখন সংবিধান সরকারিভাবে দেশে লাগু হয়, তখনও পর্যন্ত। ‘মনু আমাদের হৃদয়েশ্বর’ (Manu Rules Our Hearts) নামে একটি সম্পাদকীয়তে আরএসএসের তরফে কড়া সমালোচনার ভঙ্গীতে লেখা হয়ঃ

“যদিও ডক্টর আম্বেডকর সম্প্রতি বম্বেতে জানিয়েছেন যে মনুর জমানা অনেকদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু সত্যিটা হল এই যে মনুস্মৃতি এবং অন্যান্য স্মৃতিতে উল্লিখিত নিয়মাবলী আর আইনের বাঁধনেই দেশের হিন্দুদের দৈনিক জীবনচর্যা এবং প্রতিটা দিন চালিত হয়। এমনকি উদারপন্থী হিন্দুরাও স্মৃতিতে লিপিবদ্ধ কিছু নিয়ম সর্বদা মেনে চলেন, সেই স্মৃতিকে তাঁদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিলে তাঁরা ক্ষমতাচ্যূত হয়ে পড়বেন।”

 

 

এঁদের আজকাল দেশপ্রেমী বলা হয়
তো পরিশেষে, আমি জানতে চাই, এই যে সম্প্রদায়টি, যারা সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে বশ্যতা প্রকাশ করে, দেশের স্বাধীনতা আনার উদ্দেশ্যে জনতার আন্দোলনের বিরোধিতা করে; এই সম্প্রদায় যারা জাতীয় পতাকার এবং দেশের সংবিধানের যথাযথ সম্মান দেয় না, এবং যার ‘সদস্যরা আনন্দের সঙ্গে মিষ্টি বিলিয়ে বেড়িয়েছিল’ জাতির জনক হিসেবে সম্মানিত একজন মহান নায়কের হত্যার পরে – এই সম্প্রদায়টিকে এক কথায় বর্ণনা দেবার জন্য কী ধরণের শব্দ ব্যবহার করা যথাযথ হতে পারে? দেশদ্রোহী বলা যায় কি এদের? না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, যখন রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝে দাঁড়িয়ে ইতিহাস প্রায়শই ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, এদেরকে আমাদের আজ “জাতীয়তাবাদী” হিসেবে চিনতে হবে। বাকি সবাই “অ্যান্টি-ন্যাশনাল”।


মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s