অরুণাচলের দেশেঃ সপ্তম পর্ব

পর্ব ১পর্ব ২পর্ব ৩পর্ব ৪পর্ব ৫পর্ব ৬

“ও মা তুমি বাঙালি? হেহেহে … এই শুনচো, এই দ্যাখো এ-ও বাঙালি … অ্যাঁ? না না, আমরা কলকাতা থেকে নয়, আমরা এসিচি শিলিগুড়ি থেকে, ঐ যে ও, ওরা এসচে হাওড়া থেকে, আমার ননদ হয় …”

খচরমচর শব্দে ঘুম ভাঙল। লেপের তলা থেকে মুণ্ডু বের করে দেখি, সতীশ তার ব্যাগ গোছাচ্ছে। রুম হীটার এখনও বীরবিক্রমে তার দিকে তাক করে চলেই যাচ্ছে। কটা বাজে? … সাড়ে ছটা। উঠি, তৈরি হই। সতীশ এত সকাল সকাল তৈরি হয়ে নিচ্ছে কেন, ও কি আমার আগে বুমলা পাসে পৌঁছতে চায়? জিজ্ঞেস করতে বলল, না ব্রো, আয়্যাম গোয়িং ব্যাক টু দিরাং টুডে, নট ফীলিং টু গো টু বুমলা।

সেকী? কাল যে অত লড়ে এসে বললে, পাস পেয়ে গ্যাছো?

না ব্রো, কাল সেলা পাসে এত বরফ দেখেছি, আর দেখার ইচ্ছে নেই, আজও তো আবার দেখবই, আর বুমলা যাবো না। এই নাও ব্রো, ছশো টাকা, আমার ঘরভাড়ার শেয়ার, আমি বেরোই।

এত বরফ দেখেছে! হাসি চেপে, হাই তুলে বেরোলাম, বাইরে সে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে যাওয়া পর্যন্ত হাসিহাসি মুখে হাত নাড়লাম। সতীশ হারিয়ে গেল সামনের মোড়ে, আর আমি টের পেলাম – এমন কিছু অসহনীয় ঠাণ্ডা নয়, চটপট রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়া যেতেই পারে।

গীজার চলছে, তাতে জলও গরম হচ্ছে, অতএব, সুন্দর করে চান সেরে নিলাম। ফিটফাট হয়ে সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম, আজ আর লাগেজ বাঁধাছাঁদা করার কিছু নেই, সন্ধেবেলা এখানেই ফিরে আসব, জেমিথাং যাব না, জেমিথাং এবারের মত বাদ দিলাম। সামনে আরও অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে ইটিনেরারিতে, একটা জেমিথাং বাদ গেলে কিছু এসে যায় না।

তাওয়াং শহরের মধ্যে খানিক ঘুরপাক খেয়ে উত্তরদিকের রাস্তাটা ধরলাম। যাচ্ছি বটে সাঙ্গেতসর লেক দেখতে, তবে এই রাস্তায় আরও বেশ কিছু লেক পড়বে। প্রথম হল, পাংকাং টেং সো (Pangkang Teng Tso) বা পিটি সো। তাওয়াং থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরত্বে।

DSC_0176

বেশ ভালোই রাস্তা, সুন্দর। চারপাশে নীলচে পাহাড়। বিভিন্ন শেডের নীল। আট কিলোমিটার মত যাবার পরে একটা আর্মি ক্যান্টনমেন্ট মত পড়ল, রাস্তার ওপর চেকপোস্ট, সেইখানে বুমলার জন্য পাসটি দেখাতে হল। দেখানো তো নয়, হাত থেকে গ্লাভস খোলো, হেলমেট খোলো – না হলে পিঠ থেকে ব্যাগ নামবে না, তারপরে ব্যাগ থেকে পাস বের করে দেখাও, তারপর পুরো ব্যাপারটা আবার রিভার্স অর্ডারে। বেশ খানিকটা সময় লাগে, ততক্ষণে আর্মি জওয়ানটির সাথে আলাপ করে ফেললাম। হিন্দির টান দেখেই বুঝেছি, হরিয়ানভি। হিসারে বাড়ি।

আবার এগনো গেল, সাত কিলোমিটারের মাথায় দেখা গেল পিটি সো লেক। খুব আহামরি কিছু না, তবু নীল আকাশের ছায়ায় টলটলে নীল জল, দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে। এগিয়ে গেলাম।

DSC_0180

গলায় ঝোলানো ক্যামেরাটা বের করেছি, তার ঢাকনা এখনও ইউভি ফিল্টারের সাথে আটকে আছে – প্যাঁচ ঘুরিয়ে ঢাকনা খুলতে হয়, প্যাঁচ ঘোরাতে যাবো – হেলমেটের ব্লুটুথে ফোন বাজল।

অফিস।

অনসাইটের আর্কিটেক্ট। বলচিলাম কি, তুমি যে জাভার প্যাকেজটা বানিয়ে দিয়েচো, সেটা নতুন সার্ভারে চালাতে চাইচি, চলচে না, তুমি যেভাবে বলেচিলে, সেইভাবেই কমপাইল করিচি, কিন্তু কী সব জার ফাইল বলে এরর দিচ্চে। কী করে করব একটু বলে দাও না!

লোকটা হাতের কাছে থাকলে, সত্যি বলছি, ঐখানেই একটা পাথর তুলে ওর মাথায় ধাঁই করে বসিয়ে দিতাম, কর্পোরেট এথিক্স ফেথিক্সের তোয়াক্কা না করে। হতচ্ছাড়াটা জাভার জ বোঝে না, অন্য টেকনোলজির লোক, পুরো সল্যুশনের জাভার পার্টটা আমি সামলাই, পইপই করে আসার আগে বলে এসেছিলাম ডিসেম্বরের ছাব্বিশ তারিখের আগে ওতে হাত দিও না, আমি ফিরে এসে নতুন সার্ভারে ডিপ্লয় করে দেব, ইনস্টল করে দেব, রান করে দেব, তোমার ও নিয়ে মাথা ঘামাবারই দরকার নেই, ইনি সেই হাত লাগিয়েছেন, যেহেতু অনসাইটে আছেন, অতএব “আর্কিটেক্ট” হিসেবে নিজের কেরদানি দেখাতে গিয়ে ছড়িয়ে ছত্তিরিশ করে বসে আছেন। এখন আমি পিটি সো লেকের সামনে দাঁড়িয়ে কী করে ওকে বোঝাই কোন ফাইল কোন সার্ভারের কোন ফোল্ডারে রাখলে জাভা অ্যাপ্লিকেশন কমপাইল করা যাবে, এ কি মুখে মুখে বলে বুঝিয়ে দেবার জিনিস?

ছেলেটি গাঁট, ধানাই পানাই করার পরেও বুঝল না যে আমি ওকে অ্যাপ্লিকেশনে হাত লাগাতে বারণ করছি। বাইশে নভেম্বরের বদলে ছাব্বিশে ডিসেম্বর ও অ্যাপ্লিকেশন ইনস্টল হলে দুনিয়ায় কারুর কিছু আসবে যাবে না, ক্লায়েন্টেরও না। অতএব ওকে বললাম, ভাই, মোটরসাইকেলের ওপর বসে আছি, একটু পরেই নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাব, সন্ধেবেলায় হোটেলে ফিরে দেখব বরং, ও তুমি বলে দিলে করতে পারবে না, তুমি জাভার লোক নও, তুমি এখন ঘুমোতে যাও, তোমার রাত হয়েছে।

টানা পনেরো মিনিট বকবক করার পর অবশেষে সে ক্ষান্ত দিল। আমি খানিকক্ষণ কী রকম শূন্য দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নিষ্কৃতি কি নেই? কেন এইসব জায়গাতেও মোবাইলের নেটওয়ার্ক থাকে? কেন?

20181122_083821

মাত্রই এক ঘণ্টা হল জার্নি শুরু করেছি, কী রকম মনে হচ্ছে অবসন্ন হয়ে আসছি। ধুর, ও সব মনের ভুল, বলে আবার মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিলাম। খানিক বাদেই ভালো রাস্তা গায়েব হয়ে গেল, শুরু হল পাথুরে রাস্তা। প্রথম ছোটমেজো সাইজের, তারপরে বড় বড় পাথরের ওপর দিয়ে চলা। খানিক এগিয়ে যেতে আরেকটা মোটরসাইকেলের দেখা পেলাম, কেরালার নাম্বারপ্লেট। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে বসে। পাঁচশো সিসির বুলেট, অনায়াসে উঠে যাচ্ছে খাড়া রাস্তা বেয়ে, আমাকে দুশো সিসির পালসার নিয়ে একটু কসরৎ করতেই হচ্ছে। বেশ খানিকটা এগোবার পরে দেখলাম, একটা প্রচণ্ড খাড়া চড়াই এবং বাঁক, সেখানে মেয়েটিকে নামিয়ে ছেলেটি একা একা ওঠার চেষ্টা করল। জায়গাটাতে বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই ভর্তি, মানে যার ওপর দিয়ে মোটরসাইকেলের চাকা গড়াতে হবে। খানিকটা জায়গা এরকম, তারপরে আবার খাড়াই কমে গেছে, সেইখানে গিয়ে আবার মেয়েটি মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে বসল। আমি পেছনেই ছিলাম, এইবারে আমার পালা, এই অংশটা ক্রস করার, মোটরসাইকেল ফার্স্ট গিয়ারে নামিয়ে আনলাম, নিয়ে চলবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু একটা পাথরের সামনে এসে গাড়ি গেল বন্ধ হয়ে, সেই পাথরের ওপর চাকা উঠতে পারছে না। এই ঠাণ্ডাতেও শুধু ঝাঁকুনির চোটে আমার হার্টবীট বেড়ে গেছে, এমনিতেই অনেকটা ওপরে উঠে এসেছি, অক্সিজেন এখানে পাতলা, মোটরসাইকেলে বসে হাঁফাচ্ছি। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে আবার মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিলাম, এইবারে একটু পুশ করতেই পাথরের ওপর গড়য়ে উঠে পড়ল চাকা, গতি পেয়ে গিয়ে আরও কয়েকটা পাথর পেরিয়ে কম খাড়াই এলাকায় গিয়ে পৌঁছলাম। সামনের মোটরসাইকেলটা ততক্ষণে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। টের পেলাম, হেলমেটের ভেতর দিয়েই, বাঁ কানের পাশ দিয়ে একটা ঘামের রেখা নেমে এল মাথা থেকে কানের নিচের দিকে।

একটু পরেই একটা তিনমাথার মোড় চলে এল, ম্যাপে এই জায়গাটার নাম ওয়াই জংশন। এখান থেকে ডানদিকের রাস্তা চলে যাচ্ছে বুমলা পাসের দিকে, আর সোজা রাস্তা যাচ্ছে সাঙ্গেতসার লেক হয়ে জেমিথাংএর দিকে।

ঘড়ির দিকে তাকালাম, সওয়া নটা বাজে। ওয়াই জংশনে একটা মিলিটারি পোস্ট, সেখানে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়ে ডানদিকের রাস্তায় এগোলাম। রাস্তা বলে তো কিছুই নেই, পাথর, ধুলো এইসবের ওপর গাড়ি চলে চলে একটা রাস্তার মত ব্যাপার তৈরি হয়ে আছে। প্রচণ্ড লাফাচ্ছে আমার মোটরসাইকেল। খানিক এগোবার পরে আরও একটা চেকপোস্ট, এইখানে পাস দেখাতে হচ্ছে আবার। সামনে চলা মোটরসাইকেল এবং ছেলেমেয়েদুটির আবার দেখা পেলাম এখানে। আলাপ হল, কেরালা থেকে এসেছে, গাড়ি ট্রেনে করে নিয়ে এসেছে গৌহাটি। জিজ্ঞেস করলাম, বুমলা দেখে কোথায় যাবে, সাঙ্গেতসার? ওরা বলল, না না, আমরা এটা দেখেই তাওয়াং ফিরে যাবো।

চেকপোস্টে পাস দেখিয়ে এন্ট্রি করিয়ে আবার এগনো গেল। রাস্তা একই রকম। তবে পাথরের সংখ্যা কম, চলা যায় কোনও রকমে। ঝাঁকুনির চোটে হার্টবীট বেড়ে যাচ্ছে। এমনিতেই অক্সিজেন কম এখানে। তবে সাঙ্ঘাতিক কিছু নয়, অন্তত গুরুদোংমার বা  খারদুংলা-র যে অভিজ্ঞতা, তার তুলনায় এটা প্রায় কিছু নয়।

এ রাস্তায় লেক একটা দুটো নয়, অনেকগুলো। বুমলা যাবার পথেই অন্তত আরও কয়েকটা লেক দেখে ফেললাম। টলটলে জল, আকাশের সাথে রঙ মেলানো নীল, চোখ ধাঁধিয়ে যায় নীলের ঔজ্জ্বল্যে।

20181122_100135DSC_0187

চেকপোস্ট থেকে আট ন কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথ ধরে কখনও নিচের দিকে, কখনও ওপর দিকে চলবার পর সামনে দেখা গেল গাড়ির মেলা। বেশ অনেক টুরিস্ট এসেছে। বুমলা পাস, অবশেষে পৌঁছলাম।

DSC_0182
বুমলা পাসের শেষমাথা। গার্ড রেলিংএর ওপ্রান্ত থেকে চীন শুরু।

প্রাচীন কালে এই পথ চীনা ব্যবসায়ীদের আসাযাওয়ার পথ ছিল, উনিশশো বাষট্টির যুদ্ধে চীন এই রাস্তা দিয়েই ঢুকে পড়ে অরুণাচলের মধ্যে। দীর্ঘকাল এই পাস সাধারণের জন্য বন্ধ ছিল, ২০০৬ সালে এটা আবার খুলে দেওয়া হয়, মূলত দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য, আর টুরিস্টদের জন্য। শেষ দেড়শো মিটার খুব তরিবত করে সাজানো, প্রথমে আর্মির একটা হলঘর মত, সেখানে ফ্রি-তে চা দেওয়া হয়, সুভেনির বেচা হয়, এর পরে একটা ছোট একশো মিটারের পথ সোজা চলে গিয়ে হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে একটা গার্ড রেল ব্যারিকেডের সামনে, তাতে লেখা ওয়েলকাম টু বুমলা। ব্যস, এই রেলের ওপারেই চীন। ভারতের দিকে রাস্তার দুধারে ছোট ছোট হোর্ডিং, একেকটাতে ভারতের একেকটা রাজ্য সম্বন্ধে গুণগান, আর ইতস্তত এদিক ওদিক ইংরেজি, হিন্দি আর চীনা ভাষায় লেখা ভারত আর চীন কেবলমাত্র একে অপরের সাথে বন্ধুত্বের জন্যই বেঁচে আছে; হিন্দি চিনি ভাই ভাই; ভারত চীন মৈত্রী দীর্ঘজীবি হোক; ইত্যাদি।

ভারতের দিকে যত সেনার রমরমা, উঁকিঝুঁকি মেরে চীনের দিকে কাউকেই দেখা গেল না। ফাঁকা রাস্তা চীনের দিকে দূর পর্যন্ত চলে গেছে, দৃষ্টিসীমার মধ্যে একটি মানুষও নেই।

বরফও নেই। তাওয়াং থেকে এতটা রাস্তা এলাম, কোথাও বরফের চিহ্নমাত্র নেই।

বাংলায় কিচিরমিচির শুনে পেছন ফিরে তাকালাম – একদল মাসিমাজেঠুজেঠিমার দল বেড়াতে এসেছেন। আর গুঁতোগুঁতি করছেন কে কার ছবি তুলবে ঐ ওয়েললাম টু বুমলা লেখা ব্যারিকেডের সামনে। গুঁতোগুঁতি থামলে একজন জেঠিমাকে বিনীতভাবে অনুরোধ করলাম আমার মোবাইলটা বাড়িয়ে দিয়ে, একটা ছবি …

জেঠিমা তো একগাল হেসে “ও মা তুমি বাঙালি? হেহেহে … এই শুনচো, এই দ্যাখো এ-ও বাঙালি … অ্যাঁ? না না, আমরা কলকাতা থেকে নয়, আমরা এসিচি শিলিগুড়ি থেকে, ঐ যে ও, ওরা এসচে হাওড়া থেকে, আমার ননদ হয় … ও মা, তুমি দিল্লিতে থাকো, দিল্লি থেকে এসচো? একা একা? এই শুনচো, এই দ্যাখো, এ দিল্লি থেকে এসচে, এই ওর একটা ফটো তুলে দাও না গো …”

20181122_100645

ছবি তুলিয়ে নিয়ে, দঙ্গল থেকে পালিয়ে এলাম। বুমলা দেখা হল। আশ্চর্য ব্যাপার, মনে কোনও দাগ কাটল না। সেই একই মানসিকতা খুঁচিয়ে তুলছে, কেন এলাম? কী হল এটা দেখে? মনে আনন্দও এল না – কেন ঘুরছি এইভাবে? কেন?

ফিরে গিয়ে হেলমেট পরে গ্লাভস পরে মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিলাম, এইবারে ফিরে যেতে হবে সেই ওয়াই জংশনে, সেখান থেকে সাঙ্গেতসার লেক। না, জেমিথাং যাবো না, মন থেকে যাবার ইচ্ছে হচ্ছে না, সাঙ্গেতসার দেখে একই রাস্তা ধরে তাওয়াংই ফিরে যাবো।

খিদে পেয়েছে সাঙ্ঘাতিক, সকালে কিছু না খেয়েই বেরিয়েছি, এখন বাজে সাড়ে দশটা। হলঘরে উঁকি মেরে চা খাবার তেমন কোনও ব্যবস্থা দেখলাম না, এখানে আর কোথাও কোনও খাবার জায়গা নেই, সে হোক, আমার না খেয়ে থাকা অভ্যেস আছে, ধীরেসুস্থে ফেরার পথ ধরলাম। সেই একই পাথুরে রাস্তা ধরে একই নাম-না-জানা লেকের পাশ দিয়ে এসে আবার ফিরলাম ওয়াই জংশনের চেকপোস্টে। এবার ডানদিক যেতে হবে। ডানদিক মুড়তেই দেখতে পেলাম একটা আর্মি পরিচালিত ক্যাফেটেরিয়া। ঝটপট ঢুকে গেলাম, গরম গরম মোমো আর কফি খেয়ে শরীরে বল এল। এইবারে যেতে হবে সাঙ্গেতসার। মাত্রই বারো কিলোমিটার, কিন্তু যেতে সময় লাগবে অনেকখানি। পাথরে ভরা রাস্তা।

ঝাঁকুনি খেতে খেতে, লাফাতে লাফাতে এগোতে থাকলাম, দূরত্ব কমতে থাকল, ঘড়ির দিকে একটা চোখ রেখে যেতেই হচ্ছে, কারণ ভারতের এই অংশে চারটে বাজার পরেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। তাওয়াং সাড়ে চারটের মধ্যে পৌঁছতেই হবে, অন্ধকারে এই রাস্তায় চলার রিস্ক কোনওমতেই নেওয়া যায় না।

মোবাইল সিগন্যাল যদিও সেই পিটি সো ছাড়ার পর থেকেই নেই, তবে জিপিএস চলছে। জিপিএস যখন বলছে সাঙ্গেতসার লেক আর মাত্র দেড় কিলোমিটার, হঠাৎই রাস্তার রূপ গেল বদলে।

DSC_0188

বরফ, বরফ! স্নো-ফল হয়েছে এখানে। একটু দূরেই একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তার সামনে এক যুবক লামা দুটি মেয়ের সাথে খুব খুনসুটি করছে আর ছবি তুলছে। আমি একটু দূরত্ব রেখে মোটরসাইকেল থামালাম। দুতিনটে ছবি নিলাম। এবার প্রায় ওপর থেকেই মনে হচ্ছে যেন দেখা যাচ্ছে লেক।

DSC_0190

লেকের আশেপাশে কোথাও বরফের চিহ্নমাত্র নেই, শেষ এক কিলোমিটার একদম খাড়া উতরাই। সামনে রাজকীয় ভঙ্গীতে অজস্র পাইন গাছের কাণ্ড বুকে গেঁথে উপস্থিত সাঙ্গেতসার লেক।

DSC_0194DSC_019720181122_132728

এই লেকটা আসলে ছিল এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে, একটু ওপর দিকে। এই জায়গাটায় ছিল পাইন গাছের জঙ্গল। অনেকদিন আগে এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়, তার ফলে এদিক সেদিক থেকে কিছু পাথর সরে যায়, আর ওপর থেকে সম্পূর্ণ লেকের জল এসে আছড়ে পড়ে এই পাইন গাছের জঙ্গলে। সেই থেকে এই লেক এইখানেই অবস্থান করছে, পাইন গাছের কাণ্ডগুলো এখনও সেই পুরনো জঙ্গলের অস্তিত্ব জানান দেয়, আর আগে যেখানে লেক ছিল, সেখানে লেকের বা জলের আর কোনও অস্তিত্ব নেই।

আমরা যখন কলেজে পড়ি, তখন শাহরুক খান আর মাধুরী দীক্ষিতের একটা অখাদ্যতম সিনেমা হয়েছিল, কোয়লা। সে সিনেমা আবার বসুশ্রী হলএ গিয়ে কোন এক বন্ধুর সাথে পুরোটা দেখেওছিলাম। সেই কোয়লা সিনেমাতে একটা গানের নাচ মাধুরী এইখানে এসে নেচেছিলেন, গোটা গানের এক তৃতীয়াংশ জুড়ে বোধ হয় ছিল লেকটা, তাইতে এই লেকের দ্বিতীয় নাম হয় মাধুরী লেক বা মাধুরী ঝিল।

নব্বইয়ের দশকে অনেকদিন ধরে বোধ হয় মাধুরী অনেকেরই অবসেশন ছিলেন (আমার কোনওকালেই হন নি, আমার মাধুরী দীক্ষিত পোষায় নি কস্মিনকালেও), উত্তর এবং উত্তর পূর্ব ভারত জুড়ে একটা নয়, একাধিক লেকের নাম মাধুরীর নামে আছে। জানি না, সবকটার সামনে গিয়েই উনি টাইম টু টাইম নেচে এসেছিলেন কিনা।

লেকের সামনে একটা আখাম্বা জাতীয় পতাকা। ঠিক কী কারণে এখানে দেশপ্রেম দেখানোর দরকার পড়ল, জানি না – হয় তো খুব কাছেই চীন বর্ডার। এই লেকের জল ভারতীয় এবং তিব্বতি বৌদ্ধদের কাছে খুব পূতপবিত্র। খানিকক্ষণ দাঁড়ালাম লেকের সামনে। টুরিস্টের ভিড়। একটু দূরে ঘাসে ঢাকা জমির ওপর একজন বসে তারস্বরে একটি রেডিও বা ওয়াকম্যান চালিয়েছেন, মানে চারদিকে এক হট্টমেলার পরিবেশ।

না, এই শোরগোল শুনতে আমি আসি নি। আমার সামনে সাঙ্গেতসার, হাওয়ার ধাক্কায় অল্প অল্প ঢেউ উঠছে তার জলে, আমি একদৃষ্টে খানিক চেয়ে রইলাম সেদিকে। ভালো লাগছে না। উত্তর পাচ্ছি না – অনেকগুলো ‘কেন’র। অনেক মাস ধরে, অনেক দিন রাত ধরে আমি প্ল্যান করেছি এই জার্নির, একটা একটা দিনের পরিকল্পনা বানিয়েছি কাজের ফাঁকে ফাঁকে, সব, সব মিথ্যে মনে হচ্ছে। কেমন একটা বিশাল হলোনেস জেঁকে বসছে মনের মধ্যে। কী হচ্ছে কিছুতেই বুঝতে পারছি না, কিছুতেই অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারছি না এই সৌন্দর্য। কিচ্ছু ভালো লাগছে না, এই প্রথম মনে হচ্ছে একা একা এত বড় একটা জার্নি, বড় ক্লান্তিকর ঠেকছে, সঙ্গে একটা কেউ থাকলে বোধ হয় … একজন সঙ্গী থাকলে একটু কি এনজয়েবল হত? কিন্তু আমার কমপ্যাটিবিলিটিও যে বড্ড কম!

আমি একলা চুপচাপ থাকা মানুষ, লোকজনের সান্নিধ্য বড় একটা পছন্দ করি না, অথচ এইবারে কেমন মনে হচ্ছে একা একা হাঁফিয়ে উঠছি, দম আটকে আসছে। এখনও তো চার সপ্তাহ বাকি, মাত্র ছ দিন হয়েছে! কেন? মোটরসাইকেল রাইডার হিসেবে আমার প্রথম আত্মপ্রকাশ দুহাজার পনেরোতে। চরম এনজয় করেছিলাম লাদাখের সেই রাইড, হাজার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, চমৎকার দুজন বন্ধু পেয়েছিলাম, আজও তাদের সাথে যোগাযোগ আছে, বন্ধুত্বের উষ্ণতা বজায় আছে একেবারে একই রকম। তার পরে দু হাজার ষোলতে স্পিতি, সতেরোতে সিকিম আর ভুটান … পথে সঙ্গী পেয়েছি, কখনও তা মনমত হয়েছে, কখনও হয় নি, কিন্তু নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর দিনগুলো তো কম এনজয়েবল হয় নি! তা হলে কি সঙ্গী পাওয়াটা ফ্যাক্টর নয়, আসলে রাইডার হিসেবে আমি ফুরিয়ে আসছি? ফুরিয়ে গেছি, জাস্ট একটা ইমেজকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি?

প্যাশন বনাম পারপাস। হৃদয় বনাম মস্তিষ্ক। মোটরসাইকেল চালানোটা আমার প্যাশন, নিজেকে খুঁজে পাবার একটা উপায় – সেভাবেই উপলব্ধি করেছি আমি। কিন্তু কী এর পারপাস? কী চেয়েছি আমি জীবনের কাছ থেকে? একটা চাকরি করি, মন্দ রোজগার হয় না, কিন্তু সেটা না আমার প্যাশন, না পারপাস, রোজগার করি জীবনের নৈমিত্তিক চাহিদা মেটাবার জন্য, আর চাহিদা মিটিয়ে, সঞ্চয়ের পরেও সামান্য কিছু খুদকুঁড়ো জমিয়ে রাখি এই প্যাশন মেটাবার জন্য। কী হত যদি না করতাম এসব? যদি না আসতাম, অনেক হাজার টাকা বেঁচে যেত, নৈমিত্তিক প্রয়োজনের তালিকার কিছু আইটেম হয় তো কমে যেত, প্যাশন মেটাবার থেকেও আপাতদৃষ্টিতে যা জরুরি? জরুরি কোনটা? মস্তিষ্কের দাবি মেনে জাগতিক প্রয়োজন মেটানো, নাকি কোনওসময়ে প্রয়োজনকে পাশ কাটিয়ে, বুকের কাছে কান পেতে মনের চাহিদা মেটানো?

মিটছে চাহিদা? বুকের মাঝে কান পেতে যা শুনেছি, তাই করতেই তো পথে নেমেছিলাম। তা হলে বার বার মনে হচ্ছে কেন, আমি চাহিদা বুঝতে ভুল করেছি এইবারে? কী সেই ভুল? কোনটা ঠিক? কোন পথে শান্তি মিলবে? পারপাসের সন্ধান পাবো?

DSC_019920181122_145041

ফিরে চললাম তাওয়াংএর দিকে। নিচে নামার রাস্তা – সময় কম লাগে, পাথর ডিঙিয়ে সাবধানে নেমে এলাম ভালো রাস্তার কাছাকাছি, তার খানিক পরেই তাওয়াং। মার্কেটের সামনে এসে মোটরসাইকেল পার্ক করলাম। চারটে দশ। সারাদিনে ছটা মোমো আর এক কাপ কফি ছাড়া আর কিছু পেটে ঢোকে নি, পেটপুরে খেতে হবে এইবারে।

মার্কেটের মধ্যে রাস্তা ওয়ান ওয়ে, একধারে ট্রাফিক পুলিশ থামালেন, বললেন, এইখানে মোটরসাইকেল পার্ক করে রাখতে। যেখানে পার্ক করলাম, সেখান থেকে একটু এগিয়েই দেখতে পেলাম একটা খাবার জায়গা – পরিষ্কার বাংলায় লেখা আছে ভাত তরকারি মাছ মাংস সব পাওয়া যায়। টক করে ঢুকে পড়লাম। হ্যাঁ, সোয়া চারটে বাজলেও খাবার সবই পাওয়া যাচ্ছে। মাছ মাংস দুটোই অর্ডার করে দিলাম, সঙ্গে চমৎকার আলুভাজা এল, বেগুনভাজা এল, আর একটা বেশ উপাদেয় তরকারি। ভাতটা একটু ঠাণ্ডা ছিল, তো তাতে কিছু অসুবিধে হয় না খিদের মুখে। গোগ্রাসে খেতে খেতেই আবার কল এল। তাওয়াং শহরে এখন মোবাইল নেটওয়ার্কে ঢুকে গেছি, অতএব অফিস আবার পিছু নিয়েছে। মুখে মাছ, কানে ফোন – থাক, সে বিবরণ আর আপনাদের দেব না, বেকার নিজের খারাপ লাগাটাকে অন্যের মধ্যে চারিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে আর নেই।

খেয়ে উঠলাম যখন – তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। সওয়া পাঁচটা বাজে। খাবারের দাম খুবই কম নিল, মাত্র একশো কুড়ি টাকা। মনে হয় এতেই রাতের খাবারও হয়ে যাবে, রাতে আর খাবার দরকার নেই। হোটেলে ফিরি, জিনিসপত্র গোছাতে হবে।

মনাস্ট্রির কাছে এসে দেখলাম, আকাশ আলো করে বিশাল বড় চাঁদ উঠেছে, পূর্ণিমার চাঁদ। রূপোলী আলোয় ঝলমল করছে তাওয়াং শহর। এখান থেকে সমস্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দূরে একটা বিশাল বুদ্ধমূর্তি, পুরো তাওয়াং শহরকে নজরে রাখছেন বুদ্ধদেব, এদিকে এটা কি হেলিপ্যাড না স্টেডিয়াম? একটা বেশ বড়সড় ফাঁকা জায়গা। বেশ সুন্দর মায়াবী পরিবেশ, ভালো লাগার মতই জায়গা।

DSC_0211

তাওয়াং মনাস্ট্রি দেখা হল না। শুনেছি এটা নাকি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মনাস্ট্রি, লাসার পোটালা প্যালেসের পরেই। ১৬৮০ সালে এই মনাস্ট্রি স্থাপিত হয়েছিল মেরাক লামা লোদ্রে গিয়াৎসোর তত্ত্বাবধানে। তিব্বতী ভাষায় “তা” মানে ঘোড়া, “ওয়াং” মানে চোজেন, পছন্দ করা। তাওয়াং মানে ঘোড়ার পছন্দ করা জায়গা। কথিত আছে পঞ্চম দালাই লামা এই মেরাক লামাকে একটি ঘোড়া সমেত পাঠিয়েছিলেন মনাস্ট্রি বানাবার আদর্শ জায়গা খুঁজতে। মেরাক লামা প্রচুর খুঁজেও পছন্দসই জায়গা বের করতে পারলেন না, তখন তিনি এক নিকটস্থ গুহায় ঢুকে তথাগতর উদ্দেশ্যে প্রার্থনায় বসেন, যাতে তথাগত তাঁকে সাহায্য করেন জায়গা খুঁজে বের করতে। প্রার্থনা সেরে বেরিয়ে এসে তিনি দেখেন, ঘোড়া মিসিং। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে তিনি দেখতে পান ঘোড়া সামনের পাহাড়ে আরও উঁচুতে এক ঘাসে ঢাকা জমিতে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। মেরাক লামার মনে হয় এই বোধ হয় তথাগতর ইশারা। এই এলাকাটির নাম ছিল তানা মানদেখাং, খুব কাছেই রাজা কালা ওয়াংপোর প্রাসাদ। মেরাক লামা এইখানেই মনাস্ট্রি স্থাপিত করা মনস্থ করেন। ঘোড়া এই জায়গা পছন্দ করে, তাই মনাস্ট্রির নাম তাওয়াং, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর নাম তাওয়াং, শহরের নাম এবং পুরো জেলার নাম আজ তাওয়াং। তাওয়াংএর এই মনাস্ট্রি মহাযান বৌদ্ধ দর্শনের পীঠস্থান, প্রচুর প্রচুর দুষ্প্রাপ্য পুঁথি এখানে রক্ষিত আছে।

মাত্র একশো মিটার দূরত্বে সেই মনাস্ট্রির গেট, দুদিনে দেখা হল না।

থেকে যাব আর এক দিন? কাল তাওয়াং ছেড়ে সেপ্পা যাবার দিন, প্রায় পৌনে চারশো কিলোমিটার দূরত্ব। গেছোদাদা বলেছিল বটে খুব ভোর ভোর বেরোলে সন্ধে নাগাদ সেপ্পা পৌঁছে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়, কিন্তু এই কদিনে রাস্তার অবস্থা দেখে তেমন মনে হচ্ছে না। সেলা পাসের আগে পাঁচ কিলোমিটার খারাপ রাস্তা আছে, তার পরেও টুকটাক খারাপ প্যাচ আছে কিছু, রূপার পরে রাস্তা কেমন, আমি জানি না। রূপা দুশো কিলোমিটার। হিসেবমত আজ আমার জেমিথাংএ থাকার কথা ছিল, কাল তাওয়াংএ ফিরে এসে পরশু দিন তাওয়াং থেকে সেপ্পা যাবার কথা ছিল। তো, আজ যখন তাওয়াংএ ফিরে এসেইছি, কাল তা হলে রূপা পর্যন্ত যাই, পরশু সেপ্পা পৌঁছনো যাবে, প্ল্যানমাফিক। জার্নিও খুব বেশি হবে না।

সেপ্পা ইটানগরের খুব কাছেই জেলা সদর, এখান থেকে জিরো ভ্যালি যাওয়ার রাস্তা। আমার পরের ট্রিপ জিরো ভ্যালির দিকে, কিন্তু সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতেই যদি এনার্জি শেষ হয়ে যায়, তা হলে একেবারেই কিছু এনজয় করতে পারব না। তার চেয়ে কাল সক্কাল সক্কাল তাওয়াং মনাস্ট্রি দেখে রূপার উদ্দেশ্যেই যাত্রা শুরু করি।

আর … আর …

হোটেলের ঘরে ফিরে ল্যাপটপ খুললাম। না, অফিস থেকে আর কোনও ফলো আপ নেই। জাভার কমপাইলেশন হোক বা এসক্যালেশনের ঝড়, তারা আমার অনুপস্থিতিতেই দিব্যি সামলে নিচ্ছে আস্তে আস্তে। অফিসের নেটওয়ার্ক থেকে লগআউট করে আমার ইটিনেরারির এক্সেল খুলে বসলাম। পরের দিকে কয়েকটা জায়গা বাদ দিলাম – থাক, সব একবারে দেখার চেষ্টা না করাই ভালো। সাত আটদিন কমিয়ে নিলাম পরের দিকের জার্নি থেকে, উনচল্লিশ দিন থেকে কমে গিয়ে দাঁড়াল বত্রিশ দিনে।

গোছগাছ শেষ। বাড়িতে দু জায়গায় ফোন করে আপডেট দিয়ে ঘুমোতে গেলাম।

ঘুম আসছে না। ধুত্তেরি! গল্প শোনাই একটা? স্বপ্নপূরণের গল্প? এভারেস্ট ছোঁয়ার গল্প? সত্যিকারের এভারেস্ট।

ছন্দা গায়েনের নাম শুনেছেন আপনারা? শুনেছেন, সব্বাই। রাহা মোহারাকের নাম শুনেছেন?

H2A9151_9329489রাহা মোহারাক। ২০১৩ সালে, মাত্র সাতাশ বছর বয়েসে মেয়েটি ছুঁয়ে এসেছে এভারেস্টের চূড়া। … তাতে কী? আজ পর্যন্ত, বচেন্দ্রী পাল থেকে শুরু করে কত মেয়েই তো উঠেছে, জয় করেছে এভারেস্ট। এখন তো আর এটা নতুন কিছু খবর নয়!

না, এভারেস্টে ওঠাটা নতুন কোনও খবর নয়, সত্যিই, কিন্তু মেয়েটি যদি হয় প্রথম সৌদি মহিলা এবং কনিষ্ঠতম আরব, তা হলে খবরটা একটু ঘুরে পড়তে হয় বৈকি।

জেড্ডাতে জন্ম রাহার, সৌদি আরবে, সেই সৌদি, যেখানে মেয়েদের খেলাধুলো করা তো বটেই, স্টেডিয়ামে যাওয়া, এমনকি বিনা আত্মীয় পুরুষসঙ্গী ছাড়া বাড়ির বাইরে বেরনোও বারণ। প্রাক-মধ্যযুগীয় কিছু অর্থহীন পুরুষতান্ত্রিক নিয়মকে ইসলামের নাম দিয়ে সেখানে বেঁধে রাখা হয় দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে। সেই দেশের মেয়ে রাহা। রাহার নিজের কথায় – মাউন্টেনিয়ারিং শিখতে যাবার জন্য নিজের প্রাচীনপন্থী পরিবারকে, নিজের বাবা-মা-কে কনভিন্স করাতে যে স্ট্রাগল করতে হয়েছিল তাঁকে, এভারেস্টের চূড়ায় ওঠা তার থেকে অনেক সহজ ছিল। 

ট্রেনিংএর সুবিধের জন্য রাহা সৌদি থেকে চলে আসেন ইউএই-তে, শারজায়, সেখানে ট্রেনিংএর পাশাপাশি চলতে থাকে পড়াশুনোও। ভিজুয়াল কমিউনিকেশনসে এমবিএ করেন। এভারেস্ট জয়ের আগে উনি ৮টি শৃঙ্গ জয় করেন একে একে, প্রস্তুতির অংশ হিসেবে – সবকটা সামিট তিনি সম্পূর্ণ করেন এক বছরের মধ্যে। তার একটা ছিল কিলিমাঞ্জারো। মরতে বসেছিলেন বেখেয়ালে ভুল স্টেপ নিতে গিয়ে। তবু ছেড়ে আসার কথা ভাবেন নি। গিভিং আপ – হাল ছেড়ে দেওয়া শব্দটাই তাঁর কাছে অপরিচিত। নিজের পরিবারের সাথে, নিজের পরিবেশের সাথে, নিজের কমিউনিটির সাথে নিরন্তর লড়াই করে নিজের স্বপ্ন অর্জন করে নেবার সামিটও অবশ্য কম উত্তেজনাপূর্ণ নয়, তার সাথে সাথেই চলতে থাকে প্রস্তুতি, পাখির চোখে মাউন্ট এভারেস্ট। ২০১৩ সালে, নেপালের দিক থেকে আরও বত্রিশ জন মাউন্টেনিয়ারের সঙ্গে গিয়ে তিনি এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন।

রাহা এখন দুবাইতে থাকেন।

প্যাশন আর পারপাস যখন মিলে যায় একসাথে, মানুষ তখন আকাশে বিচরণ করে।


4 thoughts on “অরুণাচলের দেশেঃ সপ্তম পর্ব

  1. এই এপিসোডটা পড়তে পড়তে মিক্সড ফীলিং হচ্ছে, তাই পুরোটা শেষ না করেই ক’টা কথা লিখি। লিখি? 🙂

    বেশ দিন কতক আগে বোর হতে হতে একটা সিনেমা দেখলাম – A Dog’s Purpose – আর চারটে একই ধরণের সিনেমার (Marley & Me, Two Brothers, Eight Below..) চাইতে কোথায় যেন আলাদা। একটা সাধারণ কুকুর, যে কিনা বিভিন্ন জন্মে নিজের ‘পারপাস’ খুঁজে বেড়ায়। কিছু, যা আমার খুব পরিচিত দৃষ্টিভঙ্গী দৈনিক একটু একটু করে পালটে দিতে পারে, তা হল আমার ঘেরাটোপ। আমার নিজের মধ্যের আমি’টা এই ঘেরাটোপের মধ্যে দৈনিক একটু একটু করে পালটে যায়। সবার ক্ষেত্রে নয় হয়ত, অনেকের নিজস্ব বর্ম বেশীরভাগ দৈনন্দিন আক্রমণ হয়ত বা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও হতে পারে। আমরা যারা সবকিছু মানিয়ে নিয়ে চলি, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রতিঘাত সহ্য করার মত উপযুক্ত বর্ম সবসময় পরে ওঠা হয়ে ওঠে না। তার কিছুটা আবার, ওই ঘেরাটোপের অন্তর্বর্তী আমি’র আর্কিটাইপ বাঁচিয়ে রাখার জন্য, সচেতন বা অবচেতনে। আমাদের মধ্যের আমিগুলো কখনও-ই একটা entity নয়। সম্মুখ সমরে মাঝে মাঝেই ঘেরাটুপ্ত আমিগুলো পারপাস-খোঁজা আমিদের হারিয়ে দিয়ে র‍্যালা নেয়।

    কিন্তু, এটা সাময়িক। আর অনেক কিছুর মত, প্রত্যের কুকুর্দশাপ্রাপ্ত মানুষেরই নিজের নিজের দিন আসে। চেনাজানা ব্যাট্‌লফীল্ড। বর্মটা একটু মোটা বানাতে হবে। কেভ্লা‌র লেয়ার সমেত। সাঙ্গেতসর লেক নিজেও জানত না, পরিচিত ঘেরাটোপ থেকে বেরোলে একদিন তার বুকে এত অজস্র পাইন গেঁথে যাবে। অথবা, এখন হয়ত এত এত পাইনের কঙ্কাল নিয়ে সে ভালোই আছে।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.