জেলখানার চিঠি

লেখাটি অর্ক ভাদুড়ির অনূদিত, নাগরিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে গত ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২২। অর্ক এবং বনজ্যোৎস্নার অনুমতিক্রমে অনুবাদটি হুবহু তুলে রাখলাম আমার ব্লগে, এই সময়ের একটা দলিল হিসেবে।

উমর খালিদ, গত দু বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দী রয়েছে, ২০২০র দিল্লি দাঙ্গায় প্ররোচনা দেবার মিথ্যে অভিযোগে। কোনও প্রমাণ জোগাড় করা যায় নি, কোনও বিচারই শুরু হয় নি। ইউএপিএ আইনের বলে যে কাউকে অনির্দিষ্টকাল বন্দী রাখা যায় ভারতে, ভারত রাষ্ট্র যদি কোনও নাগরিকের ওপর প্রতিশোধ নিতে চায় বিশেষ কোনও কারণ বা অকারণে, রাষ্ট্র তার ওপর চাপিয়ে দেয় এই কালা কানুন। এই মুহূর্তে, উমর ছাড়াও আরো অনেক মানুষ ইউএপিএ আইনে বন্দী রয়েছেন ভারতের বিভিন্ন জেলে। তাঁদের মধ্যে যাঁরা বিচারপ্রক্রিয়া অবধি পৌঁছতে পেরেছেন, তাঁরা অব্যাহতি পেয়েছেন, বাকিরা আজও বছরের পর বছর ধরে ‘বিচার’ নামক একটি প্রহসনের আশায়। 

উমর, তাঁদের একজন। 


সংবাদমাধ্যমের মিথ্যা পুলিসের মিথ্যাচারকেও ছাপিয়ে যায়

গত মঙ্গলবার, অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বর উমর খালিদ দিল্লি পুলিসের আনা অভিযোগের ভিত্তিতে কারাবাসের দুবছর পূর্ণ করলেন তিহার জেলে। তাঁর বিচার এখনো শুরুই হয়নি। প্রায় একমাস আগে, স্বাধীনতা দিবসে, রোহিত কুমার উমরের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। গত সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর, উমর সে চিঠির জবাব দেন। দ্য ওয়্যার ওয়েবসাইট রোহিত ও উমরের অনুমতিক্রমে সেই চিঠি প্রকাশ করে। উমরের অনুমতিক্রমে এই ভাষান্তর প্রকাশ করা হল।

Umar

প্রিয় রোহিত,

স্বাধীনতা দিবস এবং আমার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ধন্যবাদ, ধন্যবাদ আমাকে চিঠি দেওয়ার জন্য। আশা করি আপনি ভালো আছেন। এই বদ্ধ পরিসরের মধ্যে বসেও আপনার খোলা চিঠি পড়তে পেরে আমি আনন্দিত।

যে সময়ে আমি এই জবাব লিখতে বসেছি, (জেলের ভিতর) লাউডস্পিকারে শোনা যাচ্ছে সেইসব বন্দিদের নাম, যারা আজ রাতে মুক্তি পেতে চলেছে। সূর্যাস্তের পরে এই সময়টায় আদালত থেকে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে এসে পৌঁছয় মুক্তি পর্চা বা কারামুক্তির নির্দেশনামাগুলো। জেল চত্বরে সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে কয়েকজন বন্দি মুক্তির আলো দেখতে চলেছেন। তাঁদের চোখেমুখে আনন্দ, বিশুদ্ধ আনন্দ।

দুবছর ধরে প্রতি রাতে এই ঘোষণা শুনে চলেছি আমি – “নামগুলো শুনুন। এই বন্দি ভাইয়েরা মুক্তি পেতে চলেছেন”। আশা করে আছি, নিজের নামটা কবে শুনতে পাব। মাঝে মাঝেই ভাবি, কত দীর্ঘ এই অন্ধকার পথ? কোথাও কি কোনো আলো দেখা যাচ্ছে? আমার অন্ধকার দিনগুলো কি শেষ হয়ে এল, নাকি এখন সবে মাঝপথ? নাকি এই সবে শুরু?

শুনছি আমরা নাকি স্বাধীনতার অমৃতকালে প্রবেশ করেছি। কিন্তু দেশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে চাওয়ার পরিণাম দেখলে মনে হয় আমরা বুঝি ব্রিটিশ রাজত্বে ফিরে গেছি। ঔপনিবেশিক দাসত্বের সব চিহ্ন মুছে ফেলার কথা খুব বলা হয় আজকাল। বলতে বলতেই ছাত্রছাত্রী, আন্দোলনকারী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি ঔপনিবেশিক শাসন মনে করিয়ে দেওয়ার মত আইনগুলো প্রয়োগ করা হয়। এই বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন (ইউএপিএ) – যে আইনের আওতায় আমরা জেলে পচছি – আর পরাধীন ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ব্যবহৃত রাওলাট আইনের মধ্যে মিল দেখতে পান না মানুষ? এখনো মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করে চলা ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার এই আইনি অস্ত্রগুলোকে বাতিল করব না আমরা? আমার বিশেষ করে আশ্চর্য লাগে যে আমাদের বা আমাদের মত আরও অনেককেই বিনা বিচারে, এমনকি কবে বিচার হতে পারে তার কোনো আভাস ছাড়াই, দীর্ঘদিন জেলে আটকে রাখা হচ্ছে।

স্বাধীনতা দিবসের সন্ধ্যায় আমি আরও কয়েকজনের সঙ্গে জেলকক্ষের বাইরে বসেছিলাম। অনেক উঁচুতে আকাশে কিছু ঘুড়ি উড়তে দেখা যাচ্ছিল এবং আমরা ভাবছিলাম আমাদের ছোটবেলার স্বাধীনতা দিবসগুলোর কথা। আমরা এখানে পৌঁছলাম কী করে? দেশটা কবে এত বদলে গেল?

ইউএপিএ ব্যবহার করে বছরের পর বছর আমাদের জেলে আটকে রাখা সম্ভব। যারা আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছে তাদের কিছু প্রমাণও করতে হবে না। কিন্তু আদালতে আমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হাজির করতে না পারলেও এই সময়ের মধ্যে আমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রটনা থেকে তাদের আটকাতে পারবে না কেউই।

জেলের একজন ওয়ার্ডেন একদিন আমার বিরুদ্ধে চলা মামলাটা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি বললেন ২০২০ সালে প্রথম যখন আমাকে জেলের মধ্যে দেখেন উনি, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো বিশ্বাস করা ওঁর পক্ষে কঠিন হয়েছিল। ভেবেছিলেন এসবই নেহাত রাজনৈতিক ব্যাপার স্যাপার এবং কিছুদিনের মধ্যেই আমি ছাড়া পেয়ে যাব। কিন্তু এই ২০২২ সালেও যখন আমি বন্দিমুক্তির ঘোষণায় নিজের নাম শোনার অপেক্ষায়, তিনি জিজ্ঞেস করছেন “আপনার জামিন হচ্ছে না কেন? কৃষক আন্দোলনের অভিযুক্তদের তো জামিন হয়ে গেছিল কয়েকদিনেই।” আমি তাঁকে ইউএপিএর কথা বলছিলাম এবং ভারতীয় দণ্ডবিধি (আইপিসি)-র বিভিন্ন ধারার সঙ্গে পার্থক্যটা বোঝবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কথাটা এগোতে পারল না বেশিদূর, তাঁর মনোযোগ ধরে রাখতে পারলাম না। এত আইনি কচকচি কে-ই বা বুঝবে! আইন যাঁদের বিষয় এবং এই আইনের যারা শিকার, তাদের বাইরে আর কারোর বোঝার দায়ই বা কী?

মিথ্যা অভিযোগের দুঃসহ ভার

এই উত্তরসত্যের যুগে বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল কী দেখানো হচ্ছে। আমাকে নিয়ে আপনি ঠিক কী ভাবেন, আপনার চিঠিতে আপনি খুব সুন্দর করে তা লিখেছেন। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি আরও লিখেছেন, জেলে প্রতিদিন আমি যাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযোগ পাই, তাদেরও আমি নিশ্চয়ই আপনার মতই প্রভাবিত করতে পারি। তারা অন্তত মিডিয়ার বলা মিথ্যেগুলোকে বিশ্বাস করে না। ঘটনা হল, আপনাকে প্রভাবিত করা সহজ, কিন্তু যারা প্রতিদিন বাধ্য হচ্ছে মিডিয়ার তৈরি করা মিথ্যের সমুদ্রে স্নান করতে, তাদের সত্যিটা বোঝানো সত্যিই বড্ড কঠিন। বিশেষ করে এই মিথ্যাচারের যখন কোনো সীমা নেই।

আমি দুবছর ধরে জেলে আছি। আমার মামলা নিয়ে খবরের কাগজগুলো নিয়মিত লেখালিখি করছে। বলে রাখি, এখানে বাইরের খবর পাওয়ার একমাত্র সূত্র ওই খবরের কাগজগুলোই। ইংরেজি কাগজগুলো যেটুকু নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে, হিন্দি কাগজগুলোর সে বালাইও নেই। অথচ ৯০ শতাংশেরও বেশি কয়েদি খবরের জন্য হিন্দি কাগজের উপরেই নির্ভরশীল। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, হিন্দি খবরের কাগজগুলো সাংবাদিকতার যাবতীয় মূল্যবোধ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। ওগুলো নির্ভেজাল বিষ ছড়ানো ছাড়া আর কিছু করে না।

ওরা আমার জামিনের শুনানি নিয়ে খুব হিসাব করে খবর করে। আমার আইনজীবী যখন কোনো যুক্তি দেন, অধিকাংশ সময়েই তা ছাপা হয় না। মাঝে মাঝে দয়া করে পাঁচ বা ছয়ের পাতায় খবরটুকু যায় বটে, তবে কোনো অদ্ভুত শিরোনাম দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি আইনজীবীর বয়ান ছাপা হয় প্রথম পাতায়, বড় বড় করে। এমনভাবে লেখা হয়, যে পড়লে মনে হবে ওটা সরকারি আইনজীবীর বক্তব্য নয়, খোদ আদালতের মত। খবরটাকে আরও মুচমুচে করে তুলতে ওরা আমার কিছু ঝাপসা, অন্ধকার হয়ে যাওয়া ছবি ব্যবহার করে।

একদিন দেখলাম একটা কাগজের শিরোনাম হয়েছে ‘খালিদ বলেছিল বক্তৃতায় কাজ হবে না, রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে হবে।’ শিরোনামে যা লেখা হয়েছে তা কিন্তু প্রতিবেদনে লেখা হয়নি। তার উপর শিরোনামে যা লেখা হয়েছে, তা যে একটা অপ্রমাণিত অভিযোগ মাত্র, যা আদালতে যাচাই হয়নি, তারও উল্লেখ নেই। কোনও উদ্ধৃতি চিহ্ন নেই, জিজ্ঞাসার চিহ্নও নেই। এই একই খবরের কাগজ দুদিন পরে আরও রসালো শিরোনাম নিয়ে আবির্ভূত হল: ‘খালিদ চেয়েছিল মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশ’। ওই শিরোনাম যা দাবি করছে, তার মানে হল, যমুনার এপারে ওপারে দিল্লির যে দাঙ্গায় সবচেয়ে বেশি মরতে হল মুসলমানদের, সেই দাঙ্গার ফলে নাকি মুসলমানদের জন্য একটা নতুন দেশ তৈরি হয়ে যেত। আমার এগুলো ট্র্যাজিকমেডি বলে মনে হয়। হাসব না কাঁদব বুঝতে পারি না। যারা এই মিথ্যের বিষ প্রতিদিন গিলছে, তাদের কী করে কী বোঝাব?

এর আগে একটা হিন্দি দৈনিক দাবি করেছিল আমি নাকি দিল্লি দাঙ্গায় আমার যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছি। অথচ আমি দুবার আদালতকে জানিয়েছি যে পুলিশি হেফাজতে থাকার সময়ে আমি কোনো বিবৃতি দিইনি, কোনো কাগজে সই পর্যন্ত করিনি। তাহলে ওই ‘খবর’-টার উৎস কী?

এরা যা করে, সেটাকে আর যাই হোক রিপোর্টিং বলা যায় না। আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া একটা মিথ্যা ন্যারেটিভকে প্রমাণ করতে এরা নিজেদের ইচ্ছা মত যুক্তি সাজায়, কখনো আবার ডাহা মিথ্যা বলে। আদালতের বিচারের আগেই ওরা আমাকে জনতার চোখে দোষী সাব্যস্ত করতে চায়। এইভাবে ওরা সংখ্যাগুরুবাদী যৌথ বিবেক তৈরি করছে।

মাঝেমধ্যে সংবাদমাধ্যমের মিথ্যা পুলিসের মিথ্যাচারকেও ছাপিয়ে যায়। একটা গুরুত্বপূর্ণ হিন্দি দৈনিকের প্রতিবেদনের কথা বলি। ওরা লিখে দিল, ২০২০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ দিল্লি দাঙ্গার ঠিক এক সপ্তাহ আগে আমি জাকির নগরে শার্জিল ইমামের সঙ্গে দেখা করেছি। ঘটনা হল, পুলিশ পর্যন্ত আদালতে জানিয়েছে ওই তারিখে আমি ছিলাম দিল্লি থেকে ১১৩৬ কিলোমিটার দূরে মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে। আর শার্জিল ছিল তিহার জেলে, কুড়ি দিন আগে অন্য একটা মামলায় ওকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। মহামান্য সাংবাদিক একদম বুনিয়াদি তথ্যগুলোও মিলিয়ে নেওয়ার সময় পান না।

অবশ্য আজকাল কে-ই বা তথ্য, সত্য – এসব নিয়ে মাথা ঘামায়? আজকের ভারতে সত্য সেটাই যা মানুষের কাছে পৌঁছয়, যা আসলে ঘটেছিল সেটা নয়। আমি যাদের সঙ্গে কথা বলি, আমার কথা বা আচরণের চেয়ে তাদের অনেক বেশি প্রভাবিত করে ওইসব শিরোনাম। দুবছর ধরে আমি দেখছি, মানুষ ছাপা শব্দের উপর প্রায় নির্বোধের মত বিশ্বাস করে। আপনি যাকে “নিজের চোখে দেখা প্রমাণ” বলেন, তার উপরেও মানুষের অত বিশ্বাস নেই। লোকে ভাবে কাগজে যখন বেরিয়েছে তখন অমুক কথাটা নির্ঘাত সত্যি। “কিছু তো নিশ্চয়ই করেছে। কাগজে কি আর পুরোপুরি মিথ্যে লিখবে?”

সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক সঞ্জু। ছবিটার অনেক সমস্যা আছে, কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে যেভাবে তুলে ধরেছে সেটা একদম ঠিক। মিডিয়া সত্যিই একরকমের ড্রাগ। প্রতিদিন সকালে আমি দেখি, কাগজের পৃষ্ঠাগুলো কেমন করে মানুষের মস্তিষ্ককে ভোঁতা করে দেয় এবং এক বিকল্প বাস্তবে নিয়ে যায়। গণহারে মিথ্যে উৎপাদিত হতে থাকলে সাধারণ মানুষের সত্যি-মিথ্যা আলাদা করে চেনার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। একবার এই পর্যায়ে পৌঁছে গেলে আর ভাল মিথ্যেও বলতে হয় না, মানুষকে যা খুশি তাই গিলিয়ে দেওয়া যায়।

মিথ্যাচারের এই দানবিক যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা কীভাবে লড়ব? ঘৃণা এবং অসত্যের এই কারবারিদের হাতে অনেক অস্ত্র – টাকা, ধামাধরা চব্বিশ ঘন্টার নিউজ চ্যানেল, ট্রোলবাহিনী এবং পুলিশ। সত্যি বলতে কী, রোহিত, আমাকে মাঝেমধ্যে হতাশা গ্রাস করে। মাঝেমধ্যে আমার খুব একাও লাগে। আমার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা বহু মানুষ, যাঁরা একজোট হয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, সিএএ- এনআরসি/এনপিআরের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন, আজ যখন আমি এইসব মিথ্যে প্রচারের শিকার হচ্ছি, তখন চুপ করে আছেন। এটা দেখে আমার নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে হয়। মনে হয় আমি যেন নিজভূমে পরবাসী। সেই নিরাশার মুহূর্তগুলোতে একটি উপলব্ধিই আমাকে সান্ত্বনা দেয়। সেটা হল যা ঘটছে তার কিছুই তো ব্যক্তিগত নয়। আমার বন্দিত্ব এবং বিচ্ছিন্নতা আরও বড় একটা জিনিসের প্রতীক – আজকের ভারতে মুসলমানদের সার্বিক নিপীড়ন এবং বিচ্ছিন্নতার প্রতীক।

স্বস্তি কেবল নৈঃশব্দ্য আর একাকিত্বে

কিছুদিন হল আমি এখানকার লোকেদের কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা বোঝানোর চেষ্টা করা ছেড়ে দিয়েছি। কতগুলো মিথ্যাকে আমি মিথ্যা বলে প্রমাণ করব? কতজনের কাছে? আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে এখন ভাবতে বাধ্য হচ্ছি, মানুষ কি শুধুই প্রোপাগান্ডায় বিপথে চালিত হচ্ছে, নাকি মানুষ এই মিথ্যা কথাগুলোতে বিশ্বাস করতেই চায়, কারণ অবচেতনে যে কুসংস্কার, যে পক্ষপাতগুলো রয়েছে এই কথাগুলো তার সঙ্গে মিলে যায়?

খামোকা দেওয়ালে মাথা না ঠুকে আমি এখন বেশিরভাগ সময়টা জেলের ভিতরে একাই কাটাই। গত দুবছরে এটাই আমার ভিতরে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। এতে খুবই অস্থির হয়ে উঠি একেকসময়। আমার পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছে নৈঃশব্দ্য এবং একাকিত্বে স্বস্তি খুঁজে নিতে। একটা ছোট্ট, নির্জন সেলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে আমার শুরুর দিকে যতটা দমবন্ধ লাগত, এখন আর লাগে না। বরং আদালতে যাওয়ার দিনগুলোতে লোকজন, ট্র্যাফিকের দৃশ্য এবং আওয়াজ আমাকে উত্যক্ত, উদ্বিগ্ন করে। মানুষের থেকে দূরে জেলের নির্জনতাতেই আমি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। আমি কি বন্দিজীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি?

সম্প্রতি আমি একটা স্মৃতিকথা পড়লাম। এমন একজনের স্মৃতিকথা, যিনি মিথ্যা অভিযোগে ১৪ বছর জেল খেটেছেন। জেলজীবনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি ‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফেরার পর কী কী সমস্যা হয়েছিল, তা-ও লিখেছেন। তিনি জেলে থাকার সময় তীব্রভাবে চাইতেন মুক্তি, চাইতেন খোলা আকাশের নিচে শ্বাস নেওয়ার স্বাধীনতা। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর দেখলেন, এই স্বাধীনতা নিয়ে তিনি কী করবেন, ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না বা মনে করতে পারছেন না। জেলে থাকাকালীন তিনি অধীর আগ্রহে মুক্তির পর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবতেন। কিন্তু মুক্তির পরে লোকজন, ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলতে শুরু করলেন। তাঁর অধিকাংশ সময় কাটত নিজের ঘরে, একদম একা। রোহিত, আমি মাঝেমধ্যে ভাবি, আবার স্বাভাবিক হতে আমার ঠিক কতদিন সময় লাগবে?

তবে এতসব সত্ত্বেও জেল আমার জীবনে বেশকিছু “ইতিবাচক” পরিবর্তনও ঘটিয়েছে। ধূমপান করা ছেড়ে দিয়েছি। দুবছর হল মোবাইল ফোন ছাড়া রয়েছি, ফলে আরও একটা ড্রাগের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি – যার নাম সোশাল মিডিয়া। যখন এখানে ঢুকেছিলাম তখন একটা টুইট পড়তে যতটুকু সময় লাগে সেটুকু সময়ই মনোযোগ ধরে রাখতে পারতাম। আর এখন প্রতি মাসে একাধিক উপন্যাস পড়ে ফেলি। মা শুনলে খুশি হবেন, বহু বছরের চেষ্টার পর আমার ঘুম ঠিকঠাক হচ্ছে। রাত শেষ হলে ঘুমোতে যাওয়ার বদলে এখন আমি সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি। সকালবেলাটা ভারি সুন্দর লাগে।

আমার মনে হয়েছে চিঠিটা শেষ করার আগে এই কথাগুলো বলা দরকার ছিল, কারণ দেশে রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা বাড়ছে। যাঁরা বিরাট ঝুঁকি নিয়ে গণতন্ত্রের পক্ষে, ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে লড়ছেন, যাঁরা সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষে লড়ছেন, তাঁদের জেল নিয়ে খুব একটা চিন্তা করার দরকার নেই। জেল আপনাকে বেশ কিছু খারাপ অভ্যাস থেকে মুক্তিও দিতে পারে। জেলজীবন শান্ত, ধৈর্যশীল, স্বনির্ভর করে তুলতে পারে – আমাকে যেমন করেছে।

শেষে বলি, জেলবন্দিদের কাউন্সেলর হিসাবে আপনার কাজের কথা আমি জানি। দু মাস আগে আমি আপনার ক্রিসমাস ইন তিহার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ বইটা পড়েছি। কী চমৎকার ছোট্ট একটা বই! এই অন্ধকূপে গল্পের তো কোনো বিকল্প নেই। কত রকমেরই না গল্প – সংগ্রামের গল্প, আকাঙ্ক্ষা এবং অন্তহীন অপেক্ষার গল্প, দারিদ্র্য আর হৃদয় মোচড়ানো অন্যায়ের গল্প, স্বাধীনতার জন্য মানুষের আকুতির গল্প, আবার মানুষের ভয়ংকর বদমাইশির গল্পও। আশা করি আমি শিগগির একজন স্বাধীন মানুষ হিসাবে আপনার সঙ্গে এক কাপ কফি নিয়ে বসে এইসব গল্প শোনাতে পারব।

ভালো থাকুন, লিখতে থাকুন।

ইতি আপনার

উমর খালিদ


মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.