পার্সপেকটিভের সাতকাহন

অবান্তর কথোপকথন

– তুই অনির্বাণকে চিনিস?
– কে অনির্বাণ?
– ভট্টাচারিয়া।
– অনির্বাণ ভট্টাচার্য? … (নামটা চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু এতই কমন নাম, আমার একগাদা চেনাপরিচিত লোক আছে অনির্বাণ নামে, তাদের মধ্যে কোন জন ভট্টাচার্য …)
– আরে জেএনইউয়ের ছেলেটা – যাকে জেলে ভরে রেখেছিল, কালকে ছাড়া পেল যে –
– ও হো, ওই অনির্বাণ? না মানে, কাগজ পড়ে টিভি দেখে তুই যতটা চিনেছিস, আমিও ততটা চিনি। সামনাসামনি আলাপ নেই – ও-ও আমাকে চেনে না, মানে আমরা কেউই কাউকে চিনি না, … কিন্তু কেন?
– না, তুই ওদের সাপোর্ট করেই তো জেএনইউতে গেছিলি না, গত রোববার?
– জেএনইউতে গেছিলাম, সেটা সত্যি, কিন্তু ওদের সাপোর্ট করে মানে? আর ওদের মানে তো একাধিক লোক, সবার মধ্যে হঠাৎ অনির্বাণের নামই বা নিলি কেন?
– বেশ, একাধিক লোকই না হয় হল, তুই ওদের সাপোর্ট করিস?
– সাপোর্ট করি মানে? বুঝলাম না।
– মানে, এই যে ওরা দেশের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়েছে, ভারত বরবাদ হোক বলেছে, আফজল গুরুকে সাপোর্ট করে জিন্দাবাদ বলেছে – এগুলো তুই সাপোর্ট করিস?
– …
– সাপোর্ট করিস তা হলে?
– আমি মানে, ঠিক ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তুই যা বলছিস, তা কি জেনেশুনে বলছিস? নাকি নিজের মত করে একটা খবর বানিয়ে আমাকে সেই বিষয়ে জিজ্ঞেস করছিস?
– খবরের কাগজ আমিও পড়ি সিকি। নিউজ চ্যানেল আমিও দেখি – মনে করিস না তুই একাই দেশদুনিয়ার খবর রাখিস।
– আগেইন, আমি একবারও সে কথা মনে করি নি, মানে তুইও যে খবরের কাগজ পড়িস, নিউজ চ্যানেল দেখিস – সেটাও জানি, কিন্তু তোর বক্তব্যে তো এই দেখা-জানাগুলো রিফ্লেক্ট করছে না!
– বলতে চাস অনির্বাণরা এইসব কাজ করে নি? পুলিশ ওদের এমনি এমনি তুলে নিয়ে জেলে ঢুকিয়েছে?
– তুই একসাথে বেশ কয়েকটা কথা বলেছিস – তার সবকটা তো অনির্বাণরা করে নি, কিছু করেছে।
– কোনটা করে নি? শ্লোগান দেয় নি? আফজল গুরুকে সাপোর্ট করে নি?
– না আধুলি। তুই যদি সত্যিই কাগজ পড়তিস তা হলে এই রকমের কথা বলতিস না। চ্যানেলের কথা বলতে পারব না, কিছু চ্যানেল এই ধরণের গল্প ছড়াচ্ছে, তুই সেগুলোই বেছেবুছে দেখিস কিনা আমি জানি না, কিন্তু ওরা যে শ্লোগান দেয় নি, যে ভিডিওটা দেখানো হয়েছে সেটা যে ডক্টর্ড, সেটা তো গত কয়েকদিন ধরেই মিডিয়ার চর্চায়। সেগুলো দেখিস নি?
– আচ্ছা, নিজেরা না হয় দেয় নি, কিন্তু সাপোর্ট তো করেছে? তুই সেটাকে সাপোর্ট করিস?
– অনেকটা সরিয়েছিস গোলপোস্ট, কিন্তু এখনও পুরোটা সরে নি। সাপোর্ট করা বলতে কী বোঝাস?
– সবাই যা বোঝে! সমর্থন করা!
– সে তো আমিও জানি। আমি যদ্দূর জানি, ওরা সাপোর্ট করে নি, শ্লোগান যারা দিচ্ছিল, তাদের থামাবার চেষ্টা করে নি।
– সে তো একই হল। নিজেরা ভারতের বরবাদীতে বিশ্বাস করে বলেই তো থামাবার চেষ্টা করে নি।
– তাই কী? আমি একটা অ্যাক্সিডেন্ট হতে দেখলাম, গাড়িগুলোকে থামাবার চেষ্টা করলাম না বলেই আমি অ্যাক্সিডেন্ট হওয়াটাকে সাপোর্ট করছি?
– সিকি, রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া আর ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে দেশবিরোধী শ্লোগান দেওয়া এক জিনিস নয়।
– না, নয়। কিন্তু আসল ঘটনাটাকে ঘুরিয়ে রিপ্রেজেন্ট করতে গেলে আমাকেও তো এই ধরণের উদাহরণই নিয়ে আসতে হয়। তাও তো আমরা এখনও দেশবিরোধী শ্লোগানের কথাই বলছি। আফজল গুরুর গল্পে আসিই নি।
– তার কী গল্প?
– গল্প সেই একই –
– কী, ওরা আফজল গুরুকে সাপোর্ট করে নি?
– যদি বলি, না করে নি?
– এবার তো তুইই ঘটনাকে ঘোরাচ্ছিস সিকি। সারা দেশ জানে যে ওরা আফজল গুরুকে সাপোর্ট করে শ্লোগান দিচ্ছিল।
– সরি টু ডিফার আধুলি, ওরা একবারও আফজলকে সাপোর্ট করে শ্লোগান দেয় নি।
– দেয় নি? আফজল হাম শর্মিন্দা হ্যায়, তেরে কাতিল জিন্দা হ্যায় – এগুলো বলা মানে আফজলকে সাপোর্ট করা নয়?
– যদি বলি, না নয়?
– সে তুই যদি এ রকম মনে করিস, তা হলে তো কিছুই বলার থাকে না, কিন্তু সারা দেশ ছি ছি করছে –
–  তুইও করছিস, আমি জানি। কিন্তু আমি ঠিক সারা দেশ যে লাইনে ভাবছে, সেই লাইনে ভাবি না – এবার এখানেও দুটো ক্যাচলাইন আছে,
– ক্যাচলাইন আমাকে শেখাতে আসিস না সিকি, মোদ্দা কথাটা স্বীকার করছিস কিনা বল্‌। হ্যাঁ কি না।
– এর এক কথায় হ্যাঁ বা না-তে উত্তর হয় না বন্ধু আধুলি, তোমাকে আগে ব্যাপারটা বুঝতে হবে। আমি কি এখানে দুটো কথা বলতে পারি?
– বল্‌, শুনছি।
– ক্যাচলাইনটা হল, এই যে বললি “সারা দেশ ছি-ছি করছে” – এটা একটা জেনারেলাইজড স্টেটমেন্ট। দেশ কোনও হোমোজিনিয়াস এনটিটি নয়, এখানে সবাই এক লাইনে একভাবে চিন্তাভাবনা করে না – হ্যাঁ, অনেকে ছি-ছি করছে এটা যেমন সত্যি, ঠিক তেমনি এটাও সত্যি যে অনেকেই ছি-ছি করছে না, বরং অনির্বাণ, উমর, কানহাইয়াদের ওপর হওয়া অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে – আমিও করছি। আমিও, এরাও, এই দেশেরই মানুষ। শুধু যারা ছি-ছি করছে তাদের ভয়েসটাই দেশের ভয়েস নয়, আমাদের ভয়েসটাও তো ভয়েস। আর, এক রকমের ভয়েসে মত ব্যক্ত করে হরতন রুইতন ইস্কাবনেরা। ভারত দেশটা তাসের দেশ নয় আধুলি। গণতান্ত্রিক দেশে বিভিন্ন রকমের ভয়েস উঠবে, পাশাপাশি থাকবে, তর্কবিতর্ক হবে – সেটাই স্বাভাবিক নয় কি?
– বেশ, শুনি তোর ভয়েস কী।
– নিশ্চয়ই বলব, তবে তোকে শুনতে হবে একেবারে আনবায়াসড মন নিয়ে। তুই হয় তো এই মুহূর্তে আমার ওপর বিরক্ত হয়ে আছিস, কারণ আমি তোর মতে মত দিচ্ছি না। দিচ্ছি কি দিচ্ছি না সেটা কথা নয় – তুই মনে করছিস যে আমি তোর মতন করে ভাবছি না – এই ভাবনাটাকে আপাতত পাশে সরিয়ে রেখে শুনতে হবে, আমিও তোর কথা শুনব। আমার সত্যি কোনও প্রেজুডিস নেই, যদি মনে হয় তোর কথায় দম আছে, আমি তোর কথা মেনে নেব, কিন্তু যদি আমার কথায় দম থাকে, আমি তোকে ফোর্স করব না আমার কথা মেনে নিতে, ইউ স্টিল ক্যান হ্যাভ আ ডিফারেন্ট ওপিনিয়ন, এটা পাটিগণিতের অঙ্ক নয় যে যেভাবেই কষো একটাই উত্তর আসবে, একটা ঘটনা, একটা ইভেন্ট, র‍্যাদার একটা সিরিজ অফ ইভেন্টের দশ রকমের পার্সপেক্টিভ থাকতে পারে, তুই একটা চুজ করলি, আমি একটা চুজ করলাম, দুটো আলাদা হতেই পারে, তাতে কোনও ক্ষতি নেই, কিন্তু সবার আগে এইটা স্বীকার করে নিতে হবে যে ঘটনাপ্রবাহের একাধিক পার্সপেক্টিভ থাকতে পারে, ঘটনাপ্রবাহ পাটিগণিতের অঙ্ক নয় – এই বেসিক ব্যাপারটুকু মেনে নিতে না পারলে আমার মনে হয় আলোচনা চালিয়ে কোনও লাভ নেই।
– ঠিক আছে, বল্‌ শুনি। কী তোর পার্সপেক্টিভ।
– পার্সপেক্টিভ নয়। আমার অবজার্ভেশন। সেটা ভুল হতেও পারে, না-ও পারে। … শোন, আফজল গুরুকে কেউ “সাপোর্ট” করে নি। অনির্বাণ করে নি, উমর খালিদ করে নি, কানহাইয়া কুমার করে নি, জেএনইউয়ের কোনও ছাত্রই করে নি। প্রশ্নটা এখানে সাপোর্ট করা বা না করার নয়। আফজল গুরুকে একটা হাফ-কুকড জাজমেন্টের বেসিসে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। ওর অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় নি। সুপ্রিম কোর্ট ফাঁসির আদেশ দেবার সময়ে যুক্তিপ্রমাণের ওপর নির্ভর করার থেকে বেশি জোর দিয়েছিল “দেশের বিবেক শান্তি পাবে” – এই তত্ত্বের ওপর। আফজলের ফাঁসির সেই রায় এখন ইন্টারনেটেই পাওয়া যায়, সময় পেলে পড়ে দেখিস। জেএনইউতে সেদিনের প্রতিবাদটা ছিল এই ভুল বিচারে ফাঁসি দেবার বিরুদ্ধে। সেটা ছিল আফজলের ফাঁসির দিন। আফজল সত্যিই পার্লামেন্ট হামলায় অপরাধী কিনা, এটা জুডিশিয়ারির কোনও পর্যায়েই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয় নি। একই চার্জ গঠিত হয়েছিল দিল্লি ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এস এ আর গিলানী, আর আফসান নামে আরেকজন। লোয়ার কোর্টে তিনজনেরই ফাঁসির আদেশ হয়। মামলা আসে হায়ার কোর্টে, এবং একই গল্প, একই সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে গিলানী আর আফসান বেকসুর মুক্তি পান। আফজলকেও মুক্তি দেওয়াই যেত – কিন্তু দেওয়া হয় নি, দিলে পুলিশের হাতে “শাস্তি” দেবার জন্য আর কেউ থাকত না। একজনকে তো শাস্তি দিতেই হত দেশের রক্তপিপাসু বিবেককে “শান্ত” করার জন্য। আফজলের থেকে যোগ্যতর ব্যক্তি সেদিক থেকে আর কেউ হতে পারত না। আফজলের সন্ত্রাসবাদী ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল, পাকিস্তান থেকে জিহাদি ট্রেনিং নিয়ে এসেছিল। তাই সন্দেহাতীত তথ্যপ্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট তার ফাঁসির সাজা বহাল রাখে, ফাঁসি হয়, এবং এমনভাবে তার পরিবারকে সে খবর জানানো হয়, যে তারা খবর পায় যখন আফজলের ফাঁসি হয়ে গেছে, এমনকি ফাঁসির পরে আফজলের দেহও তার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় নি। – আমি তোকে পুরো গল্পটা বলতে পারতাম, কিন্তু বেটার হবে যদি তুই আমার ব্লগে এই নিয়ে লেখাগুলো পড়ে নিস। ওখানে আফজলের কেস নিয়ে, কাশ্মীরের কেস নিয়ে বেশ কয়েকটা লেখা আছে। কিন্তু আমি জানি, তুই আমার ব্লগ পড়বি না, আমার লেখা তোর পছন্দ হয় না – আমি জানি। আমি তাই জোরও করব না।
– না, তোর লেখা বড় বেশি র‍্যাডিকালাইজড। আমি পড়ি নি, শুনেছি তুই নাকি লিখেছিস তুই দেশপ্রেমিক নোস, জনগণমন শুনলে উঠে দাঁড়ানো পছন্দ করিস না …
– শুনেছিস। অথচ পড়ে দেখিস নি আমি সত্যিই এই কথা ঠিক এই ভাবে লিখেছি কিনা। আমার ব্লগটা ফ্রি, পড়তে গেলে লগ ইন করতে হয় না, পয়সা দিতে হয় না, তবু তুই “শুনেছিস”, পড়িস নি। সময়ের অভাব থাকতেই পারে, ইন্টারেস্টের অভাবও থাকতে পারে – এ নিয়ে আমার কিছুই বলার নেই, আফটার অল, আমার ব্লগ তুই পড়লে বা না পড়লে আমার কিস্যু যাবে আসবে না – পছন্দ বা অপছন্দ করলেও। তবে এটুকু বলি, ব্লগে শুধুই আমার লেখা থাকে না, আরও দু একজনের লেখাও আমি তাদের অনুমতি নিয়ে তুলে রেখেছি, সোহাইলা আবদুলালি, রৌহিন, মিঠুন, রবিশ কুমার – সবার লেখাই কিন্তু ঠিক র‍্যাডিকালাইজড নয়। আর সব লেখাই দেশপ্রেম বা দেশদ্রোহিতা নিয়েও নয়।
– ঠিক আছে, বাদ দে। তো আফজলের ফাঁসির বিরোধিতাই বা করবে কেন? তুইই বলছিস ওর সন্ত্রাসবাদী ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল – আর সুপ্রিম কোর্ট নিশ্চয়ই না বুঝে না বিচার করে কাউকে ফাঁসিতে ঝোলায় নি, তুই আইনের কী বুঝিস যে তুই বা তোর ওই পেয়ারের অনির্বাণ বা উমর খালিদরা সুপ্রিম কোর্টের রায়েরও বিরোধিতা করে শ্লোগান দেয়? না হয় মেনে নিলাম আফজলকে সাপোর্ট করে নি, কিন্তু ওর ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা মানে তো সুপ্রিম কোর্টকে অসম্মান দেখানো, সেটা তুই মানিস?
– মানি, আধুলি। মানার পরেও আমি প্রতিবাদ করি। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়, সেখান থেকে একবার একটা রায় বেরোলে যে তাকে আর চ্যালেঞ্জ করা যায় না, সেটুকু জানি। কিন্তু ন্যায়ালয়ও যে সবসময় ন্যায় করে না, তার উদাহরণ আমরা বারে বারে পেয়েছি। ওটা দেশের নিয়ম যে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করা যায় না, চ্যালেঞ্জ কেউ করেও নি, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তো ভগবানেরা চালায় না, চালায় তোর আমার মতই কিছু মানুষ যারা ল গ্র্যাজুয়েট, তারা তো ভুল করেই, করতেই পারে। সুপ্রিম কোর্ট এর আগে একাধিক বিতর্কিত রায় দিয়েছে, যাতে কিছু মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছে, কিছু মানুষকে সারাজীবনের মত চলে যেতে হয়েছে জেলের ভেতরে। কিছু মানুষকে অন্য ভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে। চ্যালেঞ্জ না হয় না-ই করলাম, তাই বলে সুপ্রিম কোর্ট ভুল করেছে মনে হলে, সেটা বলতেও পারবে না কেউ? … ছোট অ্যানেকডোট, সুপ্রিম কোর্টের দু-তিনজন উকিলকে আমি চিনি, একজন আবার ক্রিমিনাল লইয়ার, মেধার হিসেবে তাদের গাধা বললেও গাধাকে অপমান করা হয়। অসম্ভব বায়াসড মাইন্ডসেট, বেসিক আইন সম্বন্ধে অজ্ঞ, লজিকের থেকে ইমোশনে বেশি বিশ্বাস রাখে – এই ধরণের লোকগুলোই তো সুপ্রিম কোর্টে কেস লড়ে, প্রেজেন্ট করে বিচারপতির সামনে। সেটাকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিই কী করে? … আধুলি, আফজল গুরুর কেসটা নিয়ে অনেক বড় বড় অ্যাক্টিভিস্ট, ইতিহাসবিদ, আইনজীবি প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বৈধতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ কেউই করেন নি, কারণ সেটা করা যায় না, কিন্তু প্রশ্ন তুলেছেন। তারা সবাই কি “দেশদ্রোহী”?
– কোন অ্যাক্টিভিস্ট কোন ইতিহাসবিদ আফজলের ফাঁসির প্রতিবাদ জানিয়েছেন আমি জানি না –
– কেন জানিস না? তুই তো বললি তুইও খবরের কাগজ পড়িস, তুইও নিউজ চ্যানেল দেখিস, তা হলে আমি যা জানলাম, সেটা তুই কেন জানলি না? … কিছু জিনিস তুই জানবি না, কিছু জিনিস তুই পড়বি না, অথচ নিজের মতন করে একটা থিওরি খাড়া করে অন্য মতকে বলবি র‍্যাডিকালাইজড, জানবার বোঝবার চেষ্টাও করবি না, কিছু স্ট্যান্ডার্ড ধারণার বশবর্তী হয়ে একটা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করাকে ধরে নিবি অপরাধীকে সাপোর্ট করা – দেশের মেজরিটি মানুষ এটাই করছে, তুইও এটাই করবি?
– তা তুই কী জন্য ওদের সাপোর্ট করছিস? দেশের মেজরিটি ওদের সাপোর্ট করছে না, তাদের বিপরীতে তুই দাঁড়াতে চাস বলে, নাকি কিছু নামকরা ইতিহাসবিদ ওদের ফরে কথা বলেছে বলে? কোন্‌টা?
-কোনওটাই নয় রে আধুলি। আমি কানহাইয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মিছিলে হেঁটেছি, কানহাইয়া আমাকে চেনেও না, আমি অনির্বাণ আর উমর খালিদের মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত হওয়া মাস ডিসকাশন শুনতে জেএনইউতে গেছি, অনির্বাণ বা উমর আমাকে চেনেও না, আমি ওদের জন্য সামান্য এটুকু করেছি, যাকে সোজা ইংরেজিতে বলে সলিডারিটি, সম্পূর্ণ নিজের যুক্তি, নিজের বিবেক দিয়ে পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে আমি এই সিদ্ধান্তটুকু নিয়েছি। পরে জেনেছি, আমার মত করেই কিছু লোক ভেবেছেন, আর কিছু লোক আমার মতন করে ভাবেন নি। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়াটুকু একান্তই আমার ব্যক্তিগত যুক্তিনির্ভর ছিল। সিদ্ধান্ত আমি নিতেই পারি, আমার সিদ্ধান্ত ভুলও হতে পারে – কিন্তু তুই কথা শুরু করলি কোনখান থেকে? না, আমি অনির্বাণকে চিনি কিনা। যেন তাকে চিনলেই ঘটনাপরম্পরা বুঝে নেওয়াটা কত সহজ হয়ে যায়। না চিনলেই হিসেব মিলছে না, তাই না আধুলি?
– তা তোর মোদ্দা বক্তব্য কী? ওরা কোনও দোষ করে নি শ্লোগান দিয়ে, পুলিশ শুধু শুধু ওদের তুলে নিয়ে গিয়ে কেস দিয়েছে, তাই তো?
– তোর বড় সহজিয়ার দিকে মন, আধুলি। সব কিছু কেমন এক লাইনে নিয়ে গিয়ে শেষ করিস, যার উত্তর তোর মত অনুযায়ী হ্যাঁ বা না-তেই শেষ হতে পারে।
– হ্যাঁ, যত শক্ত জিনিস বুঝিস তুই। বিশাল বোদ্ধা।
– টন্টিং করতে চাইলে করতেই পারিস। তবে আবারও বলি, এটা একটা ঘটনাপ্রবাহ। এর পার্সপেক্টিভ আলাদা হতেই পারে। পুলিশ ওদের তুলে নিয়ে গিয়ে কেস দিয়েছে, আমি যেটার বিরোধিতা করছি। এখন এর মধ্যে “শুধু শুধু” ক্লজটা যেটা ঢোকালি – সেটা নিয়ে দুটো কথা বলার দরকার আছে। না, শুধু শুধু নয়। অনির্বাণ ভট্টাচার্য বা উমর খালিদ শ্লোগান দিয়েছে কি দেয় নি, সেটা ডিবেটেবল টপিক, তাই নিয়ে তদন্ত হতেই পারে, হোক, আমার আপত্তি নেই। ওরা দিক বা না দিক, কেউ দিয়েছে। অনেক লোক শুনেছে যে এই রকমের শ্লোগান দেওয়া হয়েছে। এইবারে আমার পয়েন্টটা আমি পরিষ্কার করে দিই – না, ভারতের বরবাদীর শ্লোগান, একজন ভারতীয় হিসেবে আমি সমর্থন করি না। যে-ই বলুক, বলা উচিত হয় নি। হ্যাভিং সেইড দ্যাট, বলা উচিত হয় নি বলেই তাকে পুলিশ তুলে নিয়ে যাবে, আদালত চত্বরে উকিল কাউকে ক্যালাবে – এইটার আমি স্ট্রং বিরোধী। না, শ্লোগান দিয়ে যারা ভুল করেছে, তাদের জন্য একবার জোরে বকা দিলেই ব্যাপারটা ওখানে মিটে যেত। শ্লোগানের ভিত্তিতে কোনও দেশ আজ পর্যন্ত বরবাদ হয়ে যায় নি যে তার জন্য থানা পুলিশ অবশি যেতে হবে। সৈকতের একটা বই পড়িয়েছিলাম তোকে, বন্দরের সান্ধ্যভাষা – মনে আছে? সেই একটা সাত বছরের মেয়ের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল – কী অপরাধে? না, সে তার বন্ধুর জামা চুরি করেছিল – তাও সেটা হিয়ারসে, প্রমাণিত হয় নি, তাতেই মেয়েটার ফাঁসির সাজা হয়েছিল। চারশো না পাঁচশো বছর আগেকার বিচারপদ্ধতি, আজ শুনলে কেমন অবাক লাগে না? ফুলচুরিও চুরি, আর জুয়েলারি কি মোবাইল চুরিও চুরি। তোর পকেট থেকে দামি মোবাইল চুরি গেলে তুই পুলিশে খবর দিবি, পুলিশ চোর ধরতে পারলে তার নামে কেস দেবে, কিন্তু ফুল চুরির ক্ষেত্রে কি তুই পুলিশ ডাকবি? না চোর ধরা পড়লে তাকে হাজতে ঢুকিয়ে দিয়ে আসবি? … একটা সামান্য প্রতিবাদের ঘটনাকে বাড়িয়ে চড়িয়ে দেশদ্রোহের রঙ লাগিয়ে – এমনকি তথাকথিত শিক্ষিত লোকেরাও যেভাবে দাপাদাপি করছে ছেলেগুলোর মুণ্ডু চেয়ে – যেটা সামান্য একজন অধ্যাপকের ভর্ৎসনাতেই মিটে যেতে পারত, আর পুরো জিনিসটাই ঘটছে রাষ্ট্রের মদতে একটা সম্পূর্ণ অন্য জিনিসের ভুল, সরলীকৃত ইন্টারপ্রিটেশনের মধ্যে দিয়ে – কী? না, ওরা ভারতের বরবাদী চেয়েছে, ওরা আফজল গুরুকে সাপোর্ট করেছে। অতএব, পেটাও ওদের, দাও ফাঁসি, পাঠিয়ে দাও পাকিস্তানে। যেখানে ঘটনাটা আদৌ সেটা নয়।
– কিন্তু আজকে যে শ্লোগান দিচ্ছে ভারতের বরবাদীর, কালকে সে-ই যে ভারতের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেবে না তার কী গ্যারান্টি আছে? আগে থেকেই তো সাবধান হওয়া ভালো, না?
– আমি আজকে তোকে দশটা খিস্তি মারলাম, কালকে তোকে যে খুন করব না তার কী গ্যারান্টি আছে? যা পুলিশের কাছে, গিয়ে দ্যাখ তো জাস্ট এই অ্যান্টিসিপেশনের ভিত্তিতে পুলিশ আমায় আজকে অ্যারেস্ট করে কিনা। … আধুলি, তুই লেখাপড়া জানা পোস্টগ্র্যাজুয়েট একটা মাঝবয়েসী লোক, তুই কী করে এই ধরণের মন্তব্য করিস? তোর মনে হয়, কাল কেউ কিছু “করতেও পারে” সেই আন্দাজের ভিত্তিতে আজকে পুলিশ কাউকে অ্যারেস্ট করতে পারে? যতক্ষণ না অ্যাকচুয়াল অর্থে ভারতের বরবাদী হচ্ছে, আর যতক্ষণ না প্রমাণ করা যাচ্ছে এই ছেলেগুলোর কারণেই ভারতের বরবাদী হয়েছে, ততক্ষণ তো কোনও কেসই দাঁড়ায় না এদের নামে!
– হুঁঃ, হতে আর কতক্ষণ। এই জেএনইউর ছেলেমেয়েগুলো তো সব রত্নবিশেষ। মাওবাদীরা পুলিশ খুন করলে এরা উল্লাস করে, মিষ্টি বিলি করে খাওয়ায়।
– অ্যাঁ??? পুলিশ মারলে … মিষ্টি? কোথায়, কীভাবে পড়লি এইসব খবর? মানে, কে বলেছে তোকে?
– কেন সিকি, তুই তো সব খবরের কাগজ পড়িস, তুই তো সব নিউজ চ্যানেলের খবর রাখিস – এই খবরগুলো জানিস না?
– বিশ্বাস কর, আমি সত্যিই জানতাম না। বলছিস যখন, আমি খুঁজে পড়ব নিশ্চয়ই, তবে এটা কবেকার ঘটনা?
– আমি নিজেও ঠিক জানি না, আমার অফিসের একজন বলছিল, মাওবাদীরা ছত্তিশগড়ে কবে যেন অনেকগুলো পুলিশ মেরেছিল ল্যান্ডমাইন ব্লাস্ট করিয়ে, সেদিন জেএনইউতে এর খুশিতে মিষ্টি বিলি করে সেলিব্রেট করা হয়েছিল।
– বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আধুলি, জেএনইউ এই ধরণের কাজ করতে পারে এটা আমার কল্পনার বাইরে, কিন্তু এটা হলে কি কোনও মিডিয়া চুপ থাকত? অ্যাট লিস্ট অর্ণব গোস্বামী তো সবার আগে লাফাত। স্টিল। আমার পয়েন্টটা আমি আবার ক্লিয়ার করে দিই – যদি এই কাজ কেউ করে থাকে, তার জন্য আমার ঘেন্না রইল, ছত্তিশগড়ের পুলিশ ধোয়া তুলসীপাতা নয়, তাদের কীর্তিকলাপ মেনস্ট্রিম মিডিয়ায় বেরোয় না, যদিও প্যারালাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের অনেক গল্পই আমি জানি, শুনলে ঘেন্নায় গা রি-রি করবে, তাই সেই গল্পে আমি যাচ্ছি না, কিন্তু তাদের মেরে ফেলার খবরে কেউ মিষ্টি খেয়ে বা খাইয়ে সেলিব্রেট করতে পারে, এটা আমার কল্পনার বাইরে। যে-ই করুক, তার প্রতি আমার কোনও রকমের সমর্থন নেই। তবে খবরের ডিটেলস-টা পেলে আমার বক্তব্য ক্লিয়ার করতে আরও সুবিধে হবে।
– সুবিধের আর কী, জেএনইউ তো সবসময়েই এই সব ভায়োলেন্সকে সাপোর্ট করে, এ তো সবাই জানে। তুইও তাই করিস নিশ্চয়ই, নইলে তুই জীবনে কখনও জেএনইউয়ের ধারকাছ মাড়াস নি, এই সময়ে জেএনইউ যেতে গেলি কেন? ওদের মিছিলে হাঁটতে গেলি কেন? ওই একই আইডিওলজি তুইও তো সাপোর্ট করিস, তাই নয় কি?
– না আধুলি, আমি ভায়োলেন্সকে সাপোর্ট করি না। কোনও অবস্থাতেই নয়।
– করিস না?
– না। করি না। এবং আমি যদিও জেএনইউয়ের কেউ নই, কোনওদিনও ছিলাম না, এটুকু বলতে পারি, ওখানকার কেউই ভায়োলেন্সকে সাপোর্ট করে না। আমি এইটুকু ওদের হয়ে বলতে পারি। ভায়োলেন্স কোনওদিন কোথাও কোনও সমাধান আনে নি, আনতে পারে না।
– সে কী কথা সিকি? চোখের সামনে উদাহরণ দেখিয়ে দিলাম, তার পরেও বলবি জেএনইউ ভায়োলেন্স সাপোর্ট করে না? ওরা মাওবাদীদের সাপোর্ট করে, সেটাই কি যথেষ্ট নয়?
– না, যথেষ্ট নয়, আধুলি। প্রথম কথা, জেএনইউ ঠিক মাওবাদীদের আখড়া নয়, ওখানে ল্যান্ডমাইন বা গ্রেনেডের চাষ করা হয় না, আর দ্বিতীয় কথা, মাওবাদের সমর্থন করা মানেই হিংসায় সমর্থন করা, ব্যাপারটা এতটাও সহজ নয়। যে সব বেল্টে মাওবাদীদের প্রাবল্য বাড়ছে, সেখানে সেইসব জায়গায় কেন বাড়ছে – সেটাও কাউন্ট করা উচিত। কিন্তু সে সব সম্পূর্ণ অন্য টপিক। আপাতত এইটুকু বলি, সিপিআই এমএল, মাওবাদী দল একটা ব্যান না হওয়া পার্টি, আনলাইক সিমি। তো, গণতান্ত্রিক দেশে একটা পার্টি, যেটা ব্যানড নয়, তার সমর্থক হওয়াটা কোনও অপরাধ তো নয়! আমার ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী, না, আমি মাওবাদীদের আইডিওলজির সমর্থক নই – ফলোয়ার হওয়া তো পরের কথা। কিন্তু কেউ সমর্থন করলেই তাকে জেলে ঢোকানোর প্রতিবাদ আমি করব। জি এন সাইবাবার জেল খাটারও প্রতিবাদ আমি করেছি। আর আমি ততবার প্রতিবাদ করব, যতবার রাষ্ট্র এইভাবে প্রতিবাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করবে বেআইনি ভাবে। রাষ্ট্র ভুল করলে, আমি একশোবার মুখ খুলব তার বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রদ্রোহিতা মানেই দেশদ্রোহিতা নয়, সেটা দরকার হলে জনে জনে বোঝাব। দেশ আর রাষ্ট্র, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা এনটিটি। আলাদা প্ল্যাটফর্ম।
– তুই কি কমিউনিস্ট?
– লে হালুয়া। এইবারে এই সিদ্ধান্তটা কোদ্দিয়ে এল?
– তোর কথাবার্তা কেমন কমিউনিস্টদের মত শোনাচ্ছে। সবসময়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বঞ্চনা, নিপীড়ন – এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তা, এতই যখন শখ, সরাসরি পার্টিতে গিয়ে জয়েন কর না!
– আধুলি, তুই আমায় বারে বারে হতাশ করছিস। আমি তো একবারও বলি নি আমি কমিউনিস্ট, বা কমিউনিস্ট নই? ইন ফ্যাক্ট, কমিউনিস্ট বলতে তুই কী বুঝিস, সেটাই আমি বুঝতে পারলাম না। যদি বলিস, কমিউনিস্ট কোনও পার্টির মেম্বার হওয়া – তো, না, আমি কোনও কমিউনিস্ট কেন, কংগ্রেস তৃণমূল বিজেপি আরেসেস শিবসেনা পিডিপি – কোনও পার্টিরই রাজনৈতিক মেম্বার নই। যদি বলিস, কমিউনিস্ট চিন্তাভাবনার শরিক, তা হলে হাতজোড় করে বলব, আমি কমিউনিস্ট চিন্তাধারার অ-আ-ক-খ জানি না, মাওয়ের বাণী পড়ি নি, লেনিন স্টালিন পড়ি নি, জানি না, দাস ক্যাপিটাল পড়ি নি, ম্যানিফেস্টো পড়ি নি, আমি সামনাসামনি কোনও হার্ডকোর কমিউনিস্টের সাথে কমিউনিজম নিয়ে কোনও কথাই বলি নি! আমি যতটুকু বললাম, যা বললাম, সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনার মাধ্যমে বললাম। অন্যায় দেখলে আমি প্রতিবাদ করবই, এবং আমি অন্যায় করলে তুই, তোরা সবাই প্রতিবাদ করবি, এটাই আমি চাইব।
– এর ফলাফলটা কী হতে পারে, ভেবে দেখেছিস, সিকি? তোর স্পাউস একজন সরকারি কর্মচারী। তোর জন্য যদি তার চাকরিতে কোনও দাগ পড়ে?
– পড়া উচিত নয়, কারণ আমার বিচারবুদ্ধি, আমার সিদ্ধান্ত, একান্তই আমার নিজস্ব। তবে এটুকুনি বলতে পারি, তার কেরিয়ারে ক্ষতি হয়, এমন কোনও কাজ আমি করব না, সেটুকু বোধবুদ্ধি আমার আছে।
– তা হলে তুই সেদিনের মিছিলে কেন গেছিলি?
– মানে? সেদিনের মিছিলটা কি সরকারবিরোধী মিছিল ছিল? সরকারকে উলটে দেবার দাবি ছিল সেখানে?
– না, কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত তো ছিল কানহাইয়াকে জেলে ঢোকানোটা …
– আবারও, আধুলি, অনেকগুলো লেয়ার আছে। পুলিশ, যারই নির্দেশে হোক, ছেলেটাকে অন্যায়ভাবে হস্টেলে ঢুকে তুলে নিয়ে গেছিল। কোর্ট চত্বরে ওকে নির্দয়ভাবে পিটিয়েছিল উকিলের পোশাক পরা কিছু গুণ্ডা। কানহাইয়ার বিচার হোক, আমিও চাই, কিন্তু ফেয়ার ট্রায়াল হোক। ও নির্দোষ হলে ওকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হোক। অনির্বাণকে মুক্তি দেওয়া হোক, উমরকে মুক্তি দেওয়া হোক, আর দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া হোক। প্রমাণিত হলে, তবেই। মিডিয়া বা মাস ট্রায়ালের মাধ্যমে শাস্তি নয়। ওটা জঙ্গলের মধ্যে মাওবাদীরা করে, ক্যাঙারু কোর্ট বসিয়ে বিচার করে আর শাস্তি দেয় নিজেদের আইডিওলজি অনুযায়ী, আমি ওই আইডিওলজির সমর্থক নই। দিল্লির মাঝখানে বসে পাতিয়ালা হাউস কোর্টে কিছু গুণ্ডা সেই রকমের ক্যাঙারু কোর্ট বসিয়ে যদি বিচার করতে যায়, আমি তার প্রতিবাদ করবই। অন্য জায়গায় থাকলে ভার্চুয়ালি প্রতিবাদ করতাম, দিল্লিতে আছি, তাই মিছিলে গেছি। সেদিন সময় ছিল, তাই গেছি। সেদিনের আগে পরে আরও অনেকবার মিছিল বেরিয়েছে, আমি যাই নি। ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সময় করে উঠতে পারি নি, আমারও কাজ আছে, অফিস আছে। আমি যদি হায়দরাবাদে থাকতাম, রোহিত ভেমুলার ঘটনার প্রতিবাদে ওখানকার মিছিলেও একবার না একবার হাঁটতাম। দেশটাকে ভালোবাসি বলেই এই প্রতিবাদটা করি। প্রতিবাদটা দেশের বিরুদ্ধে নয়, ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে। ফ্যাসিজম এইভাবেই শুরু হয়। প্রতিবাদ জারি রাখাটা জরুরি। সরকারের ফ্যাসিজমের প্রতিবাদ করার মানেই সরকারবিরোধী নয়। যদিও, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিরোধী থাকাটাও কিন্তু জরুরি। বিরোধিতা না থাকলে সেটা আর গণতন্ত্র থাকে না।


অতঃপর …

কথোপকথনগুলো নিতান্তই বাস্তব, কয়েকমাসের পুরনো, তবে আধুলি কোনও একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়। আধুলিরা একাধিক। ফেব্রুয়ারি আর মার্চ মাসে, বিভিন্ন লোকের সঙ্গে এ বিষয়ে টুকটাক যা কথা হয়েছে, সেটারই কোলাজ একসাথে করে দিলাম। বিষয়টা অনেকদিন ধরে কচলে কচলে এখন প্রায় ঘ্যানঘ্যানে হয়ে গেছে। তবুও দিলাম। দিলাম এইটা বোঝানোর জন্য – যুক্তির অবতারণা, কিংবা যুক্তির অভাব কতভাবে, কত দিক দিয়ে আমাদের ওপর এসে পড়তে পারে। কত সহজ দুই আর দুই যোগ করে চার বলে দেওয়া – এবং কতই সহজ “সবাই তো বলছে”র ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া।

দিলাম, কারণ, প্রসঙ্গরা এখনও মরে নি।

জিতেন্দর সিংহ তোমর – নামটা এখন হয় তো অনেকেরই মনে পড়বে না। বছরখানেক হয়ে গেছে কিনা। ইনি সদ্যগঠিত আম আদমি পার্টির দিল্লির মন্ত্রীমণ্ডলে আইনমন্ত্রী ছিলেন, ল মিনিস্টার। মন্ত্রীত্ব চালাবার কয়েকদিনের মাথায় তাঁর হলফনামায় লেখা ডিগ্রির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তদন্ত হয় এবং সাথে সাথে জানা যায়, ডিগ্রিগুলি জাল। তোমরকে মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করতে হয়, পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন, এবং বর্তমানে তিনি জেলবন্দী।

এক বছর আগের ঘটনা। অনেকেই হয় তো ভুলে গেছে, মনে রাখবার মত খুব একটা বড় ঘটনা নয়, অবশ্যই। কিন্তু ঘটনাটা ফের মনে এল এ বছরে একই ধরণের আরেকটি প্রসঙ্গ সামনে আসায়। এবারে সন্দেহের নজর যাঁর দিকে উঠেছে, তাঁর নাম নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

modi2apজল ঘোলা হচ্ছে, হয়েই চলেছে, আম আদমি পার্টির লোকেরাও যথাসাধ্য লড়ে যাচ্ছেন, সোশাল নেটওয়ার্কে বিভিন্ন পলিটিকাল খিল্লি এবং মেমে-তে ভরে যাচ্ছে দেয়াল, কিন্তু সন্দেহ ঘুচছে না। সন্দেহের নিরসনে প্রথমদিকে গুজরাত বা দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয় একেবারেই সাহায্য করে নি, “দেশের নিরাপত্তা”র স্বার্থে তারা প্রধানমন্ত্রীর এডুকেশনাল ডিটেলস শেয়ার করতে রাজি হয় নি প্রথমে। তার পরে কোথা অইতে কী হইয়া গেল, শ্রীযুক্ত অমিত শাহ এবং শ্রীযুক্ত অরুণ জেটলি একেবারে জনতার দরবারে হাজির হয়ে গেলেন, সঙ্গে দু দুখানি সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে। দাবি, এগুলিই নাকি প্রধানমন্ত্রীর বিএ এবং এমএর শংসাপত্র, যথাক্রমে গুজরাত এবং দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে। সন্দেহ তাতে বাড়ল বই কমল না। আগে ছিল একটি দুটি প্রশ্ন, এখন একসাথে উঠে এল আরও একগুচ্ছ প্রশ্ন। দুটি আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা বছরে ইস্যু করা সার্টিফিকেটে কী করে একই হাতের লেখা থাকতে পারে? বিএ আর এমএর সার্টিফিকেটে জন্মতারিখ একেবারে আলাদা কী করে হতে পারে? দিন, মাস, বছর, তিনটেই আলাদা আলাদা। আরও বড় প্রশ্ন, সেই সময়ের সার্টিফিকেট কম্পিউটার প্রিন্টেড কী করে হতে পারে? তাও এমন ফন্টে ছাপানো, যে ফন্ট মাইক্রোসফট বাজারে এনেছে তার প্রায় দেড় দশক পরে? আজ পর্যন্ত এমন একজনকেও সারা দুনিয়ায় কেন খুঁজে পাওয়া গেল না যিনি প্রধানমন্ত্রী মহাশয়ের সঙ্গে একই ক্লাসে বসেছিলেন, একই সাথে পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন? কেন তা হলে মোদী প্রথমদিকের ভাষণে নিজেই বলেছিলেন তিনি “দস্‌বি পাস” – দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা? আর দশম শ্রেণীর সাল থেকে কেন গ্র্যাজুয়েশনের সালের হিসেব মেলে না?

এক ঝুট কো ছুপানে কে লিয়ে দস্‌ ঝুট বোলনে পড়তে হ্যায়?

দশ কেন, একশোটা মিথ্যে দিয়েও যখন মিথ্যেটা চাপা যাচ্ছে না, তখন কী করা যায়? একটাই উপায় – পার্সপেকটিভটা বদলে দাও। ভক্তজন তো পার্সপেকটিভ বদলাতে ওস্তাদ, জেএনইউ এপিসোডে আমরা সেটা খুব ভালোভাবেই দেখেছি, সে হ্যাংওভার থেকে বেশির ভাগ দেশবাসীই এখনও বেরিয়ে আসতে পারেন নি। এবারের পার্সপেক্টিভও তাই হল – দুটো ডিগ্রি দিয়ে কী এসে যায়? মানুষটা কেমন কাজ করছেন, সেটাই মুখ্য হওয়া উচিত নয় কী? ভারতের ইতিহাসে অনেক বড় বড় রাজা বা নেতা এসেছেন, যাঁদের প্রথাগত শিক্ষাদীক্ষা কিছুই ছিল না, তবু ইতিহাস তাঁদের মনে রেখেছে দক্ষ, সু-শাসক হিসেবে। কেন দুটো ডিগ্রির কাগজ আসল না নকল তাই নিয়ে মাথার চুল ছিঁড়ে মরছি আমরা? ওতে কী বাড়তি প্রমাণ বা অপ্রমাণ হবে?

মজার কথা, শুধু যে আম-ভক্তরা এই প্রশ্ন তুলে নজর ঘোরাবার চেষ্টা করছে, তাই নয়। গত বারোই মে আনন্দবাজার পত্রিকার এই সম্পাদকীয়তেও সেই মানসিকতারই প্রতিফলন দেখা গেল – নেই কাজ তো খই ভাজ। দেশে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে সমাধান করার জন্য, প্রধানমন্ত্রীর ডিগ্রি আসল না নকল – সে সমস্যা নিতান্তই বালখিল্য অপরাপর সমস্যার তুলনায়।

খুব সঠিক কথা। আমিও একমত। তবে কি, বেসিকালি কুচুটে মন কিনা, তাই খালি খালি ওই জিতেন্দর সিংহ তোমরের কথা মনে পড়ে যায়। আমাকে কেউ দয়া করে আম আদমি পার্টির কট্টর বা মৃদু সমর্থক ভেবে নেবেন না – সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে আমার সেই একটাই প্রশ্ন, এই কথাগুলো কেন তোমরবাবুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হল না, যে, ডিগ্রিতে কী আসে যায়, তোমর কাজ কেমন করছেন সেটাই আসল বিবেচ্য হওয়া উচিত?

আনন্দবাজারের সম্পাদক বা অন্য যাঁরা এই “পার্সপেকটিভ”টা তুলে আনছেন, তাঁরা সামান্য একটা ব্যাপার ভুলে যাচ্ছেন – প্রধানমন্ত্রী মহাশয় আদপেই কতটা শিক্ষিত সেটা এই পর্যায়ে বিবেচ্য নয়। নিরক্ষর মানুষও দেশের মন্ত্রী হবার অধিকার রাখেন, যদি তিনি জনমত দ্বারা নির্বাচিত হন। প্রশ্নটা অন্যখানে। নির্বাচনের হলফনামায় ভুল তথ্য দেওয়া। তথ্য ভুল প্রমাণিত হওয়া ক্রিমিনাল অফেন্স। যিনি ভুল তথ্য দিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ান, জিতে যাবার পরেও তাঁর সাংসদ-পদ, বিধায়ক-পদ খারিজ হয়ে যেতে পারে, তাঁর জেল হতে পারে এই নির্বাচন কমিশনকে ভুল তথ্য দেবার জন্য। জিতেন্দর সিংহ তোমরের ক্ষেত্রে একদম সেই পদ্ধতিটাই অনুসরণ করা হয়েছে, কোনও ভুল হয় নি। তাই মোদী স্বয়ং যে নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া হলফনামায় সঠিক তথ্যই দিয়েছেন নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্বন্ধে, সেটা প্রমাণিত হওয়া জরুরি। এবং, লোকটি নরেন্দ্র মোদী বলেই আরও বেশি জরুরি – কারণ মিথ্যে তথ্য দিয়ে ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা করার অভ্যেস এঁর আজকের নয়, অনেকদিনের। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের হলফনামায় প্রথম তিনি লেখেন – তিনি বিবাহিত। তার আগে গুজরাতের নির্বাচনের একাধিক হলফনামায় কোথাও তিনি নিজের বিয়ের উল্লেখ পর্যন্ত করেন নি। এদিকে তাঁর বিয়ে নাকি হয়েছিল আঠেরো বছর বয়েসে, স্বেচ্ছায় কি অনিচ্ছায়, সে প্রশ্ন পরের – কিন্তু হয়েছিল।

ইতিমধ্যেই দেখছি সন্দেহবাতিকগ্রস্ত কুচুটে লোকজনদের প্রশ্নের বেগে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। রাজনীতির এটাই মজা, আজকে যে ইস্যু নিয়ে মিডিয়া থেকে জনমত সরগরম থাকে, এক সপ্তাহের মধ্যে সেই ইস্যুতে নীরব থেকে সেটাকে হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, ততদিনে নতুন নতুন ইস্যু এসে যায় বাজারে, নাচবার এবং নাচাবার জন্য। বঙ্গেশ্বরীর ইস্ট জর্জিয়া ইউনিভার্সিটি বা তুলসী-ম্যাডামের ইয়েল ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি নিয়েও একই কেস হয়েছে, এর পরে আমরা সবাই বসে বসে দেখব, এই ডিগ্রির আসল-নকলের খেলাটাও কেমন টুক করে বিস্মৃতির অন্তরালে তলিয়ে যায়, এবং অবশেষে আমরাও ভুলে যাব।

অবশ্য কিছু লোক এখনও লড়ে যাচ্ছে। ঘটনাচক্রে তারা আম আদমি পার্টির লোক। দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে আরটিআই করেছিল, সেটি সঠিক লোকের কাছে করা হয় নি, এই উত্তর দিয়ে আরটিআই ফেরত পাঠিয়েছে দিল্লি ইউনিভার্সিটি। আরটিআই করতে লাগে দশ টাকা, সেটা ফেরত পাঠানো হয়েছে সতেরো টাকার স্পিড পোস্টে।

অপেক্ষায় আছি, নতুন কী বেরোয় পরবর্তী আরটিআইতে।

Advertisements

3 thoughts on “পার্সপেকটিভের সাতকাহন

  1. I am wondering when we will get a write-up from you on any issue where you think that the current central government’s stand is/was right. I’m sure we will get such a piece soon because, as an ‘unbiased’ person, you must have identified at least a few such issues and feeling compelled to write on them.

    Like

  2. Let’s do a comparative study among the past governments and this one. I would like to understand your rating & it’s reasoning of performances based on the below parameters:

    1. Economy
    2. Job Creation
    3. National Security
    4. Foreign relations
    5. Law & Order
    6. Education
    7. Optimized Military
    8. Social development & justice
    9. Corruption & it’s impact on society & economy

    I am assuming that you would give -10/10 on the subject of communal harmony. Now, please give the grades to other governments (Cong, 3rd front). Please be honest while rating the dangerous-ness as well.

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s